বিয়ের পর পরকিয়া
মানুষ কেন পরকীয়া করে, গবেষণা কী বলছে
ভালোবাসা, সংসার, সন্তান—সবই আছে। তবু কেন মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে? কেবল শারীরিক আকর্ষণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কারণ? শিরোনামের প্রশ্নটা আপাতদৃষ্টে যতটা সহজ-সরল, আদতে এর উত্তর ততটাই কঠিন। পরকীয়া কখন থেকে শুরু হলো? এর একটাই উত্তর, যখন থেকে বিয়ের উদ্ভব ঘটেছে। রোমান্টিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল, জটিল আর বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম পরকীয়া। এর পেছনে আছে জটিল মানসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জৈবিক—এমনকি আর্থিক পরিপ্রেক্ষিত।
রোমান্টিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল, জটিল আর বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম পরকীয়া
রোমান্টিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল, জটিল আর বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম পরকীয়াছবি: পেক্সেলস
বিশ্বজুড়ে গবেষণা কী বলছে
পরকীয়া নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণাগুলোর একটি করেছে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনফিডেলিটি রিকভারি ইনস্টিটিউটের গবেষক দল। এই গবেষকেরা বলছেন, মানুষ কেবল শারীরিক আকর্ষণের জন্য নয়, অনেক সময় ভালোবাসা না পাওয়া, গুরুত্ব না পাওয়া, নতুন কিছু পাওয়ার হাতছানি বা মানসিক সমস্যার কারণেও অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
মানুষ শুধু সঙ্গীর প্রতি অসন্তুষ্ট বলেই নয়, কখনো কখনো নতুন অভিজ্ঞতার আকর্ষণ বা কৌতূহল থেকেও পরকীয়ায় জড়ায়।
ডিলান সেলটারম্যান, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির কিনসি ইনস্টিটিউটে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন ড. জাস্টিন লেমিলার। পরকীয়া, যৌনকল্পনা, সম্পর্কের বৈচিত্র্য ও যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে তিনি করেছেন উল্লেখযোগ্য গবেষণা। ‘টেল মি হোয়াট ইউ ওয়ান্ট’ বইয়ে লেমিলার লিখেছেন, ‘পরকীয়া সব সময় অসুখী দাম্পত্যের ফল নয়। অনেক সময় সুখী দম্পতির একজন নতুন অভিজ্ঞতা, বৈচিত্র্য বা উত্তেজনার খোঁজে সম্পর্কের বাইরে পা বাড়াতে পারে।’
পরকীয়া সব সময়ই স্বার্থপরতা নয়। অনেক সময় এটি মানুষের একাকিত্ব, মানসিক শূন্যতা বা ভালোবাসার অভাব পূরণের চেষ্টা।
অ্যামি রোকাচ, সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, কানাডা
গবেষণায় উঠে আসা প্রধান কারণগুলো
১. দাম্পত্য সম্পর্কে অসন্তুষ্টি: বোঝাপড়ার অভাব, অবহেলা, শারীরিক সম্পর্কে অসন্তুষ্টি ইত্যাদি কারণে মানুষ অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
২. রোমাঞ্চ ও নতুনত্বের খোঁজ: ‘একঘেয়ে’ সংসার থেকে বেরিয়ে নতুন উত্তেজনা অনুভবের জন্য অনেকে পরকীয়ায় জড়ান। গবেষণা বলছে, এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত তিন মাস থেকে দুই বছরের বেশি টেকে না।
৩. মানসিক স্বস্তি ও মুক্তি: দায়িত্ব আর দুশ্চিন্তার ভারে ক্লান্ত মানুষ অনেক সময় সম্পর্কের বাইরে গিয়ে আশ্রয় খোঁজে।
৪. ডেটিং অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম: প্রযুক্তি পরকীয়াকে আরও সহজলভ্য করেছে। পরিচয় গোপন রেখেও সম্পর্ক চালিয়ে নেওয়া যায়।
৫. কর্মস্থলের ঘনিষ্ঠতা: দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করার ফলে সহকর্মী থেকে প্রেমিক/প্রেমিকা হয়ে ওঠার ঘটনাও নতুন নয়।
৬. প্রেমে পড়া স্বভাব: কেউ কেউ বারবার প্রেমে পড়তে অভ্যস্ত। সঙ্গী যত ভালোই হোক, তাঁরা নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
৭. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) বা বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো সমস্যায় অনেকে স্থায়ী সম্পর্কে স্থির থাকতে পারেন না।
৮. স্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা: সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক সুবিধার জন্যও কেউ কেউ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে যান।
৯. অল্প বয়সে বিয়ে: ২০ বছরের আগেই যাঁদের বিয়ে হয়, তাঁদের মধ্যে পরে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
১০. শৈশবের ট্রমা: মা-বাবার ঝগড়া ও অশান্তিতে বেড়ে ওঠা সন্তানেরা অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।
১১. প্রতিশোধপরায়ণতা: অতীতে প্রতারিত কেউ অনেক সময় নতুন সম্পর্কে গিয়ে প্রতারণাকে নীরব প্রতিশোধ হিসেবে ব্যবহার করেন।
১২. অভ্যাসগত প্রতারণা: গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা একবার প্রতারণা করেছেন, তাঁদের একাধিকবার প্রতারণায় জড়ানোর সম্ভাবনা প্রবল।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বোঝা যায়, পরকীয়া কোনো একক কারণে ঘটে না। রাগ, অবহেলা, নতুনত্বের খোঁজ কিংবা ক্ষমতার অনুভূতি—নানা কারণই মানুষকে টেনে নেয় অন্য সম্পর্কে।
তবে গবেষকেরা মনে করিয়ে দেন, খোলামেলা যোগাযোগ, পারস্পরিক মনোযোগ আর প্রতিশ্রুতিই হতে পারে যেকোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
পরকীয়া সম্পর্কে কী বলে ইসলাম?
বিয়ে জীবনের পবিত্র এক অনুষঙ্গ। বিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক। আল্লাহ তাআলাই পৃথিবীতে জোড়া মিলিয়ে পাঠিয়েছেন। বিয়ের পরও শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ জড়িয়ে পড়ে পরকীয়ায়। ইসলামে পরকীয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এর শাস্তিও ভয়াবহ।
রসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কারণ, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে।
রসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কারণ, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে।
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
পরকীয়ার মতো অবৈধ সম্পর্ক কেবল আখেরাতকেই বরবাদ করে না দুনিয়ার জীবনেও রক্তপাত ও নির্মম হত্যার মতো ঘটনার উপলক্ষ্য হয়। নর-নারীর অবৈধ সম্পর্কের অনুকূল পরিবেশ সযত্নে লালন করলে সে সম্পর্কের বিষ ও দূষণ তো যখন তখন সমাজে প্রকাশ হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। নর-নারীর বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর সব রকম অবৈধ সম্পর্কের বিরুদ্ধে ইসলাম বহু দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
ইসলামের বিচার ও আইনি ব্যবস্থায় বিবাহিত নর-নারীর অবৈধ সম্পর্ককে অধিকতর কঠোর দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়েছে। আজ বিষাক্ত পরকীয়ায় মমতাময়ী মায়ের হাতে বলি হচ্ছে সন্তান। এ অবৈধ সম্পর্ক মা ও সন্তানের পরস্পরের যে বন্ধন তাতেই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। এ সব অবৈধ সম্পর্ক থেকে বাঁচতে ইসলামি শিক্ষার বিকল্প নেই। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, দাম্পত্য, যৌন-নৈতিকতা বিষয়ে ইসলামের শিক্ষার দিকে মনোযোগী না হলে সমাজে এ ধরনের অনৈতিকতা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
পরকীয়া শব্দটি বর্তমান সমাজে প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়। তাছাড়া খবরের কাগজেও আমরা অনেকেই পরকীয়া সংক্রান্ত ঘটনাগুলো সম্পর্কে পড়ে থাকি। পরকীয়া বলতে আমরা সাধারণত বিয়ের পর হওয়া অবৈধ সম্পর্ক কে বুঝিয়ে থাকি। বিবাহিত কোন নারী কিংবা পুরুষ যদি নিজের বৈধ স্ত্রী বা স্বামী থাকা সত্ত্বেও অন্য কারও প্রতি আসক্ত হয়, যেমন কোনো প্রেমের সম্পর্ক বা যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় তবে তাঁকে পরকীয়া বলা হয়।
আমাদের আজকের এই পোস্টটিতে আমরা পরকীয়া নিয়ে লেখা কিছু উক্তি, স্ট্যাটাস, ক্যাপশন, বাণী, ছন্দ ও কবিতা ইত্যাদি তুলে ধরব।
বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ মানুষ সামাজিক মাধ্যমেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের মনোভাব তুলে ধরার চেষ্টা করে, তাই আপনাদের মধ্যে যারা এই বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস, ক্যাপশন, উক্তি, ছন্দ ইত্যাদি খোঁজ করে থাকেন তারা এই পোস্টে থাকা লেখাগুলো খুব সহজেই সংগ্রহ করে নিতে পারবেন। আশা করছি এই উক্তিগুলো পাঠকদের পছন্দ মতন হবে এবং বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করার যোগ্য হবে।
সম্পর্কের দড়িটা যদি একদিকে শক্ত আর অন্যদিকে শক্ত না থাকে, তাহলে ওই ফাঁকে পরকীয়া ঢুকে পড়ে।
পৃথিবীতে যারা পরকীয়া করে তারা খানিকক্ষণের
জন্য সুখ পায়, কিন্তু শেষ পরিণতি হিসেবে সারা জীবনের জন্য তাদের কষ্ট পেতে থাকে, বলতে গেলে তারা নিজেই কষ্টকে জীবনে ডেকে আনে।
পরকীয়া মানুষকে মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ করে দেয়। এটি যেন বিষপান সম।
ভালোবাসা খুব পবিত্র ব্যাপার, কিন্তু এ ভালোবাসার মাঝে জঘন্যতম পরিস্থিতি শুরু হয়ে যায় যখন মানুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে যায়।
পরকীয়া শুধুমাত্র একটি অবৈধ সম্পর্ক নয় বরং এটি একটি কলুষিত, পাপ, অপরাধ ও অন্যায়, যার কারণে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় হাজারও সুখ দিয়ে সাজানো সংসার।
পরকীয়ার কারণে মানুষের দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে চরম অশান্তি, যার কারণে বর্তমান সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরকীয়া যে করে তার কাছে মধুর মনে হতে পারে, কিন্তু সে ব্যক্তি এর পরিণতি কী হতে পারে তা ভুলে যায়।
বর্তমান এই সমাজে মানুষ ভালোবাসা নামে শুধু চারিদিকে পরকীয়া করে বেড়াচ্ছেন, যেটা করা একটা মানুষের জন্য মোটেও উচিত না।
নিজের স্ত্রী বা স্বামীকে পরকীয়া থেকে বাচাঁনোর জন্য প্রত্যেক স্বামী ও স্ত্রী-কে তার নিজের সম্পর্কের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত !
তুমি মানুষকে এটা বলতে শুনে থাকবে যে পরকীয়া হল অবৈধ সম্পর্ক। কিন্তু আমি মনে করি যে একজন ব্যক্তি যে কোন রমণীর দিকে যদি লালসার দৃষ্টিতে তাকায়, তবে সে তার মনেই পরকীয়া করে ফেলেছে।
পরকীয়া হচ্ছে সম্পদের চরমরূপে বহিঃআক্রমণ।
আমরা যদি পরকীয়ার সত্য মূলকে খুঁজতে যাই তবে আমরা বারবার একই জায়গায় ফিরে যাব, তা হলো সৃষ্টিকর্তার সাথে একজন নারী কিংবা পুরুষের সম্পর্ক।
পরকীয়া আর বিশ্বাসঘাতকার সমাজে মানুষ এখনও কীভাবে দূরবর্তী আনুগত্যতায় বিশ্বাস বা আশা করে।
পরকীয়া প্রেম সংক্রান্ত আমাদের আজকের এই পোস্টটি ভালো লেগে থাকলে আশা করি
না বলা ভালোবাসার কিছু কথা
পরকীয়া নিজেই একটি সমস্যা এবং কোন সন্দেহ ছাড়াই বলা যায় যে এটা সময়ের সাথে আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করবে।
পরকীয়া হচ্ছে গ্লাস ভর্তি দুধের মত যাতে বিষ মেশানো থাকে। শুরুতে এটা তোমার ভালো লাগে তবে নির্ঘাত কেউ না কেউ মারা যাবে।
ভালবাসা আসলে কি তা বোঝার জন্য তোমার অনেকগুলো প্রেম থাকাটা মোটেও আবশ্যক নয়। বিয়ের আগে যারা একসাথে অনেকগুলো প্রেম করে তারা বিয়ের পরে পরকীয়া করবেনা বলে কোনো আশা করা দায়।
সংসারে অশান্তি থাকলে নাকি মানুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, কিন্তু কেউ এই অশান্তি দূর করার সঠিক চেষ্টা করে না।
পরকীয়া নামক ভুল পথে যাওয়া হয়তো খুব সহজ, কিন্তু এই ভুলের মাশুল গুনতে গিয়ে জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
কাউকে ঠকানো কোন ভুল নয় বরং এটি আমাদের ইচ্ছাই মাত্র। পরকীয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই হয়।
পরকীয়ার সম্পর্কগুলো শুধু ক্ষণিকের জন্যই সুখের অনুভূতি প্রদান করে আর ধীরে ধীরে মানুষের জীবনকে নিঃশেষ করে দিতে থাকে।
অন্য জায়গার ঘাস এখানকার ঘাসের থেকে বেশি সবুজ নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্যত্র মরুভূমির অবস্থান থাকে, কিন্তু মানুষ সেই স্থানকে ঘাসে ভরা মাঠ বলে ভুল করে। সাধারণত পরকীয়ার ক্ষেত্রে এমনটাই হয়।
যে ব্যক্তি স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন মহিলার সাথে পরকীয়া করলো, তাকে তোমরা হত্যা কর।
পরকীয়ার ফলে সমাজ নষ্ট হয় এবং মানুষের মনুষত্ববোধ নষ্ট হয় তাই এই পরকীয়াকে মানুষ ভালো চোখে দেখেন না।
তোমার বিবাহিত স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজগুলোর মধ্যে একটা। তোমার কারণে কারও প্রতারিত হওয়া উচিত নয় তা হোক শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে।
পরকীয়াকারী ও যার সাথে তা করা হয় উভয়কে এক’শ ঘা করে বেত্রাঘাত কর।
সমাজের সকলেই পরকীয়ার বিরুদ্ধে, তাও কিভাবে এই সমাজে পরকীয়া বেড়ে চলেছে!
কোন ব্যক্তি যখন পরকীয়া করে তখন তার ভেতর থেকে ঈমান বেরিয়ে যায়, এরপর তা তার মাথার উপর ছায়ার মত অবস্থান করতে থাকে। এরপর সে যখন তা থেকে তওবা করে তখন তার ঈমান পুনরায় তার কাছে ফিরে আসে।
মানসিক পরকীয়াও আমাদের সমাজে বিরাজমান। সেটা হল পত্নী ব্যাতিত অন্য কারও সাথে মানসিকভাবে ঘনিষ্ঠতা করা।
তোমরা পরকীয়ার নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।
তোমরা পরকীয়া পরিত্যাগ কর। কেননা এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে।
বর্তমানে আজকের এই সমাজের পরকীয়ার মতো জঘন্যতম পাপ ও অপরাধের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি সাজানো-গোছানো সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
পরকীয়া করে কেউ কোনোদিনও সুখ পায় না, এটি সাময়িক আনন্দ মাত্র।
পরকীয়া প্রেমের পরিণতি
লাভ নেই তাতে কোন,
আছে শুধু ক্ষতি আর ক্ষতি।
সমাজের মানুষ ঘৃণা করে অতি।
একবার যদি হয় পরকীয়া
অনেক সময় পরিণাম হয় জীবন দিয়া।
একটু সুখের আশায় কেহ
পরকীয়া প্রেমে বন্দী হয়
আসলে পরে দেখে সেটা আসলে সুখ নয়
ইসলাম তাই করছে মানা
করতে পারকীয়ার মতো প্রেম।
কঠিন শাস্তির বিধান আছে
কোরআন হাদিসের আলোকে।
পরকীয়ায় মজেছো তুমি, ভাবছো ‘আছি বেশ’।
সবুর করো কয়েকটা দিন, তারপরই সব শেষ৷
পরকীয়ার গোলকধাঁধায়, যদি একবার যাও৷
ঢোকার পথ অনেক আছে,
বেরুবার পথ নাহি খুঁজে আর পাও৷
যেতে যেতে যদি সংসার কখনও ডাকে,
ফিরে আসতে চাইলে তুমি, পড়বে গভীর খাদে৷
একপাশে সংসার তোমার, অন্যপাশে পরকীয়া৷
অপমান আর অপযশে যাবে যে ডুবিয়া৷
জীবন তখন কঠিন ভীষণ,
ভাববে মুক্তি মিলিবে একমাত্র মরিয়া৷
পরকীয়া মানে প্রেম নাকি প্রণয়?
নাকি শুধুই গোপন, নাকি অবৈধ আকর্ষণ।
পরকীয়া মানে, টানাপড়েন যন্ত্রনা,
লুকোচুরি লুকোছাপা নিরব নিস্তদ্ধ মুখ
তিক্ততায় মোড়ানো, নিষিদ্ধ সুখ|
পরকীয়া মানে নিষেধে ভরা একটি ভুল,
নিষিদ্ধ গোপন সর্ম্পক ! নাকি একাকিত্বের অবসান
নাকি প্রেমেরই জয়গান?
তোমাকে ভালোবাসি বলেই
এ প্রেম নিষিদ্ধ নয়,
বলুক তারা পরকীয়া।
তোমাকে কথা দিয়েছি,
এ রুদ্ধশ্বাসের পৃথিবী আর নয়
মুক্তো হাওয়ার দেশ দেখাবো
এবার আলিঙ্গনে আমার।
নব সূর্যের রাঙ্গা আলোকে
হবে আমাদের মিলন,
হাসুক তারা,বলুক পরকীয়া
আমরা ভালোবাসি বলেই
এ প্রেম নিষিদ্ধ নয়,হতে পারে না।
পরকীয়া সম্পর্ক নারীরাই বেশি উপভোগ করেন!
পরকীয়া শব্দটিই শুনলেই অনেকেই নাক শিঁটকান। তবে সাধারণত প্রেমের গল্পের চেয়ে পরকীয়ার গল্পগুলো অনেক বেশি মুখরোচক হয়। এই সম্পর্কে থাকার অভিযোগের আঙুল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওঠে পুরুষদের দিকে। অথচ সমীক্ষা বলছে, পরকীয়া সম্পর্কে পুরুষদের তুলনায় নারীরাই খুশি হন বেশি!
কানাডার একটি অনলাইন ডেটিং এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সার্ভিস অ্যাপ ‘অ্যাশলে ম্যাডিসন’ সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় এমনটাই দাবি করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক অ্যালিসিয়া ওয়াকারের নেতৃত্বে এক হাজার বিবাহিত পুরুষ-নারীর মধ্যে এই সমীক্ষা চালানো হয়। আর তাতেই জানা যায়, পরকীয়া সম্পর্ক নাকি নারীরা বেশি উপভোগ করেন।
‘অ্যাশলে ম্যাডিসন’-এর এই সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, যে সব নারীরা বিবাহিত জীবনে তেমন সুখী নন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারাই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছেন। এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শরীর ছাড়া আর কিছুই তেমন গুরুত্ব পায় না। পরকীয়ায় জড়িত এই নারীদের প্রত্যেকেই নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ সোজা-সাপ্টা তাদের পরকীয়া সম্পর্কের সঙ্গীকে জানিয়ে দেন।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, এই সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ নারীরাই ব্যক্তি স্বাধীনতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অধ্যাপক ওয়াকারের মতে, নিজেদের বিবাহিত জীবনের সুপ্ত বাসনা এবং প্রসমিত কামনাকে পূরণ করতেই বেশির ভাগ নারীরাই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক কথায়, নিজেদের বিবাহিত জীবনের অপূর্ণতা এবং হতাশা থেকেই বেশির ভাগ নারীরা এই ধরনের সম্পর্কে জড়ান।
ইসলামে পরকীয়ার শাস্তি
নারী-পুরুষ সবাইকেই চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৩২)
ব্যভিচারকারীদের শাস্তি হিসেবে অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারকারী নারী ও পুরুষ উভয়কে ১০০টি করে বেত্রাঘাত করো’ (সুরা: নুর ২)। এটা অবিবাহিত জিনাকারীর শাস্তি। আর পরকীয়া কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে বিবাহিত নারী-পুরুষ যদি জিনায় লিপ্ত হয়, তাদের জন্য ইসলামে আরও ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে একশ করে বেত্রাঘাত কর।’ (সুরা: নুর ২)
হাদিসে নববীতে ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কারণ, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে: তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ু সংকীর্ণ হয়ে যাবে, তার দারিদ্র্য চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে: সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।’ (বায়হাকি, হাদিস ৫৬৪)
হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বুখারি ৭৬৫৮)
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পরিবারে দেবরের সঙ্গে ভাবির সম্পর্ক। দেবরকে মৃত্যুর মতো ভয় করতে বলা হয়েছে। কঠিনভাবে হারামের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হজরত উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেয়ো না।’ এক আনসার সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? রাসুল সা. বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য।’ (মুসলিম হাদিস ২৪৪৫)
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বড় সমস্যা পরকীয়া। ব্যাপক হারে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠছে। পরকীয়ায় বলি হচ্ছে স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। প্রবাসীদের স্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ছেন এতে।
স্ত্রী পরকীয়া করলে স্বামী থেকে তালাকপ্রাপ্ত হয়ে যায়?
স্ত্রী পরকীয়া করলে স্বামী থেকে তালাকপ্রাপ্ত হয় না। তাদের বিবাহ বলবৎ থাকে। স্ত্রী গোনাহের কাজ করার কারণে তার গোনাহ হয়েছে। কিন্তু এতে করে তার বিবাহের সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। সুতরাং স্বামী স্ত্রী একসাথে বসবাস করতে কোন সমস্যা নেই। স্ত্রী যদি তওবা করে তাহলে তাকে তালাক না দিয়ে শোধরানোর সুযোগ দেয়া উত্তম। فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا ۗ [٤:٣٤] যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। (সুরা নিসা-৩৪)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّ امْرَأَتِي لَا تَمْنَعُ يَدَ لَامِسٍ قَالَ: «غَرِّبْهَا» قَالَ: أَخَافُ أَنْ تَتْبَعَهَا نَفْسِي، قَالَ: «فَاسْتَمْتِعْ بِهَا»
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে অভিযোগ করলো, আমার স্ত্রী কোনো স্পর্শকারীর হাতকে নিষেধ করে না। তিনি বললেন, তুমি তাকে ত্যাগ করো। সে বললো, আমার আশঙ্কা আমার মন তার পিছনে ছুটবে। তিনি বললেন, (যেহেতু ব্যভিচারের প্রমাণ নেই) তাহলে তুমি তার থেকে ফায়দা হাসিল করো। (সুনানে আবু দাউদ ২০৪৯, সুনানে নাসায়ি ৩২২৯)
পরকীয়ায় লিপ্ত স্ত্রীর ক্ষেত্রে করণীয় কী?
পরকীয়া স্ত্রী বা স্বামী যদি ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসে, তওবা করে, আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল। সাচ্চা দিলে তওবা করলে স্ত্রী বা স্বামীকে গ্রহণ করতে পারেন। এতে কোন সমস্যা নেই। তওবা বলা হয় তিন জিনিসকে। ক. গোনাহের কাজটি ছেড়ে দেয়া। খ. গোনাহটির জন্য লজ্জিত হওয়া। গ. ভবিষ্যতে কখনোই উক্ত পাপকর্ম না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
যদি আপনার স্ত্রী বা স্বামী তওবা করতে সম্মত না হয়, তাহলে পারিবারিকভাবে বিষয়টির সুরাহা করতে চেষ্টা করুন। আপনার স্ত্রী কী চায়? সেকি আপনার সাথে থাকতে চায়? সেকি এ অপকর্ম ছেড়ে দিবে কি না? এসব বিষয়ে পারিবারিকভাবে মিটমাট করতে চেষ্টা করুন। যদি এতেও সক্ষম না হোন তাহলে তাকে এক তালাক প্রদান করে আলাদা করে দিন। তিন তালাক কিছুতেই প্রদান করবেন না। যেহেতু এক তালাকের মাধ্যমেই বিচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হয়ে যায়, তাই একাধিক তালাক দেয়া অর্থহীন কর্ম ছাড়া আর কিছু নয়। যেন ভবিষ্যতে মিলমিশ হয়ে গেলে আবার একত্রে বসবাসের সুযোগ বাকি থাকে।
انَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا [٤:١٧]وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّىٰ إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ ۚ أُولَٰئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا [٤:١٨
অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে, এরাই হল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ।
আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে,এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সুরা নিসা-১৭-১৮)
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ ۗ وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَن يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ [٢:٢٢٩]
তালাকে-‘রাজঈ’ হল দুবার পর্যন্ত তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে। আর নিজের দেয়া সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য জায়েজ নয় তাদের কাছ থেকে। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয়, তবে উভয়ের মধ্যে কারোরই কোন পাপ নেই। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। কাজেই একে অতিক্রম করো না। মূলত যারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তারাই জালেম। (সুরা বাকারা ২৩০)
فَاتَّقُوا اللهَ فِي النِّسَاءِ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللهِ، وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللهِ، وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ، فَإِنْ فَعَلْنَ ذَلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ، وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ،
রসুল সা. বলেন, তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর। কেননা, তোমরা তাদেরকে গ্রহণ করেছো আল্লাহর জামানত এবং আল্লাহর নির্দেশে তাদের যৌনাঙ্গকে করেছো হালাল। তাদের প্রতি তোমাদের অধিকার হল, তোমরা যাকে অপছন্দ কর তারা যেন তোমাদের বিছানায় আসতে না দেয়, (তোমাদের সন্তুষ্টি ছাড়া কাউকে যেন তোমাদের গৃহে আসতে না দেয়। চাই সে পুরুষ হোক বা নারী)। যদি তারা এটা করে (অপছন্দের ব্যক্তিকে আসতে দেয়) তবে তাদের মৃদু প্রহার কর। আর তোমাদের উপর তাদের অধিকার, তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের অন্ন ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করবে। (মুসলিম ১২১৮)
আরও পড়ুন: মানসিক প্রশান্তি পেতে নবীজির শেখানো দোয়া
পরকীয়ায় লিপ্ত স্ত্রীকে বাড়িতে রাখা কি জায়েজ?
স্ত্রী পরকীয়া করার মাধ্যমে মারাত্মক গোনাহগার হলেও এতে করে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় না। তাই বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকে। এক্ষেত্রে যেহেতু স্বামী বিশ্বাস করে না যে তার স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত তাহলে এতে করে আপনাদের কোন দায়িত্ব নেই। পরকীয়ার কথা জানার পর স্বামীর অধিকার থাকে, তাকে রাখা বা তালাক দিয়ে দেয়া।
যদি আপনাদের এখানে থেকে খারাপ কাজ চালিয়ে যায়, এতে করে আপনাদের মান সম্মান নষ্ট হয়, তাহলে তাকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও এক বাড়িতে থাকায় শরয়ি কোন বিধিনিষেধ নেই।
তবে তাকে তার ঘৃণ্য গোনাহ না করা এবং খাঁটি দিলে তওবা করার আন্তরিক আহ্বান ও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّ امْرَأَتِي لَا تَمْنَعُ يَدَ لَامِسٍ قَالَ: «غَرِّبْهَا» قَالَ: أَخَافُ أَنْ تَتْبَعَهَا نَفْسِي، قَالَ: «فَاسْتَمْتِعْ بِهَا»
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে অভিযোগ করলো, আমার স্ত্রী কোনো স্পর্শকারীর হাতকে নিষেধ করে না। তিনি বললেন, তুমি তাকে ত্যাগ করো। সে বললো, আমার আশঙ্কা আমার মন তার পিছনে ছুটবে। তিনি বললেন, (যেহেতু ব্যভিচারের প্রমাণ নেই) তাহলে তুমি তার থেকে ফায়দা হাসিল করো। (সুনানে আবু দাউদ ২০৪৯, সুনানে নাসায়ী ৩২২৯)
পরকীয়ার মাধ্যমে জন্ম নেয়া সন্তানের জনক কে হবে?
শরিয়তের দৃষ্টিতে ওই মহিলার স্বামীই সন্তানের প্রকৃত পিতা বলে গণ্য হবে। তারই উত্তরসূরি হিসেবে মিরাছ পাবে। (আবু দাউদ ১/৩১০, রদ্দুল মুখতার ২/৫৫০, ফতাওয়া দারুল উলুম ১১/৫১১)
গোপনে বিয়ে করার বিষয়ে ইসলাম কী বলে?
বিয়ে করবে প্রকাশ্যে। এটি বৈধ পন্থা। এখানে লুকোচুরির কিছুই নেই। বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তে অভিভাবকের অভিমত গুরুত্বপূর্ণ। এক হাদিসে এ বিষয়ে তাগিদ দিয়ে আল্লাহর রসুল সা. বলেন, ‘অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সংঘটিত হয় না।’ (তিরমিজি ১১০১, আবু দাউদ ০৮৩)
ঘোষণা না দিয়ে, আপনজনকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করা অসামাজিক, অমানবিক ও লজ্জাজনক কাজ। এজন্য বিয়ের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা পছন্দ করে না ইসলাম। ঘটা করে ঘোষণা দিয়ে বিয়ে করার কথা বলেছেন রসুল সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো, ‘বিয়ে করবে ঘোষণা দিয়ে।’ (মুসনাদে আহমাদ ৪/৫)
পরকীয়া নিয়ে আল্লাহর সতর্কবার্তা
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে গতিতে এগোচ্ছে, ঠিক একই গতিতে ভাঙছে সামাজিক ও পারিবারিক জীবন। অর্থনৈতিক জটিলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক জটিলতা।
নব্বইয়ের দশক থেকেই মূলত দেশের পরিবারগুলো ছোট হতে শুরু করে, আর এখন? বড় শহরগুলোতে পরিবার টিকছেই না। বিয়ে ভেঙে যাওয়া এখন যেন ট্রেন্ড। কিন্তু কেন? একটাই উত্তর-পরকীয়া।
একটা সময় ছিল যখন বিয়েতে নাচ-গান ছিল ফিল্মি একটা ব্যাপার, বর্তমানে বিয়ের আগে সবাই আয়োজন করে নাচ শেখে, বিয়ের দিন পারফর্ম করে। অর্থাৎ ফিল্মি ব্যাপারগুলো এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ঠিক একইভাবে পরকীয়াও এখন আর শুধু ফিল্মে বা নায়ক-নায়িকাদের জীবনে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বস্তরে।
পরকীয়া একটি সমাজ বিধ্বংসী বিকৃত মানসিকতা। পরকীয়ার জেরে স্বামী স্ত্রীকে খুন করছে। স্ত্রী স্বামীকে খুন করে খাটের নিচের মেঝেতে পুঁতে রাখছে। পরকীয়ার মোহে খুন হচ্ছে সন্তান। এমনকি পরকীয়ায় লিপ্ত মসজিদের ইমাম সাহেব খুন করে এসে ফজরের নামাজে ইমামতি করছেন। তারপরও এ সমস্যাকে যদি আপনারা শুধুই পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর খবর মনে করে এড়িয়ে যান তবে এ বিপদ আমাদের সবার জন্যই অপেক্ষা করছে। আর যদি এটাকে আমরা বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করি, তবে এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় আমাদের ব্যক্তি জীবনে ধর্মীয় তথা ইসলামিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করা।
সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর ৩১ নম্বর আয়াতে নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখার পাশাপাশি পরপুরুষের সামনে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। স্ত্রীর সৌন্দর্য স্বামীকে তার প্রতি আনুরাগী করলে সংসারের শান্তিই বাড়বে। পক্ষান্তরে নারীর সৌন্দর্য তার স্বামী ছাড়া অন্যকে আকর্ষণ করলে তা কেবল অশান্তিই বাড়াবে।
ইসলামে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে নারী-পুরুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোনো নারীর পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। সূরা আহজাবের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারীদের পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। যাতে নারীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কোনো পুরুষ আকর্ষণবোধ না করেন। যদিও এ আয়াতটি নবীর স্ত্রীদের উদ্দেশে করে নাজিল হয়েছিল, তবে তা সব মুমিনের বেলায় প্রযোজ্য।
সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ পুরুষ-নারী সবাইকে চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ। ‘ (সূরা বনি ইসরাইল, ৩২)
সূরা নূরে ব্যভিচারের শাস্তি উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে একশ ঘা করে বেত্রাঘাত কর। ’ (সূরা নূর, ২)
রাসুলুলুল্লাহ (সা.) ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে মুসলমানরা! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কেননা এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে, তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য বিনষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং তার দারিদ্র্য চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে, সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। ‘ (বায়হাকি, হা নম্বর-৫৬৪)
স্ত্রীদের তাদের দেবরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার ক্ষেত্রেও সাবধনতার বিধান রেখেছে। হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেও না। ’ এক আনসার সাহাবি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? নবীজি (সা.) বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য। ’ (মুসলিম, ২৪৪৫)
তাহলে বুঝতেই পারছেন ইসলাম সর্বক্ষেত্রে পরকীয়ার মতো ব্যভিচার থেকে বিরত থাকতে বলেছে। এর বিপরীতে কঠিন শাস্তির বিধান রেখেছে। আল্লাহ আমাদের জৈবিক চাহিদা, স্বাভাবিক প্রবৃত্তি আর শয়তানের প্রলোভন সব বিষয়ে অবগত। তাই তার দেওয়া বিধানের পরিপূর্ণ অনুসরণ আমাদের জীবনকে করবে সহজ ও সাবলীল।
আসুন আমরা সেই চেষ্টা করে যাই। আল্লাহ আমাদের সবার পারিবারিক জীবনকে হেফাজত করুক। আমিন।
ইসলামে পরকীয়ার শাস্তি কী
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু পাপ রয়েছে যা বারবার মানুষের পতনের কারণ হয়েছে। পরকীয়া, ব্যভিচার ও অবৈধ প্রেম তার অন্যতম।
ইসলাম একে শুধু গুনাহ নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতা ও সভ্যতার জন্য মরণব্যাধি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবুও আজকের পৃথিবীতে অনেকেই এটিকে আর অপরাধ মনে করে না।
আধুনিকতার নামে, ভালোবাসার ছদ্মবেশে মানুষ সহজেই জড়িয়ে পড়ছে অবৈধ সম্পর্কে। অথচ কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে—“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং বিপজ্জনক পথ।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ সম্পর্ক কেবল শারীরিক মিলনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রেমের নামে গোপন যোগাযোগ, ডেটিং, অশ্লীল আলাপ, হাত ধরা, চুম্বন কিংবা অন্তরঙ্গ আচরণ—এসবকেও জিনার ভূমিকা হিসেবে গণ্য করা হয়।
এ কারণেই শরীয়তে বলা হয়েছে, এগুলোও গুনাহ এবং মানুষকে মূল জিনার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তবে এ ধরণের সম্পর্কের জন্য কুরআন ও হাদিসে নির্দিষ্ট হদ্দ শাস্তি নির্ধারিত হয়নি।
এর বিচার নির্ভর করে রাষ্ট্রপ্রধান বা বিচারকের ওপর, যিনি সমাজের কল্যাণের জন্য অপরাধীকে তাআযীর (সতর্কতামূলক) শাস্তি দিতে পারেন।
তাআযীর শাস্তি পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্কবার্তা, কারাদণ্ড, জরিমানা বা অন্য কোনো ব্যবস্থা হতে পারে, যা মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখবে।
কিন্তু যখন কেউ প্রকৃত জিনায়—অর্থাৎ অবৈধ যৌন মিলনে—লিপ্ত হয়, তখন এর শাস্তি ইসলামে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। যদি কেউ অবিবাহিত অবস্থায় এ অপরাধ করে, তবে তার শাস্তি হলো প্রকাশ্যে একশত বেত্রাঘাত।
কুরআনে সূরা আন-নূর (আয়াত ২)-এ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে। ইসলামের উদ্দেশ্য এখানে কেবল অপরাধীকে দণ্ড দেওয়া নয়, বরং সমাজের সামনে একটি ভীতিকর সতর্কবার্তা হাজির করা, যাতে অন্যরা এ পথে হাঁটতে সাহস না করে।
অন্যদিকে, যদি কেউ বিবাহিত হয় এবং বৈধ বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও জিনায় লিপ্ত হয়, তবে তার অপরাধ বহুগুণে ভয়ংকর। এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড—প্রস্তরাঘাত বা রাজম।
নবী করিম সা.-এর যুগে এই শাস্তি কার্যকর হয়েছে, তবে অত্যন্ত কঠিন শর্তের ভিত্তিতে। অপরাধীকে স্বেচ্ছায় বারবার স্বীকারোক্তি করতে হতো, অথবা চারজন বিশ্বস্ত সাক্ষীকে প্রত্যক্ষদর্শী হতে হতো।
এ থেকে বোঝা যায় যে, ইসলাম শাস্তি দেওয়ার জন্য উদগ্রীব নয়, বরং এ শাস্তির ঘোষণা দিয়ে মানুষকে ভীত ও সতর্ক করে সীমারেখার ভেতর রাখাই মূল লক্ষ্য।
ইতিহাসও আমাদের সতর্ক করছে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে ছিল নৈতিক অবক্ষয় ও পরিবার ভাঙনের অগ্নি। গ্রীস শক্তি হারিয়েছিল অবাধ যৌনাচার ও অনৈতিকতার কারণে। অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ সময়েও অভিজাত সমাজে অবৈধ সম্পর্কের প্রসার তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। পরিবার যখন ধ্বংস হয়, তখন সভ্যতাও পতনের দিকে ধাবিত হয়। আজকের সমাজেও অবস্থা ভিন্ন নয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পরিবার আদালতের নথি বলছে, বিচ্ছেদের মামলার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পরকীয়া। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি দশটি তালাকের মধ্যে চারটির পেছনে রয়েছে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ। পাশ্চাত্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, সেখানে শতকরা বিশ শতাংশের বেশি শিশু জন্ম নিচ্ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে। এর সামাজিক প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করতে হচ্ছে।
পরকীয়া ছাড়ার উপায় বললেন ‘পরকীয়া বিশারদ’
পরকীয়া ছাড়ার উপায় বললেন ‘পরকীয়া বিশারদ’
পরকীয়া ‘আসক্তি’ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে দাবি করেছেন পরকীয়া বিশারদ খ্যাত ৪৩ বছর বয়স্ক ক্যালিফোর্নিয়ার রেস ডেভিস। তার মতে, কোনও সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, কোনও বেদনা ভোলার জন্য, অফিসে অতিরিক্ত কাজের চাপ কিংবা পরিবারে কোনও সমস্যা হলে দম্পতির একজন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।
যাঁরা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন, তাঁদের সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেন রেস। দাম্পত্য জীবনে কোথায় গলদ হচ্ছে তা বোঝা বেশ মুশকিল। রেসের মতে, ‘আমি স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারি। বিয়ের বাইরে অন্য কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তৈরি হয় আসক্তি! ব্যক্তির মস্তিষ্কে ডোপামাইন নামক রাসায়নিকের ক্ষরণ হয়, যা আসক্তির মূল কারণ।’
পরকীয়া থেকে মুক্তি যেভাবে
রেসের মতে, আমি দম্পতিকে সত্য কথা বলি। যিনি ধোকা দিচ্ছেন, তাঁকেও সত্যটা দেখাই এবং যাঁকে ধোকা দেওয়া হচ্ছে, তাঁকেও সত্য বলি। যখন কেউ পরকীয়ায় জড়ান, তখন তাঁর মনে হয়ে আমি আমার স্ত্রী বা স্বামীকে আর ভালোবাসি না! অথচ মনের কুঠুরিতে ভালোবাসা কিন্তু থেকেই যায়। আমি সেই ভালোবাসার কথাই ওঁদের মনে করিয়ে দিই।
তা নিয়ে তাঁদের দাম্পত্যে কলহ হয়। রেসে বলেন, ‘তখন আমি কোনও মনোবিদের কাছে যাইনি। নিজেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। ভাগ্যবশত আমার বন্ধুরা আমাকে পরকীয়া থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁরাই আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, আমি ভুল কাজ করছি। আমি এ নিয়ে নানা পড়াশোনা করি। আমি শেষপর্যন্ত বুঝতে পারি একমাত্র লোকের সঙ্গে কথা বলেই এর সমাধান সম্ভব। তাই আমি দম্পতিদের সঙ্গে কথা বলি। তাঁদের সমস্যা শুনি ও সমাধান দিই।’
পরকীয়ায় আসক্তির কারন ও বাঁচার উপায়
পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্ক- বাঙালির মনে এক আশ্চর্য অনুভূতি জাগানো সম্পর্কের নাম। পরকীয়াকে অনেকটা মৌসুমী ফলের সাথে তুলনা করা যায়।মৌসুমী ফল দেখলেই যেমন খেতে ইচ্ছে করে, তেমনি পরকীয়া শব্দটি শুনলেই মনটা এক অন্যরকম অনুভূতিতে জেগে ওঠে। পরকীয়া সম্পর্ক কিন্তু নতুন কোনো বিষয় নয়! বর্তমান বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশেও এখন এর প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরকীয়ার গোপন বাসনা হৃদয়ে পোষণ করে না, এমন মানুষ হয়তো বিরল। কিন্তু কেন এই পরকীয়া সম্পর্ক? কেন এটি গড়ে উঠছে? এটাকে রোধ করার উপায়ই বা কি?
কেন পরকীয়া প্রেম দিন দিন বাড়ছে?
পরকীয়া প্রেম হচ্ছে, বিবাহিত জীবন থাকা স্বত্ত্বেও অন্য কোনো নারী বা পুরুষের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকাণ্ড। বেশির ভাগ পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠে নারী বা পুরুষের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটানোর জন্য। এই পরকীয়ার ছোবলে একটি সুন্দর সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে নিমষেই, এর ফলাফল, কোন সন্তান হারায় তার প্রিয় মা/বাবাকে, কোন স্বামী হারায় তার স্ত্রীকে এবং কোন মা হারায় তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা একটি পরিবার। আমাদের সমাজ এবং ধর্মেও এই পরকীয়া সম্পর্ককে অবৈধ সম্পর্ক হিসেবে বলা হয়েছে।
পরকীয়ার কারণ কম বয়সে বিয়ে
এটি সাধারণত লাভ ম্যারেজের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।দেখা যায়, পরিবারের মতামতকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেক ছেলে-মেয়ে কম বয়সেই বিয়ে করে ফেলে। এই সময়ে ছেলে বা মেয়ের মধ্যে যুক্তির চেয়ে আবেগই বড় হয়ে দেখা দেয়। যার ফলে বিয়ের কিছুদিন পরই স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন রকমের মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং এই সময়েই সেই তারা পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ে।
বেশিরভাগ মানুষই লাভ ম্যারেজের সম্পর্ক বেশিদিন আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না, খুবই সামান্য বিষয়ে দাম্পত্য কলহ দেখা দিলেই স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি মনোযোগ বা আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর না হলে একই ছাদের তলায় থাকলেও একসময় মন হাঁপিয়ে ওঠে যার ফলাফল হয় পরকীয়া।
পরকীয়ার কারণ দৈহিক চাহিদা
বিবাহিত জীবনে শারীরীক চাহিদা প্রধান। শারীরিক সম্পর্ক মানুষের একটি স্বাভাবিক চাহিদা। কিন্তু সবসময় প্রত্যাশা অনুযায়ী সবার শারীরিক সক্ষমতা এক থাকে না। ফলে সেখানে স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্কে অতৃপ্তি থাকে। আবার যদি স্বামী ও স্ত্রী সমবয়সী হয় অথবা স্বামীর থেকে স্ত্রী যদি বয়সে বড় হয় তখনও সমস্যা দেখা দেয়। এ কারণে স্বামী বা স্ত্রী বাইরের অন্য কারো সাথে পরকীয়া তে আসক্ত হয়ে পড়ে।
সঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলা
বিয়ের পর প্রত্যেকেই সঙ্গীর কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করেন। অনেকেই এমন অনেক আশা নিয়ে বিয়ে করেন যা দাম্পত্য জীবনে পূরণ হয় না। অনেক পুরুষ নিজের জীবনে একজন নারী থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীর মধ্যে নতুন স্বাদের সন্ধান করে। তাছাড়া অনেক সময় সঙ্গীর উদাসীনতার কারণে পরকীয়া তে আগ্রহ বাড়ে।
অনেকই আছেন যারা একঘেয়ে জীবন-যাপন করতে পছন্দ করে না। প্রতিদিন একই চেহারা, একই আচরণ দেখে তারা একসময় বিরক্তবোধ করেন, অনেকেই নিজের সঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন। অনেক স্বামীই চাকরিসূত্রে স্ত্রীর থেকে দূরে থাকেন। তখন শুধু যৌনসম্পর্ক নয় বরং তাদের মধ্যে শুধু যোগাযোগটাও ঠিক মত হয়ে ওঠে না। আবার সন্তান হওয়ার পর অনেক মেয়ে মোটা হয়ে যায়। এতে স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে অনেক স্বামীর। সংসার নামক বন্দিজীবনে একটুখানি বৈচিত্র্যের ছোঁয়া পেতে তখনই তারা পরকীয়া এর পথে পা বাড়ান।
পরকীয়া সম্পর্কের পেছনে মানসিক কারণ
প্রিয় মানুষ প্রচণ্ড কষ্ট দিলে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই খারাপ অবস্থায় তারা একটা সাহায্যের হাতের সন্ধান করে হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সাহায্যের হাতটা আসে তৃতীয় পক্ষ থেকে যে কারণে সঙ্গীর অগোচরেই পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে যায় আরেকজন। কখনো দেখা যায় স্বামী বা স্ত্রী রেগে গিয়ে জেদের বশে অথবা শুধু সঙ্গীকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মনোবিদরা বলেন, যাদের মধ্যে বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার আছে, তাদের পরকীয়া সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশী দেখা যায় কারণ তারা কোনো কিছুর মধ্যে স্থিরতা খুঁজে পায় না।
পরকীয়ার কারণ দাম্পত্য কলহ
পরকীয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংসারে ঝগড়া-বিবাদ অন্যতম। সংসারজীবন সব সময় মধুর হয় না। দাম্পত্য জীবনে ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি হয়েই থাকে, কিন্তু সেজন্যে ভালোবাসা কমিয়ে দেওয়া বা কেয়ার না করা মোটেও ভাল কথা না। সামান্য ঝগড়া থেকে শুরু করে মাঝে মধ্যে যখন গায়ে হাত তোলার ঘটনা ঘটে তখনই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মানসিক শান্তির জন্য অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রী চেষ্টা করেন অন্য পুরুষ বা নারীকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করানোর। পরকীয়া প্রেমের সবচেয়ে বড় সুবিধাটা হলো সেখানে কোনো দায় দায়িত্ব থাকে না বা কোনও কমিটমেন্ট করতে হয় না।
যথেষ্ট সময় না দেওয়া
নিজের পরিবারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে পরিবারের একজন বা দুজনেই ছোটাছুটি করেন। দিনশেষে দেখা যায় অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে গিয়ে নিজেদেরকে সময় দিতে পারেন না তারা। পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অনেক অশান্তি সৃষ্টি হয়। আর আমাদের দেশে তো একটি কথা ব্যাপক ভাবে প্রচলিত আছেই- স্বামী বিদেশে থাকলে স্ত্রীরা পরকিয়া করে। কথাটি পুরোপুরি সত্য না হলেও এটা মানতেই হবে যে, দূরত্ব একটা মজবুত সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় তৃতীয় পক্ষ এসে থাকে। আর অবস্থা বেশি খারাপ দিকে যেতে থাকলে পরকীয়া থেকে মাঝে মাঝে বিচ্ছেদের পথেও মোড় নেয়।
পরকিয়ার কারন পোরনো অভ্যাস
বিয়ের আগে অনেকর অভ্যেস থাকে একাধিক সম্পর্ক বয়ে চলার। অনেকের মধ্যে এই বদ অভ্যাস বিয়ের পরও থেকে যায়। তখন তারা অভ্যাসবশত বা অনেকে শখ থেকেও পরকীয়া সম্পর্কে জড়ায়। অনেকের মধ্যে শখ থাকে আরেকটা শরীর কেমন সেটা জানার। যেমন- একটি মেয়ের মধ্যে কি এমন আছে যে সে তার পুরুষ সঙ্গী তাকে নিয়ে এত সুখী। এই ধরনের লিপ্সা থেকে পুরুষের মনে আসে অন্যের স্ত্রীর প্রতি, অন্য নারীর প্রতি আসক্তি।
বিয়ে পরবর্তী জটিলতা
অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ এ অনেক সময় অভিভাবকরা ভাল-মন্দ কোনো কিছু না দেখে-শুনে তাড়াহুড়ো করেই তাদের সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দেন। যার ফলে ভবিষ্যতে তাদের ছেলে-মেয়েদের বিবাহিত জীবন সুখের হয় না। বিয়ের পর একটা সন্তান পরিবারে আসার পর মূলত সন্তানদের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সন্তানদের নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকার কারণে স্বামী-স্ত্রী কেউই একে অপরকে সময় দিতে পারেন না যার কারণে আগের মত সেই ভালবাসা থাকে না। আর তখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পরবর্তীতে তারা পরকীয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
কিছু পুরুষ বা নারী তার ক্যারিয়ারে দ্রুত প্রমোশনের জন্য তাদের অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে পরকীয়া সম্পর্কে লিপ্ত হন। তারা মনে করেন এতে করে তারা চাকরিতে অনেক সুযোগ সুবিধা পাবেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণই ভুল চিন্তা!
পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার উপায়
অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও যেহেতু এই সমস্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছে, সুতরাং এগুলো দ্রুত প্রতিকার করতে হবে। একমাত্র কেবল মানুষ নিজেই পারেন এই সমস্যার সমাধান করতে। আবেগ দিয়ে নয়, বরং বিবেক দিয়ে প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন
পরকীয়া ভেঙে বেরিয়ে আসতে হলে সবার আগে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। আপনাকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি সত্যিই সম্পর্ক শেষ করতে চান তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা করুন। চাইছেন, অথচ বার বার ফিরে এসে সময় নষ্ট করছেন এমনটা হলে কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। দেরি না করে তাই আপনার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিন।
সম্পর্ক ছিন্ন করুন
পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে প্রথমেই সেই পুরুষ বা মহিলার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করুন। যে কোনও সম্পর্ক শেষ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সরাসরি কথা বলা। যদি সরাসরি জানাতে না পারেন তাহলে ফোনে বা ম্যাসেজে লিখে বিনীত ভাবে জানান। তাকে বুঝিয়ে বলুন যাতে সে পরে ও আপনার সাথে সম্পর্ক না রাখার চেষ্টা করে। পালিয়ে গিয়ে বা দোষারোপ করে সম্পর্ক শেষ করতে গেলে ফলাফর উল্টো হতে পারে।
পরকীয়া থেকে দূরে থাকতে আলোচনা করুন
কেন পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন আগে সেই কারণটা বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর দু’জনে আলোচনার মাধ্যমে ঠান্ডা মাথায় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই বিশেষ সমস্যাটি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। আপনার আচরণ, কথা সব কিছুতেই যেন ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে । কারণ অনেকই আছেন যে মুখে বলে ভালোবাসে কিন্তু কাজের সময় দেখা যায় সঙ্গীর কথার কোন মূল্যায়ন করে না। কাজেই স্ত্রীকে সত্যিকার অর্থে ভালবাসুন। স্ত্রীকে পরকীয়া থেকে বাঁচতে এবং একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু দাম্পত্য জীবন এবং শান্তিপূর্ণ সংসার পেতে সঙ্গীর চাহিদার মূল্যায়ন করুন।
সঙ্গীকে নতুনভাবে ভালোবাসুন
নিজেদের মধ্যে কথা বলে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করুন। যেই কারণেই আপনি পরকীয়া তে জড়িয়ে পড়েন না কেন তা শুধরাবার চেষ্টা করুন। সঙ্গীর বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা করুন। তার জন্য সবসময় সত্য কথা বলুন ও সৎ থাকুন। আপনার স্বামী বা স্ত্রীর আপনার জন্য কী করেছেন ভাবুন। পরিবারে নিজের গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করুন। নতুন দায়িত্ব নিন। এতে আপনাদের সম্পর্ক আবার আগের মত ভালো হয়ে যাবে।
পরকীয়া সম্পর্কের শেষ কথা
স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক প্রেম-ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার সম্পর্ক । কাজেই বিয়ের মাধ্যমে বন্ধনে আটকে গেছে বলেই যে ভালোবাসার বন্ধন সবসময় থাকবে এমনটা ভাবা বোকামি । একবার বিয়ে করেই এই সম্পর্ককে শুধু স্রোতের দিকে ছেড়ে দিলেই হবে না বরং একে লালন করতে হবে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই।
পরকীয়া থেকে বাচাঁর উপায় :
ইসলাম মানব জাতির পরিপূর্ণ জীবন বিধান। সকল সমস্যার সুন্দর সমাধান রয়েছে ইসলামে। তাই পরিবার বিধ্বংসী পরকীয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ইসলামে রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা। নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করার মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজেকে পরকীয়া থেকে বাঁচাতে পারেন।-
১. আল্লাহকে ভয় করা : প্রকৃত আল্লাহভীতি মানুষকে সকল প্রকার পাপাচার থেকে বিরত রাখতে পারে। আবূ যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন,اتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ، ‘তুমি যখন যেভাবে থাকবে, আল্লাহকে ভয় করবে। কোন পাপ কাজ হয়ে গেলে সাথে সাথেই ভালো কাজ করবে। কারণ ভালো কাজ পাপকে মুছে দিবে। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করবে’।[1] এক্ষেত্রে পরকীয়ার দুনিয়াবী শাস্তির পাশাপাশি পরকালীন শাস্তির কথা স্মরণে রাখতে হবে এবং সৎপথে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। অতএব মুমিন পুরুষ-নারীদের উচিত কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন যাপন করা।
২. অশ্লীল বিনোদন পরিহার করা : পরকীয়া থেকে বিরত থাকার জন্য অশ্লীল নাটক, সিনেমা, গান-বাজনা, টিভি, ইন্টারনেট, বিজ্ঞাপন, কুরুচিপূর্ণ সাহিত্য, কবিতা, উপন্যাস ও অসৎসঙ্গ তথা যৌন উত্তেজক সব মাধ্যম থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ যৌন উত্তেজক এসব বিষয়গুলো মানুষের কু-প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনাকে বাড়িয়ে দেয়।
৩. বিবাহের পূর্বে পরস্পর দেখাদেখি করা : বিয়ের পূর্বে পাত্র-পাত্রী শরী‘আত সম্মত উপায়ে পরস্পরকে দেখবে। এতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে মহববত সৃষ্টি হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলল, আমি আনছারদের এক মেয়েকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক। তিনি বললেন, ‘তুমি তাকে প্রথমে দেখে নাও। কারণ আনছার মহিলাদের চোখে দোষ থাকে’।[2] তিনি আরো বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোন পাত্রীকে প্রস্তাব দিবে সম্ভব হ’লে সে যেন পাত্রীকে দেখে নেয়। যা বিবাহের জন্য সহায়ক হবে’।[3] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘পাত্রী দর্শনে পরস্পরে মহববত সৃষ্টি হয়’।[4] তিনি আরো বলেন,إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ امْرَأَةً فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَيْهَا إِذَا كَانَ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَيْهَا لِخِطْبَتِهِ وَإِنْ كَانَتْ لاَ تَعْلَمُ، ‘তোমাদের কেউ কোন নারীর প্রতি বিয়ের প্রস্তাব প্রদানের পর তাকে দেখলে কোন গুনাহ হবে না, যদিও তার অজান্তেই দেখে’।[5]
৪. ছেলে-মেয়ের সম্মতিতে বিয়ের ব্যবস্থা করা : বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর সম্মতি থাকা যরূরী। আর পরকীয়া থেকে সমাজকে বাঁচাতে হ’লে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে বিয়ের পরে তাদের মধ্যে মহববত পয়দা হবে। অনেক পরিবার এক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব দেয় না বা তাদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। অথচ এটা ইসলাম বিরোধী। মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে, তোমরা বলপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকারী হবে’ (নিসা ৪/১৯)। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ وَلاَ تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ وَكَيْفَ إِذْنُهَا قَالَ أَنْ تَسْكُتَ. ‘কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি।[6] এমনকি মেয়েকে অভিভাবক তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ দিলে মেয়ে বিবাহ নাকচ করতে পারে। খানসা বিনতু খিযাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তার পিতা তাকে বিয়ে দিলেন, এতে তিনি সস্মত ছিলেন না। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে অভিযোগ করলে তিনি ঐ বিয়ে নাকচ করে দেন।[7]
৫. বিয়েতে সমতা রক্ষা করা : বিয়েতে বর ও কনের মধ্যে সমতা বা সাদৃশ্য রাখার দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। বয়স, সম্পদ, দ্বীনদারী, বংশমর্যাদা ও আর্থিক দিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমতা হ’লে দাম্পত্য জীবন সুন্দর হয়। আর দাম্পত্য জীবন সুখের হ’লে পরকীয়া থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, تَخَيَّرُوْا لِنُطَفِكُمْ وَانْكِحُوا الأَكْفَاءَ وَأَنْكِحُوْا إِلَيْهِمْ. ‘তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ কর এবং সমতা (কুফূ) বিবেচনায় বিবাহ কর, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো’।[8]
৬. বিয়ের পর মানিয়ে নেওয়া : দু’টি ভিন্ন পরিবারের দু’জন ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিবাহের পর দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সাথী হয়তো অনেকই পান না। ফলে তারা অধৈর্য হয়ে যান, আবার বিভিন্ন চাপে বিবাহ বিচিছন্নও করতে পারেন না। অথচ ইসলাম এক্ষেত্রে মানিয়ে নেওয়া ও ছাড় দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,فَإِنْ كَرِهْتُمُوْهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوْا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيْرًا، ‘যদি তোমরা তাদের অপসন্দ কর, (তবে হ’তে পারে) তোমরা এমন বস্ত্তকে অপসন্দ করছ, যার মধ্যে আল্লাহ প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন’ (নিসা ৪/১৯)। তাই স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য হবে দুনিয়ার অল্প সময় ও আখেরাতের দীর্ঘস্থায়ী নে‘মতের দিকে লক্ষ্য রেখে যেকোন বিষয়ে ছাড় দিয়ে মানিয়ে নেওয়া। এতে পরকীয়া থেকে বাঁচা যাবে।
৭. পরিবারে ইসলামী শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা : পরিপূর্ণ ইসলামী পরিবেশ ও ইসলামী শিক্ষা পরকীয়ার মত পরিবার বিধ্বংসী পাপ থেকে নারী-পুরষকে রক্ষা করতে পারে। ইসলামী শিক্ষা, পর্দা প্রথা, দৃষ্টি নিমণগামী রাখার নির্দেশ, বিনা প্রয়োজনে মাহরাম থেকে দূরে থাকার বাস্তবধর্মী আমলগুলোই মানুষকে পরকীয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
৮. পরস্পরকে ক্ষমা করা, ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করা ও সংশোধন করে দেওয়া : ছোট ছোট বিষয়ে মনোমালিন্য, ঝগড়া-বিবাদ থেকেই পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম হয়। ফলে একটু সুখের আশায় মানুষ পরকীয়ার দিকে পা বাড়ায়। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছোট-খাটো ভুল-ক্রটিগুলো ক্ষমা করে পরস্পরকে সংশোধন করে দিতে হবে।
৯. গায়র মাহরাম থেকে দূরে থাকা: মাহরাম নয়, এমন পরপুরুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ না রাখা। কেননা চারিত্রিক নির্মলতা ও মানসিক পবিত্রতা রক্ষায় এটি খুবই যরূরী। শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে।[9] কোন গায়র মাহরাম মহিলার সাথে একাকী অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অশ্লীল কাজে লিপ্ত করা শয়তানেরই কাজ। এজন্যই শরী‘আত উক্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ، ‘কোন পুরুষ একজন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হ’লে তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয় শয়তান’।[10] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يَدْخُلَنَّ رَجُلٌ بَعْدَ يَوْمِى هَذَا عَلَى مُغِيْبَةٍ إِلاَّ وَمَعَهُ رَجُلٌ أَوِ اثْنَانِ ‘আমার আজকের এই দিনের পর থেকে কোন পুরুষ একজন বা দু’জন পুরুষ সঙ্গী ব্যতীত কোন স্বামী থেকে দূরে থাকা মহিলার সাথে নির্জনে দেখা করতে পারবে না’।[11]
১০. পরিপূর্ণ পর্দা করা : পরকীয়া থেকে বাচাঁর অন্যতম উপায় হ’ল পরিপূর্ণ পর্দা মেনে চলা। বেপর্দা হয়ে চলাচলের কারণে একে অন্যের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, নিজেদের মধ্যে অবৈধ ভাব বিনিময় হয়, স্বামী-স্ত্রীর দুর্বল দিক নিয়ে কথা হয় এবং পরবর্তীতে পরকীয়ার দিকে ধাবিত হয়। মুসলিম মহিলাদের উপর পর্দা ফরয করে মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِيْنَ يُدْنِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُوْرًا رَحِيْمًا، ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিনা স্ত্রীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের বড় চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (আহযাব ৩৩/৫৯)।
১১. প্রয়োজন ছাড়া গায়র মাহরামের সাথে সাক্ষাৎ না করা : স্বামীর বা নিজের নিকটাত্মীয় তথা দেবর, ভাসুর, চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো ও খালাতো ভাই, ভগ্নিপতি (দুলাভাই) বেয়াই প্রভৃতি ব্যক্তিদেরকে নিজ ঘরে প্রবেশের সুযোগ না দেয়া। বিনা প্রয়োজনে তাদের সাথে যোগাযোগ বা দেখা-সাক্ষাৎ না করা। একান্ত প্রয়োজন হ’লে পূর্ণ পর্দার সঙ্গে সামনে না এসে আড়াল থেকে কথা বলা। সামনাসামনি হ’লে দৃষ্টি নিমণগামী রাখা। আল্লাহ বলেন,قُلْ لِلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ، ‘তুমি মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতর। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত’ (নূর ২৪/৩০)। মহানবী (ছাঃ) বলেন, زِنَا الْعَيْنِ النَّظَرُ ‘চোখের যিনা দৃষ্টিপাত করা’।[12]
পরকীয়া থেকে বাঁচতে পুরুষদের ন্যায় মহিলারাও বেগানা পুরুষের পানে কুমতলবে তাকাবে না। আল্লাহ বলেন,وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ‘আর তুমি মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান সমূহের হেফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে যেটুকু বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পায় সেটুকু ব্যতীত’ (&নূর ২৪/৩১)।
১২. হঠাৎ দৃষ্টি চলে গেলে ফিরিয়ে নেওয়া : পরকীয়া থেকে বাঁচতে চোখের হিফাযতের কোন বিকল্প নেই। এজন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও কারো দিকে দৃষ্টি চলে গেলে সাথে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (রাঃ) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির চক্ষু জাহান্নাম দর্শন করবে না। ১. যে চক্ষু আল্লাহর পথে পাহারা দিয়ে রাত্রি যাপন করে, ২. যে চক্ষু আল্লাহর ভয়ে কাঁদে এবং ৩. যে চক্ষু আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্ত্ত দর্শন করা থেকে বিরত থাকে’।[13]
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কারো প্রতি নযর চলে গেলে সাথে সাথে নযর ফিরিয়ে নিতে হবে। আর অনিচ্ছাকৃত নযরের জন্য ব্যক্তি পাপী হবে না। বুরায়দাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী (রাঃ)-কে বললেন,يَا عَلِىُّ لاَ تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الآخِرَةُ، ‘হে ‘আলী! (কোন নারীর প্রতি) আকস্মিক একবার দৃষ্টিপাতের পর আবার দৃষ্টিপাত করো না। তোমার জন্য প্রথম দৃষ্টি (অনিচ্ছাকৃত) জায়েয, পরবর্তী দৃষ্টি জায়েয নয়’।[14] জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে (কোন নারীর প্রতি) আকস্মিক দৃষ্টি নিক্ষেপ হওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়ার আদেশ দিলেন।[15]
১৩. দূরবর্তীর সফরে সাথে মাহরাম থাকা : পরকীয়া থেকে বাঁচতে দূরের সফর হ’লে অবশ্যই স্বামী অথবা মাহরাম সাথে থাকতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلاَّ مَعَ ذِى مَحْرَمٍ، وَلاَ يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ، ‘মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন পুরুষ কোন মহিলার নিকট গমন করতে পারবে না’।[16] তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ^াস রাখে এমন কোন মহিলার জন্য বৈধ নয় যে, সে তার পিতা, পুত্র, স্বামী, ভাই অথবা কোন মাহরাম পুরুষ ছাড়া তিন দিন বা তার বেশী দূরত্বে সফর করে’।[17] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ ثَالِثُهُمَا، ‘কোন মহিলার সাথে কোন পুরুষ নির্জনে একত্রিত হ’লে তাদের সাথে তৃতীয়জন হয় শয়তান’।[18] মহিলারা একাকী সফরের কারণে অনেক সময় শ্লীলতাহানির শিকার হয়। চলন্ত বাসে বা গাড়ীতে ধর্ষণের শিকার হয়। বখাটের ইভটিজিং-এর শিকার এবং শারীরিক ও মানসিক যৌনতার শিকার হয়।
১৪. ঝগড়া-বিবাধ থেকে দূরে থাকা : ঝগড়া-বিবাদ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একজন অন্যজনকে পর ভাবতে থাকে। আর শয়তান এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরকীয়ার দিকে ধাবিত করে। শয়তানের কাজ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া বাধিয়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ইবলীস (শয়তান) সমুদ্রের পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশী ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিতনা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন ইবলীস বলে, তুমি কিছুই করনি। রাসূল (ছাঃ) বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি দম্পতির মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ‘মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবের (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, ‘অতঃপর ইবলীস তার সাথে আলিঙ্গন করে’।[19]
১৫. বিবাহ বৈধ এমন কারো দেহে স্পর্শ না করা : পরকীয়ার একটি ধাপ হ’ল, পর নারী-পুরুষ একে অপরকে স্পর্শ করা। ইসলাম এটাকে হারাম করেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لأَنْ يُطْعَنَ في رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لاَ تَحِلُّ لَهُ، ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ঐ মহিলাকে স্পর্শ করা থেকে অনেক শ্রেয়, যে তার জন্য হালাল নয়’।[20] নিঃসন্দেহে এটা হাতের যিনা। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَالْيَدَانِ تَزْنِيَانِ وَالرِّجْلاَنِ تَزْنِيَانِ وَالْفَرْجُ يَزْنِى، ‘দু’চোখ যিনা করে, দু’হাত যিনা করে, দু’পা যিনা করে এবং লজ্জাস্থানও যিনা করে’।[21] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে অধিক পবিত্র মনের মানুষ আর কে আছে? অথচ তিনি বলেছেন, إِنِّى لاَ أُصَافِحُ النِّسَاءَ ‘আমি নারীদের সাথে মুছাফাহা করি না’।[22]
তিনি আরও বলেছেন, إِنِّيْ لاَ أَمُسُّ أَيْدِيَ النِّسَاءِ ‘আমি নারীদের হাত স্পর্শ করি না’।[23] মা আয়েশা (রাঃ) বলেছেন,لاَ وَاللهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ، غَيْرَ أَنَّهُ بَايَعَهُنَّ بِالْكَلاَمِ، ‘আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাত কখনই কোন বেগানা নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি মৌখিক বাক্যের মাধ্যমে তাদের বায়‘আত নিতেন’।[24]
১৬. আকর্ষণীয় কণ্ঠে কথা না বলা : পরপুরুষের সাথে নারীর প্রগল্ভতার সাথে কিংবা আকর্ষণীয় কণ্ঠে কথোপকথন করাও ব্যভিচারের পথসমূহের অন্যতম ছিদ্রপথ। পরকীয়া থেকে বাচঁতে হ’লে প্রয়োজনীয় কথা বলার ক্ষেত্রে মহিলাদের মোহনীয় কন্ঠ পরিহার করতে হবে, যাতে দুর্বল হৃদয়ের মানুষগুলো আকৃষ্ট না হয়। এ বিষয়ে সাবধান করে আল্লাহ বলেন,يَانِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِيْ فِيْ قَلْبِهِ مَرَضٌ، ‘হে নবীপত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না। তাহ’লে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়বে’ (আহযাব ৩৩/৩২)। মহান আল্লাহ নারীদের কণ্ঠকে কোমল করে সৃষ্টি করেছেন। তাদের মিষ্টি কথায় কোন কোন পুরুষের মনে যৌনানুভূতি জাগ্রত হ’তে পারে। তাই পরপুরুষের সাথে মোলায়েম কণ্ঠ পরিহার করে কেবল যরূরী কথা বলবে।
১৭. পরিবারের সাথে থাকা : আজকাল বিভিন্ন কারণে নারী-পুরুষ আলাদা থাকে। ফলে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কু-প্রবৃত্তির তাড়নায় তারা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে যাদের স্বামী দূরে অবস্থান করে তাদের সাথে পরপুরুষ একাকী হবে না। সন্তানদের সঙ্গে রাখবে। সন্তান না থাকলে মা, বোন, ভাগ্নী-ভাতিজী, ননদ, শাশুড়ী, পিতা, আপন ভাই কিংবা নিকটাত্মীয় নারীদের সঙ্গে থাকবে। স্বামী-স্ত্রী কোন কারণে একত্রে থাকা সম্ভব না হ’লে নিয়মিত নফল ছিয়াম পালন, কুরআন তেলাওয়াত, সীরাতুর রাসূল, ছাহাবী চরিত ও ইসলামী বই-পুস্তক বেশী বেশী পাঠ করা এবং পারিবারিক ও অন্যান্য কাজকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা।
১৮. মাহরাম ব্যতীত নারী-পুরুষ একত্রিত না হওয়া : পরকীয়ার আরেকটি মাধ্যম হ’ল গায়র মাহরাম নারী-পুরুষ একত্রিত হওয়া। চাকুরী, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি কারণে দূরে কোথাও যাতায়াতকালে গায়র মাহরাম নারী পুরুষ একসাথে চলাফেরা করে, পরস্পর কথা-বার্তা বলে থাকে। ইসলাম এটাকে হারাম করেছে। জাবীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تَلِجُوا عَلَى الْمُغِيبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِى مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّمِ. قُلْنَا وَمِنْكَ قَالَ وَمِنِّى وَلَكِنَّ اللهَ أَعَانَنِى عَلَيْهِ فَأَسْلَمُ. ‘যাদের স্বামী অনুপস্থিত, সে সকল মহিলাদের নিকট তোমরা যেও না। কেননা শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে। আমরা বললাম, আপনার মধ্যেও কি? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমার মধ্যেও। কিন্তু আমাকে আল্লাহ সাহায্য করেছেন, তাই আমি নিরাপদ’।[25]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন কখনো কোন মেয়ের সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ না করে যতক্ষণ না ঐ মেয়ের কোন মাহরাম তার সাথে থাকে। কারণ সে সময় তৃতীয় জন থাকে শয়তান’।[26] অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কোন পুরুষ যেন মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ না করে যতক্ষণ না তার সাথে তার মাহরাম থাকে এবং কোন মহিলা যেন সফর না করে যতক্ষণ না তার কোন মাহরাম তার সাথে থাকে’।[27]
১৯. স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের আমানত রক্ষা করা: স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের ব্যাপারে সাবধান থাকবে ও নিজের সতীত্ব হেফাযতের মাধ্যমে আমানত রক্ষা করবে। তারা কোনভাবেই খেয়ানত করবে না। তাই সে কোন পরপুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না। সে পরপুরুষের সাথে সম্মোহনী কথা বলবে না এবং অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত হবে না। সে স্বামী বা অভিভাককে ধোঁকা দিয়ে পরপুরুষের সাথে সাক্ষাত করবে না। বস্ত্তত এসব কাজ তার দ্বীন-ধর্ম ও ইয্যত-আব্রুকে কদর্য করে দেয়। সুতরাং স্বীয় চোখের দৃষ্টি অবনমিত করা, গলার আওয়াজ নীচু করা এবং স্বীয় যবান ও হাতকে অন্যায়, অশ্লীলতা ও কদর্যতা থেকে হেফাযত করা অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَاحَفِظَ اللهُ ‘অতএব সতী-সাধ্বী স্ত্রীরা হয় অনুগত এবং আল্লাহ যা হেফাযত করেছেন, আড়ালেও (সেই গুপ্তাঙ্গের) হেফাযত করে’ (নিসা ৪/৩৪)।
২০. উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে পরস্পরে আলোচনা করা ও সমাধানের চেষ্টা করা : স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হ’লে, অবিশ্বাস সৃষ্টি হ’লে, কারো প্রতি সন্দেহ হ’লে পরস্পর খোলামেলা আলোচনা করা ও সমাধানের চেষ্টা করা। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের পরিবারের সদস্যদের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে।
আল্লাহ বলেন,وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا، ‘আর যদি তোমরা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশংকা কর, তাহ’লে স্বামীর পরিবার থেকে একজন ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর। যদি তারা উভয়ে মীমাংসা চায়, তাহ’লে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে (সম্প্রীতির) তাওফীক দান করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও তোমাদের সবকিছু অবগত’ (নিসা ৪/৩৫)। এক্ষেত্রে পারিবারিক বৈঠকের বিকল্প নেই। পরিবারের সকল সদস্য যদি সপ্তাহে নির্দিষ্ট একদিন তাদের পরিবার নিয়ে আলোচনা করেন তাহ’লে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে।
[1]. তিরমিযী হা/১৯৮৭; ছহীহুত তারগীব হা/২৬৫৫; মিশকাত হা/৫০৮৩।
[2]. মুসলিম হা/১৪২৪; মিশকাত হা/৩০৯৮।
[3]. আবুদাঊদ হা/২০৮২; মিশকাত হা/৩১০৬; ছহীহাহ হা/৯৯।
[4]. ইবনু মাজাহ হা/১৮৬৫; মিশকাত হা/৩১০৭; ছহীহাহ হা/৯৬।
[5]. মুসনাদে আহমাদ হা/২৩৬৫০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৯৭।
[6]. বুখারী হা/৫১৩৬; মুসলিম হা/১৪১৯; মিশকাত হা/৩২০৪।
[7]. বুখারী হা/৫১৩৮; আবূ দাঊদ হা/২১০১; নাসাঈ হা/৩২৬৮।
[8]. ইবনু মাজাহ হা/১৯৬৮; ছহীহাহ হা/১০৬৭।
[9]. আবু দাউদ হা/৪৭১৯; ছহীহুল জামে‘ হা/১৬৫৮।
[10]. তিরমিযী হা/১১৭১; মিশকাত হা/৩১১৮।
[11]. মুসলিম হা/২১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৮১।
[12]. বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭; মিশকাত হা/৮৬।
[13]. ত্ববরানী কাবীর, হা/১০০৩।
[14]. তিরমিযী হা/২৭৭৭; আবূ দাঊদ হা/২১৪৯; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৯৫৩।
[15]. মুসলিম হা/২১৫৯; তিরমিযী হা/২৭৭৬; আবূ দাঊদ হা/২১৪৮।
[16]. বুখারী হা/১৮৬২; মুসলিম হা/১৩৪১।
[17]. মুসলিম, আবু দাউদ হা/১৭২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৫০।
[18]. তিরমিযী হা/১১৭১; মুসনাদে আহমাদ হা/১১৪।
[19]. মুসলিম হা/২৮১৩; ছহীহাহ হা/৩২৬১; ছহীহুত তারগীব হা/২০১৭; আহমাদ হা/১৪৩৭৭।
[20]. ছহীহুত তারগীব হা/১৯১০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৬।
[21]. আহমাদ হা/৩৯১২; ছহীহুল জামে‘ হা/৪১২৬।
[22]. আহমাদ হা/২৭৫৩; ছহীহাহ হা/২৫০৯।
[23]. তাবারাণী কাবীর, ২৪/৩৪২; ছহীহুল জামে‘ হা/৭১৭৭।
[24]. বুখারী হা/৫২৮৮; মুসলিম হা/১৮৬৬।
[25]. তিরমিযী হা/১১৭২; মুসনাদ আহমাদ হা/১৪৩২৪।
[26]. তিরমিযী হা/২১৬৫; ছহীহুল জামে‘ হা/২৫৬৪।
[27]. বুখারী হা/১৮৬২, ৩০০৬, ৩০৬১, ৫২৩৩; মুসলিম হা/৩৪১।
স্ত্রীকে পরকীয়া থেকে বাঁচানোর উপায়
পরকীয়া : কারণ ও প্রতিকার
স্বামী-স্ত্রী যে কেউ পরকীয়ায় জড়িত হ’তে পারে। পরিবারের কর্তা হিসাবে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মাধ্যমেই স্ত্রীকে পরকীয়া থেকে রক্ষা করা যায়। এক্ষেত্রে স্বামী নিম্নের কাজগুলো করতে পারেন।-
১. ইসলামী অনুশাসন বাস্তবায়ন করা : স্যাটেলাইটের এই যুগে বিভিন্ন অপসংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার কারণে অনেক সময় নিজ স্বামীর প্রতি স্ত্রীদের অনিহা জন্ম নেয় এবং অন্য পুরুষের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এজন্য তাকে পরিপূর্ণ ইসলামী অনুশাসন শিক্ষা দেওয়া যরূরী। যেমন- গায়র মাহরামের সাথে দেখা না করা, অশ্লীল বাদ্য-বাজনা থেকে দূরে থাকা, বেপর্দা ও অর্ধ নগ্ন পোষাক থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি। মু‘আয (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে দশটি বিষয়ের উপদেশ দিয়েছেন। (তন্মধ্যে একটি হ’ল) وَلاَ تَرْفَعْ عَنْهُمْ عَصَاكَ أَدَباً ‘তাদের থেকে তোমার শিষ্টাচারের লাঠিকে উঠিয়ে নিও না’।[1]
২. স্ত্রীর প্রতি উপদেশ দেওয়া ও উত্তম কথা বলা : হাসিমুখে থাকা ও উত্তম কথা বলা ছাদাক্বা।[2] স্বামী তার স্ত্রীকে যে পর্যাপ্ত ভালবাসে এটা অন্তরের পাশাপাশি মুখেও প্রকাশ করতে হবে। এজন্য হাসিমুখে থাকা ও তার সাথে উত্তম কথা বলা বিশেষভাবে যরূরী। ফলে স্ত্রী স্বামীর কোন বিষয়ে দুর্বল দিক থাকলেও হাসিখুশি রাখার কারণে ভুলে যাবেন এবং পরকীয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَإِذَا شَهِدَ أَمْرًا فَلْيَتَكَلَّمْ بِخَيْرٍ أَوْ لِيَسْكُتْ وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَىْءٍ فِى الضِّلَعِ أَعْلاَهُ إِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا. ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যখন কোন বিষয় প্রত্যক্ষ করবে তখন যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। আর নারীদের প্রতি সদুপদেশ প্রদান করে। কেননা পাঁজরের একটি হাড় দিয়ে নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সর্বাধিক বাঁকা হ’ল তার উপরের অংশ। তুমি তাকে সোজা করতে গেলে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর তাকে স্বীয় অবস্থায় রাখলে তা সদা বাঁকা থেকে যাবে। সুতরাং নারীদের প্রতি সদুপদেশ দান কর’।[3]
৩. স্ত্রীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া : বর্তমান ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতার যুগে অধিকাংশ পুরুষ নিজের চাকুরী, ক্যারিয়ার বা ব্যবসা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারকে একটু সময় দেয়ার মতো সুযোগ থাকে না। স্ত্রী-সন্তানদের সাথে আলাপ-আলোচনা করা, সুখ-দুঃখ নিয়ে কথা বলা এবং স্ত্রীর সাথে সময় কাটানোর ফুসরত হয় না। ফলে স্ত্রী সারা দিনের একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য বন্ধু, পরিচিত আত্মীয় অথবা পুরনো সহপাঠীর সাথে যোগযোগ শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে একদিন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) স্ত্রীদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতেন। আসওয়াদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী করীম (ছাঃ) ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ‘ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। আর ছালাতের সময় হ’লে ছালাতের জন্য বের হয়ে যেতেন’।[4]
৪. স্ত্রীকে মূল্যায়ন করা : অনেক স্বামী তার কর্মক্ষেত্রে তার অধীনস্থ লোকদের সাথে ভালো আচরণ করেন, তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনেন, চাওয়া-পাওয়াকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন। কিন্তু নিজ স্ত্রীকে মূল্যায়ন করেন না। এমনকি পরিচিতদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যে পুরুষ ভাল আচরণ করত, বিয়ের পর স্বামী হিসাবে পূর্বের মত আচরণ করে না বা তাকে সেভাবে মর্যাদা দেয় না। আর এই কারণে তথাকথিত প্রেমের বিয়ে অনেক ক্ষেত্রে টিকে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্ত্রীদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। যেমন অহী নাযিলের পর খাদীজা (রাঃ)-এর সাথে এবং হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় উম্মে সালামা (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করেন ও তাদের পরামর্শ গ্রহণ করেন।[5]
৫. স্ত্রীকে সালাম দেওয়া : স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আস্থা-ভালবাসা কমে গেলেই সাধারণত স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িত হয়। আর সালাম পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা বৃদ্ধি করে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,أَولَا أدلكم على شَيْء إِذا فعلتموه تحاببتم؟ أفشوا السَّلَام بَيْنكُم، ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন কথা বলে দেব, যা সম্পন্ন করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে। (তা হ’ল) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রচলন করবে’।[6] রাসূল (ছাঃ) আনাস (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন,يَا بُنَىَّ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ يَكُوْنُ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ، ‘হে বৎস! তুমি যখন তোমার পরিবার-পরিজনের নিকটে যাবে, তখন সালাম দিবে। তাতে
তোমার ও তোমার পরিবার-পরিজনের কল্যাণ হবে’।[7]
৬. স্ত্রীর প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা প্রকাশ করা : স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালবাসা আল্লাহ প্রদত্ত নে‘মত। আপনার আচার-আচরণ, কথা-বার্তা সব কিছুতেই যেন ভালবাসা প্রকাশ পায়। অনেকে আছেন অন্তরে স্ত্রীকে অনেক ভালবাসলেও মুখে প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন। ফলে স্ত্রী মনে করেন তার স্বামী তাকে যথাযথভাবে ভালবাসেন না। ফলে তিনি পরকীয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
৭. স্ত্রীকে সন্দেহ না করে খোলামেলা কথা বলা ও খোশগল্প করা : পরকীয়া থেকে স্ত্রীকে বাচাঁতে হ’লে স্বামীর অন্যতম দায়িত্ব হ’ল, স্ত্রীর সাথে খোশগল্প করবে ও কোন বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিলে খোলামেলা কথা বলবে। স্বামী যদি বুঝতে পারেন যে, তার স্ত্রী কোন ছেলে বন্ধু বা প্রতিবেশীর প্রতি দুর্বল সেক্ষেত্রে এটা চেপে না রেখে স্ত্রীর সাথে খোলামেলা কথা বলতে হবে। রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) এত ব্যস্ত থাকার পরেও তার স্ত্রীদের সাথে খোশগল্প করতেন ও প্রয়োজনীয় কথা বলতেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন,أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا صَلَّى {سُنَّةَ الْفَجْرِ} فَإِنْ كُنْتُ مُسْتَيْقِظَةً حَدَّثَنِى وَإِلاَّ اضْطَجَعَ حَتَّى يُؤْذَنَ بِالصَّلاَةِ. ‘নবী করীম (ছাঃ) যখন (ফজরের সুন্নাত) ছালাত আদায় করতেন, তখন আমি জাগ্রত হ’লে তিনি আমার সাথে কথা বলতেন। অন্যথা তিনি শয্যাগ্রহণ করতেন এবং ফজরের ছালাতের জন্য মুওয়াযযিন না ডাকা পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন’।[8]
৮. শারঈ পর্দা বজায় রাখা : পর্দাহীনতা পরকীয়ার অন্যতম কারণ। আবার অনেক স্বামী আছেন, যারা বিয়ের পর কারণে অকারণে স্ত্রীকে নিজের বন্ধু-বান্ধব, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, খালাতো ও ফুফাতো ভাইদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে দেন। এর ফলে অনেক সময় নিজের অজান্তে তার স্ত্রী তার পরিচিত বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,ثَلاَثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَالْعَاقُّ وَالدَّيُّوثُ الَّذِى يُقِرُّ فِى أَهْلِهِ الْخُبْثَ، ‘তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন। লাগাতার শরাব পানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ূছ, যে নিজ পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতার সুযোগ দেয়’।[9]
৯. স্ত্রীর সামনে পরিপাটি হয়ে থাকা : স্ত্রীর সামনে নিজেকে সুন্দর পরিপাটি করে রাখাও স্ত্রীকে অন্য পুরুষের আকর্ষণ থেকে বিরত রাখতে পারে। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, إِنَّيْ أُحِبُّ أَنْ أتَزَيَّنَ لِامْرَأَتِيْ، كَمَا أُحِبُّ أنْ تَتَزَيَّنَ لِيْ، ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য সুসজ্জিত হ’তে ঐরূপ পসন্দ করি যেভাবে আমার জন্য তার সুসজ্জিত হওয়া পসন্দ করি’।[10]
১০. স্ত্রীর দোষ-ক্রুটি ক্ষমা করা : মানুষ হিসাবে সকলের ছোট-খাট ভুল হ’তে পারে। স্বামী হিসাবে স্ত্রীর প্রতিটি কাজে ভুল ধরলে সে বিরক্ত হয়ে বিকল্প তালাশ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلْعٍ وَإِنَّكَ إِنْ تُرِدْ إِقَامَةَ الضِّلْعِ تَكْسِرْهَا فَدَارِهَا تَعِشْ بِهَا، ‘নিশ্চয়ই মহিলাদের সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড্ডি থেকে। যদি তুমি পাঁজরের হাড্ডিকে সোজা করতে চাও তাহ’লে তাকে ভেঙ্গে ফেলবে। সুতরাং তার সাথে উত্তম আচরণ কর ও তার সাথে বসবাস কর’।[11]
১১. স্ত্রীর আচার-আচরণের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা : স্বামী পরিবারের প্রধান হিসাবে পরিবারের সব বিষয়ের প্রতি নযর রাখবেন। বিশেষ করে স্ত্রীর ভাল-মন্দ আচরণ, কোন বিষয়ে সন্দেহ হ’লে তাকে উত্তম উপদেশের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। বিদায় হজ্জের দিন রাসূল (ছাঃ) বলেন,اسْتَوْصُوْا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا فَإِنَّمَا هُنَّ عِنْدَكُمْ عَوَانٌ. لَيْسَ تَمْلِكُوْنَ مِنْهُنَّ شَيْئًا غَيْرَ ذَلِكَ إِلاَّ أَنْ يَأْتِيْنَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ، ‘তোমরা স্ত্রীদেরকে উত্তম নছীহত প্রদান কর। কেননা তারা তোমাদের কাছে বন্দী। উত্তম আচরণ ছাড়া তাদের উপর তোমাদের কোন অধিকার নেই। তবে যদি তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় (তাহ’লে ভিন্ন কথা)’।[12]
১২. স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা পূরণ করা : দাম্পত্য জীবনের প্রধান দায়িত্ব হ’ল- স্বামী-স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা পূরণ করা। এটা স্বামীর নিকটে স্ত্রীর হক। তাই এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া যরূরী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নফল ইবাদতের চেয়েও এ হক্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে রাসূল (ছাঃ) বলেন,فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، ‘তোমার উপর তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক রয়েছে এবং তোমার উপর তোমার স্ত্রীরও হক রয়েছে’।[13] আবুদ্দারদা (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِىْ حَقٍّ حَقَّه، ‘তোমার উপর তোমার দেহের হক আছে, তোমার রবের হক আছে, মেহমানের হক আছে এবং তোমার পরিবারের হক আছে। অতএব প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য হক প্রদান কর’।[14]
১৩. নিজ বাড়ী ছাড়া অন্যত্র রাত্রি যাপন করতে না দেওয়া : বিনা প্রয়োজনে একজন স্ত্রী স্বামীর বাড়ী ছাড়া অন্য স্থানে রাত্রি যাপন করবে না। তালাকের পর ইদ্দত পালনকালেও স্ত্রীকে বাড়ী থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন,لاَ تُخْرِجُوْهُنَّ مِنْ بُيُوْتِهِنَّ وَلاَ يَخْرُجْنَ إِلاَّ أَنْ يَأْتِيْنَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ، ‘তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিও না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়’ (তালাক্ব ৬৫/১)। হাকীম ইবনু মু‘আবিয়াহ্ আল-কুশায়রী (রহঃ) তাঁর পিতা হ’তে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! স্ত্রীগণ আমাদের ওপর কি অধিকার রাখে? উত্তরে তিনি বললেন, তুমি যখন খাও, তখন তাকেও খাওয়াও; তুমি পরলে তাকেও পরিধান করাও, (প্রয়োজনে মারতে হ’লে) মুখমন্ডলে আঘাত করো না, তাকে গালি দিও না, (প্রয়োজনে তাকে ঘরে বিছানা পৃথক করতে পার), কিন্তু বাড়ী ছেড়ে অন্যত্র একাকিনী অবস্থায় রাখবে না’।[15]
১৪. স্ত্রী অসুস্থ হ’লে সেবা করা : অনেক স্বামী মনে করেন তারা অসুস্থ হ’লে স্ত্রীরা তাদের সেবা করবে কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ হ’লেও যে স্বামীকে তার সেবা করতে হবে এটা ভুলে যান। অথচ ইসলামের নির্দেশ হ’ল স্ত্রী অসুস্থ হ’লে তাকে সেবা করা। এমনকি রাসূল (ছাঃ) ইসলামের প্রথম জিহাদ বদর যুদ্ধেও ওছমান (রাঃ)-এর স্ত্রী অসুস্থ থাকায় যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।[16]
১৫. একাধিক স্ত্রী থাকলে ইনছাফ করা : ইসলাম একজন সামর্থ্যবান পুরুষকে চারটি পর্যন্ত বিবাহের অনুমতি দিয়েছে (নিসা ৪/৩)। কারো একাধিক স্ত্রী থাকলে সকলের প্রতি ইনছাফ করতে হবে। অর্থাৎ সকলের প্রতি সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অন্যথা অবহেলিত স্ত্রী পরকীয়ার মত জঘন্য সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। আল্লাহ পুরুষদের প্রতি স্ত্রীদের মধ্যে সমতা বিধানের নির্দেশ দিয়ে বলেন,وَلَنْ تَسْتَطِيْعُوْا أَنْ تَعْدِلُوْا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلاَ تَمِيْلُوْا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ وَإِنْ تُصْلِحُوْا وَتَتَّقُوْا فَإِنَّ اللهَ كَانَ غَفُوْرًا رَحِيْمًا- ‘তোমরা যতই আগ্রহ পোষণ কর না কেন তোমরা কখনো স্ত্রীদের প্রতি সম ব্যবহার করতে পারবে না। তবে তোমরা কোন একজনের দিকে সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড় না ও অপরকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখ না। যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর ও সাবধান হও তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (নিসা ৪/১২৯)। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ كَانَ لَهُ امْرَأَتَانِ يَمِيْلُل إِحْدَاهُمَا عَلَى الأُخْرَى جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَدُ شِقَّيْهِ مَائِلٌ- ‘যার দু’জন স্ত্রী আছে, আর সে তাদের একজনের চেয়ে অপরজনের প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ে, সে ক্বিয়ামতের দিন তার (দেহের) এক পার্শ্ব পতিত অবস্থায় আগমন করবে’।[17] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا كَانَ عِنْدَ الرَّجُ لِامْرَأَتَانِ فَلَمْ يَعْدِلْ بَيْنَهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ سَاقِطٌ، ‘যে ব্যক্তির দু’জন স্ত্রী আছে সে যদি তাদের মধ্যে সমতা না রাখে তবে ক্বিয়ামতের দিন সে তার দেহের এক পার্শ্ব পতিত (বিকলাঙ্গ) অবস্থায় আগমন করবে’।[18]
স্বামীকে পরকীয়া থেকে বাঁচানোর উপায়
একজন আদর্শ স্ত্রী তার স্বামীকে যথাসাধ্য পাপ থেকে বিরত রাখবেন। নিজের অধিকার যথাযথ রক্ষা ও নিজের স্বামীকে পরকীয়া থেকে বাচাঁনোর জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবেন। সেক্ষেত্রে স্ত্রী নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারেন।-
১. স্বামীর রাগের সময় ধৈর্যধারণ করা : স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মধ্যে অনেক সময় স্বামী রাগের মাথায় স্ত্রীকে মারধর করেন। এমনকি তালাকের মত ঘটনাও ঘটে যায়। এমতাবস্থায় স্ত্রী যদি ধৈর্যধারণ করেন এবং নিজের দোষ থাকলে স্বীকার করেন তাহ’লে অনেক সময় স্বামীকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা যায়। সেই সাথে অন্য মহিলার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে বাচাঁনো যায়। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,وَنِسَاؤُكُمْ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ الْوَدُودُ الْعَؤُودُ عَلَى زَوْجِهَا، الَّتِي إِذَا غَضِبَ جَاءَتْ حَتَّى تَضَعَ يَدَهَا فِي يَدِهِ، ثُمَّ تَقُولُ: لَا أَذُوْقُ غَمْضًا حَتَّى تَرْضَى، ‘তোমাদের জান্নাতী স্ত্রীরা হ’ল যে অধিক প্রেমময়ী, সন্তানদানকারিণী, ভুল করে বার বার স্বামীর নিকট আত্মসমর্পণকারিণী, যার স্বামী রাগ করলে সে তার নিকট এসে তার হাতে হাত রেখে বলে, আপনি রাযী না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাব না’।[19]
২. নিজেকে স্বামীর জন্য আকর্ষণীয় করে রাখা : একজন আদর্শ স্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব হ’ল নিজের সকল ভালবাসা স্বামীর জন্য উজাড় করে দেওয়া। তার জন্য নিজেকে আকর্ষণীয় করে রাখা। এর মাধ্যমেই একজন পুরুষকে পরকীয়া থেকেও বাচাঁনো যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَلاَ أُخْبِرُكَ بِخَيْرِمَا يَكْنِزُ الْمَرْءُ الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ وَإِذَا أَمَرَهَا أَطَاعَتْهُ وَإِذَاغَابَ عَنْهَا حَفِظَتْهُ، ‘আমি কি তোমাকে মানুষের সর্বোত্তম সম্পদ সম্পর্কে অবহিত করব না? তা হ’ল, নেককার স্ত্রী। সে (স্বামী) তার (স্ত্রীর) দিকে তাকালে স্ত্রী তাকে আনন্দ দেয়, তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা মেনে নেয় এবং সে যখন তার থেকে অনুপস্থিত থাকে, তখন সে তার সতীত্বের হেফাযত করে’।[20] অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন,خَيْرُ النِّسَاءِ تَسُرُّكَ إِذَا أَبْصَرْتَ وَتُطِيْعُكَ إِذَا أَمَرْتَ وَتَحْفَظُ غَيْبَتَكَ فِيْ نَفْسِهَا وَمَالِكَ، ‘উত্তম স্ত্রী সে, যার দিকে তুমি তাকালে তোমাকে আনন্দিত করে, তুমি নির্দেশ দিলে তা পালন করে, তোমার অনুপস্থিতিতে তার নিজেকে ও তোমার সম্পদ হেফাযত করে’।[21]
ঘরের বাইরে নারীদের সুগদ্ধি ব্যবহার করার অনুমতি না থাকলেও নিজেদের ঘরে স্বামীর জন্য কসমেটিক ব্যবহার করতে পারবেন এবং সুগন্ধি ব্যবহার করবেন। যার গন্ধ গায়র মাহরাম পাবে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, পুরুষের জন্য সুগন্ধি যাতে রং নেই এবং নারীর জন্য রং যাতে সুগন্ধি নেই। রাবী সাঈদ বিন আবু ‘আরূবাহ বলেন, আমি মনে করি যে, এর দ্বারা তারা অর্থ নিতেন, যখন নারী বাইরে যাবে। কিন্তু যখন সে তার স্বামীর কাছে থাকবে, তখন যা খুশী সুগন্ধি ব্যবহার করবে’।[22]
৩. স্বামীর সঙ্গে থাকা : স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পোষাক স্বরূপ (বাক্বারাহ ২/১৮৭)। বিশেষ কারণ ছাড়া স্বামীর সাথেই স্ত্রী থাকবে এটাই রীতি (বাক্বারাহ ২/৩৫)। পরকীয়া থেকে স্বামীকে বাচাঁতে হ’লে একজন স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হ’ল স্বামীর সাথে থাকা। কারণ বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হ’ল নিজের ইয্যত-সম্ভ্রম হেফাযত করা এবং গোনাহের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
৪. স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়া : স্বামীকে পরকীয়া থেকে বাচাঁনোর অন্যতম উপায় হ’ল তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করা। ইসলাম এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ، ‘কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর রাগান্বিত হয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহ’লে ফেরেশতাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত করতে থাকে’।[23]
৫. অল্পেতুষ্ট থাকা : স্বামীর সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে স্ত্রীদের উচিত অল্পেতুষ্ট থাকা এবং স্বামীকে সৎপথে থাকার উপদেশ দেওয়া। এতে স্বামী স্ত্রীর প্রতি সন্তষ্ট থাকবে ও পরকীয়া থেকে বিরত থাকবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ ‘তোমরা কুমারী নারী বিয়ে কর, কেননা কুমারী রমণীর মুখের মধুময়তা বেশী, অধিক গর্ভধারণযোগ্য এবং অল্পেতুষ্টির অধিকারী।[24] ছাওবান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি আমরা জানতাম কোন সম্পদ উত্তম, তাহ’লে তা জমা করে রাখতাম। তখন তিনি বললেন, তোমাদের কারো শ্রেষ্ঠ সম্পদ হ’ল আল্লাহর যিকিরকারী জিহবা, কৃতজ্ঞ অন্তর ও মুমিনা স্ত্রী; যে তার (স্বামীর) ঈমানের (দ্বীনের) ব্যাপারে সহযোগিতা করে’।[25]
৬. গৃহে নিজের কাজ নিজে করা : একান্ত যরূরী প্রয়োজন ছাড়া নিজের কাজ নিজে করাই উত্তম। এতে সংসার, ছেলে-মেয়ে যেমন সুন্দরভাবে লালিত-পালিত হবে তেমনি স্বামীকে বেশী সময় দেয়া যাবে ও পরনারী থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। কারণ অনেক সময় স্ত্রী কাজের প্রয়োজনে বাইরে গেলে আর ঘরে কাজের মেয়ে আসলে স্বামী তার সাথেও পরকীয়ায় লিপ্ত হ’তে পারেন। নবী করীম (ছাঃ)-এর স্ত্রীরা ও মেয়েরা নিজের কাজ নিজেরাই করতেন। আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ফাতেমা (রাঃ) চাক্কি ঘুরাতে গিয়ে তার হাতে ব্যথা অনুভব করলেন। তখন নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে বন্দি এসেছিল। তাই তিনি বন্দি হ’তে একজন খাদেমের জন্য রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে গেলেন। কিন্তু তাকে পেলেন না। তিনি আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে দেখা করে তাকে ব্যাপারটি অবহিত করলেন। অতঃপর যখন নবী করীম (ছাঃ) আগমন করলেন তখন আয়েশা (রাঃ) তাঁর নিকট ফাতেমা (রাঃ)-এর আগমনের বিষয়টি অবহিত করলেন।
অতঃপর নবী করীম (ছাঃ) আমাদের নিকট আসলেন। এমন সময় আমরা আমাদের শয্যাগ্রহণ করেছিলাম। আমরা উঠতে লাগলাম। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘তোমরা তোমাদের যথাস্থানে থাকো। অতঃপর তিনি আমাদের দু’জনের মাঝে বসলেন। এমনকি আমি তার পা মুবারকের শীতলতা আমার সীনার মধ্যে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের এমন বিষয় শিখিয়ে দিব না, যা তোমাদের প্রার্থিত বস্তর চেয়ে উত্তম? যখন তোমরা শয্যা গ্রহণ করবে তখন ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার সুবহা-নাল্ল-হ’ এবং ৩৩ বার আলহামদুলিল্লা-হ’ পড়ে নিবে। এটি তোমাদের জন্যে খাদেমের চেয়ে উত্তম হবে’।[26]
পরিশেষে বলব, পরকীয়া থেকে বাঁচতে পরিবারে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে হবে এবং যথার্থ আল্লাহভীরু হ’তে হবে। আল্লাহ সবাইকে এই জঘন্য পাপ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিন-আমীন!
[1]. মুসনাদে আহমাদ হা/২১৫৭০; ছহীহুত তারগীব হা/২৩৯৪; মিশকাত হা/৬১।
[2]. বুখারী হা/২৯৮৯; তিরমিযী হা/১৯৭০; মিশকাত হা/১৮৯৬, ১৯১০।
[3]. মুসলিম (হা. এ) হা/১৪৬৮; (ই.ফা) ৩৫০৮।
[4]. বুখারী হা/৬৭৬; তিরমিযী হা/৩৮০৭।
[5]. বুখারী হা/৪৯৫৩, ২৭৩২।
[6]. মুসলিম হা/৯৩; তিরমিযী হা/২৬৮৮; আবু দাউদ হা/৫১৯৩; মিশকাত হা/৪৬৩১।
[7]. তিরমিযী হা/২৬৯৮; ছহীহুত তারগীব হা/১৬০৮; ইরওয়া হা/২০৪১।
[8]. বুখারী হা/১১৬১।
[9]. আহমাদ, নাসাঈ; মিশকাত হা/৩৬৫৫।
[10]. তাফসীরে কুরতুবী ৫/৯৭; তাফসীরে ত্ববারী, ৪/৫৩২।
[11]. আহমাদ হা/২০১০৫; ছহীহুল জামে‘ হা/১৯৪৪।
[12]. তিরমিযী হা/১১৬৩; ইবনু মাজাহ হা/১৮৫১; ছহীহুল জামে‘ششش হা/৭৮৮০।
[13]. বুখারী হা/১৯৭৫; মিশকাত হা/২০৫৪।
[14]. বুখারী হা/৬১৩৯; তিরমিযী হা/২৪১৩।
[15]. আবূ দাঊদ হা/২১৪২; ইবনু মাজাহ হা/১৮৫০; আহমাদ হা/২০০১৩; ইরওয়া হা/২০৩৩; ছহীহুত তারগীব হা/১৯২৯।
[16]. বুখারী হা/৩১৩০, ৩৬৯৮।
[17]. আবূদাউদ হা/২১৩৩; নাসাঈ হা/৩৯৪২; ইবনে মাজাহ হা/১৯৬৯।
[18]. তিরমিযী হা/১১৪২; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬১; মিশকাত হা/৩২৩৬।
[19]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৮৩৫৮; ছহীহাহ হা/২৮৭।
[20]. আবু দাউদ হা/১৬৬৪; ছহীহুল জামে‘ হা/১৬৪৩।
[21]. ছহীহুল জামে‘ হা/৩২৯৯।
[22]. আবুদাঊদ হা/৪০৪৮; তিরমিযী হা/২৭৮৭; নাসাঈ হা/৫১১৭; মিশকাত হা/৪৩৫৪।
[23]. বুখারী হা/৩২৩৭; মুসলিম হা/১৪৩৬।
[24]. ইবনু মাজাহ হা/১৮৬১; ছহীহাহ হা/৬২৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৪০৫৩।
[25]. তিরমিযী হা/৩০৯৪; ছহীহুত তারগীব হা/১৪৯৯; ইবনু মাজাহ হা/১৮৫৬।
[26]. মুসলিম হা/২৭২৭।
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পরকিয়া- ব্যভিচার ও ভয়াবহ পরিণতি
পরকিয়া-যিনা-ব্যাভিচার
সাধারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য ব্যভিচার
যিনা বা জিনা ( আরবি: زِنَاء, زِنًى, زِنًا) হল বিবাহের সম্পর্ক ছাড়া দুইজন মানুষের (পুরুষ এবং মহিলা) মধ্যে যৌনক্রিয়া। ব্যুৎপত্তিগতভাবে: যিনা হলো ইসলামি বৈবাহিক নিয়ম অনুযায়ী পরস্পর বিবাহের সম্পর্ক স্থাপন না করে দুই মুসলিমের মাঝে অবৈধ যৌন সম্পর্ক বিষয়ক একটি ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা। [৩] বিবাহোত্তর যৌনতা ও বিবাহপূর্ব যৌনতা, যেমন:[৪][৫]
পরকীয়া ( পারস্পারিক সম্মতিতে বিবাহিতদের অবৈবাহিক যৌন সম্পর্ক),[৬][৭]
ব্যভিচার ( দুই জন অবিবাহিতের পারস্পারিক সম্মতিতে যৌনসঙ্গম)[৮],
পতিতাবৃত্তি (অর্থের বিনিময়ে যৌনসঙ্গম),
সমকামিতা,[৯] (তবে এতে কিছু ব্যাখা আছে। আরো জানতে দেখুন: ইসলামে সমকামিতা)
সডোমি (পায়ুসঙ্গম),
অজাচার (নিজ পরিবারের সদস্য বা অবিবাহযোগ্য রক্তসম্পর্কের ব্যক্তির সঙ্গে যৌনসঙ্গম),
পশুকামিতা (অমানব পশুর সঙ্গে যৌনসঙ্গম) ও
ধর্ষণ (জোরপূর্বক অবৈবাহিক যৌনসঙ্গম)[১০] এসব কিছু জিনার অন্তর্ভুক্ত। তবে শাস্তির বিধানে কমবেশ হওয়ার কথা আছে। যিনা কবিরা গুনাহ, যা তাওবা ব্যাতিরেকে মাফ হয় না। কুরআনে বলা হয়েছে যে, ”ওয়া লা তাকরাবুয যিনা” যার অর্থ হলো, “তোমরা যিনার ধারে-কাছেও যেও না”।
যিনা হারাম হওয়ার লোগো
বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর যৌনতার বিরুদ্ধে যিনা আইন বিশিষ্ট মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা[১][২]
প্রাথমিক ইসলামি শাস্ত্রলিপিসমূহ
সম্পাদনা
ইসলামে যিনা একটি হুদুদ আইনের শাস্তিযোগ্য পাপ অথবা আল্লাহর বিরুদ্ধাচারকারী একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।[১১] কুরআন এবং হাদিসসমূহে এটি উল্লেখিত রয়েছে। কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যে কোন প্রকারের যৌন ক্রিয়াকলাপ যা বৈধ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ব্যতীত সম্পাদিত হয় সেগুলো যিনা বলে গণ্য হবে, এবং তা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সমানভাবে শাস্তিযোগ্য
কুরআনের বেশ কয়েকটি জায়গায় যিনা সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রথমটি হল কুরআনের সাধারণ নিয়ম যেখানে মুসলিমদের যিনায় লিপ্ত না হতে আদেশ দেয়া হয়েছে:
“তোমরা যিনার ধারে কাছেও যেয়ো না: কারণ এটি একটি লজ্জাজনক ও নিকৃষ্ট কর্ম, যা অন্যান্য নিকৃষ্ট কর্মের পথ খুলে দেয়। ”
— কুরআন, সূরা ১৭ (আল-ইসরা/বনি ইস্রাঈল), আয়াত ৩২[১২]
কুরআনের পর ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপি উৎস হাদিসে যিনাকে সঙ্গায়িত করা হয়েছে সকল প্রকারের বিবাহবহির্ভূত যৌনসঙ্গম হিসেবে।[১৩]
আবূ হুরায়রা সুত্রে মুহাম্মাদ (সাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আদম সন্তানের উপর যিনার যে অংশ লিপিবদ্ধ আছে তা অবশ্যই সে প্রাপ্ত হবে। দু-চোখের যিনা হল (নিষিদ্ধ যৌনতার প্রতি) দৃষ্টিপাত করা, দু’কানের যিনা হল শ্রবণ করা, রসনার যিনা হল কথোপকথন করা, হাতের যিনা হল স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হল হেঁটে যাওযা, অন্তরের যিনা হচ্ছে আকাঙ্ক্ষা ও কামনা করা। আর যৌনাঙ্গ অবশেষে তা বাস্তবায়িত করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
— সহীহ বুখারী, ৮:৭৭:৬০৯ (ইংরেজি),সহীহ মুসলিম, ৩৩:৬৪২১ (ইংরেজি)
ব্যভিচার ও পরকীয়া
সম্পাদনা
কুরআন
সম্পাদনা
কুরআনে সর্বপ্রথম সূরা নিসায় যিনার শাস্তি সম্পর্কিত সাময়িক অস্থায়ী নির্দেশনা অবতীর্ণ করা হয়।
“আর নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচারিণী তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চার জন পুরুষকে সাক্ষী হিসেবে তলব কর। অতঃপর যদি তারা সাক্ষ্য প্রদান করে তবে সংশ্লিষ্টদেরকে গৃহে আবদ্ধ করে রাখ, যে পর্যন্ত মৃত্যু তাদেরকে তুলে না নেয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন পথ নির্দেশ না করেন। তোমাদের মধ্যে যে দুজন সেই কুকর্মে (ব্যভিচারে) লিপ্ত হয়, তাদেরকে শাস্তি প্রদান কর, অতঃপর তারা যদি উভয়ে তওবা (অনুশোচনা,অনুতাপ) করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তবে তাদের থেকে হাত গুটিয়ে নাও। নিশ্চই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, দয়ালু। ”
— সূরা: নিসা, আয়াত: ১৫-১৬[১৪]
কিন্তু পরবর্তীতে সূরা নূরে নবায়িত নির্দেশনা অবতীর্ণ হওয়ার পর পূর্বোক্ত আয়াতের নির্দেশনা রহিত হয়ে যায়। এছাড়াও, অধিকাংশ নিয়মকানুন যেগুলো যিনা (ব্যভিচার/পরকীয়া), স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর উপর বা সমাজের সদস্যগণ কর্তৃক সতী সাধ্বী নারীর উপর আরোপিত অভিযোগ সম্পর্কিত, সেগুলো সূরা নূর (আলো) এ পাওয়া যায়। এই সূরাটি শুরু হয়েছে যিনার শাস্তি সম্পর্কিত বেশ কিছু বিশেষ নির্দিষ্ট নিয়মকানুন প্রদানের মধ্য দিয়েঃ
“ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত পুরুষ ও নারী যারা,- তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত প্রদান কর: তাদের বিষয়ে করুণা যেন তোমাদেরকে দুর্বল না করে, এমন একটি বিষয়ে যা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে, যদি তোমরা আল্লাহ এবং মহাপ্রলয় দিবসের উপর বিশ্বাস রাখো: এবং বিশ্বাসীদের একদলকে তাদের শাস্তির সাক্ষী করে রাখো।”
— কুরআন, সূরা ২৪ (আন-নুর), আয়াত ২[১৫]
“এবং যারা নিরপরাধ নারীদের উপর অভিযোগ আরোপ করে এরপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের বেত্রাঘাত কর, আঁশিটি করে, এবং এরপর কখনই তাদের কাছ থেকে কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ করো না; এবং এটি একারণে যে তারা সীমালঙ্ঘনকারী। তারা ব্যতীত যারা অনুতপ্ত হয় এবং সংশোধিত হয়, কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। ”
— কুরআন, সূরা ২৪ (আন-নুর), আয়াত ৪-৫[১৬]
হাদিস
সম্পাদনা
হাদিসে যিনার শাস্তির বর্ণনা এসেছে জনসম্মুখে বেত্রাঘাত এবং পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড হিসেবে, এটি পাওয়া যায় মূলত হাদিসের “কিতাব-আল হুদুদ” নামক সংকলিত খণ্ডাংশে।[৮][১৭]
‘উবাদা বিন আস-সামিত বর্ণনা করেন: আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি: আমার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। আল্লাহ সেসব মহিলাদের জন্য আদেশ জারি করেছেন। যখন একজন অবিবাহিত পুরুষ একজন অবিবাহিত নারীর সাথে ব্যভিচার করে, তাদেরকে একশত বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন পেতে হবে। আর বিবাহিত পুরুষের সাথে বিবাহিত নারীর ব্যভিচারের ক্ষেত্রে, তাদেরকে একশত বেত্রাঘাত এবং পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে হবে।
— সহীহ মুসলিম, ১৭:৪১৯১ (ইংরেজি)
আল্লাহর রাসুল বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রদান করতেন এবং, তাঁর পরে, আমরাও পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রদান করতাম, আমি ভয় করি যে কালের অতিক্রমের সাথে সাথে, মানুষ হয়তবা এটি ভুলে যাবে এবং হয়তো বলবে: আমরা আল্লাহর কিতাবে পাথর নিক্ষেপের শাস্তি খুঁজে পাই নি, এবং আল্লাহর নির্দেশিত এই কর্তব্য পরিত্যাগ করে বিপথে যাবে। পাথর নিক্ষেপ হল আল্লাহর কিতাবে দেয়া ব্যভিচারী বিবাহিত পুরুষ ও নারীদের জন্য ধার্যকৃত একটি দায়িত্ব যখন তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়, অথবা যদি গর্ভধারণ ঘটে, অথবা যদি দোষ স্বীকার করা হয়।
— সহীহ মুসলিম, ১৭:৪১৯৪ (ইংরেজি)
মা’য়িয মুহাম্মদের নিকট এলো এবং তার উপস্থিতিতে নিজের ব্যভিচার করার কথা চারবার স্বীকার করল, তাই মুহাম্মদ (সাঃ) তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার আদেশ দিলেন। কিন্তু হুজ্জালকে বললেন: “তুমি যদি তাকে তোমার কাপড় দ্বারা ঢেকে দিতে, তাহলে তা তোমার জন্য ভাল হত।”
— সুনান আবু দাউদ, ৩৮:৪৩৬৪ (ইংরেজি)
আরেক বিশুদ্ধ নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ সহিহ বুখারীতে কয়েকটি ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার কথা উল্লেখ রয়েছে।[১৮] উদাহরণস্বরূপ,
আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত: ‘উতবা বিন আবি ওয়াক্কাস তাঁর ভাই সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে বললেন, “জা’মার দাসীর পুত্রটি আমার থেকে আগত, তাই একে তোমার তত্ত্বাবধানে রাখো।” তাই মক্কা বিজয়ের বছরে, সা’দ তাকে নিয়ে নিলেন এবং বললেন, “(এ হল) আমার ভাইয়ের পুত্র যাকে আমার ভাই আমার তত্ত্বাবধানে রাখতে বলেছেন।” ‘আব্দ বিন জা’মা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে গেলো এবং বললো, “(সে) আমার ভাই, আমার বাবার দাসীর পুত্র, এবং আমার পিতার বিছানায় তাঁর জন্ম হয়েছিল।” তাই তারা উভয়েই আল্লাহর রাসুলের সামনে তাদের মোকাদ্দমা পেশ করলেন। সা’দ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! এই বালক আমার ভাইয়ের পুত্র আর তিনি একে আমার দায়িত্বে অর্পণ করেছেন।” ‘আব্দ বিন জা’মা বলল, “এই বালক আমার ভাই এবং আমার পিতার দাসীর ছেলে, এবং আমার পিতার বিছানায় তাঁর জন্ম হয়েছিল।” আল্লাহর রাসুল বললেন, “এই বালকটি তোমার, হে ‘আব্দ বিন জা’মা!” এরপর আল্লাহর রাসুল আরও বললেন, “উক্ত সন্তানটি বিছানার মালিকের, এবং উক্ত ব্যভিচারকারীকে পাথর নিক্ষেপ করা হোক।” যখন তিনি উতবার সাথে বাচ্চাটির সাদৃশ্য দেখলেন, তখন সাওদা বিন জা’মাকে বললেন, “তোমার পর্দা তাঁর সামনে নামিয়ে দাও।” বালকটি মৃত্যুর পূর্বে আর কখনই ওই মহিলাকে দেখতে পায় নি।
— সহীহ বুখারী, ৯:৮৯:২৯৩ (ইংরেজি)
পুরুষ ও নারীর মধ্যে যিনা সম্পর্কিত আরও যে সকল হাদিস রয়েছে সেগুলো হল:
অবৈধ যৌন কর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্য এক ইহুদি মহিলাকে পাথর নিক্ষেপ (রজম)।[১৯]
আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন যে মুহাম্মদ(সাঃ) একজন যুবক এবং একজন বিবাহিত মহিলার দৈহিক মিলনের অভিযোগে মহিলাটিকে পাথর নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন[২০] এবং যুবকটিকে চাবুক মারতে ও এক বছরের জন্য নির্বাসন দিতে নির্দেশ দিলেন;
ওমর ইবন আল-খাত্তাব নিশ্চিত করেন যে, একটি নির্দেশ নাযিল হয়েছিল এই বিষয়ে যে, কোন মুহসান ব্যক্তি (একজন প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন, মুসলিম যে পূর্বে বৈধভাবে বৈবাহিক যৌন সম্পর্কে অংশ নিয়েছে, এবং তাঁর বিবাহ এখনো নিশ্চিতভাবে বহাল রয়েছে) যদি অবৈধ যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় তবে তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে।
প্রাচীন সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে কুরআন এর অনুমতিক্রমে মুহাম্মদের নির্দেশানুযায়ী একজন বিবাহিত বা অবিবাহিত মুসলিম পুরুষ তার নিজ মালিকানাধীন কোন ক্রীতদাসীর সাথে উক্ত ক্রীতদাসীর সম্মতিতে অথবা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন ক্রিয়াকলাপ করতে পারত এবং এ ধরনের যৌনতা যিনা হিসেবে গণ্য হত না।[২১][২২][২৩]
ধর্ষণ
সম্পাদনা
আরবি ভাষায়, ইগতিসাব (বলপূর্বক কোন কিছু আদায় করা) বা যিনা-আল-জিবর শব্দটি ধর্ষণ অর্থে ব্যবহৃত হয়।[১০] ইসলামি এটি হিরাবাহ বা রাহাজানি শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম ধর্ষণ বা বলপূর্বক যৌন হয়রানিকে অনুমোদন করে না। এ সম্পর্কে আবু দাউদে মুহাম্মাদের(সাঃ) সময়কালের একটি ঘটনা[২৪] এবং মুয়াত্তা ইমাম মালিক গ্রন্থে প্রাথমিক সময়ের দুজন খলিফার দুটি বিচারকার্যের ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।[২৫] এগুলো হল:
আলকামা তাঁর পিতা ওয়াযেল থেকে বর্ণনা করেন যে, মুহাম্মদের(সাঃ) যুগে জনৈক মহিলা সালাত আদায়ের জন্য গমনকালে পথিমধ্যে তার সাথে একজন পুরুষের দেখা হলে, সে ব্যক্তি জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। সে মহিলা চিৎকার দিলে, তার পাশ দিয়ে গমনকালে জনৈক ব্যক্তি এর কারণ জানতে চায়। তখন সে মহিলা বলেঃ অমুক ব্যক্তি আমার সাথে এরূপ অপকর্ম করেছে। পরে তার পাশ দিয়ে মুহাজিরদের একটি দল গমনকালে সে মহিলা তাদের বলেঃ অমুক ব্যক্তি আমার সাথে এরূপ কাজ করেছে। তারপর তারা গিয়ে এক ব্যক্তিকে ধরে আনে, যার সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে, সে-ই এরূপ করেছে। এরপর তারা সে ব্যক্তিকে উক্ত মহিলার কাছে উপস্থিত করলে, সেও বলেঃ হ্যাঁ। এই ব্যক্তিই এ অপকর্ম করেছে। তখন তাঁরা সে ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ এর নিকট নিয়ে যায়। মুহাম্মদ(সাঃ)যখন সে ব্যক্তির উপর শরীআতের নির্দেশ জারী করার মনস্থ করেন, তখন মহিলার সাথে অপকর্মকারী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যায় এবং বলেঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আমি এই অপকর্ম করেছি। তখন নবি মুহাম্মাদ সে মহিলাকে বলেনঃ তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমার অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন। এরপর তিনি(সাঃ) ভুলভাবে ধরে আনা লোকটির সাথে উত্তম ব্যবহার করেন এবং ধর্ষক ব্যক্তিটির জন্য বলেনঃ একে পাথর মেরে হত্যা কর। [২৬] মুহাম্মদ(সাঃ) আরও বলেনঃ[২৭] লোকটি এমন তাওবা করেছে যে, সমস্ত মদীনাবাসী এরূপ তাওবা করলে, তা কবূল হতো।
— যামী আল-তিরমিযি, 17:37, সুনান আবু দাউদ, ৩৮:৪৩৬৬ (ইংরেজি)
মালিক নাফির কাছ থেকে আমাকে বর্ণনা করেন যে, খুমুসের ক্রীতদাসদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে একজন ক্রীতদাস নিযুক্ত ছিল এবং সে একজন কৃতদাসীর উপর ঐ নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করল এবং তাঁর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হল। ওমর ইবনুল খাত্তাব তাকে চাবুকপেটা করলেন এবং তাকে বহিষ্কার করলেন, এবং তিনি দাসীটিকে চাবুকপেটা করলেন না কারণ ঐ নারীর উপর বল প্রয়োগ করে জোর খাটান হয়েছিল।
— সহিহ বুখারী[২৮],আল-মুয়াত্তা, ৪১ ৩.১৫ (ইংরেজি)
মালিক শিহাবের কাছ থেকে আমাকে বর্ণনা করেন যে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ধর্ষণের একটি বিচারে রায় দিলেন যে ধর্ষককে ধর্ষিত মহিলার জন্য মোহর দিতে হবে। ইয়াহিয়া বললেন যে তিনি মালিককে বলতে শুনেছেন, “আমাদের সম্প্রদায় যা করা হয় একজন পুরুষকে যে একজন নারীকে ধর্ষণ করে, হোক সে কুমারী বা অকুমারী, যদি সে মুক্ত হয়, তাহলে অবশ্যই ঐ পুরুষকে ঐ মহিলার জন্য মহিলাটির চাহিদা অনুযায়ী মোহর দিতে হবে। যদি সে একজন দাসী হয়, তাহলে অবশ্যই ঐ নারীকে এমন সমতুল্য কিছু দিতে হবে যা তাঁর অপমানিত মূল্যকে লাঘব করে। এরকম মামলায় হদ বা হুদুদ শাস্তি প্রয়োগ করা হবে, এবং ধর্ষিত মহিলাটির উপর কোন শাস্তি প্রয়োগ করা হবে না। যদি ধর্ষকটি একজন কৃতদাস হয়, তাহলে উক্ত দ্বায় তাঁর মালিকের উপর বর্তাবে যদি না ঐ মালিক ঐ ক্রীতদাসটিকে আদালতের কাছে অর্পণ করে।”
— আল-মুয়াত্তা, ৩৬ ১৬.১৪ (ইংরেজি)
তাই হাদিসের বিবৃতি অনুযায়ী অধিকাংশ আইনবিদের বক্তব্য হল, ধর্ষকের শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। তবে কিছু আধুনিক আইনবিদ মনে করেন, ধর্ষকের শাস্তি একজন যিনাকারীর মতই, অর্থাৎ ধর্ষক বিবাহিত হলে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড এবং অবিবাহিত হলে তাকে একশত বেত্রাঘাত প্রদান এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন দিতে হবে: এবং উভয় ক্ষেত্রেই শাস্তি জনসম্মুখে প্রদান করতে হবে। ধর্ষিতাকে কোন প্রকার শাস্তি দেয়া হবে না, কারণ ধর্ষিতাদের সাধারণত প্রতিরোধ ক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল হয়ে থাকেন।[১০] [২৯]
ইমাম মালিক সহ বেশ কিছু ইসলামি পণ্ডিত আরও বলেন যে ঐ ব্যক্তির উক্ত মহিলাকে মোহর দিতে হবে। :
ইমাম মালিক বলেন, আমাদের মতে যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে ধর্ষণ করে, হোক সে মহিলা কুমারী অথবা না, যদি সে একজন মুক্ত মহিলা হয় তাকে অবশ্যই দাবি অনুযায়ী অর্থ দিতে হবে, আর যদি ঐ মহিলা কোন দাসী হয়, তবে তাকে অবশ্যই এমন কিছু দিতে হবে যা দ্বারা সে নিজের উপর সংঘটিত উক্ত দুর্ঘটনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। ধার্য শাস্তি ধর্ষকের উপর প্রযুক্ত হবে এবং যে মহিলা ধর্ষিত হয়েছে তাঁর জন্য কোন শাস্তি নেই, মামলা যাই হোক না কেন।
— আল-মুয়াত্তা, ২/৭৩৪[১০]
আল-শাফায়ি, আল-লায়িস উক্ত দৃষ্টিভঙ্গিরর সঙ্গে ঐকমত্যদেখিয়েছেন এবং আলী ইবনে আবি তালিবও একই রকম মতামত দিয়েছেন। আবু হানিফা এবং আস-সাওরি দাবি করেন যে, হুদুদ শাস্তি দিতে হবে কিন্তু ধর্ষক মোহর দিতে বাধ্য নয়। যাই হোক, আলেমগণ সকলেই এ বিষয় একমত যে, ধর্ষককে হুদুদ আইনের অধীনে শাস্তি দিতে হবে, যদি তাঁর বিরুদ্ধে পরিষ্কার তথ্য প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় অথবা যদি সে অপরাধ স্বীকার করে এবং ধর্ষিত মহিলাকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না।[৩০] ধর্ষণের মামলায়, চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেটি সকল পরিস্থতিতিতে প্রযোজ্য নয়। যদি কোন ব্যক্তি তাঁর অপরাধ স্বীকার করে, তখন প্রত্যক্ষদর্শীর প্রয়োজন হবে না।[৩১] কোন কোন ক্ষেত্রে এধরনের অপরাধ স্বীকার বাতিল বলে গণ্য হয় এবং সাক্ষীর আবশ্যকতা আবার পুনর্বহাল হতে পারে। যদি কোন প্রমাণ নাই পাওয়া যায় অথবা আসামী যদি দোষ নাই স্বীকার করে অথবা চারজন সাক্ষী না পাওয়া যায়, তখন বিচারক ধর্ষককে এমন কোন শাস্তি দিতে পারেন যেটি তাকে এবং তাঁর মত অন্যান্যদেরকে এধরনের কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করবে এবং বিরত রাখবে।[১০] ধর্ষণের অভিযোগকারী মহিলা থেকে যদি, ধর্ষণের সময় আর্তনাদ বা সাহায্যের জন্য চিৎকারের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়, তবে নিযুক্ত কাজি উক্ত ঘটনাকে একটি শক্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন যা নির্দেশ করে যে, পুরুষটি উক্ত মহিলাকে জোর করেছিল বা তাঁর উপর শক্তি প্রয়োগ করেছিল।[১০] ধর্ষণের অভিযোগকারী যদি অভিযোগটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা মিথ্যা অভিযোগ বলে গ্রহণ করা হবে, যার শাস্তি হল বেত্রাঘাত।[৩২]।রেফার
পতিতাবৃত্তি
সম্পাদনা
পতিতাবৃত্তি ইসলামে নিষিদ্ধ। কুরআনে বলা হয়েছে,
আর শুধু পার্থিব জীবনে তোমরা কিছু স্বার্থ লাভ করার উদ্দেশ্যে তোমাদের দাসীদেরকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করো না, যদি তারা সতীত্ব বজায় রাখতে চায়। কুরআন ২৪:৩৩
কোন মুসলিম যদি এ কাজে সম্পৃক্ত হয় তবে তার শাস্তি ব্যভিচারের অনুরুপ, তা হল অবিবাহিতের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও একবছরের নির্বাসন এবং বিবাহিতের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও মৃত্যুদন্ড। ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে আরবে এর প্রচলন ছিল। ইসলাম আগমনের পর নবি মুহাম্মাদ সকল স্তরে পতিতাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আবু মাসুদ আল আনসারি বর্ণিত:
“আল্লাহর বার্তাবাহক কুকুরের মূল্য, পতিতাবৃত্তি থেকে অর্জিত অর্থ এবং জাদুকরের আয়করা অর্থ নিতে নিষেধ করেছেন।”। সহীহ বুখারী, ৩:৩৪:৪৩৯ (ইংরেজি)
জাবির হতে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল তার দাসীদেরকে বলতেন, যাও এবং পতিতাবৃত্তির মমাধ্যমে আমাদের জন্য কিছু আয় করে আনো। এর পরপরই এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা উক্ত আায়াত নাজিল করেন:”আর তোমাদের অধীনস্থ দাসীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করো না, যখন তারা ইহকালীন জীবনে ভালো কিছু পাবার আশায় নিজেদের সতীত্ব বজায় রাখতে চায়, আর কেউ যদি তাদেরকে বাধ্য করে, তবে নিশ্চই বাধ্য করার পর আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।” (২৪:৩৩)।
— সহীহ মুসলিম, ৪৩:৭১৮০ (ইংরেজি),সহীহ মুসলিম, ৪৩:৭১৮১ (ইংরেজি),সুনান আবু দাউদ, ১২:২৩০৪ (ইংরেজি)
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বর্নিত:
মুহাম্মদ বলেছেন: ইসলামে কোন পতিতাবৃত্তি নেই। কেউ যদি ইসলাম-পূর্ব সময়ে পতিতাবৃত্তির চর্চা করে থাকে, তাহলে তা হতে আগত সন্তান (দাসীর অর্থাৎ পতিতার) মালিকের সম্পত্তি হবে। যে ব্যক্তি বৈধ বিয়ে বা মালিকানা ছাড়া কাউকে সন্তান দাবি করে, তার কোন উত্তরাধিকারীও থাকবে না, এবং সে কারও উত্তরাধিকারও পাবে না।
— সুনান আবু দাউদ, ১২:২২৫৭ (ইংরেজি)
উরওয়া ইবনে জুবাইর বর্নিত:
তিনি বলেন, তাকে মুহাম্মদের(সাঃ)সহধর্মিনী আয়িশা(রা.) বলেছেন, জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল। এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মাসিক ঋতু থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সাথে যৌন মিলন কর। এরপর তার স্বামী নিজ স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনও এক বিছানায় ঘুমাত না, যতক্ষণ না সে অন্য ব্যক্তির দ্বারা গর্ভবতী হত, যার সাথে স্ত্রীর যৌন মিলন হত। যখন তার গর্ভ সুস্পষ্টবাবে প্রকাশ হত তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। এটা ছিল তার স্বামীর অভ্যাস। এতে উদ্দেশ্য ছিল যাতে করে সে একটি উন্নত জাতের সন্তান লাভ করতে পারে। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইস্তিবদা’ বলা হত।
তৃতীয় প্রথা ছিল যে, দশ জনের কম কতিপয় ব্যক্তি একত্রিত হয়ে পালাক্রমে একই মহিলার সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হত। যদি মহিলা এর ফলে গর্ভবতী হত এবং কোন সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হত, সেই মহিলা এ সকল ব্যক্তিকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। যখন সকলেই সেই মহিলার সামনে একত্রিত হত, তখন সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো- তোমরা কি করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি, সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ঐ মহিলা যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন এ ব্যক্তি উক্ত শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং ঐ মহিলা তার স্ত্রীরূপে গণ্য হত।
চতুর্থ প্রকারের বিবাহ হচ্ছে, বহু পুরুষ একই মহিলার সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হত এবং ঐ মহিলা তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে শয্যা-শায়ী করতে অস্বীকার করত না। এরা ছিল বারবনিতা (পতিতা), যার চিহ্ন হিসাবে নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে এদের সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হতে পারত। যদি এ সকল মহিলাদের মধ্য থেকে কেউ গর্ভবতী হত এবং কোন সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়া সকল কাফাহ্ পুরুষ এবং একজন ‘কাফাহ্’ (এমন একজন বিশেষজ্ঞ, যারা সন্তানের মুখ অথবা শরীরের কোন অঙ্গ দেখে বলতে পারত- অমুকের ঔরসজাত সন্তান) কে ডেকে আনা হত সে সন্তানটির যে লোকটি সাথে এ সা’দৃশ্য দেখতে পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ঐ লোকটি ঐ সন্তানকে নিজের হিসাবে অস্বীকার করতে পারত না। যখন মুহাম্মদ(সাঃ) সত্য দ্বীনসহ পাঠানো হল তখন তিনি জাহেলী যুগের সমস্ত বিবাহ প্রথাকে বাতিল করে দিলেন এবং বর্তমানে প্রচলিত শাদী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিলেন।
— সহীহ বুখারী, ১:৬২:৫৮ (ইংরেজি)
তবে, দাসপ্রথার সময়কালে উপপত্নীত্ব নামক যৌন দাসত্বকে ইসলামে পতিতাবৃত্তি হিসেবে গণ্য করা হত না।[৩৩] ইবনে বতুতা তার ভ্রমণকথায় বহুবার দাসী কেনার বা উপহার পাবার কথা উল্লেখ করেছেন।[৩৪]
শিয়া মুসলিমদের মতানুযায়ী, মুহাম্মদ(সাঃ) নিকাহ মুতাহ নামক নির্দিষ্টকালের জন্য বিয়ের অণুমতি দিয়েছিলেন।[৩৫] তবে সুন্নি মুসলিমগণের বক্তব্য হল, মুতাহ বিয়ের চর্চা নবি মুহাম্মাদ নিজে বাতিল করেছিলেন এবং খলিফা আবু বকরের সময় তা পুনরাবির্ভাব ঘটার পর খলিফা ওমর পুনরায় এটি নিষিদ্ধ করেছিলেন।[৩৬][৩৭][৩৮]
“ ” আয়াশ ইবনে সালামাহ তার পিতার সূত্রে বলেছেন, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আওতাস যুদ্ধের বছর তিনদিনের (মুতাহ) বিবাহের অণুমতি দান করেছিলেন। তারপর তিনি তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে খলিফা ওমরও এই কাজ করতে নিষেধ করেন।” ”
সডোমি
সম্পাদনা
মূল নিবন্ধসমূহ: পায়ুসঙ্গমের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও মুখমৈথুনের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
মুহাম্মদ লূতের সাদুম সম্প্রদায়ের “সীমালঙ্ঘনমূলক” কাজগুলোকে “সডোমি” বলা হয়, বর্তমানে সডোমি বলতে পায়ুকাম (লিওয়াত) ও মুখমৈথুনকে বোঝানো হয়।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী মানবদেহে পায়ূতে লিঙ্গ প্রবেশ হারাম।[৩৯] ইউসুফ আল-কারযাভির মতে, নিজ স্ত্রীর সঙ্গেও পায়ূমৈথুন হারাম বা নিষিদ্ধ, এবং ইসলামি বৈবাহিক সম্পর্কে তা নিষিদ্ধ হওয়ায় স্ত্রীরা স্বামীকে তা থেকে বিরত রাখবে, এবং স্বামী তাকে জোর করলে তালাকের আবেদন করতে পারবে।[৪০] যদিও তাতে বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল হয় না, কিন্তু ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী এ ঘটনায় স্ত্রী তালাক আবেদনের অধিকার রাখেন।[৪১] সকল মুসলিম আইনবিদই একমত ষে, পায়ুকাম নিষিদ্ধ, যার ভিত্তি হল এই হাদিসগুলো :
“তোমরা (পুরুষেরা) নারীদের সাথে পায়ুপথে সহবাস কোরো না।”
— (আহমাদ, আত-তিরমিযি, আন-নাসায়ী, এবং ইবনে মাজাহে বর্ণিত)
মুহাম্মদ(সাঃ) আরও বলেন,
“সে পুরুষ অভিশপ্ত, যে কোন নারীর সাথে পায়ুপথে সঙ্গম করে।”
— (আহমাদ)
[৪২] খুজাইমা ইবনে সাবিদ বর্ণনা করেন,
“আল্লাহর রাসুল (সাঃ)বলেছেন: আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন না: তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে পায়ুপথে সঙ্গম করো না।”
— (আহমাদ হতে বর্ণিত, ৫/২১৩)
ইবনে আবাস বর্ণনা করেন: “আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন:
“আল্লাহ সেই পুরুষের দিকে তাকাবেন না যে তার স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করেছে।”
— (ইবনে আবি শাইবা হতে বর্ণিত, ৩/৫২৯, আত-তিরমিযীতে এটিকে বিশুদ্ধ হাদিস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ১১৬৫)
উপরন্তু, বলা আছে যে মুহাম্মদ(সাঃ) একে ছোট “সডোমি(অজাচার)” বলে আখ্যায়িত করেছেন। (আন-নাসায়ী হতে বর্ণিত)
বর্ণিত আছে যে, মদিনার ইহুদিগণ বলতো যে, কেও যদি তার স্ত্রীর সাথে পেছন দিক থেকে জরায়ুপথে সঙ্গম করে তবে তার সন্তান ট্যাড়া চোখ নিয়ে জন্মাবে। সে সময়ে একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব মুহাম্মদের(সাঃ) নিকট এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি!” নবি মুহাম্মাদ প্রশ্ন করলেন, “কি তোমাকে ধ্বংস করেছে?” তিনি উত্তরে বললেন, “গত রাতে আমি আমার স্ত্রীকে পেছন দিকে ঘুরিয়ে ফেলেছিলাম। ,” অর্থাৎ তিনি পেছন দিক থেকে তার স্ত্রীর সাথে জরায়ুপথে সহবাস করেছিলেন।
মুহাম্মদ(সাঃ) তাকে কিছু বললেন না। এরপর এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলঃ
“তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র, অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার (তোমাদের স্ত্রীদের সাথে জরায়ুপথে যেকোনোভাবে সঙ্গম করতে পারো কিন্তু পায়ুপথে নয়)। আর তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য আগেই কিছু পাঠাও (ভালো কাজ করো আথবা আল্লাহর কাছে পুণ্যবান সন্তানসন্তদি প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করো) ও আল্লাহ্কে ভয় করো। আর জেনে রাখো যে, আল্লাহ্র সাথে নিশ্চয়ই তোমাদের (পরকালে) দেখা করতে হবে। আর (হে মুহাম্মাদ,) বিশ্বাসীদেরকে সুখবর দাও।”কুরআন ২:২২৩
উপরিউক্তে আয়াতে স্ত্রীর সাথে জরায়ুপথে সঙ্গমকে শস্যক্ষেত্রে বীজ বপনের সাথে তুলনা করে এটি নির্দেশ করা হয়েছে যে, ইসলামে ইচ্ছেমত যে কোন পন্থায় শুধুমাত্র জরায়ুপথেই সঙ্গম করাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে, কারণ শস্যক্ষেত্রে বীজ বপনের ফলে যেমন ফসল উৎপন্ন হয় ঠিক সেভাবে জরায়ুপথে সঙ্গমের ফলেই সন্তানের জন্ম হয়।
এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মুহাম্মদ(সাঃ) ওমর বিন খাত্তাবকে(রা.) উত্তর দেন, “সামনে বা পেছনে যে কোন দিক থেকে [নিজের স্ত্রীর সাথে জরায়ুপথে সংগম কর], কিন্তু পায়ুপথকে পরিহার কর এবং রজস্রাবকালে সঙ্গম থেকে বিরত থাকো।” (আহমাদ এবং তিরমিজী হতে বর্ণিত)
কুরআনে লুতের সম্প্রদায়ের ঘটনার মাধ্যমেও পুরুষ সমকামী পায়ুসঙ্গমকে উল্লেখ করা হয়েছে।[৪৩] মুহাম্মদ তার অনুসারীদের মাঝে লূত-এর অধীনস্থ সডোম ও গোমরাহ সম্প্রদায়ের এই সকল “সীমালঙ্ঘনমূলক কর্মকাণ্ড” ছড়িয়ে পড়ার ব্যপারে সতর্ক করেছেন এবং তার অনুসারীদের মাঝে এসব কর্মে জড়িত ব্যক্তিদের মৃত্যুদন্ড দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। আবু বকর তার খিলাফতের সময় এ ধরনের ব্যক্তিদের উপর দেয়াল ধ্সিয়ে দিতেন এবং আলী(রা) তার খিলাফতের সময় এদের আগুনে পুড়িয়ে মারতেন।
ইসলামে বৈবাহিক মুখমৈথুনকে কিছু আইনবিদ মাকরুহ তাহরীমী[৪৪][৪৫] বা কঠোরভাবে বর্জনীয় বলে স্বাব্যস্ত করেছেন।[৪৬] এর পেছনে কারণটি কুরআন ও হাদিসে একে উৎসাহিত করা হয় নি সে কারণে নয়, বরং তা হল শালীনতা, পবিত্রতা (ইসলামে ধর্মীয় রীতিনীতিগত পবিত্রতা বা তাহারাত) ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক দ্বন্দ্ব।[৪৭] এর পেছনে সবচেয়ে সাধারণ দাবিটি হল,[৪৫] যে, মুখ এবং জিহ্বা কুরআন পঠন ও আল্লাহর স্মরণে ব্যবহৃত হয়, তাই তা অপবিত্রতায় ব্যবহার করা উচিত নয়।[৪৮] প্রথমত, মুসলিম পন্ডিতগণ মুখের মাধ্যমে গুপ্তাঙ্গ স্পর্শকে বর্জনীয় বলে বিবেচনা করেন, যার কারণ, বাম হাতের পরিবর্তে ডান হাতে গুপ্তাঙ্গ স্পর্শ করতে নবি মুহাম্মাদ নিষেধ করেছেন; তাদের মতে যেহেতু মুখ ডান হাতের তুলনায় অধিক সম্মানিত, সেই হিসেবে মুখের মাধ্যমে গুপ্তাঙ্গ স্পর্শ অধিক ঘৃণ্য ও বর্জনীয়। দ্বিতীয়ত, চারটি সুন্নি মাজহাবের পণ্ডিতগণের মধ্যে বীর্য নিঃসরণ পবিত্র কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কিছু পণ্ডিত একে অপবিত্র মনে করেন এবং কিছু পণ্ডিত করেন না।
সমকামিতা
সম্পাদনা
ইসলামে কোন পুরুষের সঙ্গে পুরুষের বা নারীর সঙ্গে নারীর বিবাহ হতে পারে না। তাই সমকামিতা বা একই লিঙ্গের ব্যক্তির সঙ্গে যৌনসঙ্গম যিনার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন সমলিঙ্গীয় যৌন সম্পর্ককে নিষিদ্ধ করেছে, সূরা আন-নিসা, সূরা আল-আরাফ (লূতের জনগণের ঘটনার মাধ্যমে), এবং অন্যান্য সূরায়। উদাহরণস্বরূপ,[৯][৪৯]
আমি লুতকেও পাঠিয়েছিলাম: সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল: “তোমরা কি এমন কুকর্ম করবে যা সৃষ্টিজগতে তোমাদের পূর্বে এর আগে কখনো কেউ করেনি? কারণ তোমরা নারীদের পরিবর্তে পুরুষের দ্বারা নিজেদের কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ কর: তোমরা তো সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।”
— কুরআন ৭:৮০–৮১
আরেকটি আয়াতে, মুহাম্মদ লুতের স্বীকারোক্তিকে নির্দেশ করা হয়েছে,
তোমরা কি পৃথিবীর পুরুষদের প্রতি অগ্রসর হও এবং তোমাদের প্রভু যাদেরকে সঙ্গিনী হিসেবে বানিয়েছে তাদেরকে (নারীদেরকে) ত্যাগ করো? তোমরা তো এমন এক সম্প্রদায় যারা সীমালঙ্ঘন করছে।
— কুরআন ২৬:১৬৫–১৬৬, অনুবাদ. সহিহ ইন্টারন্যাশনাল
কিছু ইসলামি পণ্ডিত নিম্নোক্ত আয়াতকে কুরআনে প্রদত্ত সমকামিতার শাস্তি হিসেবে নির্দেশ করেছেন:
“যদি তোমাদের মধ্যে দুইজন (পুরুষ) কুকর্মের জন্য দোষী প্রমাণিত হয়, তবে তাদের উভয়কে শাস্তি দাও। যদি তারা অনুতপ্ত হয় এবং সংশোধিত হয়, তবে তাদেরকে ছেড়ে দাও; কারণ নিশ্চয় আল্লাহ অনুতাপ-গ্রহণকারী, পরম দয়ালু। ”
— কুর’আন, সূরা ৪ (আন-নিসা), আয়াত ১৬[৫০]
তবে অনেক পণ্ডিত উক্ত আয়াতের “তোমাদের মধ্যে দুইজন” বলতে ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ হিসেবে ব্যখা করেছেন।
হাদিসে সমলিঙ্গীয় যৌনকর্মকে যিনা বলে গণ্য করা হয়েছে, এবং পুরুষ সমকামিতার শাস্তি হিসেবে হত্যা করতে বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে,[৪৯][৫১]
আবু মুসা আল আশআরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন: “যদি কোন মহিলার উপরে কোন মহিলা উপস্থিত হয়, তবে তারা উভয়ই ব্যভিচারিনী, যদি কোন পুরুষ অপর পুরুষের উপর আসে, তবে তারা দুজনেই ব্যভিচারী।”
— আল-তাবারানী, আল-মুযাম আল-আওত: ৪১৫৭, আল-বায়হাকী, শুআব আল-ইমান: ৫০৭৫
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন: মুহাম্মদ বলেছেন: তোমরা যদি লূতের সম্প্রদায়ের কর্মে লিপ্ত কাওকে খুঁজে পাও,[৫২] হত্যা কর তাকে যে এটি করে, এবং তাকে যার উপর এটি করা হয়।
— সুনান আবু দাউদ, ৩৮:৪৪৪৭ (ইংরেজি)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বলেছেন: কোন অবিবাহিত পুরুষ যদি লিওয়াত/সডোমিতে (পায়ুমৈথুনে/পুংমৈথুনে) লিপ্ত অবস্থায় ধরা পড়ে, তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হবে।
— সুনান আবু দাউদ, ৩৮:৪৪৪৮ (ইংরেজি)
আল-নুয়ায়রি (১২৭২–১৩৩২) তার নিহায়া গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন যে মুহাম্মাদ বলেছেন তিনি তার সম্প্রদায়ের জন্য লুতের জণগণের কর্মের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন (মদ ও নারীর ছলনার ব্যাপারে তিনি সমতুল্য ধারণা পোষণ করেছেন বলে মনে করা হয়। )।[৫৩]
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আকীল হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাবিরকে আমি বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যে কুকর্মটি আমার উম্মাতের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সর্বাধিক ভয় করি তা হল লুত সম্প্রদায়ের কুকর্ম।
— তিরমিজি:১৪৫৭, ইবনু মা-জাহ: ২৫৬৩
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান গারীব বলেছেন। আমরা শুধুমাত্র আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আকীল ইবনু আবূ তালিব হতে জাবিরের সূত্রেই হাদীসটি এভাবে জেনেছি। ১৪৫৭
ইসলামে সমকামিতার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পুরুষদের মধ্যকার কর্মকাণ্ড নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে; ফুকাহাগণ (ইসলামি আইনবিদ) এব্যাপারে সম্মত হয়েছেন যে “নারী সমকামিতার জন্য কোন হুদুদ শাস্তি নেই, কারণ এটি যিনা নয়। তবে একটি তাজির শাস্তি অবশ্যই প্রয়োগ করতে হবে, কারণ এটি একটি পাপ..'”.[৫৪] কিছু আইনবিদ মনে করেন যৌনসঙ্গম একমাত্র সে ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব যার শিশ্ন বা শিশ্নের ন্যায় নিম্নাঙ্গ আছে;[৫৫] তাই যৌনমিলনের উক্ত সংজ্ঞানুযায়ী এটি সঙ্গীর ছিদ্রপথে ন্যূনতম পরিমাণ হিসেবে অন্ততপক্ষে শিশ্নাঙ্গের অগ্রভাগ প্রবেশ করানোর উপর নির্ভরশীল।[৫৫] যেহেতু নারীদের শিশ্ন বা অণুরূপ কোন নিম্নাঙ্গ নেই এবং একে অপরের ছিদ্রপথে অঙ্গ সঞ্চালনে সক্ষম নয়, তাই উক্ত সংজ্ঞানুযায়ী তারা একে অপরের সঙ্গে শারীরিকভাবে যিনায় লিপ্ত হতে অক্ষম বলে গণ্য হয়।[৫৫]
অজাচার
সম্পাদনা
অজাচার হলো মাহরাম বা এমন ব্যক্তির সঙ্গে যৌনসঙ্গম যার সঙ্গে রক্ত-সম্পর্ক থাকার দরুণ বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ। যার সঙ্গে বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম যিনার অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে অজাচারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অজাচারীকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইবনে আবাস হতে বর্ণিত: যে মুহাম্মদ বলেছেন: “যদি কোন লোক আরেক লোককে বলে: ‘ওহে ইহুদী’ তবে তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করো। যদি সে বলে: ‘ওহে হিজড়া’ তাহলে তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করো। আর কেও যদি মাহরাম (আপন পরিবারে সদস্য বা রক্ত সম্পর্কের অবিবাহযোগ্য আত্মীয়) ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক করে তবে তাকে হত্যা কর।”
— জামেই তিরমিযি,১৭:৪৬
পশুকাম
ইসলামে কোন পশুর সঙ্গে মানুষের বিবাহ হতে পারে না। তাই পশুসঙ্গম যিনার অন্তর্ভুক্ত। পশুর সঙ্গে যৌনসঙ্গম ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এই কাজে লিপ্ত ব্যক্তি ও ব্যবহৃত পশু উভয়কে হাদিসে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত: আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “তোমরা যদি পশুর সাথে সঙ্গমরত কাওকে খুঁজে পাও তবে তাকে এবং ওই পশুকে হত্যা করবে।” ইবনে আব্বাসকে প্রশ্ন করা হল: “পশুটির কি দোষ?” তিনি বললেন: “আমি আল্লাহর রাসুলকে এ সম্পর্কে কিছু বলতে শুনিনি , কিন্তু আমার মতে ওই পশুর সাথে এরূপ জঘন্য অপকর্ম সঙ্ঘটিত হওয়ার কারণে আল্লাহর রাসুল উক্ত পশুর মাংস খেতে বা তা ব্যবহার করা পছন্দ করেননি।”
— জামেই তিরমিযি,১৭:৩৮
যিনার সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্তিসমূহ
সম্পাদনা
যিনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হল বিবাহোত্তর যৌনকর্ম (বিবাহিত মুসলিম পুরুষ এবং বিবাহিত মুসলিম নারীর মাঝে সঙ্ঘটিত, যারা একে ওপরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নয়), এবং বিবাহপূর্ব যৌনকর্ম (অবিবাহিত মুসলিম পুরুষ এবং অবিবাহিত মুসলিম নারীর মাঝে সঙ্ঘটিত)। ইসলামের ইতিহাসে, মুসলিম পুরুষের সাথে কোন দাসীর যৌনকর্মও যিনার অন্তর্ভুক্ত, যদি ওই দাসীটি ওই মুসলিম পুরুষের নিজের সম্পত্তি না হয়ে থাকে।[৫৬][৫৭]
পতিতাবৃত্তি, ধর্ষণ, সমকামিতা, পায়ুমৈথুন (লিওয়াত), পশুকামিতা এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সঙ্ঘটিত যে কোন প্রকারের অবৈবাহিক যৌনকর্ম যাতে জরায়ুতে শিশ্নের প্রবেশ ঘটে না সেগুলোও যিনার অন্তর্ভুক্ত। শরিয়া যিনাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একজন অবিবাহিত মুসলিম, একজন বিবাহিত মুসলিম (“মুহসান”) এবং একজন দাস/দাসীকে (মা মালাকাত আইমানুকুম) পৃথকভাবে বিচার করে। এক্ষেত্রে বিবাহিত মুসলিমকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পাঁথর নিক্ষেপ করতে হবে (রজম), যেখানে একজন অবিবাহিত মুসলিমকে বাধ্যগতভাবে ১০০ বেত্রাঘাত পেতে হবে এবং একজন অধিভুক্ত-দাস/দাসীকে ৫০ বেত্রাঘাত পেতে হবে।[৯][৫৮] দৈহিক মর্দন, চুম্বন, প্রেমময় আদর ও আলিঙ্গন, হস্তমৈথুন এবং পরস্পর অবিবাহিত একাধিক ব্যক্তির মাঝে যে কোন প্রকারের যৌন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যিনার একটি পরোক্ষ প্রকরণ হিসেবে গণ্য হয়।[৫৯][৬০]
ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ আছে যে, স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে সঙ্ঘটিত ইসলামে নিষিদ্ধ এবং অনুল্লেখিত যৌনকর্মসমূহের সম্পর্কে যিনার প্রকরণের প্রকৃতি এবং শারিয়া-নির্ধারিত শাস্তি কি হবে, যেমন মুখমৈথুন, পারস্পারিক হস্তমৈথুন এবং শরিয়া নিষিদ্ধ করে এমন সময়গুলোতে যৌনকর্ম, যেমনঃ বাধ্যতামূলক ধর্মীয় উপবাস বা ফরজ সাওমের সময়, হজ্বের সময় এবং স্ত্রীর মাসিক চলাকালীন সময়।[৬১] আবু হানিফা এবং মালিক, এবং তাদের নামের প্রধান দুটি ফিকহ, অনিয়মিত যৌনকর্মের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে “নাজাসাহ নীতি” ব্যবহার করে, যেমনঃ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মুখমৈথুন বর্জনীয় এবং অননুমোদিত (মাকরুহ), কারণ এটি অপবিত্রতা(হাদাছ-আকবর, حدث أکبر)’র দিকে পরিচালিত করে।
অভিযোগ যাচাই প্রক্রিয়া এবং শাস্তি
সম্পাদনা
সুন্নি ফিকহের চার মাজহাবে (ইসলামি আইনশাস্ত্রে), এবং শিয়া ফিকহের দুটি মাজহাবে, যিনা পরিভাষাটি হল শরিয়ায় (ইসলামি আইনে) বৈধ নয় এমন যৌনসঙ্গমের পাপ এবং তা হুদুদ(ইসলামি শাস্তির একটি প্রকার, যা আল্লাহ কর্তৃক বাছাইকৃত কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্ধারিত) অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।[৬২] যিনার ক্রিয়াকলাপ প্রমাণ করার জন্য, শরিয়া আদালতের একজন কাজি (ধর্মীয় বিচারক) যেসব বিষয়ের উপর নির্ভর করেন সেগুলো হল একজন অবিবাহিত মহিলার গর্ভধারণ, আল্লাহর নামে দোষ স্বীকার, অথবা যৌনকর্মের চারজন প্রত্যক্ষদর্শী। শেষ দুই প্রকারের পদ্ধতি সেভাবে প্রচলিত নয়, ইসলামের ইতিহাসে যিনার সবচেয়ে চলমান মামলাসমূহ হল অবিবাহিত গর্ভবতী মহিলা সম্পর্কিত।[৫৬][৬৩] ইসলামি ক প্রদত্ত শিক্ষা ধর্ষণের মকাদ্দমা প্রমাণ করতে কোন পরিষ্কার নিয়ম প্রদান করে নি, এবং এ কারণে ধর্ষণ প্রমাণ করতে চারজন সাক্ষী পেশ করার কোন আবশ্যিক প্রয়োজন নেই;[৬৪][৬৫] তা সত্ত্বেও ইসলামি আইনের কিছু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের নিয়ম আছে যে, যিনার অভিযোগে অভিযুক্ত একজন গর্ভবতী মহিলা যিনি দাবি করেন যে যৌনকর্মটি তার সম্মতিক্রমে ঘটেনি তাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে সে চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সম্মুখে ধর্ষিত হয়েছে এবং আদালতে সেই চারজনকে হাজির করে তাদের সাক্ষ্য পেশ করতে হবে। এই নিয়মের কারণে এ পর্যন্ত বহু মামলায় ধর্ষণে নির্যাতিত মহিলাদেরকে যিনার শাস্তি দেয়া হয়েছে।[৬৬][৬৭] উপযুক্ত প্রত্যক্ষদর্শী ব্যতীত যিনার অভিযোগ ইসলামে মিথ্যা অপবাদ (কাজফ, القذف) হিসেবে গণ্য হয়, যা হল একটি হুদুদের শাস্তিযোগ্য অপরাধ।[৬৮][৬৯]
সাক্ষ্য-প্রমাণ
সম্পাদনা
ইসলামে কোন পুরুষ বা কোন নারীকে যিনার শাস্তি দেয়ার জন্য বিশ্বস্ত তথ্যপ্রমাণ উপস্থিত করা প্রয়োজন। এগুলো হল:[৮][৫৬][৭০]
একজন মুসলিম কর্তৃক যিনার দোষ স্বীকার। তবে, উক্ত ব্যক্তি যে কোন সময়ে দোষ স্বীকারকে প্রত্যাহার করার অধিকার পাবে; উক্ত ব্যক্তি যদি দোষ স্বীকার প্রত্যাহার করে, তখন তাকে আর যিনার শাস্তি দেয়া যাবে না। (৪ জন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী ব্যতিরেকে), অথবা
কোন নারী যদি গর্ভবতী হয় কিন্তু বিবাহিত না হয়, অথবা
নির্ভরযোগ্য ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, তাদের প্রত্যেকেই একই সময়ে সঙ্গমরত (লিঙ্গ প্রবেশকৃত) সময়ে বা অবস্থায় দেখে থাকতে হবে।
“তোমাদের মধ্যে কোন নারী যদি কুকর্মের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়, তোমাদের মধ্য থেকে তাদের বিরুদ্ধে চার জন (নির্ভরযোগ্য) সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করো ; আর যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তাদেরকে গৃহে বন্দী করে রাখ যতদিন না মৃত্যু এসে তাদেরকে তুলে না নেয় , অথবা আল্লাহ তাদের জন্য (অন্য) কোন আদেশ জারি করেন। ”
— কুর’আন, সূরা ৪ (আন-নিসা), আয়াত ১৫[৭১]
যিনার জন্য চারজন সাক্ষীর আবশ্যকতা, যেটি পুরুষ বা নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগকৃত মামলায় প্রয়োগ করা হয়, সেটিও কুরআনের আয়াত ২৪:১১ থেকে ২৪:১৩ এর মধ্যে এবং বিভিন্ন হাদিস এ উল্লেখ করা হয়েছে।[৭২][৭৩] কিছু ইসলামি পণ্ডিত দাবি করেন যে চার জন পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীর আবশ্যকতা ছিল সেসব যিনার ক্ষেত্রে যেগুলো প্রকাশ্য স্থানে বা জনসম্মুখে ঘটে থাকে। এনিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে যে, নারী প্রত্যক্ষদর্শী যিনার ক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে অনুমোদনযোগ্য কিনা। (অন্যান্য অপরাধসমূহের ক্ষেত্রে, শরিয়া দুই জন নারী সাক্ষীকে একজন পুরুষ সাক্ষীর সমতুল্য হিসেবে গণ্য করে। )।[৭৪] ইসলামের সুন্নি ফিকহ মতে, নারী মুসলিম, শিশু এবং অমুসলিম সাক্ষীরা যিনার ক্ষেত্রে অনুমোদনযোগ্য নয়।
যে কোন অসম্পৃক্ত সাক্ষী, পারস্পারিক সম্মতিবিহীন যৌনসংগমের ভুক্তভোগী, যে কোন মুসলিমকে যিনার দায়ে অভিযুক্ত করে, কিন্তু শরিয়া আদালতের সামনে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, ধার্মিক পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শী (তাযিকিয়াহ-আল-শুহুদ) উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, সে মিথ্যা অভিযোগের অপরাধ (কাজফ, القذف) করে, এবং তাকে জনসম্মুখে আশিটি বেত্রাঘাত প্রদান করতে হবে।[৭৫][৭৬]
যিনার চার সাক্ষী বিশিষ্ট বিচারকার্যের অভিযোগ খুবই বিরল। বর্তমানকালে, অধিকাংশ মামলার বিচারকার্য তখন হয় যখন কোন মহিলা গর্ভবতী হয়, অথবা যখন তাকে ধর্ষণ করা হয় এবং সে শাস্তির দাবি জানায় এবং শরিয়া কর্তৃপক্ষ ধর্ষককে যথাযথভাবে তদন্ত করার পরিবর্তে মহিলাটিকে যিনার শাস্তি প্রদান করে থাকে।[৬৬][৭৭]
কিছু ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্রের পাঠশালা) শুবা (সন্দেহ) নীতি সৃষ্টি করেছিল, যেখানে যিনার জন্য কোন শাস্তি দেয়া হত না যদি কোন মুসলিম পুরুষ দাবি করত যে, সে মনে করেছিল যে সে তাঁর বিবাহিত স্ত্রীর সাথে অথবা তাঁর অধিকৃত দাসীর সাথে মৈথুন করছিল।[৮]
ব্যভিচার একটি মারাত্মক অপরাধ। হত্যার পরই যার অবস্থান। কারণ, তাতে বংশ পরিচয় সঠিক থাকে না। লজ্জাস্থানের হিফাযত হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক সম্মান রক্ষা পায় না। মানুষে মানুষে কঠিন শত্রুতার জন্ম নেয়। দুনিয়ার সুস্থ পারিবারিক ব্যবস্থা এতটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। একে অন্যের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যাকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে দেয়। এ কারণেই তো আল্লাহ তা‘আলা এবং তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যার পরই এর উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱلَّذِينَ لَا يَدۡعُونَ مَعَ ٱللَّهِ إِلَٰهًا ءَاخَرَ وَلَا يَقۡتُلُونَ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّ وَلَا يَزۡنُونَۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ يَلۡقَ أَثَامٗا ٦٨ يُضَٰعَفۡ لَهُ ٱلۡعَذَابُ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَيَخۡلُدۡ فِيهِۦ مُهَانًا ٦٩ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلٗا صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَئَِّاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٧٠﴾ [الفرقان: ٦٧، ٦٩]
“আর যারা আল্লাহ তা‘আলার পাশাপাশি অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না। আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ (শরী‘আত সম্মত) কারণ ছাড়া তাকে হত্যা এবং ব্যভিচার করে না। যারা এগুলো করবে তারা অবশ্যই কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে এবং তারা ওখানেই চিরস্থায়ীভাবে লাঞ্ছিতাবস্থায় থাকবে, তবে যারা তাওবা করে নেয়, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে; আল্লাহ তা‘আলা তাদের পাপগুলো পুণ্য দিয়ে পরিবর্তন করে দিবেন। আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৮-৭০]
আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! أَيُّ الذَّنْبِ أَكْبَرُ عِنْدَ اللهِ؟ قَالَ: أَنْ تَدْعُوَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ ، قَالَ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ خَشْيَةَ أَنْ يَّطْعَمَ مَعَكَ ، قَالَ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: أَنْ تُزَانِيَ بِحَلِيْلَةِ جَارِكَ»
“জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলো: হে আল্লাহর রাসূল! কোনো পাপটি আল্লাহ তা‘আলার নিকট মহাপাপ বলে বিবেচিত? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা; অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সে বললো, অতঃপর কী? তিনি বললেন, নিজ সন্তানকে হত্যা করা ভবিষ্যতে তোমার সঙ্গে খাবে বলে। সে বললো, অতঃপর কী? তিনি বললেন, নিজ প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করা”।[1]
আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে ব্যভিচারের কঠিন নিন্দা করেন। তিনি বলেন,
﴿وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَسَآءَ سَبِيلٗا ٣٢﴾ [الاسراء: ٣٢]
“তোমরা যিনা তথা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না। কারণ, তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩২]
তবে এ ব্যভিচার মুহরিমা (যে মহিলাকে বিবাহ করা শরী‘আতের দৃষ্টিতে হারাম) এর সাথে হলে তা আরো জঘন্য। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা নিজ বাপ-দাদার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা সম্পর্কে বলেন,
﴿وَلَا تَنكِحُواْ مَا نَكَحَ ءَابَآؤُكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَۚ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَمَقۡتٗا وَسَآءَ سَبِيلًا ٢٢﴾ [النساء: ٢٢]
“তোমরা নিজেদের বাপ-দাদার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করো না, তবে যা গত হয়ে গেছে তা আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয় তা অশ্লীল, অরুচিকর ও নিকৃষ্টতম পন্থা”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২২]
বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমার চাচার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তার হাতে ছিলো একখানা যুদ্ধের ঝাণ্ডা। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম: আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন,
«بَعَثَنِيْ رَسُوْلُ اللهِ e إِلَى رَجُلٍ نَكَحَ اِمْرَأَةَ أَبِيْهِ ؛ فَأَمَرَنِيْ أَنْ أَضْرِبَ عُنُقَهُ ، وَآخُذَ مَالَهُ»
“আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তির নিকট পাঠিয়েছেন, যে নিজ পিতার স্ত্রী তথা তার সৎ মায়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আদেশ করেছেন তার গর্দান কেটে দিতে এবং তার সম্পদ হরণ করতে”।[2]মুহরিমাকে বিবাহ করা যদি এতো বড় অপরাধ হয়ে থাকে তা হলে তাদের সাথে ব্যভিচার করা যে কতো বড়ো অপরাধ হবে তা সহজেই বুঝা যায়।
>
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৬
[2] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৫৭; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬৫৬
১৭ সূরাঃ আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) | Al-Isra (Bani-Israil) | اٌلاِسْرٰاء (بَنِي إِسْرَائِيل) – আয়াত নং -৩২ – মাক্কী
১৭ : ৩২ وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا ﴿۳۲﴾
আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। আল-বায়ান
আর যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অতি জঘন্য পথ। তাইসিরুল
তোমরা অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হয়োনা, ওটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। মুজিবুর রহমান
And do not approach unlawful sexual intercourse. Indeed, it is ever an immorality and is evil as a way. Sahih International
৩২. আর যিনার ধারে-কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।(১)
১. “যিনার কাছেও যেয়ে না” এ হুকুম ব্যক্তির জন্য এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও। আয়াতে ব্যভিচার হারাম হওয়ার দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছেঃ এক, এটি একটি অশ্লীল কাজ। মানুষের মধ্যে লজ্জা-শরাম না থাকলে সে মনুষ্যত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। অতঃপর তার দৃষ্টিতে ভালমন্দের পার্থক্য লোপ পায়। কিন্তু যাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের সামান্যতম অংশও বাকী আছে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলে তারা ব্যভিচারকে অন্যায় বলে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে না। আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক যুবক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন। এটা শুনে চতুর্দিক থেকে লোকেরা তার দিকে তেড়ে এসে ধমক দিল এবং চুপ করতে বলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, বস। যুবকটি বসলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি এটা তোমার মায়ের জন্য পছন্দ কর? যুবক উত্তর করলঃ আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না।
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তেমনিভাবে মানুষও তাদের মায়েদের জন্য সেটা পছন্দ করে না। তারপর রাসূল বললেন, তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য তা পছন্দ কর? যুবক উত্তর করলঃ আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অনুরূপভাবে মানুষ তাদের মেয়েদের জন্য সেটা পছন্দ করে না। তারপর রাসূল বললেন, তুমি কি তোমার বোনের জন্য সেটা পছন্দ কর? যুবক উত্তর করলঃ আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না। তখন রাসূল বললেনঃ তদ্রুপ লোকেরাও তাদের বোনের জন্য তা পছন্দ করে না। (এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ফুফু, ও খালা সম্পর্কেও অনুরূপ কথা বললেন আর যুবকটি একই উত্তর দিল) এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উপর হাত রাখলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহ! তার গুনাহ৷ ক্ষমা করে দিন, তার মনকে পবিত্র করুন এবং তার লজ্জাস্থানের হেফাযত করুন।” বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, এরপর এ যুবককে কারো প্রতি তাকাতে দেখা যেত না। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২৫৬, ২৫৭]
দ্বিতীয় কারণ সামাজিক অনাসৃষ্টি। ব্যভিচারের কারণে এটা এত প্রসার লাভ করে যে, এর কোন সীমা-পরিসীমা থাকে না। এর অশুভ পরিণাম অনেক সময় সমগ্ৰ গোত্র ও সম্প্রদায়কে বরবাদ করে দেয়। এ কারণেই ইসলাম এ অপরাধটিকে সব অপরাধের চাইতে গুরুতর বলে সাব্যস্ত করেছে। এবং এর শাস্তি ও সব অপরাধের শাস্তির চাইতে কঠোর বিধান করেছে। কেননা, এই একটি অপরাধ অন্যান্য শত শত অপরাধকে নিজের মধ্যে সন্নিবেশিত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যিনাকারী ব্যক্তি যিনা করার সময় মুমিন থাকে না। চোর চুরি করার সময় মুমিন থাকে না। মদ্যপায়ী মদ্যপান করার সময় মুমিন থাকে না। [মুসলিমঃ ৫৭]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩২) তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। [1]
[1] ইসলামে ব্যভিচার যেহেতু বড়ই অপরাধমূলক কাজ; এত বড় অপরাধ যে, কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা মহিলার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেলে, ইসলামী সমাজে তার জীবিত থাকার অধিকার থাকে না। আবার তাকে তরবারির এক আঘাতে হত্যা করাও যথেষ্ট হয় না, বরং নির্দেশ হল, পাথর মেরে মেরে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। যাতে সে সমাজে (অন্যদের জন্য) শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায়। সেহেতু এখানে বলা হয়েছে, ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। অর্থাৎ, তাতে উদ্বুদ্ধকারী উপায়-উপকরণ থেকেও দূরে থাক। যেমন, ‘গায়ের মাহরাম’ (যার সাথে বিবাহ হারাম নয় এমন বেগানা) নারীকে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তার সাথে অবাধ মেলামেশার ও কথা বলার পথ সুগম করা। অনুরূপ মহিলাদের সাজ-সজ্জা করে বেপর্দার সাথে বাড়ী থেকে বের হওয়া ইত্যাদি যাবতীয় কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা জরুরী। যাতে এই ধরনের অশ্লীলতা থেকে বাঁচা যায়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
ইসলামে পরকীয়ায় শাস্তি কঠোর
স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে প্রেম ও যৌন সম্পর্ককেই পরকীয়া বলে। ইসলাম ও নৈতিকতা এসব সম্পর্ককে কখনোই মেনে নেয় না। ইসলাম এ-জাতীয় অবৈধ সম্পর্কের ভয়াবহ শাস্তির বিধান দিয়েছে।
গোনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে স্বামী বা স্ত্রীর দূরে থাকা ইসলামে জায়েজ নেই। ছবি: সংগৃহীত
গোনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে স্বামী বা স্ত্রীর দূরে থাকা ইসলামে জায়েজ নেই। ছবি: সংগৃহীত
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
ইসলাম শান্তির ধর্ম। অশান্তি, অনৈতিকতা ইসলাম পছন্দ করে না। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল সা. অনৈতিকতাকে কঠোর হাতে দমন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের বৈধ উপায় দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। অবৈধ উপায় পরিহার করার নির্দেশনাও রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কের বিধান দিয়েছেন। পরকীয়া-ব্যভিচার অবৈধ সম্পর্কে নারী-পুরুষের মেলামেশাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
নারী-পুরুষ সবাইকেই চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,
তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা: বনি ইসরাইল ৩২)
ব্যভিচারকারীদের শাস্তি হিসেবে অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারকারী নারী ও পুরুষ উভয়কে ১০০টি করে বেত্রাঘাত করো’ (সুরা: নুর ২)। এটা অবিবাহিত জিনাকারীর শাস্তি। আর পরকীয়া কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে বিবাহিত নারী-পুরুষ যদি জিনায় লিপ্ত হয়, তাদের জন্য ইসলামে আরও ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে একশ করে বেত্রাঘাত কর।’ (সুরা: নুর ২)
হাদিসে নববীতে ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রসুলুল্লাহ সা. বলেন,
‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কারণ, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে: তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ু সংকীর্ণ হয়ে যাবে, তার দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে: সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।’ (বায়হাকি, হাদিস ৫৬৪)
হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বুখারি ৭৬৫৮)
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পরিবারে দেবরের সঙ্গে ভাবির সম্পর্ক। দেবরকে মৃত্যুর মতো ভয় করতে বলা হয়েছে। কঠিনভাবে হারামের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হজরত উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন,
‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেয়ো না।’ এক আনসার সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? রাসুল সা. বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য।’ (মুসলিম হাদিস ২৪৪৫)
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বড় সমস্যা পরকীয়া। ব্যাপক হারে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠছে। পরকীয়ায় বলি হচ্ছে স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। প্রবাসীদের স্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ছেন এতে।
হজরত ওমর রা. মেয়ে হজরত হাফসা রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার মেয়ে! নারীরা তাদের স্বামী থেকে কতদিন পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারে? তখন হাফসা রা. বললেন, মেয়েরা তাদের স্বামী থেকে চার মাস পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারে। এরপর থেকে হজরত উমর রা. চার মাস পরপর মুজাহিদ বাহিনীকে ফেরত নিয়ে আসতেন। নতুন বাহিনী পাঠিয়ে দিতেন।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক, হাদিস ১২৫৯৪)
তবে কেউ যদি প্রয়োজনে বেশি সময় দূরে থাকতে চান তাহলে স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। স্ত্রী যদি অনুমতি দেন, এ সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন, বাস্তবেও তেমনটি দেখা যায় তাহলে স্বামী চার মাসেরও বেশি সময় দূরে থাকতে পারবেন।
ইসলামে পরকীয়ার ভয়াবহ শাস্তি
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ব্যভিচারেরর ভয়াবহ পরিণতি ব্যভিচারের শাস্তি
ব্যভিচারের শাস্তি:
কেউ শয়তানের ধোকায় পড়ে ব্যভিচার করে ফেললে সে যদি অবিবাহিত হয় তা হলে তাকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করা হবে। আর যদি সে বিবাহিত হয় তা হলে তাকে রজম তথা পাথর মেরে হত্যা করা হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي ۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ وَلَا تَأۡخُذۡكُم بِهِمَا رَأۡفَةٞ فِي دِينِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۖ وَلۡيَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَةٞ مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٢﴾ [النور: ٢]
“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী; তাদের প্রত্যেককে তোমরা একশ করে বেত্রাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকরী করণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত করতে না পারে যদি তোমরা আল্লাহ তা‘আলা ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাকো এবং মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২]
আবু হুরায়রা ও যায়েদ ইবন খালিদ জুহানী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত তারা বলেন,
«جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ، فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ: صَدَقَ، اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: إِنَّ ابْنِيْ كَانَ عَسِيْفاً عَلَى هَذَا، فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ ، فَقَالُوْا لِيْ: عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ، فَفَدَيْتُ ابْنِيْ مِنْهُ بِمِئَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيْدَةٍ، ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَقَالُوْا: إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ e: لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللهِ ، أَمَّا الْوَلِيْدَةُ وَالْغَنَمُ فَرَدٌّ عَلَيْكَ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ، وَأَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ! فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هَذَا فَارْجُمْهَا ، فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسٌ فَرَجَمَهَا»
“জনৈক বেদুঈন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের মাঝে কোর‘আনের ফায়সালা করুন। তার প্রতিপক্ষও দাঁড়িয়ে বললো: সে সত্য বলেছে। আপনি আমাদের মাঝে কোর‘আনের ফায়সালা করুন। তখন বেদুঈন ব্যক্তিটি বললো: আমার ছেলে এ লোকটির নিকট কামলা খাটতো। ইতিমধ্যে সে এর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে বসে। সবাই আমাকে বললো: তোমার ছেলেটিকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। তখন আমি আমার ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নেই এ লোকটিকে একটি বান্দী ও একশটি ছাগল দিয়ে। অতঃপর অত্র এলাকার আলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো, তোমার ছেলেকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের মাঝে কুরআনের বিচার করছি, বান্দী ও ছাগলগুলো তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে এবং তোমার ছেলেটিকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। আর হে উনাইস! তুমি এর স্ত্রীর নিকট যাও। অতঃপর তাকে রজম করো। অতএব, উনাইস তার নিকট গেলো। অতঃপর তাকে রজম করলো”।[1]
উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«خُذُوْا عَنِّيْ، خُذُوْا عَنِّيْ، فَقَدْ جَعَلَ اللهُ لَـهُنَّ سَبِيْلاً ، الْبِكْرُ بِالْبِكْرِ جَلْدُ مِئَةٍ وَنَفْـيُ سَنَةٍ ، وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِئَةٍ وَالرَّجْمُ»
“তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা দিয়েছেন তথা বিধান অবতীর্ণ করেছেন। অবিবাহিত যুবক-যুবতীর শাস্তি হচ্ছে, একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ ও মহিলার শাস্তি হচ্ছে, একশটি বেত্রাঘাত ও রজম তথা পাথর মেরে হত্যা”।[2]
উক্ত হাদীসে বিবাহিত পুরুষ ও মহিলাকে একশটি বেত্রাঘাত করার কথা থাকলেও তা করতে হবে না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়িয ও গামিদী মহিলাকে একশটি করে বেত্রাঘাত করেননি। বরং অন্য হাদীসে তাদেরকে শুধু রজম করারই প্রমাণ পাওয়া যায়।
আরেকটি কথা হচ্ছে, শরী‘আতের সাধারণ নিয়ম হলো, কারোর ওপর কয়েকটি দণ্ডবিধি একত্রিত হলে এবং তার মধ্যে হত্যার বিধানও থাকলে তাকে শুধু হত্যাই করা হয়। অন্যগুলো করা হয় না। উমার ও ’উস্মান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এটির ওপরই আমল করেছেন এবং ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও ইহা বর্ণিত হয়েছে। তবে ‘আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার যুগে জনৈক ব্যক্তিকে রজমও করেছেন এবং বেত্রাঘাতও। আব্দল্লাহ ইবন ‘আব্বাস, উবাই ইবন কা‘ব এবং আবু যরও এ মত পোষণ করেন।
আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«ضَرَبَ رَسُوْلُ اللهِ e وَغَرَّبَ، وَضَرَبَ أَبُوْ بَكْرٍ t وَغَرَّبَ، وَضَرَبَ عُمَرُ t وَغَرَّبَ»
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরেছেন (বেত্রাঘাত করেছেন) ও দেশান্তর করেছেন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মেরেছেন ও দেশান্তর করেছেন এবং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু মেরেছেন ও দেশান্তর করেছেন”।[3]
ইমরান ইবন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِمْرَأَةٌ مِنْ جُهَيْنَةَ، وَهِيَ حُبْلَى مِنَ الزِّنَا، فَقَالَتْ: يَا نَبِيَّ اللهِ! أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَيَّ، فَدَعَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلِيَّهَا، فَقَالَ: أَحْسِنْ إِلَيْهَا، فَإِذَا وَضَعَتْ فَأْتِنِيْ بِهَا، فَفَعَلَ، فَأَمَرَ بِهَا، فَشُكَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا، ثُمَّ أُمِرَ بِهَا فَرُجِمَتْ، ثُمَّ صَلَّى عَلَيْهَا، فَقَالَ عُمَرُ: أَتُصَلِّيْ عَلَيْهَا يَا نَبِيَّ اللهِ! وَقَدْ زَنَتْ؟! فَقَالَ: لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِّمَتْ بَيْنَ سَبْعِيْنَ مِنْ أَهْلِ الْمَدِيْنَةِ لَوَسِعَتْهُمْ، وَهَلْ وَجَدْتَ أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بِنَفْسِهَا لِلَّهِ تَعَالَى»
“একদা জনৈকা জুহানী মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলো। তখন সে ব্যভিচার করে গর্ভবতী। সে বললো: হে আল্লাহর নবী! আমি ব্যভিচারের শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। অতএব, আপনি তা আমার ওপর প্রয়োগ করুন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অভিভাবককে ডেকে বললেন, এর ওপর একটু দয়া করো। এ যখন সন্তান প্রসব করবে তখন তুমি তাকে আমার নিকট নিয়ে আসবে। লোকটি তাই করলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করলে তার কাপড় শরীরের সাথে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো। এরপর তাকে রজম করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযার সালাত পড়ান। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্চর্যান্বিতের স্বরে বললেন, আপনি এর জানাযার সালাত পড়াচ্ছেন; অথচ সে ব্যভিচারিণী?! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে এমন তাওবা করেছে যা মদীনাবাসীর সত্তরজনকে বন্টন করে দেওয়া হলেও তা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তুমি এর চাইতেও কি উৎকৃষ্ট কোনো কিছু পেয়েছো যে তার জীবন স্বেচ্ছায় আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দিয়েছে”।[4]
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একদা তার এক সুদীর্ঘ খুৎবায় বলেন,
«إِنَّ اللهَ بَعَثَ مُحَمَّداً بِالْـحَقِّ، وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ، فَكَانَ فِيْمَا أَنْزَلَ اللهُ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ، قَرَأْنَاهَا، وَوَعَيْنَاهَا، وَعَقَلْنَاهَا، فَرَجَمَ رَسُوْلَ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ، فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَّقُوْلَ قَائِلٌ: مَا نَجِدُ الرَّجْمَ فِيْ كِتَابِ اللهِ، فَيَضِلُّوْا بِتَرْكِ فَرِيْضَةٍ أَنْزَلَهَا اللهُ»
“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য দীন দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর ওপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিলো। আমরা তা পড়েছি, মুখস্থ করেছি ও বুঝেছি। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম করেছেন এবং আমরাও তাঁর ইন্তেকালের পর রজম করেছি। আশঙ্কা হয় বহু কাল পর কেউ বলবে, আমরা কুরআন মাজীদে রজম পাই নি। অতঃপর তারা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত একটি ফরয কাজ ছেড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে”।[5]
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু যে আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তা হচ্ছে:
﴿الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا ، فَارْجُمُوْهُمَا أَلْبَتَّةَ ، نَكَالاً مِّنَ اللهِ ، وَاللهُ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ﴾
“বয়স্ক (বিবাহিত) পুরুষ ও মহিলা যখন ব্যভিচার করে তখন তোমরা তাদেরকে সন্দেহাতীতভাবে পাথর মেরে হত্যা করবে। এটি হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ এবং আল্লাহ তা‘আলা পরাক্রমশালী ও সুকৌশলী”।
উক্ত আয়াতটির তিলাওয়াত রহিত হয়েছে। তবে উহার বিধান এখন ও কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে।
কোনো অবিবাহিত ব্যভিচারী কিংবা ব্যভিচারিণী যদি এমন অসুস্থ অথবা দুর্বল হয় যে, তাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একশটি বেত্রাঘাত করা হলে তার মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে তা হলে তাকে একশটি বেত একত্র করে একবার প্রহার করা হবে।
সাঈদ ইবন সা‘দ ইবন উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«كَانَ فِيْ أَبْيَاتِنَا رُوَيْجِلٌ ضَعِيْفٌ ، فَخَبُثَ بِأَمَةٍ مِنْ إِمَائِهِمْ ، فَذَكَرَ ذَلِكَ سَعِيْدٌ لِرَسُوْلِ اللهِ e ، فَقَالَ: اِضْرِبُوْهُ حَدَّهُ ، فَقَالُوْا: يَـا رَسُوْلَ اللهِ! إِنَّهُ أَضْعَفُ مِنْ ذَلِكَ ، فَقَالَ: خُذُوْا عِثْكَالاً فِيْهِ مِئَةُ شِمْرَاخٍ ، ثُمَّ اضْرِبُوْهُ بِهِ ضَرْبَةً وَاحِدَةً ، فَفَعَلُوْا»
“আমাদের এলাকায় জনৈক দুর্বল ব্যক্তি বসবাস করতো। হঠাৎ সে জনৈকা বান্দির সাথে ব্যভিচার করে বসে। ব্যাপারটি সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়ে দাও তথা একশটি বেত্রাঘাত করো। উপস্থিত সকলে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো তা সহ্য করতে পারবে না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটি খেজুর বিহীন একশটি শাখাগুচ্ছ বিশিষ্ট থোকা নিয়ে তাকে তা দিয়ে এক বার মারবে। অতএব, তারা তাই করলো”।[6]
অমুসলিমকেও ইসলামী বিচারাধীন রজম করা যেতে পারে।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«رَجَمَ النَّبِيُّ رَجُلاً مِنْ أَسْلَمَ ، وَرَجُلاً مِنَ الْيَهُوْدِ وَامْرَأَة»
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলাম বংশের একজন পুরুষকে এবং একজন ইয়াহূদী পুরুষ ও একজন মহিলাকে রজম করেন”।[7]
ব্যভিচারের কারণে কোনো সন্তান জন্ম নিলে এবং ভাগ্যক্রমে সে জীবনে বেঁচে থাকলে তার মায়ের সন্তান রূপেই সে পরিচয় লাভ করবে। বাপের সন্তান রূপে নয়। কারণ, তার কোনো বৈধ বাপ নেই। অতএব, ব্যভিচারীর পক্ষ থেকে সে কোনো মিরাস পাবে না।
আবু হুরায়রা ও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الحَجَرُ»
“সন্তান মহিলারই এবং ব্যভিচারীর জন্য শুধু পাথর তথা রজম”।[8]
‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ عَاهَرَ أَمَةً أَوْ حُرَّةً فَوَلَدُهُ وَلَدُ زِنَا ، لاَ يَرِثُ وَلاَ يُوْرَثُ»
“যে ব্যক্তি কোনো বান্দী অথবা স্বাধীন মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করলো তার সন্তান হবে ব্যভিচারের সন্তান। সে মিরাস পাবে না এবং তার মিরাসও কেউ পাবে না”।[9]
যে কোনো ঈমানদার পবিত্র পুরুষের জন্য কোনো ব্যভিচারিণী মেয়েকে বিবাহ করা হারাম। তেমনিভাবে যে কোনো ঈমানদার সতী মেয়ের জন্যও কোনো ব্যভিচারী পুরুষকে বিবাহ করা হারাম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱلزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوۡ مُشۡرِكَةٗ وَٱلزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَآ إِلَّا زَانٍ أَوۡ مُشۡرِكٞۚ وَحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٣﴾ [النور: ٣]
“একজন ব্যভিচারী পুরুষ আরেকজন ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিকা মেয়েকেই বিবাহ করে এবং একজন ব্যভিচারিণী মেয়েকে আরেকজন ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিকই বিবাহ করে। মুমিনদের জন্য তা করা হারাম”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩]
>
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৫, ২৬৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯৭, ১৬৯৮; তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৩; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৪৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৯৭
[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯০; সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪১৫, ৪৪১৬; সুনান তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৩৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৯৮
[3] তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৩৮
[4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯৬; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৪০; তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬০৩
[5] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯১; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪১৮
[6] আহমদ: ৫/২২২; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬২২
[7] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭০১
[8] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০৫৩, ২২১৮, ৬৮১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৫৭, ১৪৫৮; ইবন হিব্বান, হাদীস ৪১০৪; হাকিম, হাদীস নং ৬৬৫১; তিরমিযী, হাদীস ১১৫৭; বায়হাক্বী, হাদীস নং ১৫১০৬; আবু দাউদ, হাদীস নং ২২৭৩; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২০৩৫, ২০৩৭; আহমদ, হাদীস নং ৪১৬, ৪১৭
[9] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৭৯৪
পরকীয়া থেকে বেরিয়ে আসার ৬ উপায়
পরকীয়া একটি অনৈতিক সম্পর্ক। বিয়ের মতো সুন্দর সম্পর্ক মুহুর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে পরকীয়ার কারণে। পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে যাবার পর অনেকে অপরাধ বোধে ভোগেন। সম্পর্ক থেকে বেরিয়েও আসতে চান। কিন্তু কিভাবে বের হবেন সেই উপায় খুঁজে পান না। পাঠকদের জন্য রইল পরকীয়া থেকে বেরিয়ে আসার ৬ উপায় :
সিদ্ধান্ত: পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবার আগে আপনাকে সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরকীয়া করার ফলে আপনি শুধু আপনার স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করছেন না, আপনি নিজেই নিজের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করছেন।
সরাসরি: যে কোনও সম্পর্ক শেষ করার সবচেয়ে ভাল উপায় সামনা-সামনি সরাসরি বিষয়টা জানানো। সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলার কথা যদি সামনা-সামনি জানাতে না পারেন তাহলে ফোনে, ই-মেল লিখে জানিয়ে দিন।
সময়: যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরকীয়ার সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলুন। পরকীয়ার সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলতে বার বার চিন্তা করার দরকার নেই। যত দেরি করবেন তত সম্পর্ক জটিল হবে।
যোগাযোগ: সম্পর্ক রাখবেন না জানিয়ে দিয়ে ফোন, ফেসবুক, চিঠি কিংবা টুইটারে যোগাযোগ রাখবেন না। একেবারে সম্পর্কের ইতি টেনে দিন। যোগাযোগ রাখলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।
সাহায্য: যদি নিজের চেষ্টায় সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে না পারেন তাহলে মানসিক ডাক্তারের সরণাপন্ন হন।
পরিবার: নিজের পরিবারকে গুরুত্ব দিন। পরিবারকে সময় দিন। দেখবেন দ্রুত পরকীয়ার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
ইসলাম ও নৈতিকতা পরকীয়ার সম্পর্ককে কখনোই মেনে নেয় না। ইসলাম এ-জাতীয় অবৈধ সম্পর্কের ভয়াবহ শাস্তির বিধান দিয়েছে। স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে প্রেম ও যৌন সম্পর্ককেই পরকীয়া বলে।
‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বুখারি ৭৬৫৮)
‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বুখারি ৭৬৫৮)
ইসলাম শান্তির ধর্ম। অশান্তি, অনৈতিকতা ইসলাম পছন্দ করে না। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল সা. অনৈতিকতাকে কঠোর হাতে দমন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের বৈধ উপায় দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। অবৈধ উপায় পরিহার করার নির্দেশনাও রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কের বিধান দিয়েছেন। পরকীয়া-ব্যভিচার অবৈধ সম্পর্কে নারী-পুরুষের মেলামেশাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
নারী-পুরুষ সবাইকেই চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,
তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা: বনি ইসরাইল ৩২)
ব্যভিচারকারীদের শাস্তি হিসেবে অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারকারী নারী ও পুরুষ উভয়কে ১০০টি করে বেত্রাঘাত করো’ (সুরা: নুর ২)।
এটা অবিবাহিত জিনাকারীর শাস্তি। আর পরকীয়া কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে বিবাহিত নারী-পুরুষ যদি জিনায় লিপ্ত হয়, তাদের জন্য ইসলামে আরও ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে একশ করে বেত্রাঘাত কর।’ (সুরা: নুর ২)
হাদিসে নববীতে ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রসুলুল্লাহ সা. বলেন,
‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কারণ, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে: তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ু সংকীর্ণ হয়ে যাবে, তার দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে: সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।’ (বায়হাকি, হাদিস ৫৬৪)
হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বুখারি ৭৬৫৮)
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পরিবারে দেবরের সঙ্গে ভাবির সম্পর্ক। দেবরকে মৃত্যুর মতো ভয় করতে বলা হয়েছে। কঠিনভাবে হারামের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হজরত উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন,
‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেয়ো না।’ এক আনসার সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? রাসুল সা. বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য।’ (মুসলিম হাদিস ২৪৪৫)
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বড় সমস্যা পরকীয়া। ব্যাপক হারে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠছে। পরকীয়ায় বলি হচ্ছে স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। প্রবাসীদের স্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ছেন এতে।
হজরত ওমর রা. মেয়ে হজরত হাফসা রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার মেয়ে! নারীরা তাদের স্বামী থেকে কতদিন পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারে? তখন হাফসা রা. বললেন, মেয়েরা তাদের স্বামী থেকে চার মাস পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারে। এরপর থেকে হজরত উমর রা. চার মাস পরপর মুজাহিদ বাহিনীকে ফেরত নিয়ে আসতেন। নতুন বাহিনী পাঠিয়ে দিতেন।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক, হাদিস ১২৫৯৪)
তবে কেউ যদি প্রয়োজনে বেশি সময় দূরে থাকতে চান তাহলে স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। স্ত্রী যদি অনুমতি দেন, এ সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন, বাস্তবেও তেমনটি দেখা যায় তাহলে স্বামী চার মাসেরও বেশি সময় দূরে থাকতে পারবেন।
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ব্যভিচারের ভয়াবহ পরিণতি ব্যভিচারের স্তর বিন্যাস
১. অবিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে ব্যভিচার। এতে মেয়েটির সম্মানহানি ও চরিত্র বিনষ্ট হয়। কখনো কখনো ব্যাপারটি সন্তান হত্যা পর্যন্ত পৌঁছোয়।
২. বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু স্বামীর সম্মানও বিনষ্ট হয়। তার পরিবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। তার বংশ পরিচয়ে ব্যাঘাত ঘটে। কারণ, সন্তানটি তারই বলে বিবেচিত হয়, অথচ সন্তানটি মূলতঃ তার নয়।
যেন এমন ঘটনা ঘটতেই না পারে সে জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামী অনুপস্থিত এমন মহিলার বিছানায় বসা ব্যক্তির এক ভয়ানক রূপ চিত্রায়ন করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَثَلُ الَّذِيْ يَجْلِسُ عَلَى فِرَاشِ الْـمُغِيْبَةِ مَثَلُ الَّذِيْ يَنْهَشُهُ أَسْوَدُ مِنْ أَسَاوِدِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ»
“যে ব্যক্তি স্বামী অনুপস্থিত এমন কোনো মহিলার বিছানায় বসে তার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায় যাকে কিয়ামতের দিন কোনো বিষাক্ত সাপ দংশন করে”।[1]
৩. যে কোনো প্রতিবেশী মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু প্রতিবেশীর অধিকারও বিনষ্ট হয় এবং তাকে চরম কষ্ট দেওয়া হয়।
মিক্বদাদ ইবন আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لَأَنْ يَّزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرِ نِسْوَةٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَّزْنِيَ بِامْرَأَةِ جَارِهِ»
“সাধারণ দশটি মহিলার সাথে ব্যভিচার করা এতো ভয়ঙ্কর নয় যতো ভয়ঙ্কর নিজ প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা”।[2]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
«لاَ يَدْخُلُ الْـجَنَّةَ مَنْ لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»
“যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না”।[3]
৪. যে প্রতিবেশী সালাতের জন্য অথবা ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য কিংবা জিহাদের জন্য ঘর থেকে বের হয়েছে তার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার।
বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«حُرْمَةُ نِسَاءِ الْـمُجَاهِدِيْنَ عَلَى الْقَاعِدِيْنَ كَحُرْمَةِ أُمَّهَاتِهِمْ ، وَمَا مِنْ رَجُلٍ مِنَ الْقَاعِدِيْنَ يَخْلُفُ رَجُلاً مِنَ الْـمُجَاهِدِيْنَ فِيْ أَهِلِهِ فَيَخُوْنُهُ فِيْهِمْ إِلاَّ وُقِفَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، فَيَأْخُذُ مِنْ عَمَلِهِ مَا شَاءَ ، فَمَا ظَنُّكُمْ؟»
“মুজাহিদদের স্ত্রীদের সম্মান যুদ্ধে না গিয়ে ঘরে বসে থাকা লোকদের নিকট তাদের মায়েদের সম্মানের মতো। কোনো ঘরে বসে থাকা ব্যক্তি যদি কোনো মুজাহিদ পুরুষের পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে তাদের তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে আমানতের খিয়ানত করে তখন তাকে মুজাহিদ ব্যক্তির প্রাপ্য আদায়ের জন্য কিয়ামতের দিন দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। অতঃপর মুজাহিদ ব্যক্তি ঘরে বসা ব্যক্তির আমল থেকে যা মনে চায় নিয়ে নিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কি এমন ধারণা হয় যে, তাকে এতটুকু সুযোগ দেওয়ার পরও সে এ প্রয়োজনের দিনে ওর সব আমল না নিয়ে ওর জন্য একটুখানি রেখে দিবে?”[4]
৫. আত্মীয়া মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু আত্মীয়তার বন্ধনও বিনষ্ট করা হয়।
৬. মাহরাম বা এগানা (যে মহিলাকে বিবাহ করা শরী‘আতের দৃষ্টিতে চিরতরের জন্য হারাম) মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু মাহরামের অধিকারও বিনষ্ট করা হয়।
৭. বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার। আর তা মারাত্মক এ জন্যই যে, তার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য তো তার স্ত্রীই রয়েছে। তবুও সে ব্যভিচার করে বসলো।
৮. বুড়ো ব্যক্তির ব্যভিচার। আর তা মারাত্মক এ জন্যই যে, তার উত্তেজনা তো তেমন আর উগ্র নয়। তবুও সে ব্যভিচার করে বসলো।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«ثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يُزَكِّيْهِمْ وَلاَ يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلـَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ: شَيْخٌ زَانٍ، وَمَلِكٌ كَذَّابٌ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ»
“তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদেরকে গোনাহ থেকে পবিত্র করবেন না, তাদের দিকে দয়ার দৃষ্টিতেও তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যুক রাষ্ট্রপতি এবং অহঙ্কারী গরীব”।[5]
৯. মর্যাদাপূর্ণ মাস, স্থান ও সময়ের ব্যভিচার। এতে উপরন্তু উক্ত মাস, স্থান ও সময়ের মর্যাদা বিনষ্ট হয়।
কোনো ব্যক্তি শয়তানের ধোকায় পড়ে ব্যভিচার করে ফেললে এবং তা কেউ না জানলে অথবা বিচারকের নিকট তা না পৌঁছলে তার উচিৎ হবে যে, সে তা লুকিয়ে রাখবে এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট কায়মনোবাক্যে খাঁটি তাওবা করে নিবে। অতঃপর বেশি বেশি নেক আমল করবে এবং খারাপ জায়গা ও সাথী থেকে দূরে থাকবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَهُوَ ٱلَّذِي يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَعۡفُواْ عَنِ ٱلسَّئَِّاتِ وَيَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُونَ ٢٥﴾ [الشورا: ٢٥]
“তিনিই (আল্লাহ তা‘আলা) তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সমূহ পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা করো তাও তিনি জানেন”। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ২৫]
আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«اِجْتَنِبُوْا هَذِهِ الْقَاذُوْرَاتِ الَّتِيْ نَهَى اللهُ عَنْهَا، فَمَنْ أَلَمَّ بِهَا فَلْيَسْتَتِرْ بِسِتْرِ اللهِ، وَلْيَتُبْ إِلَى اللهِ، فَإِنَّهُ مَنْ يُبْدِ لَنَا صَفْحَتَهُ نُقِمْ عَلَيْهِ كِتَابَ اللهِ تَعَالَى»
“তোমরা ব্যভিচার থেকে দূরে থাকো যা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এরপরও যে ব্যক্তি শয়তানের ধোকায় পড়ে তা করে ফেলে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে। যখন আল্লাহ তা‘আলা তা গোপনই রেখেছেন। তবে সে যেন এ জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট তাওবা করে নেয়। কারণ, যে ব্যক্তি তা আমাদের তথা প্রশাসনের নিকট প্রকাশ করে দিবে তার ওপর আমরা অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলার বিধান প্রয়োগ করবোই”।[6]
উক্ত কারণেই মায়িয ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বার বার ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করছিলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি এতটুকুও ভ্রূক্ষেপ করেননি। চার বারের পর তিনি তাকে এও বললেন, হয়তো বা তুমি তাকে চুমু দিয়েছো, ধরেছো কিংবা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছো। কারণ, এতে করে তিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ তা‘আলার নিকট খাঁটি তাওবা করার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলেন।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أَتَى رَسُوْلَ اللهِ e رَجُلٌ مِنَ الـْمُسْلِمِيْنَ، وَهُوَ فِيْ الـْمَسْجِدِ، فَنَادَاهُ، فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إِنِّيْ زَنَيْتُ، فَأَعْرَضَ عَنْهُ، فَتَنَحَّى تِلْقَاءَ وَجْهِهِ، فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إِنِّيْ زَنَيْتُ، فَأَعْرَضَ عَنْهُ، حَتَّى ثَنَّى ذَلِكَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ، فَلَمَّا شَهِدَ عَلَى نَفْسِهِ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ دَعَاهُ رَسُوْلُ اللهِ e فَقَالَ: أَبِكَ جُنُوْنٌ؟ قَالَ: لاَ، قَالَ: فَهَلْ أُحْصِنْتَ؟ قَالَ: نَعَمْ، فَقَالَ النَّبِيُّ e: اِذْهَبُوْا بِهِ فَارْجُمُوْهُ»
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জনৈক মুসলিম আসলো। তখনো তিনি মসজিদে। অতঃপর সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে বললো: হে আল্লাহর রাসূল! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি কোনো রূপ ভ্রূক্ষেপ না করে অন্য দিকে তাঁর চেহারা মুবারক মুড়িয়ে নিলেন। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা বরাবর এসে আবারো বললো: হে আল্লাহর রাসূল! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারো তার প্রতি কোনো রূপ ভ্রূক্ষেপ না করে অন্য দিকে তাঁর চেহারা মুবারক মুড়িয়ে নিলেন। এমন কি সে উক্ত স্বীকারোক্তি চার চার বার করলো। যখন সে নিজের ওপর ব্যভিচারের সাক্ষ্য চার চার বার দিয়েছে তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, তুমি কি পাগল? সে বললো, না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি বিবাহিত? সে বললো: জী হ্যাঁ। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা একে নিয়ে যাও এবং রজম তথা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করো”।[7]
বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়িয ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন,
«وَيْحَكَ! اِرْجِعْ فَاسْتَغْفِرِ اللهَ وَتُبْ إلَيْهِ»
“আহা! তুমি ফিরে যাও। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা চাও এবং তাঁর নিকট তাওবা করে নাও”।[8]
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«لَمَّا أَتَى مَاعِزُ بْنُ مَالِكٍ إِلَى النَبِيِّ e قَالَ لَهُ: لَعَلَّكَ قَبَّلْتَ أَوْ غَمَزْتَ أَوْ نَظَرْتَ ، قَالَ: لاَ يَا رَسُوْلَ اللهِ!»
“যখন মায়িয ইবন মা’লিক রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলো তখন তিনি তাকে বললেন, হয়তো বা তুমি তাকে চুমু দিয়েছো, ধরেছো কিংবা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছো। সে বললো, না, হে আল্লাহর রাসূল!”[9]
তবে বিচারকের নিকট ব্যাপারটি (সাক্ষ্য সবুতের মাধ্যমে) পৌঁছলে অবশ্যই তাকে বিচার করতে হবে। তখন আর কারোর ক্ষমার ও সুপারিশের কোনো সুযোগ থাকে না।
এ কারণেই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ইবন উমাইয়াহকে চোরের জন্য সুপারিশ করতে চাইলে তাকে বললেন,
«هَلاَّ كَانَ ذَلِكَ قَبْلَ أَنْ تَأْتِيَنِيْ بِهِ؟!»
“আমার নিকট আসার পূর্বেই কেন তা করলে না”।[10]
তেমনিভাবে উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু জনৈকা কুরাশী চুন্নি মহিলার জন্য সুপারিশ করতে চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অত্যন্ত রাগতস্বরে বললেন,
«يَا أُسَامَةُ! أَتَشْفَعُ فِيْ حَدٍّ مِنْ حُدُوْدِ اللهِ ؟!»
“হে উসামা! তুমি কি আল্লাহ তা‘আলার দণ্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করতে আসলে?!”[11]
আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«تَعَافَوْا الْـحُدُوْدَ فِيْمَا بَيْنَكُمْ ، فَمَا بَلَغَنِيْ مِنْ حَدٍّ فَقَدْ وَجَب»
“তোমরা দণ্ডবিধি সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো একে অপরকে ক্ষমা করো। কারণ, আমার নিকট এর কোনো একটি পৌঁছলে তা প্রয়োগ করা আমার ওপর আবশ্যক হয়ে যাবে”।[12]
এ কথা মনে রাখতে হবে যে, শুধুমাত্র তিনটি পদ্ধতিতেই কারোর ওপর ব্যভিচারের দোষ প্রমাণিত হয়। যা নিম্নরূপ:
১. ব্যভিচারী একবার অথবা চারবার ব্যভিচারের সুস্পষ্ট স্বীকারাক্তি করলে। কারণ, জুহাইনী মহিলা ও উনাইস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর রজমকৃতা মহিলা ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি একবারই করেছিলো। অন্য দিকে মায়িয ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চার চারবার ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যার ব্যাপারে হাদীসটির বর্ণনাসমূহ মুযতারিব তথা এক কথার নয়। কোনো কোন বর্ণনায় চার চার বারের কথা। কোনো কোন বর্ণনায় তিন তিন বারের কথা। আবার কোনো কোন বর্ণনায় দু’ দু’ বারের কথারও উল্লেখ রয়েছে।
তবুও চার চারবার স্বীকারোক্তি নেওয়াই সর্বোত্তম। কারণ, হতে পারে স্বীকারোক্তিকারী এমন কাজ করেছে যাতে সে শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত হয় না। যা বার বার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। আর এ কথা সবারই জানা যে, ইসলামী দণ্ডবিধি যে কোনো যুক্তিসঙ্গত সনেদহ কিংবা অজুহাতের কারণে রহিত হয় এবং যা উমার, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস এবং অন্যন্য সাহাবীগণ থেকেও বর্ণিত। আল্লামা ইবনুল মুনযির রহ. এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের ঐকমত্যেরও দাবি করেছেন। তেমনিভাবে চার চারবার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ব্যভিচারীকে ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ তা‘আলার নিকট খাঁটি তাওবা করারও সুযোগ দেওয়া হয়। যা একান্তভাবেই কাম্য।
তবে স্বীকারাক্তির মধ্যে ব্যভিচারের সুস্পষ্ট উল্লেখ এবং দণ্ডবিধি প্রয়োগ পর্যন্ত স্বীকারোক্তির ওপর স্বীকারকারী অটল থাকতে হবে। অতএব কেউ যদি এর আগেই তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নেয় তা হলে তার কথাই তখন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তেমনিভাবে স্বীকারকারী জ্ঞানসম্পন্নও হতে হবে।
২. ব্যভিচারের ব্যাপারে চার চার জন সত্যবাদী পুরুষ এ বলে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিলে যে, তারা সত্যিকারার্থেই ব্যভিচারী ব্যক্তির সঙ্গমকর্ম স্বচক্ষে দেখেছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱلَّٰتِي يَأۡتِينَ ٱلۡفَٰحِشَةَ مِن نِّسَآئِكُمۡ فَٱسۡتَشۡهِدُواْ عَلَيۡهِنَّ أَرۡبَعَةٗ مِّنكُمۡۖ﴾ [النساء: ١٥]
“তোমাদের স্ত্রীদের মধ্য থেকে কেউ ব্যভিচার করলে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চার চার জন সাক্ষী সংগ্রহ করো”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫]
৩. কোনো মহিলা গর্ভবতী হলে; অথচ তার কোনো স্বামী নেই।
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার যুগে এমন একটি বিচারে রজম করেছেন। তবে এ প্রমাণ হেতু যে কোনো মহিলার ওপর দণ্ডবিধি প্রয়োগ করতেই হবে ব্যাপারটি এমন নয়। এ জন্য যে, গর্ভটি সন্দেহবশত সঙ্গমের কারণেও হতে পারে অথবা ধর্ষণের কারণেও। এমনকি মেয়েটি গভীর নিদ্রায় থাকাবস্থায়ও তার সঙ্গে উক্ত ব্যভিচার কর্মটি সংঘটিত হতে পারে। তাই উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর যুগেই শেষোক্ত দু’টি অজুহাতে দু’ জন মহিলাকে শাস্তি দেন নি। তবে কোনো মেয়ে যদি গর্ভবতী হয়; অথচ তার কোনো স্বামী নেই এবং সে এমন কোনো যুক্তিসঙ্গত অজুহাতও দেখাচেছ না যার দরুন দণ্ডবিধি রহিত হয় তখন তার ওপর ব্যভিচারের উপযুক্ত দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একদা তাঁর এক সুদীর্ঘ খুৎবায় বলেন,
«وَإِنَّ الرَّجْمَ حَقٌّ فِيْ كِتَابِ اللهِ تَعَالَى عَلَى مَنْ زَنَى ، إِذَا أَحْصَنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ ، إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَبْلُ أَوِ الْاِعْتِرَافُ»
“নিশ্চয় রজম আল্লাহ তা‘আলার বিধানে এমন পুরুষ ও মহিলার জন্যই নির্ধারিত যারা ব্যভিচার করেছে; অথচ তারা বিশুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে ইতিপূর্বে নিজ স্ত্রী অথবা স্বামীর সাথে সম্মুখ পথে সঙ্গম করেছে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয় জনই তখন ছিলো প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন যখন ব্যভিচারের উপযুক্ত সাক্ষী-প্রমাণ মিলে যায় অথবা মহিলা গর্ভবতী হয়ে যায় অথবা ব্যভিচারী কিংবা ব্যভিচারিণী ব্যভিচারের ব্যাপারে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দেয়”।[13]
>
[1] সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস নং ২৪০৫
[2] আহমদ: ৬/৮; সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস ২৪০৪
[3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬
[4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৯৭
[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৭
[6] হাকিম: ৪/২৭২
[7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯১
[8] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯৫
[9] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮২৪
[10] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৯৪; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬৪৪; নাসাঈ: ৮/৬৯; আহমদ ৬/৪৬৬; হাকিম ৪/৩৮০; ইবনুল জারূদ, হাদীস নং ৮২৮
[11] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৭৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৮৮; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৭৩; তিরমিযী, হাদীস ১৪৩০; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৯৫
[12] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৭৬
[13] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯১; তিরমিযী, হাদীস ১৪৩২; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪১৮; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬০১
পরকীয়া আসক্তি থেকে বের হওয়ার উপায়
বর্তমান সময়ে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে পরকীয়া। ব্যক্তির চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম রূপ পরকীয়া। পরকীয়া হল বিবাহিত কোন ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তির সাথে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকাণ্ড। নারী-পুরুষ উভয়েই পরকীয়ায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। পরকীয়ার বিষাক্ত ছোবলে শতশত সুখের সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। পরকীয়ার কারণে সংঘটিত হচ্ছে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড।
বিশেষ করে জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেক মানুষ স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকে। ফলে অনেক সময় তাদের স্ত্রী পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক ও যেনা-ব্যভিচারে জড়িত হয়ে পড়ে। স্ত্রী থেকে দূরে থাকা স্বামীর বিরুদ্ধেও একইরকম অভিযোগ আছে। এমনকি স্বামী-স্ত্রী দুজনে কাছাকাছি থেকেও তাদের মনের দূরত্ব এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
পরকীয়া মানবসমাজে লঘু বা গুরুভাবে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য। পাশ্চাত্য আধুনিক সমাজে এর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বজায় থাকলেও এটি আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরকীয়াকারী ব্যক্তির বিবাহিত সঙ্গী তার সাথে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য কোর্টে আবেদন করতে পারেন।
তবে ইসলামি রাষ্ট্রসমূহে এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা হল পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদন্ড প্রদান। মনোচিকিৎসায় একথা স্বীকৃত যে, পিতামাতার পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষন্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়। এছাড়া পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিতে পরকীয়া প্রভাব রাখে।
পরকীয়ার মূল কারণগুলো হলো নৈতিক শিক্ষার অভাব, পরস্পরে ভালোবাসার অভাব, অবাধে মেলামেশা করা, অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া। এছাড়া পরকীয়ার অন্যান্য কারণগুলো হলো- অতিরিক্ত যৌন চাহিদা, পারিবারিক কলহ, একঘেয়ে সম্পর্ক, অপূর্ণ প্রত্যাশা, অসুস্থতার কারণে স্বামী-স্ত্রীর একজনের সেক্স না থাকা, আকর্ষণ হারিয়ে ফেলা, পুরনো অভ্যাস, মনোদৈহিক ও সামাজিক কারণ, ডিআরডিফোর জিন, মানসিক সমস্যা, সঙ্গীর উদাসীনতা, পশ্চিমা সংস্কৃতি, শখ থেকে পরকীয়া, দূরত্ব ও শূন্যতা, স্ত্রী দূরে গেলে, সন্তান হওয়ার পর।
বিশেষজ্ঞদের মতে পরকীয়া আদতে ‘আসক্তি’ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের মতে, চলমান কোনো সম্পর্কে টানাপড়েন চললে মানুষ মুক্তির জন্য আবেগ-তাড়িত হয়ে অন্য কোনো সম্পর্কে জড়াতে চান।
এভাবে কিছু পথ চলার পর অনেকেই নিজের ভুল বুঝতে পারে। বের হতে আসতে চান পরকীয়া থেকে। তবে কেউ কেউ চাইলেও বের হতে পারেন না। কিন্তু কিছু কৌশল অবলম্বন করলে, নিজেকে এই পরকীয়া থেকে বের করে আনতে পারবেন।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার পরকীয়া বিশারদ রেস ডেভিস (৪৩) বলেন, পরকীয়া আদতে ‘আসক্তি’ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনও সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, কোনও বেদনা ভোলার জন্য, অফিসে অতিরিক্ত কাজের চাপ কিংবা পরিবারে কোনও সমস্যা হলে দম্পতির এক জন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।
যারা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন, তাদের সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেন রেস। দাম্পত্যে কোথায় গলদ হচ্ছে তা বোঝা বেশ মুশকিল। রেসের মতে, ‘‘আমি স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারি। বিয়ের বাইরে অন্য কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তৈরি হয় আসক্তি! ব্যক্তির মস্তিষ্কে ডোপামাইন নামক রাসায়নিকের ক্ষরণ হয়, যা আসক্তির মূল কারণ।
তিনি বলেন, আমি দম্পতিকে সত্য কথা বলি। যিনি ধোকা দিচ্ছেন, তাকেও সত্যটা দেখাই এবং যাকে ধোকা দেওয়া হচ্ছে, তাঁকেও সত্য বলি। যখন কেউ পরকীয়ায় জড়ান, তখন তাঁর মনে হয়ে আমি আমার স্ত্রী বা স্বামীকে আর ভালবাসি না! অথচ মনের কুঠুরিতে ভালবাসা কিন্তু থেকেই যায়। আমি সেই ভালবাসার কথাই ওদের মনে করিয়ে দিই।
রেসে বলেন, তখন আমি কোনও মনোবিদের কাছে যাইনি। নিজেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। ভাগ্যবশত আমার বন্ধুরা আমাকে পরকীয়া থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন। তারাই আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, আমি ভুল কাজ করছি। তার পর আমি এই নিয়ে নানা পড়াশোনা করি। বুঝি, একমাত্র লোকের সঙ্গে কথা বলেই এর সমাধান সম্ভব। তাই আমি দম্পতিদের সঙ্গে কথা বলি। তাঁদের সমস্যা শুনি, তার পর সমাধান দিই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার পরকীয়ায় জড়ালে সেটা থেকে মুক্ত হওয়ার সব পথ দুর্গম হয়ে যায়। আর সম্পর্ক ফাঁস হয়ে গেলে তো ক্ষণিকের ভুল সিদ্ধান্ত সারা জীবন কাঁধে বয়ে বেড়াতে হয়। তাই সুখী দাম্পত্য চাইলে পরকীয়ার সম্পর্কে না জড়ানোই ভালো।
বিবাহিত জীবনে একবার অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে মুক্ত হওয়া সহজ কাজ নয়। তারপরও যারা এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। অনেকেই আবার এ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে সুখী দাম্পত্য জীবনে ফিরে যেতে চাইছেন। কিন্তু পারছেন না। জেনে নিন পরকীয়া আসক্তি থেকে বের হওয়ার উপায়-
পরকীয়া থেকে দূরে থাকতে আলোচনা করুন
কেন পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন আগে সেই কারণটা বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর দু’জনে আলোচনার মাধ্যমে ঠান্ডা মাথায় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই বিশেষ সমস্যাটি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। আপনার আচরণ, কথা সব কিছুতেই যেন ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে । কারণ অনেকই আছেন যে মুখে বলে ভালোবাসে কিন্তু কাজের সময় দেখা যায় সঙ্গীর কথার কোন মূল্যায়ন করে না। কাজেই স্ত্রীকে সত্যিকার অর্থে ভালবাসুন। স্ত্রীকে পরকীয়া থেকে বাঁচতে এবং একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু দাম্পত্য জীবন এবং শান্তিপূর্ণ সংসার পেতে সঙ্গীর চাহিদার মূল্যায়ন করুন। সে ক্ষেত্রে দুজনে আলোচনার মাধ্যমে সেই বিশেষ সমস্যাটি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। এতে সুখী দাম্পত্য সহজেই ফিরে আসবে।
সঙ্গীকে পরকীয়ার বিষয়টি জানান
অনেকেই পরকীয়ার বিষয়টি সঙ্গীকে জানাতে চান না। তারা মনে করেন, এ ক্ষেত্রে বিবাদ আরও বাড়বে। এতে কিন্তু ভবিষ্যতে ভালোর চেয়ে খারাপই বেশি হয়। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো থাকলে স্থান-কাল-পাত্র বুঝে সঙ্গীকে গোটা বিষয়টি খুলে বলে দিতেই পারেন। কারণ অন্য কারও থেকে ব্যাপারটা জানলে তা আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন
পরকীয়া ভেঙে বেরিয়ে আসতে হলে সবার আগে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। আপনাকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি সত্যিই সম্পর্ক শেষ করতে চান তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা করুন। চাইছেন, অথচ বার বার ফিরে এসে সময় নষ্ট করছেন এমনটা হলে কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। দেরি না করে তাই আপনার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিন।
পরকীয়ায় জড়ানো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুন
একবার পরকীয়া থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেই নারী বা পুরুষের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে অবশ্যই সম্পর্কে ইতি টানার কথা তাকে সোজাসুজি জানিয়ে দিন। আবেগপ্রবণ হয়ে কোনোভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করাই ভালো। বরং সংসার ও কাজে মন দিন। কাজটি কঠিন হলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু আপনিই সফল হবেন।
সঙ্গীকে নতুনভাবে ভালোবাসুন
নিজেদের মধ্যে কথা বলে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করুন। যেই কারণেই আপনি পরকীয়া তে জড়িয়ে পড়েন না কেন তা শুধরাবার চেষ্টা করুন। সঙ্গীর বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা করুন। তার জন্য সবসময় সত্য কথা বলুন ও সৎ থাকুন। আপনার স্বামী বা স্ত্রীর আপনার জন্য কী করেছেন ভাবুন। পরিবারে নিজের গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করুন। নতুন দায়িত্ব নিন। এতে আপনাদের সম্পর্ক আবার আগের মত ভালো হয়ে যাবে।
ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সামলান
স্ত্রী অথবা স্বামীর মধ্যে যিনি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন, তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অন্য সম্পর্কে জড়ানোর সমস্ত দায় তার ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এমনটা হলে কিন্তু পরকীয়ায় ইতি টানার উদ্দেশ্যই পূরণ হবে না। বরং কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেই বিষয়টি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। দুজনকেই ঠাণ্ডা মাথায় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি সামলাতে হবে।
বিশ্বাস রাখুন ও উপহার দিন
অনেক সময় দেখা যায়, পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পরও সঙ্গীর প্রতি সেই বিশ্বাসটা আর ফেরে না। তাই উলটো দিকের মানুষটার মনে সারাক্ষণ সন্দেহ থেকে যায়। তাই নতুন করে তার বিশ্বাস অর্জন করা জরুরি। স্ত্রী বা স্বামীকে নানা ধরনের সারপ্রাইজ দিয়ে, ভালোবাসায় ভরিয়ে সেই ভাঙা মনকে জোড়া দেওয়ার কাজটিও করতে হবে অত্যন্ত নিপুণ হাতে। এতে করেই সুখী দাম্পত্য আবারও ফিরে আসবে।
ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন
পরকীয়া রোধে সৃষ্টিকর্তার ভয় অন্তরে রাখুন। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন। কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজে অপরাধ কমিয়ে আনে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। ইসলামে পরকীয়া-ব্যভিচার অবৈধ সম্পর্কে নারী-পুরুষের মেলামেশাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। নারী-পুরুষ সবাইকেই চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, তোমরা জিনা বা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। এটি অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য আচরণ (সূরা বনি ইসরাইল-৩২)।
ব্যভিচারের অপকার ও তার ভয়াবহতা:
১. কোনো বিবাহিতা মহিলা ব্যভিচার করলে তার স্বামী, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন মারাত্মকভাবে লাঞ্ছিত হয়। জনসমক্ষে তারা আর মাথা উঁচু করে কথা বলতে সাহস পায় না।
২. কোনো বিবাহিতা মহিলার ব্যভিচারের কারণে যদি তার পেটে সন্তান জন্ম নেয় তা হলে তাকে হত্যা করা হবে অথবা জীবিত রাখা হবে। যদি তাকে হত্যাই করা হয় তা হলে দু’টি গুনাহ একত্রেই করা হলো। আর যদি তাকে জীবিতই রাখা হয় এবং তার স্বামীর সন্তান হিসেবেই তাকে ধরে নেওয়া হয় তখন এমন ব্যক্তিকেই পরিবারভুক্ত করা হলো যে মূলতঃ সে পরিবারের সদস্য নয় এবং এমন ব্যক্তিকেই ওয়ারিশ বানানো হলো যে মূলতঃ ওয়ারিশ নয়। তেমনিভাবে সে এমন ব্যক্তির সন্তান হিসেবেই পরিচয় বহন করবে যে মূলতঃ তার পিতা নয়। আরো কতো কি?
৩. কোনো পুরুষ ব্যভিচার করলে তার বংশ পরিচয়ে গরমিল সৃষ্টি হয় এবং একজন পবিত্র মহিলাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
৪. ব্যভিচারের কারণে ব্যভিচারীর ওপর দরিদ্রতা নেমে আসে এবং তার বয়স কমে যায়। তাকে লাঞ্ছিত হতে হয় এবং তারই কারণে সমাজে মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ছড়ায়।
৫. ব্যভিচার ব্যভিচারীর অন্তরকে বিক্ষিপ্ত করে দেয় এবং ধীরে ধীরে তাকে রোগাক্রান্ত করে তোলে। তেমনিভাবে তার মধ্যে চিন্তা, ভয় ও আশঙ্কার জন্ম দেয়। তাকে ফিরিশতা থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং শয়তানের নিকটবর্তী করে দেয়। সুতরাং অঘটনের দিক দিয়ে হত্যার পরেই ব্যভিচারের অবস্থান। যার দরুন বিবাহিতের জন্য এর শাস্তিও জঘন্য হত্যা।
৬. কোনো ঈমানদারের জন্য এ সংবাদ শ্রবণ করা সহজ যে, তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু এ সংবাদ শ্রবণ করা তার জন্য অবশ্যই কঠিন যে, তার স্ত্রী কারোর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে।
সা‘দ ইবন উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«لَوْ رَأَيْتُ رَجُلاً مَعَ اِمْرَأَتِيْ لَضَرَبْتُهُ بِالسَّيْفِ غَيْرَ مُصْفَحٍ»
“আমি কাউকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করতে দেখলে তৎক্ষনাৎই আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো”।[1]
উল্লিখিত উক্তিটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কানে পৌঁছতেই তিনি বললেন,
«أَتَعْجَبُوْنَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ؟ وَاللهِ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ ، وَاللهُ أَغْيَرُ مِنِّيْ ، وَمِنْ أَجْلِ غَيْرَةِ اللهِ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ»
“তোমরা কি আশ্চর্য হয়েছো সা‘দের আত্মসম্মানবোধ দেখে? আল্লাহর কসম খেয়ে বলছিঃ আমার আত্মসম্মানবোধ তার চেয়েও বেশি এবং আল্লাহ তা‘আলার আরো বেশি। যার দরুন তিনি হারাম করে দিয়েছেন প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ধরনের অশ্লীলতাকে”।[2]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
«يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ! وَاللهِ مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ مِنَ اللهِ أَنْ يَّزْنِيَ عَبْدُهُ أَوْ تَزْنِيَ أَمَتُهُ»
“হে মুহাম্মাদ-এর উম্মতরা! আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি: আল্লাহ তা‘আলার চাইতেও আর কারোর আত্মসম্মানবোধ বেশি হতে পারে না। এ কারণেই তো তাঁর অসহ্য যে, তাঁর কোনো বান্দা অথবা বান্দী ব্যভিচার করবে”।[3]
৭. ব্যভিচারের সময় ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর ঈমান সঙ্গে থাকে না।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِذَا زَنَى الرَّجُلُ خَرَجَ مِنْهُ الْإِيْمَانُ؛ كَانَ عَلَيْهِ كَالظُّلَّةِ، فَإِذَا انْقَطَعَ رَجَعَ إِلِيْهِ الْإِيْمَانُ»
“যখন কোনো পুরুষ ব্যভিচার করে তখন তার ঈমান তার অন্তর থেকে বের হয়ে মেঘের ন্যায় তার উপরে চলে যায়। অতঃপর যখন সে ব্যভিচারকর্ম সম্পাদন করে ফেলে তখন আবারো তার ঈমান তার নিকট ফিরে আসে”।[4]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ زَنَى أَوْ شَرِبَ الْـخَمْرَ نَزَعَ اللهُ مِنْهُ الْإِيْمَانَ كَمَا يَخْلَعُ الْإِنْسَانُ الْقَمِيْصَ مِنْ رَأْسِهِ»
“যে ব্যক্তি ব্যভিচার অথবা মদ পান করলো আল্লাহ তা‘আলা তার ঈমান ছিনিয়ে নিবেন যেমনিভাবে কোনো মানুষ তার জামা নিজ মাথার উপর থেকে খুলে নেয়”।[5]
৮. ব্যভিচারের কারণে ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর ঈমানে ঘাটতি আসে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لاَ يَزْنِيْ الزَّانِيْ حِيْنَ يَزْنِيْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ ، وَلاَ يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ ، وَلاَ يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ؛ وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوْضَةٌ بَعْدُ»
“ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। চোর যখন চুরি করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। মদ পানকারী যখন মদ পান করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। তবে এরপরও তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়”।[6]
৯. ব্যভিচারের প্রচার-প্রসার কিয়ামতের অন্যতম আলামত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يُّرْفَعَ الْعِلْمُ ، وَيَثْبُتَ الْجَهْلُ، وَيُشْرَبَ الْخَمْرُ، وَيَظْهَرَ الزِّنَا»
“কিয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, মূর্খতা ছেয়ে যাবে, (প্রকাশ্যে) মদ্য পান করা হবে এবং প্রকাশ্যে ব্যভিচার সংঘটিত হবে”।[7]
আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«مَا ظَهَرَ الرِّبَا وَالزِّنَا فِيْ قَرْيَةٍ إِلاَّ أَذِنَ اللهُ بِإِهْلاَكِهَا»
“কোনো এলাকায় সুদ ও ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়লে আল্লাহ তা‘আলা তখন সে জনপদের জন্য ধ্বংসের অনুমতি দিয়ে দেন”।
১০. ব্যভিচারের শাস্তির মধ্যে এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য কোনো দণ্ডবিধিতে নেই। যা নিম্নরূপ:
ক. বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি তথা হত্যা খুব ভয়ানকভাবেই প্রয়োগ করা হয়। এমনকি অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি কমানো হলেও তাতে দু’টি শাস্তি একত্রেই থেকে যায়। বেত্রাঘাতের মাধ্যমে শারীরিক শাস্তি এবং দেশান্তরের মাধ্যমে মানসিক শাস্তি।
খ. আল্লাহ তা‘আলা এর শাস্তি দিতে গিয়ে ব্যভিচারী অথবা ব্যভিচারিণীর প্রতি দয়া করতে নিষেধ করেছেন।
গ. আল্লাহ তা‘আলা এর শাস্তি জনসমক্ষে দেওয়ার জন্য আদেশ করেছেন। লুক্কায়িতভাবে নয়।
১১. ব্যভিচার থেকে দ্রুত তাওবা করে খাঁটি নেক আমল বেশি বেশি করতে না থাকলে ব্যভিচারী অথবা ব্যভিচারিণীর খারাপ পরিণামের বিপুল আশঙ্কা থাকে। মৃত্যুর সময় তাদের ঈমান নসীব নাও হতে পারে। কারণ, বার বার গুনাহ করতে থাকা ভালো পরিণামের বিরাট অন্তরায়। বিশেষ করে কঠিন প্রেম ও ভালোবাসার ব্যাপারগুলো এমনই।
প্রসিদ্ধ একটি ঘটনায় রয়েছে, জনৈক ব্যক্তিকে মৃত্যুর সময় কালেমা পড়তে বলা হলে সে বলে,
«أَيْنَ الطَّرِيْقُ إِلَى حَمَّامِ مِنْجَاب»
“মিনজাবের গোসলখানায় কীভাবে যেতে হবে, কোন পথে”?
এর ঘটনায় বলা হয়, জনৈক ব্যক্তি তার ঘরের দরোজায় দাঁড়ানো ছিলো। এমতাবস্থায় তার পাশ দিয়ে জনৈকা সুন্দরী মহিলা যাচ্ছিলো। মহিলাটি তাকে মিনজাব গোসলখানার পথ জিজ্ঞাসা করলে সে তার ঘরের দিকে ইশারা করে বললো, এটিই মিনজাব গোসলখানা। অতঃপর মহিলাটি তার ঘরে ঢুকলে সেও তার পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকলো। মহিলাটি যখন দেখলো, সে অন্যের ঘরে এবং লোকটি তাকে ধোকা দিয়েছে তখন সে তার প্রতি খুশি প্রকাশ করে বললো, তোমার সঙ্গে একত্রিত হতে পেরে আমি খুবই ধন্য। সুতরাং কিছু খাবার-দাবার ও আসবাবপত্র জোগাড় করা প্রয়োজন যাতে করে আমরা উভয় একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারি। দ্রুত লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র খরিদ করে আনলো। ফিরে এসে দেখলো, মহিলাটি ঘরে নেই। কারণ, সে ভুলবশত ঘরে তালা লাগিয়ে যায় নি। অথচ মহিলাটি যাওয়ার সময় ঘরের কোনো আসবাবপত্র সঙ্গে নেয় নি। তখন লোকটি আধ পাগল হয়ে গেলো এবং গলিতে গলিতে এ বলে ঘুরে বেড়াতে লাগলো:
يَا رُبَّ قَائِلَةٍ يَوْماً وَقَدْ تَعِبَتْ كَيْفَ الطَّرِيْقُ إِلَى حَمَّامِ مِنْجَابِ
“হে অমুক! যে একদা ক্লান্ত হয়ে বলেছিলে, মিনজাবের গোসলখানায় কীভাবে যেতে হয়, কোন পথে”?
একদা সে উক্ত ছন্দটি বলে বেড়াতে লাগলো এমন সময় জনৈকা মহিলা ঘরের জানালা দিয়ে প্রত্যুক্তি করে বললো,
هَلاَّ جَعَلْتَ سَرِيْعاً إِذْ ظَفِرْتَ بِهَا حِرْزاً عَلَى الدَّارِ أَوْ قُفْلاً عَلَى الْبَابِ
“কেন তুমি তাকে পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত দরোজা বন্ধ করে ফেলো নি অথবা ঘরে তালা লাগিয়ে যাও নি?”
তখন তার চিন্তা আরো বেড়ে যায় এবং প্রথমোক্ত ছন্দ বলতে বলতেই তার মৃত্যু হয়। নাঊযু বিল্লাহ।
১২. কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপক আযাব নিপতিত হওয়ার এক বিশেষ কারণ।
আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَا ظَهَرَ فِيْ قَوْمٍ الزِّنَا أَوِ الرِّبَا إِلاَّ أَحَلُّوْا بِأَنْفُسِهِمْ عَذَابَ اللهِ»
“কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটলে তারা নিজেরাই যেন হাতে ধরে তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার আযাব নিপতিত করলো”।[8]
মাইমূনাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لاَ تَزَالُ أُمَّتِيْ بِخَيْرٍ مَا لَمْ يَفْشُ فِيْهِمْ وَلَدُ الزِّنَا ، فَإِذَا فَشَا فِيْهِمْ وَلَدُ الزِّنَا؛ فَأَوْشَكَ أَنْ يَّعُمَّهُمُ اللهُ بِعَذَابٍ»
“আমার উম্মত সর্বদা কল্যাণের ওপর থাকবে যতক্ষণ না তাদের মধ্যে জারজ সন্তানের আধিক্য দেখা না দিবে। যখন তাদের মধ্যে জারজ সন্তান বেড়ে যাবে তখনই আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ব্যাপক আযাব দিবেন”।[9]
>
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং 6846, 7416; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৯৯
[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৪৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৯৯
[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯০১
[4] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৯০
[5] হাকিম: ১/২২; কান্যুল উম্মাল, হাদীস নং ১২৯৯৩
[6] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৮৯; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪০০৭
[7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭১
[8] সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস নং ২৪০২
[9] সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস নং ২৪০০
পরকীয়ার সূত্রপাত ও মুক্তির উপায়: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
৩) পরকীয়ার সূত্র খুজতে খুজতে এবার চোখ পড়লো এবার বাংলাদেশের বিবাহ ব্যবস্থার উপর। বাংলাদেশে অধিকাংশ বিবাহই পারিবারিক সম্মতিতে বা এরেঞ্জ ম্যারেজ হয়ে থাকে। পরিনয়সূত্রে বিবাহের (লাভ ম্যারেজ) সংখ্যা বাড়লেও তা এরেঞ্জ ম্যারেজের ৫%-১০% এর বেশি হবে না। আবার এরেঞ্জ ম্যারেজ বা লাভ ম্যারেজ যাই বলুন না কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী এবং স্ত্রীর বয়সে কমপক্ষে ৫-৬ বছরের তফাত থাকে কারন অধিকাংশ পুরুষ যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য তারা চাকুরিতে একটা ভাল অবস্থানে না গেলে বিয়ে করতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী এবং স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য আরও বেশি হয়ে থাকে যা পরবর্তীতে সমস্যার জন্ম দেয়।
অধিকাংশ এরেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে পরিবারের সিদ্ধান্তেই অনিচ্ছাস্বত্তেও সায় দিতে হয় পাত্র-পাত্রীকে। অধিকাংশ এসব পাত্র-পাত্রীর হয়তো আগের থেকেই কারও সাথে পরিনয় বা অ্যাফেয়ার আছে। কিন্তু তারা তাদের কথা বলার সুযোগ পায় না। এরা বিয়ের পরও তাদের মনের মানুষকে ভুলতে পারে না। তারা তাদের মনের মানুষের কাছেই ফিরে যেতে চায়।
মোবাইলের এ যুগে যোগাযোগ করা কোন ব্যাপারই না। স্বামী অফিসে গেলে কোঁন ফাঁক খুজে স্ত্রী তার পুরানো প্রেমিকের সাথে দেখা করতে যায়। আবার স্বামীও অফিসের মিটিং-এর কথা বলে তার পুরানো প্রেমিকার সাথে সময় অতিবাহিত করে ফিরে। এরকম পরকীয়া সম্পর্ক কতদূর যেতে পারে আশা করি সবার ধারনা আছে।
এরেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী আগে নিজেদের সম্পর্কে না জানার কারনে, বিবাহের পর মতে অমিল থাকার কারনে সাংসারিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা জন্ম দেয়। যা তাদের অন্য কারও কথা ভাবতে বাধ্য করে; যার সাথে তারা ভাল মূহুর্তগুলো ভাগাভাগি করে নিতে পারে। হয়তো কোন পুরানো বন্ধু, কলিগ কিংবা প্রতিবেশীর মধ্যে তাদের আকাঙ্খিত গুনগুলো পায় আর পরকীয়ার জন্ম হয়।
লাভ ম্যারেজের ক্ষেত্রেও মতের অমিলের কারনে পরকীয়ার সূত্রপাত হয়। স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে যে তারা আসলেই তারা “এক দুজে কে লিয়ে” অর্থ্যাৎ “একে অপরের জন্য” ছিলেন না। তাদের বিবাহ পরবর্তী জীবন তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক না চললে তারা খুবই হতাশ হয়ে যায় আর নতুন সাথী খুজতে থাকে।
আবার এরেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে অনেকেই পুরুষই যৌতুকের কারনে তাদের অপছন্দ কোন মেয়েকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু সেই অনিচ্ছাকৃত বিবাহের কারনে সাংসারিক জীবনে সুখ অধরাই রয়ে যায় আর সুখের আশায় সেই পুরুষ অন্য কারও প্রতি আকর্ষিত হয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হন।
সমাধানে কি বলবো তা নিয়ে আমিও বিশাল জটিলতায় পড়ে গেছি। কারন প্রত্যেকটা পরিবারের উচিত এরেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে নিজেদের সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে পাত্র-পাত্রীরা যাতে একে অপরকে জানতে পারে সে সুযোগটা দেওয়া।কিন্তু কয়টা পরিবারই তা করে? আর স্বামী-স্ত্রীরা একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রাখে তাহলে পরকীয়া কোনদিনও তাদের জীবনে আঘাত হানতে পারবে না। লাভ ম্যারেজের ক্ষেত্রে বলতে চাই যে সারাদিন ভালবাসায় মগ্ন থেকে বাস্তব ভুলে গেলে তো সবকিছুই গোল্লায় চলে যাবে। ভবিষ্যতের কথাও একটু চিন্তা করা উচিত নয়তো খোলা চোখে দেখা সেই রঙ্গিন সপ্ন সপ্নই রয়ে যাবে। আর যারা যৌতুক নিয়ে বিবাহ করে তাদের কাপুরুষ উপাধি দেওয়া ছাড়া আমি কোন উপাধি দিতে পারছি না।তাদের স্ত্রীদের স্যান্ডেলের বাড়িই একমাত্র মোক্ষম ঔষধ তাদের সঠিক পথে আনার জন্য। আর আমরা কেনই বা যৌতুক প্রথাকে এত প্রশয় দেই সেটা দেখে আমার কষ্ট লাগে। পরিবারগুলোর বোঝা উচিত যে যৌতুক তাদের মেয়ের জীবনে কোনদিনও সুখ বয়ে আনবে না।
আবার স্বামী-স্ত্রীদের প্রতি বলছি যে একে অপরের প্রতি স্বচ্ছ থাকুন। সংসার নামক গাড়ি তো আপনাদের দুজনকেই চালাতে হবে। পরকীয়া হতে সারাজীবন দূরে থাকুন।
ইসলামে পরকীয়ার শাস্তির বিধান।
পরকীয়া এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পরকীয়ার বিষাক্ত ছোবলে শতশত সুখের সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সন্তান হারাচ্ছে মা-বাবা, স্বামীহারা হচ্ছেন স্ত্রী, স্ত্রী হারাচ্ছেন স্বামী। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর স্বপ্ন ভঙ্গ হচ্ছে। পরকীয়ার বিষবাষ্পে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবার ও সমাজ। পরকীয়া থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র।
ইসলাম একটি সার্বজনীন, যুগোপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক ধর্ম। ইসলাম পরকীয়ার প্রতিকারে যেসব নীতিমালা এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে তা অত্যন্ত শক্তিশালী, বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবধর্মী। ইসলামে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে নারী-পুরুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোনো নারীর পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। সূরা আহজাবের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারীদের পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। যাতে নারীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কোনো পুরুষ আকর্ষণবোধ না করেন।
শুধু নারীদেরই নয়, বরং সুরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে প্রথমে আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পর ৩১ নম্বর আয়াতে মহিলাদেরকে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার পাশাপাশি গোপন শোভা অনাবৃত করতেও নিষেধ করা হয়েছে। অপাত্রে সৌন্দর্য প্রদর্শনকে হারাম করে সবটুকু সৌন্দর্য স্বামীর জন্য নিবেদনে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কারণ, স্বামী তার স্ত্রীর সৌন্দর্যে মোহিত হলে সংসারের শান্তিই বাড়বে। পক্ষান্তরে স্ত্রীর সৌন্দর্য দিয়ে অন্যকে মোহিত করার পথ অবারিত করলে, তা কেবল বিপদই ডেকে আনবে।
ইসলাম নীতি ও আদর্শের ধর্ম। ইসলামে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে নারী-পুরুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পুরুষ-মহিলা সবাইকে চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হইও না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ। ’ (সুরা বনি ইসরাইল, ৩২)
ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে একশ ঘা করে বেত্রাঘাত কর। ’ (সুরা নুর, ২)
হাদিস শরিফে ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কারণ, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে, তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য বিনষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং তার দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে, সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। ’ (বায়হাকি, হা নং ৫৬৪)
হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব। ’ (বুখারি. ৭৬৫৮)
কখনো দেখা যায় দেবরের সঙ্গে জমে ওঠে পরকীয়া। ইসলাম দেবরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার লাগামকেও টেনে ধরেছে। হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেও না। ’ এক আনসার সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? নবিজি (সা.) বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য। ’ (মুসলিম, ২৪৪৫)
হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. ফতহুল বারিতে লিখেছেন, ‘এখানে মৃত্যুর সমতুল্যর অর্থ হলো হারাম। ’ আর ইসলামে এসবের শাস্তি ভয়াবহ। এসবের শাস্তি হিসেবে রজম ও দোররার নির্দেশ এসেছে হাদিসে। যাতে কোনো নারী ও পুরুষ যেন এ ধরনের ভয়াবহ কর্মে লিপ্ত না হয়।
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে যৌনাঙ্গ হিফাযতের বিশেষ কয়েকটি ফযীলত
- যৌনাঙ্গ হিফাযতের বিশেষ কয়েকটি ফযীলত
১. যৌনাঙ্গ হিফাযত সফলতা অর্জনের একটি বিশেষ মাধ্যম:
আল্লাহ তা‘আলা লজ্জাস্থান হিফাযতকারীকে সফলকাম বলেছেন। এর বিপরীতে অবৈধ যৌন সংযোগকারীকে ব্যর্থ, নিন্দিত ও সীমালঙ্ঘনকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ١ ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ ٢ وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنِ ٱللَّغۡوِ مُعۡرِضُونَ ٣ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِلزَّكَوٰةِ فَٰعِلُونَ ٤ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِفُرُوجِهِمۡ حَٰفِظُونَ ٥ إِلَّا عَلَىٰٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُهُمۡ فَإِنَّهُمۡ غَيۡرُ مَلُومِينَ ٦ فَمَنِ ٱبۡتَغَىٰ وَرَآءَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡعَادُونَ ٧﴾ [المؤمنون: ١، ٧]
“মুমিনরা অবশ্যই সফলকাম। যারা সালাতে অত্যন্ত মনোযোগী। যারা অযথা ক্রিয়া-কলাপ থেকে বিরত। যারা যাকাত দানে অত্যন্ত সক্রিয়। যারা নিজ যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী। তবে যারা নিজ স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের সঙ্গে যৌনকর্ম সম্পাদন করে তারা অবশ্যই নিন্দিত নয়। এ ছাড়া অন্য পন্থায় যৌনক্রিয়া সম্পাদনকারী অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারী”। [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১-৭]
২. যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী কখনো নিন্দিত নয়, বরং সে একান্তভাবে সবার প্রশংসা পাওয়ার উপযুক্ত:
আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে ব্যাপকভাবে মানব জাতির নিন্দা করেছেন। তবে যারা নিন্দিত নয় তাদের মধ্যে যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী অন্যতম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِفُرُوجِهِمۡ حَٰفِظُونَ ٢٩ إِلَّا عَلَىٰٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُهُمۡ فَإِنَّهُمۡ غَيۡرُ مَلُومِينَ ٣٠ فَمَنِ ٱبۡتَغَىٰ وَرَآءَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡعَادُونَ ٣١﴾ [المعارج: ٢٩، ٣١]
“আর যারা নিজ যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী। তবে যারা নিজ স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের সঙ্গে যৌনকর্ম সম্পাদন করে তারা অবশ্যই নিন্দিত নয়। এ ছাড়া অন্যান্য পন্থায় যৌনক্রিয়া সম্পাদনকারীরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী”। [সূরা আল-মা‘আরিজ, আয়াত: ২৯-৩১]
লজ্জাস্থান হিফাযতের কারণেই মারইয়াম আলাইহাস সালাম মহিলাদের মধ্যে বিশেষ পূর্ণতা লাভ করেছেন এবং পবিত্র কুর‘আন মাজীদে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَرۡيَمَ ٱبۡنَتَ عِمۡرَٰنَ ٱلَّتِيٓ أَحۡصَنَتۡ فَرۡجَهَا فَنَفَخۡنَا فِيهِ مِن رُّوحِنَا وَصَدَّقَتۡ بِكَلِمَٰتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِۦ وَكَانَتۡ مِنَ ٱلۡقَٰنِتِينَ ١٢﴾ [التحريم: ١٢]
“আল্লাহ তা‘আলা আরো দৃষ্টান্ত দিয়েছেন ইমরান তনয়া মারইয়ামের। যে নিজ সতীত্ব রক্ষা করেছে। ফলে আমরা তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছি এবং সে তার প্রভুর বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছে। সে ছিলো অনুগতদের অন্যতম”। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১২]
৩. লজ্জাস্থান হিফাযত জান্নাতে প্রবেশের একটি বিশেষ চাবিকাঠি:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লজ্জাস্থান হিফাযতকারীকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«يَا شَبَابَ قُرَيْشٍ! احْفَظُوْا فُرُوْجَكُمْ، لاَ تَزْنُوْا، أَلاَ مَنْ حَفِظَ فَرْجَهُ فَلَهُ الْـجَنَّةُ»
“হে কুরাইশ যুবকরা! তোমরা নিজ যৌনাঙ্গ হিফাযত করো। কখনো ব্যভিচার করো না। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি নিজ লজ্জাস্থান হিফাযত করতে পেরেছে তার জন্যই তো জান্নাত”।[1]
সাহল ইবন সা‘আদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ يَّضْمَنْ لِيْ مَا بَيْنَ لَـحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْـجَنَّةَ»
“যে ব্যক্তি উভয় চোয়ালের মধ্যভাগ তথা জিহ্বা এবং উভয় পায়ের মধ্যভাগ তথা লজ্জাস্থান হিফাযত করার দায়িত্ব গ্রহণ করবে আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করবো”।[2]
উবাদাহ ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«اِضْمَنُوْا لِيْ سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْـجَنَّةَ: اُصْدُقُوْا إِذَا حَدَّثْتُمْ، وَأَوْفُوْا إِذَا وَعَدْتُمْ، وَأَدُّوْا الْأَمَانَةَ إِذَا ائْتُمِنْتُمْ، وَاحْفَظُوْا فُرُوْجَكُمْ، وَغُضُّوْا أَبْصَارَكُمْ، وَكُفُّوْا أَيْدِيَكُمْ»
“তোমরা নিজ থেকেই ছয়টি কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করবো। তোমরা কথা বললে সত্য বলবে। ওয়াদা করলে তা পুরা করবে। কেউ তোমাদের নিকট কোনো কিছু আমানত রাখলে তা যথাযথভাবে আদায় করবে। লজ্জাস্থানকে হিফাযত করবে। চোখকে নিম্নগামী করবে এবং হাতকে অসৎ কর্ম থেকে বিরত রাখবে”।[3]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِذَا صَلَّتِ الْـمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْـرَهَا، وَحَصَّنَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا؛ دَخَلَتْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْـجَنَّةِ شَاءَتْ»
“কোন মহিলা যদি রীতি মতো পাঁচ বেলা সালাত পড়ে, রামাদানের সাওম পালন করে এবং নিজ লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে; উপরন্তু তার স্বামীর আনুগত্য করে তা হলে সে জান্নাতের যে কোনো গেট দিয়ে চায় ঢুকতে পারবে”।[4]
>
[1] সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস নং ২৪১০
[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৭৪
[3] সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস নং ১৯০১
[4] সহীহুত তারগীবী ওয়াত তারহীবী, হাদীস নং ১৯৩১
৪. লজ্জাস্থান হিফাযত একান্তভাবে নেককারের পরিচয় বহন করে:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَٱلصَّٰلِحَٰتُ قَٰنِتَٰتٌ حَٰفِظَٰتٞ لِّلۡغَيۡبِ بِمَا حَفِظَ ٱللَّهُ﴾ [النساء: ٣٤]
“সুতরাং যে সমস্ত নারী পুণ্যবতী তারাই স্বামীর আনুগত্য করে এবং তার অনুপস্থিতে তার সম্পদ ও নিজ সতীত্ব রক্ষা করে। যা আল্লাহ তা‘আলা রক্ষা করলেই তা রক্ষা পাওয়া সম্ভব”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৪]
৫. লজ্জাস্থান হিফাযত আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা পাওয়ার এক বিশেষ মাধ্যম:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلۡمُسۡلِمِينَ وَٱلۡمُسۡلِمَٰتِ وَٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ وَٱلۡقَٰنِتِينَ وَٱلۡقَٰنِتَٰتِ وَٱلصَّٰدِقِينَ وَٱلصَّٰدِقَٰتِ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَٱلصَّٰبِرَٰتِ وَٱلۡخَٰشِعِينَ وَٱلۡخَٰشِعَٰتِ وَٱلۡمُتَصَدِّقِينَ وَٱلۡمُتَصَدِّقَٰتِ وَٱلصَّٰٓئِمِينَ وَٱلصَّٰٓئِمَٰتِ وَٱلۡحَٰفِظِينَ فُرُوجَهُمۡ وَٱلۡحَٰفِظَٰتِ وَٱلذَّٰكِرِينَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا وَٱلذَّٰكِرَٰتِ أَعَدَّ ٱللَّهُ لَهُم مَّغۡفِرَةٗ وَأَجۡرًا عَظِيمٗا ٣٥﴾ [الاحزاب: ٣٥]
“নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মহিলা, মুমিন পুরুষ ও মহিলা, অনুগত পুরুষ ও মহিলা, সত্যবাদী পুরুষ ও মহিলা, ধৈর্যশীল পুরুষ ও মহিলা, বিনয়ী পুরুষ ও মহিলা, সাদাকাকারী পুরুষ ও মহিলা, সাওম পালনকারী পুরুষ ও মহিলা, নিজ লজ্জাস্থান হিফাযতকারী পুরুষ ও মহিলা এবং আল্লাহ তা‘আলাকে অধিক স্বরণকারী পুরুষ ও মহিলা এদের জন্যই আল্লাহ তা‘আলা রেখেছেন তাঁর ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৫]
৬. লজ্জাস্থান হিফাযত আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ ডাকে সাড়া দেওয়া:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُل لِّلۡمُؤۡمِنِينَ يَغُضُّواْ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِمۡ وَيَحۡفَظُواْ فُرُوجَهُمۡۚ ذَٰلِكَ أَزۡكَىٰ لَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا يَصۡنَعُونَ ٣٠ وَقُل لِّلۡمُؤۡمِنَٰتِ يَغۡضُضۡنَ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِنَّ وَيَحۡفَظۡنَ فُرُوجَهُنَّ ٣١﴾ [النور: ٣٠، ٣١]
“(হে মুহাম্মাদ) তুমি মুমিনদেরকে বলে দাও, যেন তারা নিজ দৃষ্টিকে সংযত করে এবং নিজ লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্য প্রবিত্র থাকার সর্বোত্তম মাধ্যম। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাদের কর্ম সম্পর্কে অধিক অবগত। তেমনিভাবে তুমি মুমিন মহিলাদেরকেও বলে দাওঃ যেন তারা নিজ দৃষ্টিকে সংযত করে এবং নিজ লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০-৩১]
৭. লজ্জাস্থান হিফাযত অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের এক বিশেষ মাধ্যম:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلۡيَسۡتَعۡفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغۡنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِ﴾ [النور: ٣٣]
“যাদের বিয়ে করার (অর্থনৈতিক) কোনো সামর্থ্য নেই তারা যেন নিজ লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত করে দেন”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৩]
৮. লজ্জাস্থান হিফাযত সফলতাকামীদের পথ, বিপথগামীদের নয়:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمۡ وَيَهۡدِيَكُمۡ سُنَنَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ وَيَتُوبَ عَلَيۡكُمۡۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ ٢٦ وَٱللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيۡكُمۡ وَيُرِيدُ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلشَّهَوَٰتِ أَن تَمِيلُواْ مَيۡلًا عَظِيمٗا ٢٧ يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمۡۚ وَخُلِقَ ٱلۡإِنسَٰنُ ضَعِيفٗا ٢٨﴾ [النساء: ٢٦، ٢٨]
“আল্লাহ তা‘আলা চান তোমাদের জন্য (তাঁর হালাল-হারামসমূহ) বর্ণনা করতে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শসমূহ প্রদর্শন করতে; ওপরন্তু তোমাদের তাওবা গ্রহণ করতে। আল্লাহ তা‘আলা তো মহাজ্ঞানী ও বিজ্ঞানময়। আল্লাহ তা‘আলা চান তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিতে। এ দিকে প্রবৃত্তি পূজারীরা চায় তোমরা যেন ঘোর অধঃপতনে পতিত হও। আল্লাহ তা‘আলা চান তোমাদের সাথে লঘু ব্যবহার করতে। কারণ, মানুষকে তো মূলতঃ দুর্বল রূপেই সৃষ্টি করা হয়েছে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৬-২৮]
৯. লজ্জাস্থান হিফাযত সম্মানেরই মুকুট:
আজ পর্যন্ত কেউ উক্ত বাস্তবতা অস্বীকার করে নি। আদি যুগ থেকে মানুষ সাধুতা ও পবিত্রতা নিয়ে গর্ব করে আসছে।
ইবরাহীম ইবন আবু বকর ইবন ‘আইয়াশ রহ. বলেন, আমি আমার পিতার মৃত্যুর সময় তাঁর পার্শ্বেই অবস্থান করছিলাম। আমি কাঁদতে শুরু করলে তিনি আমাকে বললেন, তুমি কাঁদো কেন? তোমার পিতা তো কখনো ব্যভিচার করে নি।
পরকীয়ায় জীবন তছনছ, জেনে নিন মুক্তির সহজ উপায়
সব মানুষের জীবন একভাবে এগিয়ে যায় না। চলার পথে অনকে সময় ভুল হয়ে যায়। আর এই ভুল সম্পর্কের ক্ষেত্রেও হওয়া সম্ভব। এই পরিস্থিতিতে কিন্তু সতর্ক হওয়া খুবই জরুরি। কারণ আপনার আজকের ছোট ভুল সম্পর্কে বড়সড় সমস্যা তৈরি করে দিতেই পারে। এবার এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িয়েছে, কীভাবে আইনি প্রতিকার পাব
পাঠকের প্রশ্ন বিভাগে আইনগত সমস্যা নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন পাঠকেরা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবার।
পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ব্যারিস্টার মিতি সানজানা
প্রশ্ন: আমি একজন পুরুষ, বয়স ৪২ বছর। খুলনা শহরে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। ১৩ বছর আগে ভালোবেসে আমারই গ্রামের এক মেয়েকে বিয়ে করি। আমাদের কোনো সন্তান নেই। চেষ্টা করেছি, তবে এখনো হয়নি। স্ত্রী আগে আমার সঙ্গে ছিল, এখন গ্রামে থাকে। নানা কারণ দেখিয়ে এখন সে গ্রাম ছেড়ে আসতে চায় না। গ্রামে যাওয়ার পর থেকে একটু একটু করে সে বদলে যাচ্ছে। আমাকে সহ্য করতে পারে না, কিছু বললে রাগ দেখায়। ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্য কারও সঙ্গে কথা বলে। এলাকার মানুষ আমাকে নানা কথা বলে। সে নাকি আমার ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়েছে। ফুফাতো ভাইয়ের বয়স ২৪ বছর। আমার স্ত্রীর চেয়ে সে প্রায় ১৫ বছরের ছোট। আমার বিশ্বাস হয়নি, তবে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে সে এড়িয়ে যায়। একদিন আমি আগে কিছু না বলে গভীর রাতে গ্রামে যাই, স্ত্রীকে ডাকার পরও সে দরজা খুলতে চায় না। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সে দরজা খোলে। সেদিন আমি বাড়িতে অন্য কাউকে পাইনি। তবে সন্দেহ থেকে তল্লাশি চালিয়ে খাটের নিচে একটা জামা খুঁজে পাই, যেটা আমার সেই ফুফাতো ভাইয়ের বলে প্রতিবেশীরা শনাক্ত করেন। আমার স্ত্রীর ইমো নম্বরে অনেক ছেলে ছবি পাঠায়। সে আদতে কী করছে, ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার হাতে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই, তবে বুঝতে পারছি, সে প্রতারণা করছে। এখন আমি কীভাবে আইনি প্রতিকার পেতে পারি?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
উত্তর: প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। প্রশ্ন থেকে বুঝতে পারছি, অন্য কারও সঙ্গে আপনার স্ত্রীর সম্পর্ক আছে বলে আপনি ধারণা করছেন। এ বিষয়ে আপনার প্রতিবেশীরাও আপনাকে বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য–প্রমাণ আপনি পাননি। বাংলাদেশের আইনে দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারায় পরকীয়ার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে সেই নারীর সম্মতি সাপেক্ষে সম্পর্কে লিপ্ত হন, তবে সেই ব্যক্তি ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এ ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনা শ্রম বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
তবে এ ক্ষেত্রে পরকীয়ায় জড়িত নারীর কোনো শাস্তির কথা এ আইনে বলা নেই। স্ত্রী যদি পরকীয়া করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে এ ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবেন না তাঁর স্বামী। আইনের বিধান অনুযায়ী, স্ত্রী পরকীয়া করলে স্বামী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ পাবেন না। সে ক্ষেত্রে প্রমাণ থাকলে আপনার ফুফাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তবে আইনের আশ্রয় নিতে হলে অন্যের দেওয়া তথ্য বা কানকথায় বিশ্বাস না করে, যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করা জরুরি। তারপর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবতে পারেন।
স্ত্রীর কাছে ডিভোর্স চাইলে দেয় না, আবার আমার সঙ্গে সংসারও করতে চায় না
‘সরল মনে মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে গেলে জোরপূর্বক আমাকে সে বিয়ে করে’
পরকীয়ায় জীবন তছনছ, জেনে নিন মুক্তির সহজ উপায়
এ ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে অনেকেই বিয়ে তো করে ফেলেন। তারপর একটা সময় বাদে দাম্পত্য উষ্ণতা হারায়। সেই পরিস্থিতিতে কিন্তু অনেকেই জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ায়। আর একবার এ সমস্যায় জড়িয়ে পড়লে গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়ে যায়। তাই সতর্ক হয়ে যেতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে পরকীয়া করে সুখী হওয়া যায় না।
এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আসলে বিয়ের পরবর্তী সময়টা খুব আনন্দে কেটে যায়। তবে এরপরই শুরু হয়ে যায় যাবতীয় সমস্যা। এ ক্ষেত্রে স্বামী সময় না দিতে পারলে বা অন্যান্য বহু কারণে মানুষ পরপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। আসলে তারাও বাঁচতে চান একটু হাসি-আনন্দে। আর সেই কারণেই এই ঘটনা ঘটে।
এই পরিস্থিতিতে সতর্ক হয়ে যেতে চাইলে আপনাকে কিন্তু কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। এবার পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে মনে দংশন হলে এই কৌশলে বেরিয়ে আসতে পারেন। আসুন সেই সম্পর্কে জানা যাক টিপস-
নিজেকে প্রশ্ন করুন: আপনি জানেন যে ভুল হয়ে গেছে। এবার সেটা নিজের মনে প্রশ্ন করুন। আপনার তো পরিবার রয়েছে। সেই বিষয়টা মাথায় রাখা খুবই জরুরি। বোঝার বিষয় হলো, আপনি যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে পারেন, তবে সবটা সামনে চলে আসবে। এই বিষয়টি মাথায় রাখার চেষ্টা করুন।
আপনার নিজের ভালো বুঝুন: এই মানুষটির সঙ্গে আপনি আবেগের বশে বা সাময়িক খুশির জন্য সম্পর্কে গেছেন। কিন্তু এর ভবিষ্যত তো সত্যিই নেই। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে নিজের ভালো নিজেকে বুঝতেই হবে। সেক্ষেত্রে কোনও ভুল করা যাবে না। নইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
সম্মান চলে যাবে: আমরা সমাজবদ্ধ জীব। এবার এই সমাজে বাস করতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হয়। দেখা গেছে, পরকীয়াকে সমাজ ঠিক চোখে নেয় না। এটা সমাজের কাছে নিয়ম বিরুদ্ধ। এবার আপনি যদি এ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান, তবে সমস্যা নেই। কিন্তু শুধুই টাইমপাস করতে গেলে সম্মান হারাবেন। এটা মাথায় ঢুকিয়ে নিন আজই।
সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে তার সাহায্য নিন: আপনি এ সম্পর্কে যার সঙ্গে আছেন, তাকেও গোটা বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হবে। তাকে বলুন যে কী সমস্যা, কেন সমস্যা ইত্যাদি বিষয়গুলো। কারণ আপনি চাইলেই এই সমস্যা থেকে অনায়াসে বেরিয়ে যেতে পারবেন। এবার সেই মানুষটিকেও বুঝিয়ে দিতে হবে যে আপনি কী চাইছেন। তবেই সবাই ভালো থাকবেন।
নিজেকে দোষ দেবেন না: ভুল সবারই হয়। এবার আপনারও হয়েছে। তবে এ নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করে অবসাদে চলে যাবেন না। বরং আপনি চাইলে এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য একজন সম্পর্ক বিশারদের পরামর্শ নিয়ে নিতেই পারেন। তবেই ভালো থাকতে পারবেন।
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ব্যভচারের দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু কথা
- দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু কথা
দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু কথা:
কাউকে লুক্কায়িতভাবে ব্যভিচার কিংবা যে কোনো হারাম কাজ করতে দেখলে তা তড়িঘড়ি বিচারককে না জানিয়ে তাকে ব্যক্তিগতভাবে নসীহত করা ও পরকালে আল্লাহ তা‘আলার কঠিন শাস্তির ভয় দেখানো উচিত।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ سَتَرَ مُسْلِماً سَتَرَهُ اللهُ فِيْ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ»
“কোনো মুসলমানের দোষ লুকিয়ে রাখলে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষও লুকিয়ে রাখবেন”।[1]
দণ্ডবিধি প্রয়োগের সময় চেহারার প্রতি লক্ষ্য রাখবে:
কারোর ওপর শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত কোনো দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার সময় তার চেহারার প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে তা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষত-বিক্ষত না হয়ে যায়।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَّقِ الْوَجْهَ»
“কেউ কাউকে (দণ্ডবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে) মারলে তার চেহারার প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখবে যাতে তা আঘাতপ্রাপ্ত না হয়”।[2]
যে কোনো দণ্ডবিধি মসজিদে প্রয়োগ করা যাবে না:
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لاَ تُقَامُ الْـحُدُوْدُ فِيْ الْـمَسَاجِدِ»
“মসজিদে কোনো দণ্ডবিধি কায়েম করা যাবে না”।[3]
হাকীম ইবন হিযাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُّسْتَقَادَ فِيْ الـْمَسْجِدِ، وَأَنْ تُنْشَدَ فِيْهِ الْأَشْعَـارُ، وَأَنْ تُقَامَ فِيْهِ الْـحُدُوْدُ»
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে কারোর থেকে প্রতিশোধ নিতে, কবিতা আবৃত্তি করতে ও দণ্ডবিধি কায়েম করতে নিষেধ করেছেন”।[4]
দুনিয়াতে কারোর ওপর শরী‘আতের কোনো দণ্ডবিধি কায়েম করা হলে তা তার জন্য কাফফারা হয়ে যায় তথা তার অপরাধটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়। পরকালে এ জন্য তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না।
উবাদাহ ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ أَصَابَ مِنْكُمْ حَدًّا، فَعُجِّلَتْ لَهُ عُقُوْبَتُهُ ؛ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ، وَإِلاَّ فَأَمْرُهُ إِلَى اللهِ، إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ، وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ»
“যে ব্যক্তি (শয়তানের ধোকায় পড়ে) এমন কোনো হারাম কাজ করে ফেলেছে যাতে শরী‘আতের নির্দিষ্ট কোনো দণ্ডবিধি রয়েছে। অতঃপর তাকে দুনিয়াতেই সে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। তখন তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যদি তা তার ওপর প্রয়োগ না করা হয় তা হলে সে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। চায়তো আল্লাহ তা‘আলা তাকে পরকালে শাস্তি দিবেন নয়তো বা ক্ষমা করে দিবেন”।[5]
কোনো এলাকায় ইসলামের যে কোনো দণ্ডবিধি একবার প্রয়োগ করা সে এলাকায় চল্লিশ দিন যাবৎ বারি বর্ষণ থেকেও অনেক উত্তম।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«حَدٌّ يُعْمَلُ بِهِ فِيْ الْأَرْضِ خَيْرٌ لِأَهْلِ الْأَرْضِ مِنْ أَنْ يُّمْطَرُوْا أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا»
“বিশ্বের বুকে ধর্মীয় কোনো দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা তা বিশ্ববাসীদের জন্য অনেক উত্তম চল্লিশ দিন লাগাতার বারি বর্ষণ থেকেও”।[6]
>
[1] তিরমিযী, হাদীস ১৪২৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৯২
[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬১২; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৯৩
[3] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬৪৮
[4] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৯০
[5] তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৯; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬৫২
[6] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৮৬
এই ১২ কারণে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে মানুষ
এই ১২ কারণে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে মানুষ
১. মানিয়ে নিতে না পারা : অনেক সময় দেখা যায় অনেক মানুষই জীবনের ওঠা পড়ার সঙ্গে ঠিক মতো
খাপ খাইয়ে উঠতে পারেন না। আশ্রয় খোঁজেন অন্য কারও কাছে। পরিবারে স্বামী বা স্ত্রী সেই নির্ভরতা দিতে না পারলে, অন্যকোনো নির্ভরযোগ্য জায়গা খোঁজেন অনেকে। ফলে জড়িয়ে পড়েন পরকীয়া সম্পর্কে।
২. অপছন্দের বিয়ে : বিয়েতে মনের মিল না হওয়ায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা
থাকে বেশি। অনেক সময় বাড়ির চাপে বা কোনো অবাঞ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষ মতের অমতে গিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হন। যার ফলস্বরূপ অনেকেই অন্য সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
৩. শারীরিক চাহিদা : বিবাহিত সম্পর্কে অনেকেই একটা সময়ের পর শারীরিক সম্পর্কে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন স্বামী-স্ত্রী।
এই একঘেয়েমি কাটাতেও অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন কেউ কেউ।
৪. সম্পর্কে বদল : সন্তানের বাবা-মা হয়ে যাওয়ার পর অনেক সময়ই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে বদল আসে। ফলে দুজনের মধ্যের স্বাভাবিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সময় মানুষ এমন একজনকে চায়, যাকে বন্ধুর মতো পাশে পাওয়া যাবে।
ফলে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন অনেকে।
৫. মানসিক অশান্তি : দীর্ঘদিনের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে অনেক সময়ই মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। মনের শান্তি
খুঁজতে গিয়েও অনেকে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
৬. ভিন্ন চাহিদা : অনেক সময় দুজনের মধ্যে জীবনের চাহিদাগুলো নিয়ে দ্বিমত দেখা যায়। এটিও কখনও কখনও পরকীয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৭. মতবিরোধ : স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এটাই যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন অনেকেই পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
৮. উচ্ছ্বাসের অভাব : আপনার উল্টোদিকের মানুষটি ম্রিয়মান হলে বা তাঁর জীবন নিস্তরঙ্গ হলে অনেক
সময়ই তা অন্য মানুষটির প্রকৃতির সঙ্গে মেলে না। ফলে মানুষ অন্য কারওর মধ্যে সেই উন্মাদনাগুলো খোঁজার চেষ্টা করেন।
৯. ইচ্ছাগুলো না মেলা : অনেক সময়ই ইচ্ছা-অনিচ্ছার মিল না হওয়ায় মানুষ এমন কাউকে খোঁজে যাঁর সঙ্গে তাঁর ইচ্ছাগুলো মিলবে।
১০. অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা : চার দেয়ালের মধ্যে হাজার রকম অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে হাঁফিয়ে ওঠে মানুষ। পরকীয়া সম্পর্কে এই দায়িত্বগুলো কম থাকায় অনেকেই এই সম্পর্কে মানসিক শান্তি খুঁজে পান।
১১. উচ্চাকাঙ্ক্ষা : অনেক সময় কিছু সুবিধালোভী মানুষ উচ্চপদের জন্য বা অন্য কোনো লালসাতেও এই ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
১২. অল্প বয়সে বিয়ে : দেখা গেছে, যাঁদের ২০ পেরোতে না পোরোতেই বিয়ে হয়ে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সে গিয়ে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ব্যভিচার ও সমকামিতার ভয়াবহ পরিণতি ব্যভিচারের শাস্তি ইসলামহাউজ.কম ১ টি
- ব্যভিচারের শাস্তি
ব্যভিচারের শাস্তি:
কেউ শয়তানের ধোকায় পড়ে ব্যভিচার করে ফেললে সে যদি অবিবাহিত হয় তা হলে তাকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করা হবে। আর যদি সে বিবাহিত হয় তা হলে তাকে রজম তথা পাথর মেরে হত্যা করা হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي ۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ وَلَا تَأۡخُذۡكُم بِهِمَا رَأۡفَةٞ فِي دِينِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۖ وَلۡيَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَةٞ مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٢﴾ [النور: ٢]
“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী; তাদের প্রত্যেককে তোমরা একশ করে বেত্রাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকরী করণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত করতে না পারে যদি তোমরা আল্লাহ তা‘আলা ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাকো এবং মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২]
আবু হুরায়রা ও যায়েদ ইবন খালিদ জুহানী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত তারা বলেন,
«جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ، فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ: صَدَقَ، اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: إِنَّ ابْنِيْ كَانَ عَسِيْفاً عَلَى هَذَا، فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ ، فَقَالُوْا لِيْ: عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ، فَفَدَيْتُ ابْنِيْ مِنْهُ بِمِئَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيْدَةٍ، ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَقَالُوْا: إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ e: لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللهِ ، أَمَّا الْوَلِيْدَةُ وَالْغَنَمُ فَرَدٌّ عَلَيْكَ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ، وَأَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ! فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هَذَا فَارْجُمْهَا ، فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسٌ فَرَجَمَهَا»
“জনৈক বেদুঈন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের মাঝে কোর‘আনের ফায়সালা করুন। তার প্রতিপক্ষও দাঁড়িয়ে বললো: সে সত্য বলেছে। আপনি আমাদের মাঝে কোর‘আনের ফায়সালা করুন। তখন বেদুঈন ব্যক্তিটি বললো: আমার ছেলে এ লোকটির নিকট কামলা খাটতো। ইতিমধ্যে সে এর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে বসে। সবাই আমাকে বললো: তোমার ছেলেটিকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। তখন আমি আমার ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নেই এ লোকটিকে একটি বান্দী ও একশটি ছাগল দিয়ে। অতঃপর অত্র এলাকার আলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো, তোমার ছেলেকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের মাঝে কুরআনের বিচার করছি, বান্দী ও ছাগলগুলো তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে এবং তোমার ছেলেটিকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। আর হে উনাইস! তুমি এর স্ত্রীর নিকট যাও। অতঃপর তাকে রজম করো। অতএব, উনাইস তার নিকট গেলো। অতঃপর তাকে রজম করলো”।[1]
উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«خُذُوْا عَنِّيْ، خُذُوْا عَنِّيْ، فَقَدْ جَعَلَ اللهُ لَـهُنَّ سَبِيْلاً ، الْبِكْرُ بِالْبِكْرِ جَلْدُ مِئَةٍ وَنَفْـيُ سَنَةٍ ، وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِئَةٍ وَالرَّجْمُ»
“তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা দিয়েছেন তথা বিধান অবতীর্ণ করেছেন। অবিবাহিত যুবক-যুবতীর শাস্তি হচ্ছে, একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ ও মহিলার শাস্তি হচ্ছে, একশটি বেত্রাঘাত ও রজম তথা পাথর মেরে হত্যা”।[2]
উক্ত হাদীসে বিবাহিত পুরুষ ও মহিলাকে একশটি বেত্রাঘাত করার কথা থাকলেও তা করতে হবে না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়িয ও গামিদী মহিলাকে একশটি করে বেত্রাঘাত করেননি। বরং অন্য হাদীসে তাদেরকে শুধু রজম করারই প্রমাণ পাওয়া যায়।
আরেকটি কথা হচ্ছে, শরী‘আতের সাধারণ নিয়ম হলো, কারোর ওপর কয়েকটি দণ্ডবিধি একত্রিত হলে এবং তার মধ্যে হত্যার বিধানও থাকলে তাকে শুধু হত্যাই করা হয়। অন্যগুলো করা হয় না। উমার ও ’উস্মান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এটির ওপরই আমল করেছেন এবং ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও ইহা বর্ণিত হয়েছে। তবে ‘আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার যুগে জনৈক ব্যক্তিকে রজমও করেছেন এবং বেত্রাঘাতও। আব্দল্লাহ ইবন ‘আব্বাস, উবাই ইবন কা‘ব এবং আবু যরও এ মত পোষণ করেন।
আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«ضَرَبَ رَسُوْلُ اللهِ e وَغَرَّبَ، وَضَرَبَ أَبُوْ بَكْرٍ t وَغَرَّبَ، وَضَرَبَ عُمَرُ t وَغَرَّبَ»
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরেছেন (বেত্রাঘাত করেছেন) ও দেশান্তর করেছেন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মেরেছেন ও দেশান্তর করেছেন এবং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু মেরেছেন ও দেশান্তর করেছেন”।[3]
ইমরান ইবন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِمْرَأَةٌ مِنْ جُهَيْنَةَ، وَهِيَ حُبْلَى مِنَ الزِّنَا، فَقَالَتْ: يَا نَبِيَّ اللهِ! أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَيَّ، فَدَعَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلِيَّهَا، فَقَالَ: أَحْسِنْ إِلَيْهَا، فَإِذَا وَضَعَتْ فَأْتِنِيْ بِهَا، فَفَعَلَ، فَأَمَرَ بِهَا، فَشُكَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا، ثُمَّ أُمِرَ بِهَا فَرُجِمَتْ، ثُمَّ صَلَّى عَلَيْهَا، فَقَالَ عُمَرُ: أَتُصَلِّيْ عَلَيْهَا يَا نَبِيَّ اللهِ! وَقَدْ زَنَتْ؟! فَقَالَ: لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِّمَتْ بَيْنَ سَبْعِيْنَ مِنْ أَهْلِ الْمَدِيْنَةِ لَوَسِعَتْهُمْ، وَهَلْ وَجَدْتَ أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بِنَفْسِهَا لِلَّهِ تَعَالَى»
“একদা জনৈকা জুহানী মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলো। তখন সে ব্যভিচার করে গর্ভবতী। সে বললো: হে আল্লাহর নবী! আমি ব্যভিচারের শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। অতএব, আপনি তা আমার ওপর প্রয়োগ করুন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অভিভাবককে ডেকে বললেন, এর ওপর একটু দয়া করো। এ যখন সন্তান প্রসব করবে তখন তুমি তাকে আমার নিকট নিয়ে আসবে। লোকটি তাই করলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করলে তার কাপড় শরীরের সাথে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো। এরপর তাকে রজম করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযার সালাত পড়ান। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্চর্যান্বিতের স্বরে বললেন, আপনি এর জানাযার সালাত পড়াচ্ছেন; অথচ সে ব্যভিচারিণী?! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে এমন তাওবা করেছে যা মদীনাবাসীর সত্তরজনকে বন্টন করে দেওয়া হলেও তা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তুমি এর চাইতেও কি উৎকৃষ্ট কোনো কিছু পেয়েছো যে তার জীবন স্বেচ্ছায় আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দিয়েছে”।[4]
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একদা তার এক সুদীর্ঘ খুৎবায় বলেন,
«إِنَّ اللهَ بَعَثَ مُحَمَّداً بِالْـحَقِّ، وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ، فَكَانَ فِيْمَا أَنْزَلَ اللهُ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ، قَرَأْنَاهَا، وَوَعَيْنَاهَا، وَعَقَلْنَاهَا، فَرَجَمَ رَسُوْلَ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ، فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَّقُوْلَ قَائِلٌ: مَا نَجِدُ الرَّجْمَ فِيْ كِتَابِ اللهِ، فَيَضِلُّوْا بِتَرْكِ فَرِيْضَةٍ أَنْزَلَهَا اللهُ»
“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য দীন দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর ওপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিলো। আমরা তা পড়েছি, মুখস্থ করেছি ও বুঝেছি। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম করেছেন এবং আমরাও তাঁর ইন্তেকালের পর রজম করেছি। আশঙ্কা হয় বহু কাল পর কেউ বলবে, আমরা কুরআন মাজীদে রজম পাই নি। অতঃপর তারা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত একটি ফরয কাজ ছেড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে”।[5]
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু যে আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তা হচ্ছে:
﴿الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا ، فَارْجُمُوْهُمَا أَلْبَتَّةَ ، نَكَالاً مِّنَ اللهِ ، وَاللهُ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ﴾
“বয়স্ক (বিবাহিত) পুরুষ ও মহিলা যখন ব্যভিচার করে তখন তোমরা তাদেরকে সন্দেহাতীতভাবে পাথর মেরে হত্যা করবে। এটি হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ এবং আল্লাহ তা‘আলা পরাক্রমশালী ও সুকৌশলী”।
উক্ত আয়াতটির তিলাওয়াত রহিত হয়েছে। তবে উহার বিধান এখন ও কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে।
কোনো অবিবাহিত ব্যভিচারী কিংবা ব্যভিচারিণী যদি এমন অসুস্থ অথবা দুর্বল হয় যে, তাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একশটি বেত্রাঘাত করা হলে তার মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে তা হলে তাকে একশটি বেত একত্র করে একবার প্রহার করা হবে।
সাঈদ ইবন সা‘দ ইবন উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«كَانَ فِيْ أَبْيَاتِنَا رُوَيْجِلٌ ضَعِيْفٌ ، فَخَبُثَ بِأَمَةٍ مِنْ إِمَائِهِمْ ، فَذَكَرَ ذَلِكَ سَعِيْدٌ لِرَسُوْلِ اللهِ e ، فَقَالَ: اِضْرِبُوْهُ حَدَّهُ ، فَقَالُوْا: يَـا رَسُوْلَ اللهِ! إِنَّهُ أَضْعَفُ مِنْ ذَلِكَ ، فَقَالَ: خُذُوْا عِثْكَالاً فِيْهِ مِئَةُ شِمْرَاخٍ ، ثُمَّ اضْرِبُوْهُ بِهِ ضَرْبَةً وَاحِدَةً ، فَفَعَلُوْا»
“আমাদের এলাকায় জনৈক দুর্বল ব্যক্তি বসবাস করতো। হঠাৎ সে জনৈকা বান্দির সাথে ব্যভিচার করে বসে। ব্যাপারটি সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়ে দাও তথা একশটি বেত্রাঘাত করো। উপস্থিত সকলে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো তা সহ্য করতে পারবে না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটি খেজুর বিহীন একশটি শাখাগুচ্ছ বিশিষ্ট থোকা নিয়ে তাকে তা দিয়ে এক বার মারবে। অতএব, তারা তাই করলো”।[6]
অমুসলিমকেও ইসলামী বিচারাধীন রজম করা যেতে পারে।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«رَجَمَ النَّبِيُّ رَجُلاً مِنْ أَسْلَمَ ، وَرَجُلاً مِنَ الْيَهُوْدِ وَامْرَأَة»
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলাম বংশের একজন পুরুষকে এবং একজন ইয়াহূদী পুরুষ ও একজন মহিলাকে রজম করেন”।[7]
ব্যভিচারের কারণে কোনো সন্তান জন্ম নিলে এবং ভাগ্যক্রমে সে জীবনে বেঁচে থাকলে তার মায়ের সন্তান রূপেই সে পরিচয় লাভ করবে। বাপের সন্তান রূপে নয়। কারণ, তার কোনো বৈধ বাপ নেই। অতএব, ব্যভিচারীর পক্ষ থেকে সে কোনো মিরাস পাবে না।
আবু হুরায়রা ও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الحَجَرُ»
“সন্তান মহিলারই এবং ব্যভিচারীর জন্য শুধু পাথর তথা রজম”।[8]
‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ عَاهَرَ أَمَةً أَوْ حُرَّةً فَوَلَدُهُ وَلَدُ زِنَا ، لاَ يَرِثُ وَلاَ يُوْرَثُ»
“যে ব্যক্তি কোনো বান্দী অথবা স্বাধীন মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করলো তার সন্তান হবে ব্যভিচারের সন্তান। সে মিরাস পাবে না এবং তার মিরাসও কেউ পাবে না”।[9]
যে কোনো ঈমানদার পবিত্র পুরুষের জন্য কোনো ব্যভিচারিণী মেয়েকে বিবাহ করা হারাম। তেমনিভাবে যে কোনো ঈমানদার সতী মেয়ের জন্যও কোনো ব্যভিচারী পুরুষকে বিবাহ করা হারাম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱلزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوۡ مُشۡرِكَةٗ وَٱلزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَآ إِلَّا زَانٍ أَوۡ مُشۡرِكٞۚ وَحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٣﴾ [النور: ٣]
“একজন ব্যভিচারী পুরুষ আরেকজন ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিকা মেয়েকেই বিবাহ করে এবং একজন ব্যভিচারিণী মেয়েকে আরেকজন ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিকই বিবাহ করে। মুমিনদের জন্য তা করা হারাম”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩]
>
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৫, ২৬৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯৭, ১৬৯৮; তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৩; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৪৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৯৭
[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯০; সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪১৫, ৪৪১৬; সুনান তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৩৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৯৮
[3] তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৩৮
[4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯৬; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৪০; তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬০৩
[5] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৯১; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪১৮
[6] আহমদ: ৫/২২২; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬২২
[7] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭০১
[8] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০৫৩, ২২১৮, ৬৮১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৫৭, ১৪৫৮; ইবন হিব্বান, হাদীস ৪১০৪; হাকিম, হাদীস নং ৬৬৫১; তিরমিযী, হাদীস ১১৫৭; বায়হাক্বী, হাদীস নং ১৫১০৬; আবু দাউদ, হাদীস নং ২২৭৩; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২০৩৫, ২০৩৭; আহমদ, হাদীস নং ৪১৬, ৪১৭
[9] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৭৯৪
পরকীয়ায় নাশ সংসার
দেশে বিয়ের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকও বেড়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া (২২.৬ শতাংশ) এবং দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতা (২২.১ শতাংশ)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাগ্রত করা এবং একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার পরামর্শ দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২২ শীর্ষক এ জরিপ গত ৩১ জানুয়ারি প্রকাশ করে বিবিএস।
বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি : বিবিএসের জরিপে দেখা যায়, ২০০৬ থেকে ২০২১ সাল সময়ে স্থূল বিবাহবিচ্ছেদের হার শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ১-এর মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে ২০২২ সালে তা বেড়ে ১ দশমিক ৪-এ দাঁড়ায়। তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের দুই ধরনের হার বিবিএসের জরিপে পাওয়া পায়। একটি হলো স্থূল বিচ্ছেদ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বিবাহবিচ্ছেদের হার। অন্যটি হলো সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের হার, যাতে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের হিসাব করা হয়। বিবিএস জানিয়েছে, সংস্থাটি বিচ্ছেদ হওয়া মানুষের নিবিড় সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপটি করেছে। ফলে এই জরিপের মাধ্যমেই বিচ্ছেদের আসল কারণ উঠে এসেছে।
বিবাহবিচ্ছেদের কারণ : তালাক বা দাম্পত্য বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। এ কারণে ২২.৬ শতাশ বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে। এরপরই রয়েছে দাম্পত্য জীবন পালনে অক্ষমতা। এ কারণে ২২ দশমিক ১ শতাংশ বিচ্ছেদ ঘটছে। অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা ও অস্বীকৃতি ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, পারিবারিক চাপ ১০ দশমিক ২ শতাংশ, যৌন মিলনে অক্ষমতা বা অনীহা ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপরের অবস্থান রংপুর বিভাগের ২৬ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ বিভাগে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সিলেট বিভাগে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
মুসলমানদের মধ্যে তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদের ঘটনার কারণগুলো জাতীয় হারের মতোই। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী চিত্র লক্ষ করা যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ হলো দাম্পত্য জীবন বজায় রাখতে অক্ষমতা ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, স্থুল বিবাহবিচ্ছেদ হার ২০২১ সালে দশমিক ১৫ থেকে ২০২২ সালে দশমিক ২৯-এ দাঁড়িয়েছে, এক বছরে যা ৯৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ের মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে পৃথক থাকার গড় বয়সের (এসএমএএম) মধ্যে খুবই নগণ্য ও অসঙ্গতিপূর্ণ বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থূল তালাকের হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ২০০৬ সালে স্থুল তালাকের হার ছিল দশমিক ৬, যা ২০২২ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১ দশমিক ৪-এ উন্নীত হয়েছে। এ সময়ের ব্যবধানে পুরুষদের বিবাহের গড় বয়সে (বৈবাহিক অবস্থা নির্বিশেষে) কার্যত কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এ সময়ের ব্যবধানে নারীদের বিবাহের গড় বয়সেও তেমন বৃদ্ধি দেখা যায়নি। প্রথম বিবাহের গড় বয়স গত ১০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে স্থির বয়েছে।
বিয়ের হার : জরিপে দেখা গেছে, স্থূল বিবাহের অনুপাত গত ১৭ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৬ সালে প্রতি হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে এর অনুপাত ছিল ১২ দশমিক ৪, যা ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ১-এ উন্নীত হয়েছে। এ সময়ের ব্যবধানে সূচকটিতে উল্লম্ফন ঘটেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। এ ছাড়া ২০০৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই সাধারণ বিয়ের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৬ সালে পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ছিল প্রতি হাজারে ১৮ দশমিক ৩ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ছিল ২১ শতাংশ। তা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে পুরুষদের সাধারণ বিয়ের হার ৫২ দশমিক ৮ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৪৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ বিয়ের হারে নারী-পুরুষের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই।
তবে ধর্মভেদে তারতম্য দেখা যায়। মুসলমানদের মধ্যে হারটি বেশি ২৬। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তা ১৮-এর কিছু বেশি। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সাধারণ বিয়ের হার ১৫-এর মতো।
জরিপে নারী ও পুরুষরা প্রথম বিয়ে কত বছর বয়সে করেছেন, তার একটি গড় হিসাব উঠে এসেছে। বিবিএস বলছে, পুরুষের বিয়ের গড় বয়স ছিল ২৪ বছর। নারীর ক্ষেত্রে তা ১৮ দশমিক ৪ বছর। শহরে পুরুষ ও নারীর প্রথম বিয়ের গড় বয়স একটু বেশি। গ্রামে কম। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটনার ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সম্পদশালী হওয়া উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে।
বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি এবং এর প্রধান কারণ সম্পর্কে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বিবাহবিচ্ছেদের ফলে মানবজীবনে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়। সামাজিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বড় সমস্যায় পড়ে শিশুরা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে শিশুমনে বড় প্রভাব পড়ে। এমনি বৃদ্ধ বাবা-মাও বিপাকে পড়েন। শিশুদের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্কের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে বিবাহ। যখনই বিবাহ ছাড়া একজন পুরুষ ও নারী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তখনই তাদের সম্পর্ক সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অবৈধ সম্পর্ক বলে। এটাকে পরকীয়া সম্পর্ক বলা হয়। এই সম্পর্ক পরিবার, সমাজ ও ধর্ম কোথাও বৈধতা নেই। ফলে শুরু হয় অ অশান্তি। এই সম্পর্ক থেকে বেরি আসার জন্য সমাজিক ও ধর্মীয় মূল্য বোধকে জাগ্রত করার পরামর্শ দেন এই সমাজ বিজ্ঞানী।
পরকীয়া এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যানহীন
সাংসারিক বা দাম্পত্য জীবনে পরকীয়া সবচেয়ে জটিল সম্পর্কের একটি। পরকীয়া নামের অসামাজিক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অশুভ থাবায় বিপর্যয়ের মূখে সংসার ও পরিবার প্রথা। অনেকেই সমাজ, লোকচক্ষু ও সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে নিরবে সহ্য করে যাচ্ছে স্বামী -স্ত্রীর এই নিষিদ্ধ প্রণয়লীলা। আবার অনেকেই পরকীয়ার নরক যন্ত্রণার অনল সহ্য করতে না পেরে ঘটাচ্ছেন বিবাহ বিচ্ছেদ। কেউবা আবার বেছে নিচ্ছে অত্মহননের মতো অভিশপ্ত পথ।
সাধারণত বিবাহিত নর কিংবা নারীর পরপুরুষ বা পর নারীতে আসক্তি, শারীরিক সম্পর্ক পরকীয়া হিসেবে পরিচিত। পরকীয়ার ইংরেজি হলো Adultery, Extramarital affair, Extramarital sex .উইকিপিডিয়ার মতে পরকীয়া হলো বিবাহিত কোন ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তির সাথে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকান্ড। Cambridge Dictionary তে বলা আছে, Sex between a married man or woman and someone he or she is not married to.এবার পরকীয়া নিয়ে দুটো কেস স্টাডি দেখি।
কেস স্টাডি -১
মিসেস জেসিকা একজন বিবাহিত নারী ও স্কুল শিক্ষকা। তাদের আট বছরের দাম্পত্য জীবনে এখনো তিনি নিঃসন্তান। স্বামী একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে জব করেন। জেসিকার প্রবল ইচ্ছে মা হবার। এজন্য যাবতীয় ডাক্তারী পরীক্ষা নিরীক্ষাও চালিয়েছেন। এখন তিনি অনেক নিরাশ এবং হতাশায় ভুগছেন।জেসিকা হতাশা দূর করতে বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সময় কাটান। কারো কারো সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অথচ তার স্বামী সংসার রয়েছে।
কেস স্টাডি -২
জনাব দীপেন বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। তিনি একজন অবিবাহিত পুরুষ। অনেক দিন পর তার বিবাহিতা একজন বান্ধবীর সঙ্গে ফোনো কথা হয়। বান্ধবীর নিঃসঙ্গতা মিষ্টি কণ্ঠ দীপেনকে আকৃষ্ট করে। এরপর দীপেন এবং বান্ধবী ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে, শারীরিক সম্পর্ক করে। এক সময় তার বান্ধবী স্বামী সংসার ছেড়ে চলে আসেএবং দীপেনকে বিয়ে করে কিন্তু এখন তাদের সংসারে সুখ নেই, প্রতিনিয়ত ঝগড়া। এমতাবস্থায় দীপেন ও তার স্ত্রী পর নারী ও পুরুষে আসক্ত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। ইসলাম ধর্মের অনুসারী।ইসলাম ধর্মে পরকীয়া কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।ইসলামি আইন শাস্ত্রে পরকীয়ায় জড়িত নারী পুরুষের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা হলো পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি। বাংলাদেশে সিনেমা, নাটক, উপন্যাস, গল্প ও শর্টফিল্মের বিভিন্ন দৃশ্যে পরকীয়ার চিত্র ও আলোচনা থাকলেও এনিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে তেমনটা দেখা যায় না।কেননা ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে বৈসাদৃশ্য পরকীয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। পশ্চিমা বিশ্বে পরকীয়া নিয়ে গবেষণা ও জরিপ হলেও বাংলাদেশে তা দৃশ্যমান নয়।তার পরেও পরকীয়ার ঘটনা যে বাংলাদেশে ঘটছে না এমনটা কিন্তু নয়।এ বছরে বাংলাদেশে কয়েকটি পরকীয়া ঘটনার উল্লেখযোগ্য শিরোনাম হলো, পরকীয়া নিয়ে প্রতিদিন পত্রিকায় কোনো না কোনো সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে।স্ত্রীর পরকীয়ার বলি স্বামী-মেয়ে। (বাংলাদেশ প্রতিদিন ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯)।মায়ের পরকীয়ার বলি শিশুসন্তান। (প্রথম আলো, ১৬ জুলাই ২০১৯) স্ত্রীর পরকীয়ার বলি চিকিৎসক। (একুশে সংবাদ, ৩১ জানুয়ারি ২০১৯)।
পরকীয়ার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে, অল্প বয়সে বিয়ে,শারীরিক সমস্যা, বিয়ের ক্ষেত্রে ভুল মানুষকে নির্বাচন করা, ক্যারিয়ার আডভান্সমেন্ট, পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিতে পরকীয়া প্রভাব রাখে, বৈবাহিক জীবনে অসুখী, অবজ্ঞা, গৃহস্থলীর কাজে স্বামীর সহযোগিতা ইত্যাদি।
শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন যে পরিমাণ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে তা সামাজিক বন্ধনের বিচ্ছিন্নতাকে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। পরিসংখ্যান মতে,২০১৯ সালের বিগত ৬ মাসে অর্থাৎ ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫৫৭টি তালাকের আবেদন হলে একদিনে আবেদন হয়েছে ২৬টি তালাকের। অর্থাৎ প্রতি ৫৫ মিনিটে একটি সংসার ভাঙার আবেদন জমা পড়েছে নগর ভবনে।স্বামীর পরকীয়া, মাদকাসক্ত এসব গুরুতর কারণে যেমন তালাক হয়, আবার স্ত্রীর নানা দোষ দেখিয়েও স্বামীরা তালাকের আবেদন করে।
তবে পরকীয়া নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিসংখ্যান ও গবেষণা হলেও আমার জানা মতে বাংলাদেশের কোন সংগ্ঠন কিংবা সংস্থা পরকীয়া নিয়ে কোনো জরিপ ও গবেষণা চালায়নি। অথচ প্রতিনিয়ত পত্র পত্রিকা পরকীয়ার সম্পর্ক নিয়ে নানান দুর্ঘটনার সংবাদ ছাপা হচ্ছে ।বর্তমানে পরকীয়ার প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতা মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ নানা প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয়, তাই আজকাল পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে তোলা অনেক সহজ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।পরকীয়া যেন সেই বহমান নদীর মতো এ কূল ভাঙ্গে ঐ কূল গড়ে। একজনের সুখের সংসার ভেঙ্গে তছনছ করে আরেকটি চোরাবালিতে যেন পা দেওয়ার মতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরকীয়ার সম্পর্ক সুখের হয় না। এর পরিণতি হয় কখনো কখনো ভয়ঙ্কর ও অবমাননাকর, সামাজিকভাবে হতে হয় হেয় ও এক ঘরে।
মনোচিকিৎসায় একথা স্বীকৃত যে, পিতামাতার পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষন্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়| মিশরের একটি টিভির টক-শো অনুষ্ঠান ঐ টক-শো`র একজন অতিথি আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ করেই মন্তব্য করে বসেন যে মিশরের অন্তত ৩০% মহিলা পরকীয়ার সাথে জড়িত।এরপরে মহা বিপদে পড়েন টেলিভিশনের কর্তাব্যক্তিরা।সারা দেশে এতটাই হৈচৈ শুরু হয় যে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটিকে ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। ধর্ম ও সামাজিক মূলবোধের কারণে পরকীয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে অনেকে মুখ খুলতে চায় না।
পরকীয়া নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ভারতে। বিবাহবহির্ভূত ডেটিং অ্যাপ গ্লিডেনের জরিপ পরিচালনায় তা উঠে এসেছে । জরিপ বলছে দেশটিতে প্রত্যেক ১০ জন নারীর সাতজনই পরকীয়ায় লিপ্ত। নারীরা কেন ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ছেন’ শিরোনামে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। ব্যাঙ্গালুরু, মুম্বাই, কলকাতার মতো শহরের নারীরা সবচেয়ে বেশি পরকীয়ায় লিপ্ত বলে জরিপে উঠে এসেছে।তবে জরিপে কিছু বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্লিডেনের একজন মার্কেটিং স্পেশালিস্ট জানিয়েছেন ‘জরিপে অংশ নেয়া প্রতি ১০ জন নারীর চারজন জানিয়েছেন, অপরিচিতদের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়ানোর পর স্বামীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে।
কয়েক বছর আগে পরিচালিত অ্যাপ ভিত্তিক এই জরিপ থেকে জানা যায়, ভারতের প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী মনে করে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকা উচিত। ২০ শতাংশ পুরুষ ও ১৩ শতাংশ নারী তাদের স্ত্রী এবং স্বামীকে ঠকিয়ে পরকীয়া করছেন বলে স্বীকার করেছেন। স্বামীকে ঠকিয়ে পরকীয়া করছে এমন ৭৭ শতাংশ ভারতীয় নারী বলেছেন, তাদের বিবাহিত জীবন একঘেয়ে হয়ে পড়েছে। তাই তারা বিয়ের বাইরে একজন সঙ্গীকে খুঁজে নিচ্ছেন। নিজের স্বামীর বাইরে একজন সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার মধ্যে তারা ভিন্ন ধরনের উত্তেজনা অনুভব করেন।
ভারতে কোন বিবাহিত নারী বা পুরুষ যদি অন্য কারো সাথে পরকীয়া সম্পর্ক করেন – তাহলে তা আর ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে না বলে সেদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় রয়েছে। একজন বিশ্লেষক ড. ক্যাথরিন মার্সার বলছেন, পুরুষদের তুলনায় নারীরা অবশ্য পরকীয়ার কথা স্বীকার করেন কম।যৌন আচরণের প্রশ্নে নারীদের প্রকাশ যে ভিন্ন সে কারণেই এমনটা হয় বলে তিনি ব্যাখ্যা করছেন।
বাংলাদেশে পরকীয়া সংক্রান্ত আইনের ৪৯৭ ধারায় বলা হয়েছে যে কোন বিবাহিত ব্যক্তি যদি অন্য কোন বিবাহিত নারীর সাথে জেনেশুনে যৌন সম্পর্ক করে তাহলে তা ব্যভিচার বলে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে সেই পুরুষটির পাঁচ বছরের কারাদন্ড, অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান আছে। তবে যে নারীর সাথে ব্যভিচার করা হয়েছে – তার ক্ষেত্রে আইনে কোন শাস্তির বিধান নেই, ব্যভিচারকারী নারী ও পুরুষ উভয়ের শাস্তির কথাও বলা নেই।তবে এই আইন সংশোধনের দাবি উঠেছে।তবে যাই বলি না কেন পরকীয়ার মতো অভিশপ্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও এর কুফল নিয়ে প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে। পরকীয়ার মতো অসামাজিক ব্যাধিরও একটি জরিপ, পরিসংখ্যান থাকা প্রয়োজন। যাতে একে অঙ্কুরে নির্মূল করা সম্ভবপর হয়।
যত সর্বনাশ পরকীয়ায়
বাংলাদেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে তোলার হার অস্বাভাবিক সংখ্যায় বাড়ছে। আর পরকীয়ায় আসক্ত নর-নারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে। এর ফলে পুরো দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। এতে দগ্ধ হচ্ছে পরিবার, ধুঁকছে সমাজ। এর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক সদস্যদের হত্যা করার মতো অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই পরকীয়ায় জড়াচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজের অসুস্থ বিনোদন, নিজ রুচি ও যোগ্যতার সঙ্গে জীবনসঙ্গীর মিল খুঁজে না পাওয়া, স্ত্রীকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, বিয়ের আগে-পরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ম্যারেজ বা ফ্যামিলি কাউন্সিলিং না নেওয়া, স্বামীর অর্থনৈতিক সংকট ও স্ত্রীর উচ্চাভিলাসের কারণেই নর-নারী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। জরিপ বলছে, শহরাঞ্চলে ৮ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৭ শতাংশ বিবাহিত পুরুষই বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত। আর নারীদের মধ্যে গড়ে ০.৩ শতাংশ এ ধরনের সম্পর্কে জড়িত। এদের মধ্যে পুরুষরা তাদের মেয়ে বান্ধবী (৩২ শতাংশ) এবং আত্মীয়দের (১৫%) সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কে জড়াচ্ছে। আর যেসব পুরুষ বিয়ের আগেই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তাদের বিয়ের পর পরকীয়ায় জড়ানোর প্রবণতা বেশি থাকে। ‘বেজলাইন এইচআইভি/এইডস সার্ভে এমোং ইয়ুথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা থেকে এমনটি জানা যায়। আবার ঢাকা সিটি করপোরেশনে তালাক নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে আগের চেয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ। তারা আরও জানান, যেসব দম্পতি আমাদের কাছে তালাকের জন্য আবেদন করেন এদের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ স্বামী-স্ত্রী নিজেদের সম্পর্ক ভাঙার কারণ হিসেবে পরকীয়াকে দায়ী করেন। বাংলাদেশের যুবসমাজের ওপর আচরণগত বেইজ লাইন সার্ভেতে উল্লেখ করা হয় যে, দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ষাটের দশকের তুলনায় বর্তমানে বিবাহ বহির্ভূত ও বিবাহপূর্বক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার হার তিনগুণ বেশি। বর্তমানে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জনই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। সমাজবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে পাশ্চাত্যের মতো বাংলাদেশেও পারিবারিক সম্পর্কগুলোতে ভাঙন ধরবে। তবে এই অবস্থা রোধ করতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতাবিষয়ক শিক্ষা প্রদান, গণমাধ্যমে সুষ্ঠু প্রচারযোগ্য অনুষ্ঠান প্রচার ও পারিবারিক মূল্যবোধ তৈরির ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পরকীয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কারণ জড়িত। তিনি আরও বলেন, দেশের সেসব স্ত্রীর-স্বামী প্রবাসে থাকে তাদের তুলনামূলক বেশি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। দেখা যাচ্ছে যে, কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকরা পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পারিবারিক কলহ থেকে সন্তানকে হত্যা করছে। এ ক্ষেত্রে অবৈধ সম্পর্ক চালিয়ে যেতে কোনো বাধা পেলে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ছেন।
পরকীয়া প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন
বিশ্বব্যাপী পরকীয়া পারিবারিক অশান্তির কারণ। এর জের ধরে ভেঙে পড়ছে পরিবার কাঠামা। ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও স্বপ্ন-সাধ। কখনো কখনো খুনখারাবির মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে পরকীয়ার কারণে।
পরকীয়া সম্পর্ক ভুক্তভোগীর মনে ক্রোধ, অশান্তি, দুঃখ, অবিশ্বাস ও অশেষ মনোযন্ত্রণার সৃষ্টি করে। পরকীয়ার প্রধান কারণ আল্লাহর আইনবহির্ভূত জীবনযাপন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, তার জীবনযাত্রা সংকীর্ণ ও দুঃখে ভরপুর হয়ে ওঠে…।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১২৪)
পরকীয়া মানুষকে ব্যভিচারের দিকে টেনে নেয়।
অথচ এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল/ইসরা, আয়াত : ৩২)
নিম্নে পরকীয় প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—
আল্লাহর ভয় : বিবাহের খুতবায় পবিত্র কোরআনের তিনটি আয়াত পাঠ করতে হয়, যা যথাক্রমে সুরা নিসা, আয়াত : ১, সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০২ এবং সুরা আহজাব, আয়াত : ৭০-৭১।
(সূত্র : সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১১৮)
এই তিন আয়াতের মূলকথা হলো আল্লাহর ভয় অন্তরে সদা জাগ্রত রাখা। গভীর আল্লাহভীতি না থাকলে পারিবারিক জীবনের এই সঙ্গিন পথ পাড়ি দেওয়া কঠিন। প্রকৃত আল্লাহভীতি মানুষকে সব ধরনের পাপাচার থেকে বিরত রাখতে পারে।
বিবাহের ক্ষেত্রে সমতাবিধান : মুসলিম বিবাহে সমতাবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটাকে ‘কুফু’ বলা হয়।
অর্থাৎ বর ও কনের সমান-সমান হওয়া, একের সঙ্গে অন্যজনের সামঞ্জস্য হওয়া। তবে সেটি প্রধানত গণ্য হবে দ্বিন পালনের ব্যাপারে। ইমাম খাত্তাবি (রহ.) তাই লিখেছেন, বহুসংখ্যক মনীষীর মতে, চারটি বিষয়ে কুফু বিবেচনা করবে : দ্বিনদারি, স্বাধীনতা (আজাদি), বংশ ও শিল্প-জীবিকা। তাদের অনেকে আবার দোষত্রুটিমুক্ত ও আর্থিক সচ্ছলতার দিক দিয়েও কুফুর বিচার গণ্য করেছেন। ফলে কুফু বিচারের জন্য মোট দাঁড়াল ছয়টি গুণ। হানাফি মাজহাবে কুফুর বিচারে বংশমর্যাদা ও আর্থিক অবস্থাও বিশেষভাবে গণ্য। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বার্থে উত্তম নারী গ্রহণ করো এবং সমতা (কুকু) বিবেচনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ রাখো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৯৬৮)
ছেলে-মেয়ের সম্মতিতে বিয়ের ব্যবস্থা করা : বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর সম্মতি থাকা জরুরি। আর পরকীয়া থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী একে অন্যকে দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে বিয়ের পরে তাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হবে। অনেক পরিবার এ ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব দেয় না বা তাদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। অথচ এটা ইসলামবিরোধী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে, তোমরা বলপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকারী হবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
পরিবারে ইসলামী শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা : পরিপূর্ণ ইসলামী পরিবেশ ও ইসলামী শিক্ষা পরকীয়ার মতো পরিবার বিধ্বংসী পাপ থেকে নারী-পুরুষকে রক্ষা করতে পারে। ইসলামী শিক্ষা, পর্দা প্রথা, দৃষ্টি নিম্নগামী রাখার নির্দেশ, বিনা প্রয়োজনে মাহরাম থেকে দূরে থাকার বাস্তবধর্মী আমলগুলো মানুষকে পরকীয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। স্ত্রীর দ্বিন-দুনিয়ার প্রয়োজনমাফিক শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করাও স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার। এ ক্ষেত্রে কোরআনে নির্দেশ হলো, ‘তোমরা তোমাদের নিজেকে ও পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
গায়র মাহরাম থেকে দূরে থাকা : মাহরাম নয়, এমন পরপুরুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ না রাখা। কেননা চারিত্রিক নির্মলতা ও মানসিক পবিত্রতা রক্ষায় এটি খুবই জরুরি। কোনো গায়র মাহরাম নারীর একাকী অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অশ্লীল কাজে লিপ্ত করা শয়তানেরই কাজ। এ জন্যই ইসলাম উক্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার আজকের এই দিনের পর থেকে কোনো পুরুষ একজন বা দুজন পুরুষ সঙ্গী ছাড়া কোনো স্বামী থেকে দূরে থাকা নারীর সঙ্গে নির্জনে দেখা করতে পারবে না। (মুসলিম, হাদিস : ২১৭৩)
পরিপূর্ণ পর্দা করা : পরকীয়া থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হলো পরিপূর্ণ পর্দা মেনে চলা। বেপর্দা হয়ে চলাচলের কারণে একে অন্যের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়, নিজেদের মধ্যে অবৈধ ভাব বিনিময় হয়, স্বামী-স্ত্রীর দুর্বল দিক নিয়ে কথা হয় এবং পরবর্তী সময়ে পরকীয়ার দিকে ধাবিত হয়। মুসলিম নারীর ওপর পর্দা ফরজ করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিনা স্ত্রীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের বড় চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। বস্তুত আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’
(সুরা : আহজাব, হাদিস : ৫৯)
সফরে সঙ্গে মাহরাম থাকা : পরকীয়া থেকে বাঁচতে দূরের সফর হলে অবশ্যই স্বামী অথবা মাহরাম সঙ্গে থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, নারীরা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই, এমতাবস্থায় কোনো পুরুষ কোনো নারীর কাছে গমন করতে পারবে না। (বুখারি, হাদিস : ১৮৬২)
পরিবারের সঙ্গে থাকা : আজকাল বিভিন্ন কারণে নারী-পুরুষ আলাদা থাকে। ফলে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় তারা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে যাদের স্বামী দূরে অবস্থান করে তাদের সঙ্গে পরপুরুষ একাকী হবে না। সন্তানদের সঙ্গে রাখবে। সন্তান না থাকলে মা, বোন, ভাগ্নি-ভাতিজি, ননদ, শাশুড়ি, পিতা, আপন ভাই কিংবা নিকটাত্মীয় নারীদের সঙ্গে থাকবে। স্বামী-স্ত্রী কোনো কারণে একত্রে থাকা সম্ভব না হলে নিয়মিত নফল সিয়াম পালন, কোরআন তিলাওয়াত, নবীজীবন, সাহাবিচরিত ও ইসলামী বই-পুস্তক বেশি বেশি পাঠ করা এবং পারিবারিক ও অন্য কাজকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা।
প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ : বর্তমান প্রযুক্তির যুগে পরকীয়া অনেক সহজ। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফ্রি কলিং অ্যাপ ও মোবাইল ফোন এই কাজটি ভীষণ সহজ করে দিয়েছে। এখন আর কারো সঙ্গে দেখা করার জন্য গোপনে তার ঘরের পেছনে গিয়ে মশার কামড় খেতে হয় না। মুঠোফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে এক মুহূর্তেই প্রেমিকার দেখা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চোখের ব্যভিচার হলো (বেগানা নারীকে) দেখা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো (তার সঙ্গে) কথা বলা (যৌন উদ্দীপ্ত কথা বলা)। (বুখারি, হাদিস : ৬২৪৩)
পরকীয়া : কারণ ও প্রতিকার
ভূমিকা : ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানব বংশের ধারাবাহিক সংরক্ষণ, মানববংশ বৃদ্ধি, ইসলামের পরিপূর্ণ অনুশীলন ও বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ ও লজ্জাস্থান হেফাযতের জন্য মহান আল্লাহ পরিবার প্রথা প্রচলন করেছেন। আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ নিজেই মানব জাতির প্রথম পরিবার গঠন করেন (বাক্বারাহ ২/৩৫)। পরিবার মানব সমাজের মূল ভিত্তি। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের অধিকার আদায় ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই পরিবার টিকে থাকে। অপরদিকে অধিকার খর্ব হ’লে এবং বিশ্বাসে ঘাটতি হ’লে পরিবার ধ্বংস হয়। জন্ম নেয় পরিবার বিরোধী চিন্তা-চেতনা। অধিকার লাভে পা বাড়ায় ভুল পথে। জড়িয়ে পড়ে অনৈতিক সম্পর্কে, জড়িত হয় পরকীয়ায়।
সাম্প্রতিককালে যেসব সামাজিক ব্যাধি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তন্মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পরকীয়া। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং-এর মত এটি ব্যক্তিচরিত্র ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম রূপ। প্রতিদিনের খবরের কাগজের একটি অংশে থাকে পরকীয়ার খবর। আর এই পরকীয়ার নিষ্ঠুর বলি হচ্ছে স্বামী বা স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। আলোচ্য প্রবন্ধে পরকীয়ার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।-
পরকীয়ার পরিচয় : ‘পরকীয়া’ বাংলা স্ত্রীবাচক শব্দ। পরকীয়া হ’ল বিবাহিত কোন নারী বা পুরুষ নিজ স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো সাথে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়া। সমাজে এটি নেতিবাচক হিসাবে গণ্য।[1]
মূলতঃ পরকীয়া হ’ল- বৈধ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নিজ স্বামী বা স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে পর পুরুষ বা পর নারীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।
পরকীয়ায় জড়িত হওয়ার কারণ :
বর্তমানে সমাজে পরকীয়ার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেলজিয়ামের মনস্তাত্ত্বিক এস্থার পেরেল তাঁর ‘দ্য স্টেট অব অ্যাফেয়ার’ গ্রন্থে পরকীয়াকে ক্যান্সারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।[2] বিবাহিত নারী-পুরুষের পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার অনেক কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।-
১. ইসলামী শিক্ষার অভাব: ইসলাম মানব জাতির চরিত্রের হিফাযতের জন্য নারী-পুরুষকে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছে[3] এবং বিবাহ বহির্ভূত যাবতীয় সম্পর্ককে হারাম ঘোষণা করেছে (আন‘আম ৬/১৫১)। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক হারাম ও এর ভয়াবহ শাস্তি না জানার কারণে মানুষ পরকীয়ার মত নিকৃষ্ট কাজে জড়িয়ে পড়ে।
২. সামাজিক কারণ : ইসলাম সামর্থ্যবান পুরুষকে একাধিক বিবাহের অনুমতি দিলেও (নিসা ৪/৩) অনেক পুরুষ সামাজিক কারণে একাধিক বিয়ে করতে পারেন না। কারণ সমাজ বহু বিবাহকে ভাল চোখে দেখে না। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন চাহিদার অতৃপ্তি থেকে অনেকে এ সম্পর্কে জড়ায়। অপরদিকে দুর্বল ও অসুস্থ পুরুষের ক্ষেত্রেও নারী সামাজিক ভয়ে তালাক না নিয়ে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে।
৩. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা : পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশার সুযোগে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এরপর আলাপচারিতা ও পরবর্তীতে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। মহিলারা আজকাল চাকুরী, ব্যবসা, লেখাপড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য কারণে ইসলামী বিধান উপেক্ষা করে বাড়ির বাইরে যাচ্ছে। আর পর পুরুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, কথা-বার্তা ও ঠাট্টা-মশকরার মধ্য দিয়ে একে অপরের প্রতি ঝুকে পড়ছে। অথচ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلٰى النِّسَاءِ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ قَالَ الْحَمْوُ الْمَوْتُ، ‘মহিলাদের নিকট একাকী যাওয়া থেকে বিরত থাক। এক আনছার ছাহাবী জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! স্বামীর ভাইয়ের (দেবর-ভাসুর) ব্যাপারে কি হুকুম? তিনি উত্তর দিলেন, স্বামীর ভাই হচ্ছে মরণের ন্যায়’।[4] স্বামীর ভাইয়ের ব্যাপারে যদি ইসলাম এত কঠোরতা আরোপ করে তাহ’লে অপরিচিত বা সাময়িক পরিচিতদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি হ’তে পারে? নিঃসন্দেহে তা আরো কঠোর হবে।
৪. পর্দাহীনতা : পরকীয়ার অন্যতম কারণ হ’ল পর্দাহীনতা। এর ফলে নারী-পুরুষ একে অপরের দেখা-সাক্ষাৎ করার ও কথা বলার সুযোগ পায়। এতে তারা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর শয়তান এটাকে আরো সুশোভিত করে উপস্থান করে এবং পরকীয়ার দিকে নিয়ে যায়। এজন্য ইসলাম পর্দাহীনতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ، ‘মহিলারা হচ্ছে আবৃত বস্ত্ত। সে বাইরে বের হ’লে শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে তোলে’।[5] সুতরাং যে পোষাকে নারীর চুল, গ্রীবা, বক্ষ, পেট, পিঠ ও আবৃত অঙ্গ প্রকাশিত থাকে তা পরিধান করা হারাম।
পর্দাহীনতা বিভিন্নভাবে হ’তে পারে। আর এসবের কারণে নারী-পুরুষ পরকীয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিম্নে পর্দাহীনতার কয়েকটি পর্যায় উল্লেখ করা হ’ল।-
ক. দৃষ্টিপাত : পরকীয়া শুরু হয় নারী-পুরুষের একে অপরের প্রতি দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে। গায়র মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ জায়েয) নারীর প্রতি তাকানো ইসলাম হারাম করেছে। মহিলাদের মধ্যে যাদের প্রতি সাধারণভাবে তাকানো হারাম তাদের ছবি দেখাও হারাম; এমনকি মৃত হ’লেও। আবূ মূসা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,كُلُّ عَيْنٍ زَانِيَةٌ وَالْمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا يَعْنِي زَانِيَةً، ‘প্রতিটি চোখই যিনাকারী। কোন নারী সুগন্ধি মেখে কোন মজলিসের পাশ দিয়ে গেলে সে এমন এমন’। অর্থাৎ যিনাকারিণী।[6] তিনি আরো বলেন,اَلعَيْنَانِ تَزْنِيَان وَزِنَاهُمَا اَلنَّظْرُ، ‘(মানুষের) চক্ষু দু’টিও যেনা করে, আর চক্ষুদ্বয়ের যেনা হ’ল দৃষ্টিপাত করা’।[7] এই পাপের মাধ্যমেই পরকীয়ার সূচনা হয়।
খ. কথা বলা : গায়র মাহরাম নারী-পুরুষ পরস্পরের সাথে সরাসরি বা টেলিফোনে কথা বলার মাধ্যমে একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এক পর্যায়ে তারা পরকীয়ার দিকে ধাবিত হয়, জড়িয়ে পড়ে ব্যভিচারে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنا، مُدْرِكٌ ذلكَ لا مَحالَةَ، فالْعَيْنانِ زِناهُما النَّظَرُ، والأُذُنانِ زِناهُما الاسْتِماعُ، واللِّسانُ زِناهُ الكَلامُ، والْيَدُ زِناها البَطْشُ، والرِّجْلُ زِناها الخُطا، والْقَلْبُ يَهْوى وَيَتَمَنّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ،
‘আদম সন্তানের উপর যেনার কিছু অংশ লিপিবদ্ধ হয়েছে সে অবশ্যই তাতে লিপ্ত হবে। দুই চোখের যেনা হ’ল, দৃষ্টিপাত করা, দুই কানের যেনা হ’ল শ্রবণ করা, মুখের যেনা হ’ল, (গায়র মাহরাম মহিলার সাথে) কথা বলা, হাতের যেনা হ’ল, স্পর্শ করা এবং পায়ের যেনা হ’ল, অগ্রসর হওয়া। আর অন্তর আশা ও আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবায়ন করে অথবা মিথ্যায় পরিণত করে’।[8] সুতরাং গায়র মাহরাম পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
গ. স্পর্শ করা : গায়র মাহরাম নারীর প্রতি তাকানো যেমন যেমন জায়েয নয়, তেমনি তার গায়ে হাত লাগানোও জায়েয নয়। নবী করীম (ছাঃ) পুরুষদের হাতে হাত রেখে বায়‘আত করতেন। কিন্তু মেয়েদের বায়‘আত নেবার সময় কখনো তাদের স্পর্শ করতেন না। আয়েশা (রাঃ) বলেন,
وَاللهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ، غيرَ أنَّه بايَعَهُنَّ بالكَلامِ، واللهِ ما أخَذَ رَسولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ على النِّساءِ إلّا بما أمَرَهُ اللهِ، يقولُ لهنَّ إذا أخَذَ عليهنَّ: قدْ بايَعْتُكُنَّ كَلامًا-
‘আল্লাহর কসম! কথার দ্বারা বায়‘আত গ্রহণ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাত কখনো কোন নারীর হাত স্পর্শ করেনি। আল্লাহর কসম! তিনি কেবল সেসব বিষয়েই বায়‘আত গ্রহণ করতেন, যেসব বিষয়ে বায়‘আত গ্রহণ করার জন্য আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন। বায়‘আত গ্রহণ শেষে তিনি বলতেন, আমি কথা দ্বারা তোমাদের বায়‘আত গ্রহণ করলাম’।[9] অন্য বর্ণনায় এসেছে, উমায়মা বিনতে রুকায়া (রাঃ) বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আসুন, আমরা আপনার হাতে বায়‘আত করব। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমি স্ত্রীলোকের হাতে হাত মিলাই না’।[10] সুতরাং গায়র মাহরাম মহিলাকে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
অনুরূপভাবে যেসব পুরুষের সাথে বিবাহ বৈধ, তাদের সাথে মুছাফাহা করা বৈধ নয়। মহিলা বৃদ্ধা অথবা পুরুষ বৃদ্ধ হ’লেও আপোষে মুছাফাহা জায়েয নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে মহিলা (স্পর্শ করা) হালাল নয়, তাকে স্পর্শ করার চেয়ে তোমাদের কারো মাথায় লোহার সুচ গেঁথে যাওয়া অনেক ভাল’।[11]
মুছাফাহার ব্যাপারে যদি ইসলাম এত কঠোরতা অবলম্বন করে, তাহ’লে কিভাবে একজন বেগানা পুরুষ-নারী একে অপরকে স্পর্শ করতে পারে?
ঘ. গায়র মাহরামের সাথে সফর করা : মেয়েদের মাহরাম ছাড়া একাকী অথবা গায়র মাহরামের সাথে সফর করতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিষেধ করেছেন। কেননা এতে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্ক সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। অপরদিকে পরকীয়ার কারণেও নারী-পুরুষ নিজেদের কামনা-বাসনা পূরণের জন্য অনেক স্থানে সফর করে থাকে। সেকারণ ইসলাম মাহরাম ব্যতীত মহিলাদের সফর কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। এমনকি হজ্জের মত ফযীলতপূর্ণ সফরও মাহরাম ব্যতীত জায়েয নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, لاَ تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلاَّ مَعَ ذِي مَحْرَمٍ، وَلاَ يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ، ‘মেয়েরা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন পুরুষ কোন মহিলার নিকট গমন করতে পারবে না’।[12] তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ^াস রাখে এমন কোন মহিলার জন্য বৈধ নয় যে, সে তার পিতা, পুত্র, স্বামী, ভাই অথবা কোন মাহরাম পুরুষ ছাড়া তিন দিন বা তার বেশী পথ সফর করে’।[13]
স্মর্তব্য যে, মহিলাদের একাকী সফরের কারণে অনেক সময় তারা ধর্ষণের শিকার হন। এমনকি চলন্ত বাসে বা গাড়ীতেও ইদানিং এই বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। বখাটের ইভটিজিং-এর শিকার, শারীরিক ও মানসিক যৌনতার শিকার ইত্যাদি কারণে অনেক মেয়ে অত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ঙ. মাহরাম ব্যতীত নারী-পুরুষের নির্জনবাস করা : পর্দাহীনতার আরেকটি স্তর হ’ল গায়র মাহরাম নারী-পুরুষ নির্জনে একত্রিত হওয়া। ইসলাম একে হারাম ঘোষণা করেছে। জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تَلِجُوْا عَلَى الْمُغِيبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِيْ مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّمِ. قُلْنَا وَمِنْكَ قَالَ وَمِنِّيْ وَلَكِنَّ اللهَ أَعَانَنِيْ عَلَيْهِ فَأَسْلَمُ، ‘যাদের স্বামী উপস্থিত নেই, সে সকল মহিলাদের নিকট তোমরা যেও না। কেননা তোমাদের সকলের মাঝেই শয়তান (প্রবাহিত) রক্তের শিরায় বিচরণ করে। আমরা বললাম, আপনার মধ্যেও কি? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমার মধ্যেও। কিন্তু আমাকে আল্লাহ তা‘আলা সাহায্য করেছেন, তাই আমি নিরাপদ’।[14]
তিনি আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন কখনো কোন মেয়ের সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ না করে যতক্ষণ না ঐ মেয়ের কোন মাহরাম তার সাথে থাকে। কারণ সে সময় তৃতীয় জন থাকে শয়তান’।[15] তিনি আরো বলেন, ‘কোন পুরুষ যেন মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ না করে যতক্ষণ তার সাথে তার মাহরাম না থাকে এবং কোন মহিলা যেন সফর না করে যতক্ষণ না কোন মাহরাম তার সাথে থাকে’।[16]
বিবাহ বৈধ সকল নারী-পুরুষ নির্জন স্থানে, গাড়ীতে, লিফটে, বাড়ীতে বা পর্দার অন্তরালে একাকী কিছু সময়ের জন্যও অবস্থান করা জায়েয নয়। ইসলাম একে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثُهُمَا الشَّيْطَانُ، ‘কোন পুরুষ কোন (গায়র মাহরাম) নারীর সাথে নির্জনে একত্রিত হ’লে শয়তান হয় তাদের তৃতীয় জন’।[17] বর্তমানে এটাকে অনেকে পাপই মনে করে না। দেবর-ভাবী, শালী-দুলাভাই, ড্রাইভার-মহিলা গৃহকর্তা, ডাক্তার-নার্স, অফিসের বস-মহিলা পিএ, শিক্ষক-ছাত্রী, পীর-মহিলা মুরীদ ইত্যাদি বেগানা নারী-পুরুষ প্রতিনিয়ত নির্জনে একত্রিত হয়ে কাজ করছে। ফলে সমাজে পরকীয়ার ঘটনা তীব্রতর হচ্ছে।
৬. ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া : পরকীয়ার আকেরটি কারণ হ’ল, ছেলে-মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের অমতে বিয়ে দেওয়া। অভিভাবকরা নিজেদের কথা ভাবেন এবং অনেক তাড়াহুড়া করে তাদের সন্তানদের বিয়ে দেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ের পসন্দ বা মতামতকে অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেন না। ফলে এসব ছেলে-মেয়েদের বিবাহিত জীবন সুখের হয় না। ছেলে-মেয়ে প্রথমে মেনে নিলেও পরে তাদের মধ্যে পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি হয়। পরিবারের ভয়ে কিছু না বললেও এক সময়য়ে তারা উভয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।
৭. দৈহিক অক্ষমতা : নারী-পুরুষ জৈবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু এই চাহিদা পূরণ না হ’লে নারী-পুরুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চাইল্ড অ্যাডোলসেন্ট ও ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হেলালুদ্দীন আহমাদ বলেন, মনোদৈহিক ও সামাজিক কারণে মানুষ পরকীয়ায় জড়ায়। প্রথমে আসে দৈহিক বিষয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্কে অতৃপ্তি থেকে অনেকে এ সম্পর্কে জড়ায়।[18]
৮. নারীর পোষাক : পোষাক মানুষকে যেমন সম্মানিত করে তেমনি পোষাকের কারণে অনেক অঘটনও ঘটে থাকে। নারীদের টাইটফিট, আঁট-সাট, পাতলা ও জাঁকজমকপূর্ণ পোষাকের কারণে পর পুরুষ তার দিকে আকৃষ্ট হয়। ইসলাম এমন পোষাককে হারাম করেছে, যা পাতলা হওয়ার কারণে ভিতরের চামড়ার রঙ নযরে আসে। এজন্য মুসলিম মহিলাদের পাতলা শাড়ি, ওড়না প্রভৃতি পোষাক পরিধান করে বাইরে যাওয়া জায়েয নয়।[19] আলকামাহ ইবনু আবু আলকামাহ (রাঃ) তাঁর মাতা হ’তে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,دَخَلَتْ حَفْصَةُ بِنْتُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَلَى عَائِشَةَ وَعَلَيْهَا خِمَارٌ رَقِيقٌ فَشَقَّتْهُ عَائِشَةُ وَكَسَتْهَا خِمَارّا كَثَيفا، ‘একদিন হাফছাহ্ বিনতু আব্দুর রহমান (রাঃ) একটি খুব পাতলা ওড়না পরিহিত অবস্থায় আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গেলেন। তখন আয়েশা (রাঃ) উক্ত পাতলা ওড়নাখানা ছিঁড়ে ফেললেন এবং তাকে একটি মোটা ওড়না পরিয়ে দিলেন’।[20] আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلاَتٌ مَائِلاَتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لاَيَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلاَيَجِدْنَ رِيحَهَاوَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا.
‘দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামের অধিবাসী, যাদেরকে আমি দেখিনি (তারা ভবিষ্যতে আসবে।) প্রথম শ্রেণী (অত্যাচারীর দল) যাদের সঙ্গে থাকবে গরুর লেজের মত চাবুক, যা দ্বারা তারা লোককে প্রহার করবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী হ’ল সেই নারী যারা কাপড় পরিধান করেও উলঙ্গ থাকবে, যারা পুরুষদের আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যাদের মাথা (খোপা বাঁধার কারণে) উটের হেলে যাওয়া কুঁজের মত হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তার গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে’।[21]
আয়েশা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, একদা আসমা বিনতু আবুবকর (রাঃ) পাতলা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট আসলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘হে আসমা! মেয়েরা যখন সাবালিকা হয় তখন এই দু’টি অঙ্গ ছাড়া অন্য কোন অঙ্গ প্রকাশ করা তার জন্য সংগত নয়। এ বলে তিনি তাঁর চেহারা ও দু’হাতের কব্জির দিকে ইশারা করেন’।[22]
৯. পশ্চিমা সংস্কৃতি : পশ্চিমাদের নিকট খোলামেলা পোষাকে চলা, বেপর্দায় নিজেকে প্রদর্শন করা অন্যায় নয়। অনেক মুসলিম ছেলে-মেয়ে পশ্চিমাদের অনুকরণে পোষাক পরিধান, তাদের স্টাইলে চলা এবং তাদের মত বেশ ধারণ করে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে পাশ্চাত্যের অনুকরণে ছেলে-মেয়েরা খোলামেলা পোষাক পরা এবং নারী-পুরুষ অবাধে মেলা-মেশা করার কারণে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।
১০. অসমতা : বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের বয়স, আর্থিক সচ্ছলতা, পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বয়সের অধিক ব্যবধানের ফলে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মানসিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। যা এক সময় স্থায়ী বিচ্ছেদের রূপ পরিগ্রহ করে কিংবা তারা পরকীয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এজন্য ইসলাম বয়স, সম্পদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,تَخَيَّرُوْا لِنُطَفِكُمْ وَانْكِحُوا الْأَكْفَاءَ وَأَنْكِحُوا إِلَيْهِمْ، ‘তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ কর এবং সমতা বিবচেনায় বিবাহ কর, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখ’।[23]
১১. প্রযুক্তির সহজলভ্যতা : প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিময় করেছে তেমনি অনেক ক্ষেত্রে এর অপকারিতা জীবনকে নষ্ট করে দিচ্ছে। হাতের নাগালে মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেইসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক বিভিন্ন মাধ্যমে থাকার কারণে প্রতিনিয়ত অনেকের সাথে পরিচয় হচ্ছে এ পরিচয় থেকে অনেকে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে।
১২. কর্মসংস্থান : কর্মসংস্থান পৃথক হওয়ার কারণে অনেক স্বামী-স্ত্রী একসাথে অবস্থান করতে পারে না। ফলে পুরুষ তার অফিসের মহিলা সহকর্মীর সাথে এবং নারী তার অফিসের পুরুষ সহকর্মীর সাথে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ‘ক্রিয়ার মেন্টাল হেলথ ইউনিট’-এর সাইকোলজিস্ট ইশরাত জাহান বীথি বলেন, পরকীয়ায় জড়ানোর একটি বড় কারণ হ’ল শূন্যতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন শূন্যতা তৈরী হয়, তখন আরেকজন সেখানে প্রবেশ করে। হয়তো স্বামী বা স্ত্রী আর আগের মতো করে কথা বলে না বা আদর করে না। যত্ন কম নেয়। এসব কারণে অন্যের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়।[24]
১৩. বিদেশী টিভি চ্যানেলের প্রভাব : বিদেশী টিভি চ্যালেনগুলো পরকীয়ার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। এসব চ্যানেলগুলো বিভিন্ন সিরিয়ালের আড়ালে মানুষদেরকে পারিবারিক কলহ, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব বিশেষ করে পরকীয়ার শিক্ষা দিয়ে থাকে।
১৪. আইনের দুর্বলতা: আধুনিক সমাজে পরকীয়ার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বজায় থাকলেও এটি আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হ’লে পরকীয়াকারী ব্যক্তির বিবাহিত সঙ্গী তার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য কোর্টে আবেদন করতে পারেন।[25] বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কারো স্ত্রী যদি পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তাহ’লে স্বামীর কোন আইনগত প্রতিকার নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক প্রদান করতে পারে। পরকীয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে স্ত্রীর কোন শাস্তির বিধান নেই। কিন্তু দন্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুসারে স্ত্রীর প্রেমিকের শাস্তির বিধান করা হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছে তাকে আইনের মুখোমুখি করানো যাবে। কিন্তু স্ত্রীকে আইনে সোপর্দ করা যাবে না। এমনকি স্ত্রীকে অপরাধের সাহায্যকারী হিসাবেও গণ্য করা যাবে না।
ইসলামে পরকীয়ার শাস্তি : ইসলামে যেসব অপরাধের দন্ড উল্লেখিত হয়েছে, তন্মধ্যে পরকীয়ার মাধ্যমে সংঘটিত যেনা-ব্যভিচারের শাস্তিই সবচেয়ে কঠিন। নিম্নে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হ’ল।-
যেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া : ইসলামে ব্যভিচারের সকল উপায়-উপকরণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেউ ব্যভিচার করলে তাকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হ’তে হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে যেনা-ব্যভিচার প্রমাণিত হলে এর দু’ধরণের শাস্তি রয়েছে।-
এক. অবিবাহিত নারী-পুরুষের শাস্তি : পরকীয়ার দুই জনের একজন যদি অবিবাহিত হয় তাহ’লে তার শাস্তি হ’ল- ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য নির্বাসন দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন,الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ، ‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী- তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে। যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর ঈমানদার হও; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে’ (নূর ২৪/২)।
দুই. বিবাহিত নারী-পুরুষের শাস্তি : বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য পাথর নিক্ষেপে মৃত্যু নিশ্চিত করা। আবূ হুরায়রাহ ও যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তাঁরা বলেছেন, একবার দু’লোক ঝগড়া করতে করতে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এলো। তাদের একজন বলল, আল্লাহর কিতাব মুতাবিক আমাদের মাঝে ফায়ছালা করে দিন। দু’জনের মধ্যে বুদ্ধিমান লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব মুতাবিক ফায়ছালা করে দিন। আর আমাকে কিছু বলার অনুমতি দিন। তিনি বললেন, বল। লোকটি বলল, আমার পুত্র এ লোকটির কাছে চাকর হিসাবে ছিল। আমার পুত্র তার স্ত্রীর সঙ্গে যেনা করেছে। লোকেরা বলেছে, আমার পুত্রের (শাস্তি) রজম হবে। তাই আমি একশ’ বকরি ও একটি বাঁদী নিয়ে তার ফিদইয়া দিয়েছি।
এরপর আমি আলেমদের নিকট এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি। তারা আমাকে জানালেন যে, আমার পুত্রের একশ’ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন হবে। আর রজম হবে ঐ ব্যক্তির স্ত্রীর। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, কসম ঐ সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি তোমাদের উভয়ের মধ্যে অবশ্যই আল্লাহর কিতাব মুতাবিক ফায়ছালা করে দেব। তোমার বকরী ও বাঁদী তোমাকেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। তিনি তাঁর পুত্রকে একশ’ বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য নির্বাসিত করলেন। আর উনায়ক আসলামীকে আদেশ দেয়া হ’ল অন্য লোকটির স্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য। সে যদি (ব্যভিচার) স্বীকার করে তবে তাকে রজম করতে। সে তা স্বীকার করল। সুতরাং তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হ’ল।[26]
বুরায়দাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন মায়েয ইবনু মালিক নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আমাকে পবিত্র করুন’। তিনি বললেন, তোমার ওপর আক্ষেপ হয়, ফিরে যাও এবং আল্লাহর নিকটে ক্ষমা চাও ও তওবা কর। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি চলে গেলেন কিন্তু কিছু দূরে গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন। নবী করীম (ছাঃ)
এবারও তাকে পূর্বের ন্যায় বললেন। এভাবে যখন তিনি চতুর্থবার এসে বললেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, আচ্ছা! তোমাকে আমি কিসের থেকে পবিত্র করব? তিনি বললেন, যিনা থেকে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, সে কি পাগল? জানানো হ’ল, না সে পাগল নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তবে কি সে মদ্যপায়ী? তখন জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তার মুখ শুঁকলেন, কিন্তু মদের গন্ধ পাওয়া গেল না। তখন তিনি বললেন, أَزَنَيْتَ؟ قَالَ: نَعَمْ فَأَمَرَ بِهِ فَرُجِمَ ‘তুমি কি যিনা করেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর তিনি তাকে রজম করার নির্দেশ দিলেন। তখন তাকে রজম করা হ’ল।
এ ঘটনার পর আয্দ বংশের গামিদী গোত্রের জনৈক নারী এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাকে পবিত্র করুন। তিনি বললেন, তোমার ওপর আক্ষেপ হয়, ফিরে যাও! আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তওবা কর। তখন সে বলল, আপনি মায়েয ইবনু মালিককে যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আমাকেও কি অনুরূপ ফিরিয়ে দিতে চান? অথচ আমি তো সেই নারী যে যিনার দ্বারা অন্তঃসত্তা। তখন তিনি বললেন, সত্যি কি তুমি যিনার দ্বারা গর্ভবতী? মহিলা বলল, জি, হ্যাঁ! নবী করীম (ছাঃ) বললেন, যাও! তোমার পেটের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর। তখন এক আনছারী মহিলাটির বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজ তত্ত্বাবধানে নিয়ে গেলেন। অতঃপর সন্তান হওয়ার পর ঐ লোকটি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বলল, গামিদী গোত্রীয় মহিলা বাচ্চা প্রসব করেছে। তখন তিনি বললেন, তার শিশু বাচ্চাটি রেখে এখন তাকে রজম করা যাবে না। কেননা বাচ্চাটির দুধ পান করানোর মতো কেউ থাকবে না। তখন আনছারদের থেকে জনৈক লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর নবী! তাকে দুধপান করানোর দায়িত্ব আমার ওপর। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি তাকে রজম করলেন’।[27]
উল্লেখ্য যে, যেনা-ব্যভিচারের এই শাস্তি বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব কেবলমাত্র দেশের সরকারের। কোন ব্যক্তি বা সামাজিক দায়িত্বশীল তা বাস্তবায়ন করবে না। [ক্রমশঃ]
-মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
তুলাগাঁও (নোয়াপাড়া), দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
[1]. www.bn.wikipedia.org/wiki/পরকীয়া।
[2]. https://www.kalerkantho.com/online/Islamic-lifestylie/ 2019 /12/12/850097
[3]. বুখারী হা/৫০৬৬; মুসলিম হা/১৪০০।
[4]. বুখারী হা/৫২৩২; মুসলিম হা/২১৭২; তিরমিযী হা/১১৭১।
[5]. তিরমিযী হা/১১৭৩; ছহীহাহ হা/২৬৮৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৬৯০।
[6]. আবু দাউদ হা/৪১৭৩; নাসাঈ হা/৫১২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫৪০।
[7]. বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭।
[8]. বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭।
[9]. বুখারী হা/৫২৮৮; মুসলিম হা/১৮৬৬।
[10]. নাসাঈ হা/৪১৮১; ইবনু মাজাহ হা/২৮৭৪; ছহীহুল জামে‘ হা/২৫১৩।
[11]. ত্বাবারানী হা/৪৮৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৬।
[12]. বুখারী হা/১৮৬২; মুসলিম হা/১৩৪১ ‘হজ্জ অধ্যায়’।
[13]. মুসলিম, আবূদাউদ হা/১৭২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৫০।
[14]. তিরমিযী হা/১১৭২; মুসনাদ আহমাদ হা/১৪৩২৪।
[15]. তিরমিযী হা/২১৬৫; ছহীহুল জামে‘ হা/২৫৬৪।
[16]. বুখারী হা/১৮৬২, ৩০০৬, ৩০৬১, ৫২৩৩; মুসলিম হা/৩৪১।
[17]. তিরমিযী হা/১১৭১; মিশকাত, হা/৩১১৮।
[18]. https://www.ntvbd.com/health/101693/পরকীয়ায়-মানুষ কেন -জড়ায়।
[19]. আলবানী, হিজাবুল মার‘আতিল মুসলিমা, পৃ: ৫৯।
[20]. মুওয়াত্ত্বা মালিক হা/৩৩৮৩; আস্-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী হা/৩৩৯১; মিশকাত হা/৪৩৭৫।
[21]. মুসলিম হা/২১২৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৩২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৭৯৯।
[22]. বায়হাকী; আবুদাউদ হা/৪১০৪।
[23]. ইবনু মাজাহ হা/১৯৬৮; ছহীহাহ হা/১০৬৭।
[24]. www.ntvbd.com/health/101693/
[25]. www.bn.wikipedia.org/wiki/পরকীয়া।
[26]. বুখারী হা/৬৬৩৩, ৬৬৩৪; মুসলিম হা/১৬৯৭, ১৬৯৮।
[27]. মুসলিম হা/১৬৯৫; মিশকাত হা/৩৫৬২।
পরকিয়া নিয়ে অন্যান্য ধর্ম কি বলে?
বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক বলতে এমন যৌন কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয় যেখানে কোনো বিবাহিত ব্যক্তি তার জীবনসঙ্গী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। এই শব্দটি তখনও প্রযোজ্য হয়, যখন কোনো অবিবাহিত ব্যক্তি কোনো বিবাহিত ব্যক্তির সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়। এটি বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্ক থেকে পৃথক, যেখানে উভয় অংশীজনই অবিবাহিত।
যেসব ক্ষেত্রে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক কোনো যৌন রীতি লঙ্ঘন করে না, সেগুলোকে সম্মতিমূলক অ-একগামিতা বলা হয় (দেখুন: পলিআমরি)। তবে যেসব ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক কোনো যৌন রীতি ভঙ্গ করে, সেগুলোকে পরকীয়া, অ-একগামিতা (যেখানে বিবাহিত ব্যক্তি তার আইনগত সঙ্গী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়), ব্যভিচার, দ্বিবিবাহ, নারীঘটিত কর্মকাণ্ড অথবা বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই ভিন্ন শব্দগুলো সাধারণত নৈতিক বা ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে নেতিবাচক অর্থ বহন করে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে দেওয়ানি আইন বা ধর্মীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রসারতা
সম্পাদনা
আমেরিকান গবেষক আলফ্রেড কিন্সি ১৯৫০-এর দশকে পরিচালিত গবেষণায় দেখতে পান যে, ৫০% আমেরিকান পুরুষ এবং ২৬% নারী বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন। এটি আনুমানিকভাবে ১০ কোটিরও বেশি আমেরিকানের প্রতিনিধিত্ব করে।[১][২]
বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, ২৬% থেকে ৫০% পুরুষ এবং ২১% থেকে ৩৮% নারী বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন।[৩] আবার একটি জরিপে দেখা যায়, ২২.৭% পুরুষ এবং ১১.৬% নারী এই ধরনের সম্পর্কে ছিলেন।[৪]
অন্য একদল গবেষক উল্লেখ করেন যে, প্রায় ২০% থেকে ২৫% আমেরিকান তাদের সঙ্গীর বাইরে কারও সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়েছেন।[৫]
ডিউরেক্সের গ্লোবাল সেক্স সার্ভে ২০০৫-এ দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী ৪৪% প্রাপ্তবয়স্ক একরাতের বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছেন এবং ২২% কারও সঙ্গে প্রেমঘটিত সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।[৬]
২০০৪ সালের এক মার্কিন জরিপ অনুযায়ী, ১৬% বিবাহিত ব্যক্তি বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, যেখানে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় দ্বিগুণ। আরও ৩০% ব্যক্তি এমন সম্পর্ক নিয়ে কল্পনা করেছেন।[৭]
২০১৫ সালে ডিউরেক্স এবং Match.com পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, থাইল্যান্ড এবং ডেনমার্ক ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরকীয়া প্রবণ দেশ, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রেমঘটিত সম্পর্কে জড়িয়েছেন।[৮][৯]
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সটিটিউট ফর ফ্যামিলি স্টাডিজ ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখায়, কালো বর্ণের প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ক্যাথলিকদের তুলনায় বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের হার বেশি।[১০] ২০২২ সালের জেনারেল সোশ্যাল সার্ভের তথ্যানুযায়ী, যারা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৫০% ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ১৬% ছিলেন ক্যাথলিক।[১১]
২০১৮ সালের একটি মার্কিন গবেষণায় দেখা যায়, যারা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন, তাদের ৫৩.৫% ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরিচিত কারও সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়েছেন। প্রায় ২৯.৪% প্রতিবেশী, সহকর্মী বা দীর্ঘমেয়াদি পরিচিতদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। বাকিরা ছিলেন সাধারণ পরিচিত বা সাময়িক যোগাযোগের মানুষ।[১২] একই গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষরা নারীদের তুলনায় বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখে। যারা বিগত এক বছরে এমন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ১২% পুরুষ যৌন সম্পর্কের জন্য অর্থ লেনদেন করেছেন, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১%।[১২]
কিছু গবেষণায় বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের হার মাত্র ২.৫% বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[৩]
এই ধরনের সম্পর্কে জড়ানোর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে একজন সঙ্গীর তুলনায় অন্যজনের লিবিডো বা যৌন আগ্রহ বেশি থাকা।[১৩]
সাব-সাহারান আফ্রিকার কিছু অঞ্চলের গবেষণায় দেখা গেছে, ৫% থেকে ৩৫% পুরুষ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন।[১৪]
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
সম্পাদনা
মূল নিবন্ধ: Religion and sexuality
আরও দেখুন: Marriage § Marriage and religion, Adultery § Abrahamic religions ও Fornication
ইহুদি ধর্ম
সম্পাদনা
আরও দেখুন: Forbidden relationships in Judaism
তোরাহ অনুযায়ী, পরকীয়া বা বিবাহিত নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের জন্য গলায় ফাঁস দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ছিল।[১৫] এখানে দোষারোপের ক্ষেত্রে পুরুষের উপর কঠোর দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে, এবং নারীর ক্ষেত্রেও দায়িত্ব আর শাস্তি প্রযোজ্য, যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি ধর্ষণের শিকার হননি (লেবীয় পুস্তক Leviticus 20:10)। যেহেতু এটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ, তাই মামলা বিচারাধীন হওয়ার জন্য ন্যূনতম দুইজন সৎ সাক্ষীর প্রমাণ আবশ্যক ছিল (দ্বিতীয় বিবরণী Deuteronomy 19:15, ও মিশনাহ সানহেদ্রিন অধ্যায় ৪)।
এই ধরনের শারীরিক শাস্তিগুলি বিচারকদের যুগ এবং পবিত্র মন্দিরের সময় কার্যকর ছিল। রব্বিনিক ইহুদিতে, শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ, কারণ মন্দির পুনর্নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত উপযুক্ত বিচারব্যবস্থা সম্ভব নয়।[১৬]
খ্রিষ্টধর্ম
সম্পাদনা
আরও দেখুন: Adultery § Christianity, ও Fornication § Christian views
ঐতিহ্যবাহী খ্রিষ্টধর্ম বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে নৈতিকতাবিরোধী এবং পাপ হিসেবে গণ্য করে। এই মতের ভিত্তি বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়:
তোমরা কি জানো না যে, অধার্মিকরা ঈশ্বরের রাজ্য লাভ করবে না? ধোঁকায় পড়ো না—ব্যভিচারীরা, মূর্তিপূজক, পরকীয়াকারী, স্ত্রীসুলভ পুরুষ (যেমন নপুংসক ও সমকামী), পুরুষসঙ্গমকারী, চোর, লোভী, মদ্যপ, নিন্দাকারী, অথবা প্রতারণাকারীরা ঈশ্বরের রাজ্য লাভ করবে না। — 1 করিন্থীয়
ক্যাথলিক বিয়ে অনুযায়ী, স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার অঙ্গীকার করে থাকেন, যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল থাকে। ফলে, পরকীয়া এবং বিবাহবিচ্ছেদ উভয়ই এই প্রতিশ্রুতি এবং পবিত্র মাতৃ চার্চের চুক্তির বিরোধিতা করে।
ওয়ালডেনসিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরকীয়াকে সমর্থন করতেন।[১৭]
অন্যদিকে, কিছু আধুনিক প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ, যেমন এপিসকোপালিয়ানরা, আজকের দিনে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে উদার ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে এবং তারা বাইবেলের আধুনিক জীবনে প্রয়োগের বিষয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুসরণ করে।
ইসলাম
সম্পাদনা
মূল নিবন্ধ: Zina
আরও দেখুন: Adultery § Islam
ইসলামী আইন (বা শরিয়াহ)-এর প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জিনা অর্থাৎ বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের জন্য পুরুষ ও নারী উভয়েরই জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্কের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত পর্যন্ত হতে পারে এবং পরকীয়ার শাস্তি পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে শাস্তি কার্যকর করার আগে অন্তত চারজন সৎ মুসলিম পুরুষ সাক্ষীকে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাখেন এবং তার বক্তব্য বিচারকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। কেবল আইনগত কর্তৃপক্ষই শাস্তি প্রদান করতে পারে এবং মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তার জন্যও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।[১৮]
কিছু মুসলমান মনে করেন, এই কঠিন সাক্ষ্যপ্রমাণের শর্ত আসলে সেই সময়কার সমাজে প্রচলিত শারীরিক শাস্তিগুলোর বিলুপ্তি সাধনের উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, প্রমাণের মান এত কঠোর যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।[১৯]
হিন্দুধর্ম
সম্পাদনা
হিন্দুধর্ম বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে পাপ হিসেবে গণ্য করে।[২০] হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে, বৈধ বিবাহের বাইরে যেকোনো ধরনের যৌন কার্যকলাপ—যেমন শারীরিক, মানসিক বা আবেগঘন পরকীয়া—নিন্দনীয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই ধরনের ধারণা মানবসৃষ্ট, অর্থাৎ হিন্দু বিশ্বাস অনুসরণকারী ব্যক্তিদের উচিত এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা।[২১]
আইন
সম্পাদনা
বেশিরভাগ দেশে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক আইনত বৈধ, তবে পরকীয়ার বিরুদ্ধে আইন তুলনামূলকভাবে বেশি প্রচলিত। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ভর্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে ২০০৪ সালে জন বুশিকে পরকীয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।[২২] কিছু অঙ্গরাজ্যে পরিত্যক্ত জীবনসঙ্গী তার প্রাক্তন সঙ্গীর প্রেমিক বা প্রেমিকার বিরুদ্ধে ভালোবাসা হরণের জন্য মামলা দায়ের করতে পারেন।[২২]
কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান,[২৩] আফগানিস্তান,[২৪][২৫][২৬] মিশর,[২৭] ইরান,[২৬] কুয়েত,[২৮] মালদ্বীপ,[২৯] মরক্কো,[৩০] ওমান,[৩১] মরিতানিয়া,[৩২] সংযুক্ত আরব আমিরাত,[৩৩][৩৪] কাতার,[৩৫] সুদান,[৩৬] এবং ইয়েমেন।[৩৭]
বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
সম্পাদনা
কোনো ব্যক্তির বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণত এই ধরনের সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।[৩৮] কিছু বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গোপনে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে তা খোলাখুলিভাবে হয় এবং দম্পতিরা এই বিষয়ে পরস্পরের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেন। এই ধরনের সম্পর্ক তখনই বৈবাহিক জীবনে সমস্যা তৈরি করে, যখন এটি বিশ্বস্ততার প্রত্যাশা ভঙ্গ করে।[৩৯] বিশ্বস্ততার ধারণাটি মূলত নৈতিক মানদণ্ড এবং সামাজিক বিনিময় প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে গঠিত। পরবর্তীটি আবেগ বিনিয়োগ মডেল ও পারস্পরিক নির্ভরতা তত্ত্ব-এর উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করা হয়।[৪০]
প্রেরণা
সম্পাদনা
বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের পেছনে বিভিন্ন রকমের প্রেরণা থাকতে পারে। মানুষের অনুভূতি অনেক সময় আচরণের তুলনায় বেশি অনিয়ন্ত্রিত হয়। অনেকে এই ধরনের সম্পর্কে জড়ান বৈবাহিক জীবনে মানসিক বা শারীরিক অসন্তুষ্টি কিংবা সম্পর্কের মধ্যে সম্পদের ভারসাম্যহীনতার কারণে। আত্মীয়তা বনাম আবেগের তত্ত্ব অনুযায়ী, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া আবেগ পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। বিবাহিত সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সময় গভীর হলেও আবেগহীন হতে পারে। তবে এমন সম্পর্কে জড়াতে সুযোগও থাকতে হয়, এবং সে সময় ঝুঁকি ও সম্ভাব্য লাভ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।[৩৯]
প্রভাবক
সম্পাদনা
যেসব বিষয় বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: (১) শক্তিশালী নৈতিক মূল্যবোধ, (২) সন্তানের উপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা, (৩) মৌলিক উদ্বেগ, বিশেষ করে একাকিত্বের ভয়, এবং (৪) অন্যকে, বিশেষ করে বিবাহবহির্ভূত সঙ্গীকে কষ্ট না দেওয়ার মানসিকতা। এর মধ্যে নৈতিক মানদণ্ড ও মৌলিক উদ্বেগ সবচেয়ে কার্যকরভাবে সম্পর্ক থেকে বিরত রাখে।[৪০]
লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য
সম্পাদনা
গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষরা যৌন সম্পর্কজনিত বিশ্বাসঘাতকতাকে নারীদের তুলনায় বেশি কষ্টদায়ক মনে করেন, যেখানে নারীরা আবেগঘন বিশ্বাসঘাতকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। আচরণের দিক থেকেও পুরুষেরা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কথা বেশি স্বীকার করেন। এই প্রবণতা ব্যাখ্যার জন্য উদ্ভবমূলক ব্যাখ্যা রয়েছে, যেখানে বলা হয় বহু সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন পুরুষদের জেনেটিক সুবিধা প্রদান করে।[৩৮]
যদিও নারী ও পুরুষ উভয়েই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দীর্ঘদিনের পরিচিত কিংবা অপরিচিত কারো সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে দেখা গেছে, পুরুষেরা সাধারণভাবে আকস্মিক ডেট বা ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কে বেশি জড়িয়ে পড়েন। তারা অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাও বেশি উল্লেখ করেছেন।[৪০]
প্রভাব
সম্পাদনা
বিবাহবহির্ভূত যৌন সঙ্গীর পরিচয় অনেক সময় বৈবাহিক সম্পর্কের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং বৈবাহিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ধরনের সম্পর্ক কার সঙ্গে হচ্ছে, তা বিবেচনা না করেও বৈবাহিক জীবনের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব প্রায় সমান থাকে।[৩৯] ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও এই আচরণ সাধারণভাবে বৈবাহিক বিচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।[৪১]
বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কারণে দাম্পত্য জীবনে যে ক্ষতি হয়, তা বৈবাহিক জীবনের মান, বিয়ের স্থায়িত্ব, স্ত্রী বা স্বামীর বিচ্ছেদের প্রতি মনোভাব, তৃতীয় পক্ষের পরামর্শ কিংবা পরিবারের সন্তানের উপস্থিতি—এই কোনোটির দ্বারাই প্রভাবিত হয় না। এমনকি ধর্মীয় দম্পতিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তবে যদি স্ত্রী কর্মজীবী হন, তাহলে এই প্রভাব তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে।[৩৯]
দেশে বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে, বড় কারণ পরকীয়া: বিবিএসের জরিপ
দেশে বিয়ে এবং বিবাহবিচ্ছেদের হার উভয়ই বেড়েছে। বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া। এরপরেই রয়েছে ‘দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতা’। এ ছাড়া ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা বা অস্বীকৃতি এবং পারিবারিক চাপও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২২ শীর্ষক জরিপ গত ৩১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে সাধারণ (১৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে) বিয়ের হার ২০০৬ সালের ১৯ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ২৫ দশমিক ২ হয়েছে। ১৭ বছরের ব্যবধানে এ ক্ষেত্রে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে।
বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, একই সময় বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকও বেড়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল সময়ে স্থূল বিবাহবিচ্ছেদের হার শূন্য দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে।
তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের দুই ধরনের হার বিবিএসের জরিপে পাওয়া পায়। একটি হলো স্থূল বিচ্ছেদ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বিবাহবিচ্ছেদের হার। অন্যটি হলো সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের হার, যাতে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের হিসাব করা হয়।
দেশে পরকীয়ায় জড়ানোর কারণে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ সংসার ভেঙে যাচ্ছে। পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি সংসার ভেঙেছে ঢাকা বিভাগে—২৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
জরিপ প্রতিবেদনে সংসার ভাঙার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতা। ২২ দশমিক ১ শতাংশ দম্পতির সংসার ভেঙে যাচ্ছে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতার কারণে।
তালাক ও আপসে বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে পরকীয়া ও দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নিতে অক্ষমতা ছাড়াও অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে : ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা—১০ দশমিক ৬ শতাংশ, পারিবারিক চাপ—১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং যৌনমিলনে অক্ষমতা—৪ দশমিক ২ শতাংশ।
জরিপের সময়ে পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে—২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ—২৬ শতাংশ। পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে কম বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে ময়মনসিংহ বিভাগে—১২ দশমিক ৬ শতাংশ।
আর দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি সিলেট বিভাগে—৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কারণে বিবাহবিচ্ছেদের হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কারণে বিচ্ছেদের ঘটনার ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সম্পদশালী হওয়ার ক্ষেত্রেই বিপরীতমুখী সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে।
অন্য কারণগুলোর মধ্যে ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা বা অস্বীকৃতি (১০.৬%) ও পারিবারিক চাপকে (১০.২%) সংঘটিত প্রতি পাঁচটি তালাক/দাম্পত্য বিচ্ছেদের মধ্যে একটিরও বেশির জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিচ্ছেদ হওয়া মানুষের নিবিড় সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় উন্নতি হওয়ায় আপস করে, মেনে নিয়ে সংসার করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। এ কারণেই সংসার ভাঙার হার বেড়েছে। সংসার বেশি ভাঙলেই যে সমাজে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে, এমনটি নয়।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংসার ভাঙার বিষয়টি আগেও ছিল, এখনো আছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জায়গাটি যত বেশি তৈরি হবে, আপস করে, মেনে নিয়ে সংসার করার প্রবণতাটা তত কমে যাবে। সংসার ভাঙাকে আমরা সমর্থন করি না। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে খুব বেশি মেনে বা আপস করেও তো একে অপরের সঙ্গে থাকতে পারে না।
এটা শুধু বিয়ের বিষয় তা নয়, যেকোনো সম্পর্কের মধ্যেই এটা হতে পারে। সংসার বেশি ভাঙলেই যে সমাজে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে তা নয়, ভাঙা মানে নতুন করে গড়া বা গতিশীল হওয়া। সব সময় এটা নেতিবাচক, তা নয়।’
দেশে পরকীয়া কি বেড়ে গেছে—এ প্রশ্নে ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘সম্পর্কগুলো অসম্মান ও অনাস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সমাজ, সংসার ও রাষ্ট্র হতাশার জায়গা তৈরি করলে এটা হতে পারে।’
দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে, বড় কারণ পরকীয়া, শীর্ষে ঢাকা
দেশে বিয়ে এবং বিবাহ বিচ্ছেদের হার উভয়ই বেড়েছে। বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া। এর পরেই রয়েছে ‘দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতা’। এ ছাড়া ভরণ পোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা বা অস্বীকৃতি এবং পারিবারিক চাপও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২২ শীর্ষক জরিপ গত ৩১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে সাধারণ (১৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে) বিয়ের হার ২০০৬ সালের ১৯ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ২৫ দশমিক ২ হয়েছে। ১৭ বছরের ব্যবধানে এ ক্ষেত্রে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে।
বিবিএস’র জরিপে দেখা গেছে, একই সময় বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকও বেড়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল সময়ে স্থূল বিবাহবিচ্ছেদের হার শূন্য দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে।
তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের দুই ধরনের হার বিবিএসের জরিপে পাওয়া পায়। একটি হলো স্থূল (পৎঁফব) বিচ্ছেদ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বিবাহবিচ্ছেদের হার। অন্যটি হলো সাধারণ (মবহবৎধষ) বিবাহ বিচ্ছেদের হার, যাতে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের হিসাব করা হয়।
দেশে পরকীয়ায় জড়ানোর কারণে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ সংসার ভেঙে যাচ্ছে। পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি সংসার ভেঙেছে ঢাকা বিভাগে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
জরিপ প্রতিবেদনে সংসার ভাঙার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উলেখ করা হয়েছে ‘দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতা’। ২২ দশমিক ১ শতাংশ দম্পতির সংসার ভেঙে যাচ্ছে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতার কারণে।
তালাক ও আপসে বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে পরকীয়া ও দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নিতে অক্ষমতা ছাড়াও অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: ভরণ পোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, পারিবারিক চাপ ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং যৌনমিলনে অক্ষমতা ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
জরিপের সময়ে পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ ২৬ শতাংশ। পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে কম বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে ময়মনসিংহ বিভাগে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে সিলেট বিভাগে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
মুসলমানদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণগুলো জাতীয় হারের মতোই। কিন্তু হিন্দু স¤প্রদায়ের মধ্যে এটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী চিত্র লক্ষ করা যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ হলো দাম্পত্য জীবন বজায় রাখতে অক্ষম ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। শারীরিক মানসিক নির্যাতনের কারণে বিচ্ছেদের ঘটনার ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সম্পদশালী হওয়ার ক্ষেত্রেই বিপরীতমুখী সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে।
অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতা বা অস্বীকৃতি (১০.৬ %) ও পারিবারিক চাপকে (১০.২ %) সংঘটিত প্রতি পাঁচটি তালাক/দাম্পত্য বিচ্ছেদের মধ্যে একটিরও বেশির জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পলী শহরের ক্ষেত্রে তালাক/দাম্পত্য বিচ্ছেদের কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যবধান উলেখযোগ্য; এর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে অক্ষম বা অস্বীকার করা (৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বনাম ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ), যৌনমিলনে অক্ষমতা বা অনীহা (৪ দশমিক ২ শতাংশ বনাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং পুনর্বিবাহ (৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ বনাম ৬ দশমিক ৯ শতাংশ)।
বিচ্ছেদ হওয়া মানুষের নিবিড় সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় উন্নতি হওয়ায় আপস করে, মেনে নিয়ে সংসার করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। এ কারণেই সংসার ভাঙার হার বেড়েছে। সংসার বেশি ভাঙলেই যে সমাজে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে, এমনটি নয়।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘সংসার ভাঙার বিষয়টি আগেও ছিল এখনো আছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জায়গাটি যত বেশি তৈরি হবে, আপস করে, মেনে নিয়ে সংসার করার প্রবণতাটা তত কমে যাবে। সংসার ভাঙাকে আমরা সমর্থন করি না। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, খুব বেশি মেনে বা আপস করেও তো একে অপরের সঙ্গে থাকতে পারে না। এটা শুধু বিয়ের বিষয় তা নয়, যে কোনো সম্পর্কের মধ্যেই এটা হতে পারে। সংসার বেশি ভাঙলেই যে সমাজে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে তা নয়, ভাঙা মানে নতুন করে গড়া বা গতিশীল হওয়া। সব সময় এটা নেতিবাচক, তা নয়।’
দেশে পরকীয়া কি বেড়ে গেছে এ প্রশ্নে ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘সম্পর্কগুলো অসম্মান ও অনাস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সমাজ, সংসার ও রাষ্ট্র হতাশার জায়গা তৈরি করলে এটা হতে পারে।’
সামাজিক ব্যাধি পরকীয়া: কারণ ও আইনি প্রতিকার
সাম্প্রতিককালে যেসব সামাজিক ব্যাধি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষে রয়েছে পরকীয়া। এটিকে সামাজিক ব্যাধি না বলে ব্যক্তির চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম রূপও বলা যায়। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই অহরহ শোনা যায় পরকীয়ার বলির ঘটনা। আগে যৌতুক, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং অন্যতম সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয় বেশি ছিল, এখন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নতুন নতুন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ফলে এগুলোর তীব্রতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু ইদানীং পরকীয়া সমাজে মাথাচাড়া দিয়েছে দারুণ হতাশাজনকভাবে। কীভাবে এই সামাজিক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তার উপায় খুঁজে দেখা দরকার। তবে এই ব্যাধিটি নিতান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও গোপনীয় বিষয় হওয়ায় এটাকে রোধ করা অতটা সহজ নয়। আর এই পরকীয়ার নিষ্ঠুর বলি হচ্ছে স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তানসহ পুরো পরিবার। কেননা পরকীয়ার ফলে বেড়ে চলেছে বিবাহ বিচ্ছেদ। যাতে করে শুধু ব্যক্তির নয় বরং পারিবারিক সম্পর্কগুলোও হুমকির মুখে পড়ছে।
পরকীয়া হলো বিবাহিত কোনো ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন। মানবসমাজে এটি নেতিবাচক হিসেবেই গণ্য করা হয়। যাহোক, সমাজে কেন পরকীয়া বাড়ছে সেটি আগে খতিয়ে দেখা যাক। যদিও নারী বা পুরুষ যে কেউই পরকীয়ায় জড়াতে পারেন। কিন্তু নারীরা কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে যায়, তার কিছু কারণ প্রতিফলিত হয়েছে একটি অনলাইন জরিপে। সম্প্রতি ভিক্টোরিয়া মিলান ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইট চালিয়েছে এই জরিপ। তারা প্রায় চার হাজার নারীর সামনে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরে পরকীয়ার কারণ জানতে চেয়েছিল। জরিপে পুরুষসঙ্গীর কয়েকটি আচরণের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে কীভাবে ওই নারীরা পরকীয়ায় জড়িয়েছেন
ওই ওয়েবসাইটের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ডেইলি মেইল অনলাইন জানিয়েছে- কেবলমাত্র পুরুষসঙ্গীর প্রতারণার কারণে ৭০ শতাংশ নারী জড়িয়ে পড়েছেন পরকীয়ায়। আবার দেখা যাচ্ছে, বাকিদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ স্বামীর চেয়ে অন্যের কাছে উষ্ণ ভালোবাসা পাওয়া পরকীয়ার একটি অন্যতম কারণ। ওয়েবসাইটটির জরিপে আরও দেখা গেছে- পুরুষসঙ্গীর খারাপ আচরণ, বিশ্বাসঘাতকতা, কিছু বদ-অভ্যাস, রাতে অসংলগ্ন আচরণ, ইচ্ছার মূল্য না দেওয়া, বারবার মুঠোফোনে নজরদারি, শারীরিক সংসর্গে অনীহার কারণেই মূলত নারীরা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার দিকে ধাবিত হয়েছেন। পাশ্চাত্য আধুনিক সমাজে এর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বজায় থাকলেও এটি আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরকীয়াকারী ব্যক্তির বিবাহিত সঙ্গী তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য কোর্টে আবেদন করতে পারেন।
পুরুষ কেন এবং কখন পরকীয়ায় জড়ায় তার কিছু কারণ খুঁজে দেখা যায়- পারিবারিক কলহ, একঘেয়ে সম্পর্ক, অপূর্ণ প্রত্যাশা, আকর্ষণ হারিয়ে ফেলা, পুরনো অভ্যাস, মনোদৈহিক ও সামাজিক কারণ, ডিআরডিফোর জিন, মানসিক সমস্যা, সঙ্গীর উদাসীনতা, পশ্চিমা সংস্কৃতি, শখ থেকে পরকীয়া, দূরত্ব ও শূন্যতা, স্ত্রী দূরে গেলে এবং সন্তান হওয়ার পর। সঙ্গীর উদাসীনতা ও দূরত্বের কারণেও অনেক সময় মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে জানিয়ে তিনি বলেন- অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী বাস্তবতার কারণে, কাজের কারণে হয়তো দূরে চলে যায়। তখন তাদের মধ্যে পরকীয়ার আগ্রহ বাড়ে। অনেক সময় পশ্চিমা সংস্কৃতির ধাঁচ নিজেদের মধ্যে আনতে চায়, তখন পরকীয়া বাড়ে। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, দূরত্ব ইত্যাদির জন্যও অন্যের প্রতি আগ্রহ, আসক্তির ঘটনা ঘটে।
মানসিক সমস্যার কারণেও মানুষ পরকীয়ায় জড়াতে পারে। যাদের মধ্যে বাইপোলার মুড সমস্যা রয়েছে, তাদের পরকীয়ার সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। তারা কোনোকিছুর মধ্যে স্থিরতা খুঁজে পায় না। পারিবারিক কলহের কারণে অনেক সময় পুরুষ পরকীয়ায় জড়ায়। সংসারজীবন সব সময় মধুময় হয় না। ঝগড়া থেকে শুরু করে গায়ে হাত তোলার ঘটনাও ঘটে। তাই স্ত্রীর সঙ্গে যখন সম্পর্কের অবনতি ঘটে তখন বেশির ভাগ পুরুষ অন্য জায়গায় আশ্রয় খোঁজে এবং পরকীয়ায় জড়ায়। পৃথিবীতে বেশির ভাগ মানুষই প্রেম বা বিয়ের সম্পর্ককে বেশিদিন আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন না। জীবনভর একই ছাদের নিচে থাকেন বটে, তবে সেটা সংসারের নিয়মে। সংসার নামক বন্দিজীবনে একটুখানি বৈচিত্র্যের ছোঁয়া পেতে অনেক পুরুষ আকৃষ্ট হন অন্য নারীর প্রতি। সঙ্গীর কাছ থেকে অনেককিছু প্রত্যাশা থাকে নারীরও।
এখন পরকীয়া বিষয়ে আইন-কানুনে কী আছে বা পরকীয়া অপরাধ কি না বা তার শাস্তি কী- তা অবহিত করার চেষ্টা করবো। পরকীয়ার সাজা সংক্রান্ত দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা কেন অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। রিটে ৪৯৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশনার আবেদনও রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী কোনো স্ত্রী পরকীয়া করলে যার সঙ্গে পরকীয়া করবে শুধু সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর কিছুই করার নেই। একইভাবে স্বামী পরকীয়া করলে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে বা যার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত হবে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার পাবেন না। উপরন্তু স্বামী যদি কোনো বিধবা বা অবিবাহিত নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন এবং স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে পরকীয়ায় জড়িত হয় তা আইনত বৈধ। এই আইন সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটা অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক।
এর আগে ‘পরকীয়া ফৌজদারি অপরাধ নয়, ইংরেজ শাসনকালে তৈরি এই আইনের ৪৯৭ ধারা অসাংবিধানিক’- এমনটিই রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই আইন স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। মহিলাদের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করে। স্বামী কখনই স্ত্রীর প্রভু বা মালিক হতে পারেন না। তবে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন। ব্রিটিশদের তৈরি করা ১৮৬০ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলার প্রেক্ষিতেই শীর্ষ আদালত এই রায় দিয়েছেন। রায়ের পর থেকেই সাংবাদিক, আইনবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও সাধারণ মানুষ গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন। আবেগ-উত্তাপ ও যৌক্তিক তর্ক-বিতর্ক এখনো চলছে, চায়ের দোকান থেকে টেলিভিশন টক শো ও পত্রিকার কলাম পর্যন্ত। সন্দেহ নেই আরও কিছুকাল চলবে। চলাটাই স্বাভাবিক।
বিজ্ঞ আইনজীবী পিএম সিরাজুল ইসলাম প্রামাণিক তার কলামে লিখেছেন-১৮৬০ সালে তৈরি ওই আইনের ৪৯৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে এবং ওই মহিলার স্বামীর অনুমতি না থাকলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে। বিবাহিত নারীকে ‘অপরাধের শিকার’ বিবেচনা করে আইনে সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষকেই দোষী হিসেবে গণ্য করার বিধান ছিল। এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন জনৈক যোশেফ শাইন। তবে শীর্ষ আদালত বলেছেন, পরকীয়া সম্পর্কের কারণে জীবনসঙ্গী যদি আত্মহত্যা করেন এবং আদালতে যদি তার প্রমাণ দাখিল করা যায় তবেই এটি অপরাধে প্ররোচনা হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে সরকারি কৌঁসুলিরা ‘বিয়ের পবিত্রতা’ রক্ষার স্বার্থে আইনটি বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন।
ভারতের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ১৯৭৯ সালের হুদুদ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী পরকীয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে। তবে এ ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে মহিলাদের শাস্তির পরিমাণ বেশি রাখা হয়েছে। ফিলিপিন্সে পরকীয়া এখনো অপরাধ। স্ত্রী আর তার সঙ্গীর ৬ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে, যদি তার স্বামী প্রমাণ করতে পারেন যে, ওই পার্টনারের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রয়েছে তার স্ত্রীর। অন্যদিকে আবার স্বামীর অন্যকোনো মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক যদি স্ত্রী প্রমাণ করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে স্বামীর ১ দিন থেকে সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে ৪ বছর। মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় রক্ষণশীল দেশ সৌদি আরবে পরকীয়াকে বিরাট অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। স্বামী বা স্ত্রী যে কারও অভিযোগ প্রমাণিত হলে জরিমানা, নির্বিচার আটক, জেল, মারধর এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের শাস্তির বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো লোকের স্ত্রী জানা সত্ত্বেও বা সেটা বিশ্বাস করার অনুরূপ কারণ রয়েছে এমন কোনো নারীর সঙ্গে স্বামীর সম্মতি ছাড়া যৌন সংগম করেন এবং অনুরূপ যৌনসংগম যদি ধর্ষণের অপরাধ না হয়, তাহলে সে ব্যক্তি ব্যভিচারের দায়ে দায়ী হবেন, যার শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে নির্যাতিতাকে অন্য লোকের স্ত্রী হতে হবে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, ব্যভিচারের ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকের কোনো শাস্তির বিধান আইনে নেই। ওই স্ত্রীলোকটি যে দুষ্কর্মের সহায়তাকারিণী বা ব্যভিচারের অপরাধে দোষী অথচ তিনি কোনো সাজা পাবে না। এ বিষয়ে মহামান্য লাহোর হাইকোর্ট একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা পাকিস্তান লিগ্যাল ডিসিশন, ১৯৭৪ সন্নিবেশিত রয়েছে। মহিলা আসামি হতে পারে না। তবে ওই পুরুষটির সাজা দিতে হলে অভিযোগকারীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, ওই মহিলার সঙ্গে যৌন সংগম করার সময় আসামি জানত অথবা জানার যুক্তিসংগত কারণ ছিল যে, যৌন সংগমকারী মহিলা অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রী।
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য, অভিযুক্ত প্রেমিক পুরুষ আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণপূর্বক জামিনের আবেদন জানান এবং বিচারক মহোদয় তাকে জামিন দেন। এ মামলায় আসামিকে সাজা দিতে হলে বাদীকে পাঁচটি বিষয় অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে। প্রথমত আসামি কোনো নারীর সঙ্গে যৌন সংগম করেছিল, দ্বিতীয়ত, ওই নারী বিবাহিত ছিল, তৃতীয়ত, আসামি বিবাহের বিষয়টি জানত এবং তা বিশ্বাস করার কারণও ছিল, চতুর্থত, ওই যৌন সংগম নারীর স্বামীর সম্মতি বা সমর্থন ব্যতিরেকে হয়েছিল, পঞ্চমত, ওই যৌন সংগম নারী ধর্ষণের সামিল ছিল না। আবার সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারামতে কোনো ঘটনা প্রমাণের দায়িত্ব বাদীর। গোপাল চন্দ্র বনাম লাসমত দাসী মামলা যা ৩৪ ডিএলআর, ১৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে যে, বিচার্য বিষয় সম্পর্কে যে পক্ষ কোনো ঘটনার অস্তিত্বের দাবি করে সে পক্ষই তা প্রমাণ করবে।
ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে ইসলাম ধর্মে পরকীয়া বা ব্যভিচারীর শাস্তি কঠিন থেকে কঠিনতর। ইসলামি রাষ্ট্রসমূহে এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা হলো পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান। মনোচিকিৎসায় এ কথা স্বীকৃত যে- বাবা-মার পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষণ্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়। এছাড়া পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিতে পরকীয়া প্রভাব রাখে। পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ও পরকীয়া রোধ করতে ধর্মের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বলে মনে করি। নৈতিক শিক্ষা জোরালো করার মাধ্যমে নীতিবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি হলে
সমাজে পরকীয়া কমতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর কোন একজন পরকীয়ায় লিপ্ত হলে অপর জনের করণীয় কি?
প্রশ্নঃ ২৩৫৬৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, কোন ইমাম সাহেবের স্ত্রী পরকিয়া প্রেম করে ধরা পরলে,তার বিধান কি হবে?
এবং ঐ ইমাম সাহেবের পিছনে ইকতেদা করার বিধান কি হবে?
দলিল ভিত্তিক আলোচনা এবং তারাতাড়ি হলে খুব ভালো হয়।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
পরকীয়া যেই করুন নি:সন্দেহে দাম্পত্য জীবন, সন্তান-সন্ততির ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক সুস্থতা ও স্থিতিশীলতার বিরাট হুমকি। এটি নিজের হালাল স্বামী /স্ত্রীর সাথে আমানতের খেয়ানত, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার শামিল এবং আল্লাহ তাআলা ক্রোধের কারণ।
কোন স্বামী কিংবা স্ত্রী এই ফিতনায় জড়িয়ে গেলে অপরের করণীয় হল:
১. কুরআন-হাদিসের আলোকে তাকে পরকীয়া, অবৈধ প্রেমপ্রীতি ও যিনাব্যাভিচারের ভয়াবহতা, ইসলামী আইন অনুযায়ী দুনিয়াতে এর কঠিন শাস্তি, আখিরাতের আযাব, আল্লাহর অসন্তুষ্টি ইত্যাদি বিষয়গুলো বুঝানো। এ বিষয়ে কুরআন-হাদীসে পর্যাপ্ত ব্ক্তব্য রয়েছে। তাই এ সংক্রান্ত যে কোন ভালো ইসলামী বই বা ইসলামী আলোচনার ভিডিও কাজে লাগানো যেতে পারে।
২. পরকীয় লিপ্ত ব্যক্তির হেদায়েতের জন্য দয়াময় আল্লাহর নিকট দুআ করা।
৩. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অপছন্দীয় কোন আচার-আচরণ থাকলে তা পরিবর্তন করা এবং যথাসাধ্য তাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা। দাম্পত্য জীবনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক স্বামী-স্ত্রী এ বিষয়ে অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে সময়ের ব্যবধানে তারা দাম্পত্য জীবনের উষ্ণতা ও আবেদন হারায়। ফলে দুজনের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে ঈমানী দূর্বলতা, কুপ্রবৃত্তির তাড়না এবং শয়তানের কুমন্ত্রণায় তারা ভিন্ন পথ খুঁজা শুরু করে।
৪. স্বামী পরকীয়ায় লিপ্ত হলে প্রয়োজনে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে আরেকটি বিয়ে করার সম্মতি দেয়া।
উল্লেখ্য যে, আল্লাহর দেয়া এ বিধানটির ব্যাপারে অনেক স্ত্রীর কঠোর ও ভয়াবহ আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক দুর্বল ইমানদার স্বামী অবৈধ পথের দিকে পা বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীও এই অন্যায়ের জন্য দায়ী হিসেবে বিবেচিত হবে।
৫. সম্ভব হলে সাক্ষ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে পারিবারিক বা সামাজিক সালিশ অথবা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬. এগুলোর মাধ্যমে কোন উপকার না হলে হয় স্ত্রীক ধৈর্য ধারণ করে পরকীয়ায় লিপ্ত পক্ষকে এ পথ থেকে ফিরানোর যাবতীয় প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় সবশেষে তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ করে পৃথক হয়ে যেতে হবে।
এই সবগুলো কাজই তারা নিজেরা কিংবা পারিবারিকভাবে সমাধান করবে। অন্যদের এখানে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই । তবে হ্যাঁ! তারা বিভিন্ন উত্তম এবং কল্যাণকর পরামর্শ দিতে পারেন।
আর স্বামী-স্ত্রী একে অণ্যের হকের ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন থকার পরও যদি অপরজন পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তাহলে তার দায়ভার তার নিজেরই। অন্যের ওপর দার দায় চাপানো যাবে না। কাজেই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে যদি ওই ইমাম সাহেবের কোনো অণ্যায় না থাকে তাহলে তার স্ত্রীর অপরাধের কারণে তিনি দোষী সাব্যস্ত হবে না। এবং এর কারণে তার ইমামতিতে নামাজ আদায়েও কোনো সমস্যা হবে না। বরং অন্যদের উচিত হবে এই সঙ্কটাপন্ন সময়ে ইমাম সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন।
والله اعلم بالصواب
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
১৪২৮৮
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
ভাইয়া আমি ১৫ বছর বয়সী এক পথভ্রষ্ট ছেলে, আগে আল্লাহর আনুগত্য অনেক ছিল, জানতাম না বিয়ের আগের সম্পর্ক হারাম ভাবতাম যে শুধু ধরা ছোঁয়াই বোধ হয় গুনাহ, জেনেরাল ছাত্র বলে, সে রাগ হতো, আল্লাহ কে দোষারূপ করতাম, নামাজ ছাড়লাম, পরে বুঝতে পেরেও যে এটি হারাম, তাকে ছাড়তে পারিনি, নেশা করার পর যে নেশা খারাপ জানলাম ছাড়তে কষ্ট তো নিশ্চয়ই তবে চেষ্টা করি, আল্লাহর পথে একবার ফিরি, আবার ঘুরে যাই, আবার ফিরি আবার ঘুরে যাই, এভাবে চলতে থাকে, চোখের জেনাহে লিপ্ত হই, এই ছোট্ট বয়সে কত ধরনের ভয়ানক পাপ করি, আমি বলতেও ভয় করি, কাউকে শেয়ার ও করা যায়না, যদি আল্লাহ আরও ক্রুদ্ধ হন, আপনাকে বলাও যাবেনা আরও নাজানি কত পাপ করি, ধর্মে ফিরি আবার হারাই আবার ফিরি আবার হারাই, ভাই প্রকাশ্যে অগণিত পাপ করি, আমার অজ্ঞতার কারণে অন্যের কষ্টের কারণ হই, কত জুম্মা মিস করি, চুরি করি মিথ্যে বলি পাপে প্রেরণা দেই ঠকাই। তবে শেষ পর্যন্ত, হারাম সম্পর্ক শেষ করি, গানবাজনা ছাড়ারও চেষ্টাও করতেছি, সকল অসৎ সঙ্গ ত্যাগেরও চেষ্টা করছি তবে দুনিয়ার জীবন যেন আমায় ধাওয়া করছে এমন আর আগের মত করতে পারছিনা বোধ হয় মহান রব মহর মেরে দিয়েছেন অন্তরে, নামাজ পড়তেছি আর পড়তেছি, কিন্তু কেনো যেনো ইমান টা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, দুনিয়ার মহ আমায় পাগল করেছে কিছুই বুঝতেছিনা নাও এদিক নাও সেদিক। খুবই দিশেহারা আমি হুজুর, আমার মনে হয় আবার পাপ যখন আমার সামনে আসবে আমি নিজেকে হয়তো, ধরে রাখতে পারবনা, কিছুই ভাল্লাগেনা হুজুর, রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও লজ্জাজনক হয়ে গিয়েছে, আখিরি জবানা, আমি আমার জন্যে দুআ করেন হুজুর, বিশ্বাস, কোথায়? কিভাবে। রব কি উনার মহর আমার অন্তর থেকে আর তুলে নিবেন নাহ? কখনোই না? রবের কাছে জান্নাত নহে ঈমান ভিক্ষে চাই, তবে হয়তো কিছু বিষয় মুছে ফেলা যায়না। আমার জন্যে দুআ কইরেন হুজুর আর দয়া করে বলবেন আমি কিকরে আবার নিজের অন্তঃস্থ নফস কে হত্যা করবো কি করে আবার ঈমান সম্পূর্ণ করবো, কি করে অবিশ্বাসী মনকে সান্তনা দিবো? অনেক দিশেহারা হয়ে আপনাদের শরণাপন্ন হলাম, প্রশ্ন বড় আশা করি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। জাজাকাল্লাহ খাইরান
২৪. সূরা নূর পারা ১৮, আয়াত ৬৪, রুকু ৯ (মাদানী)
Play Surah
بِسْمِ اللَّـهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ
দয়াময় মেহেরবান আল্লাহর নামে
আমি এ সূরা নাজিল করেছি। এর মধ্যে রয়েছে অবশ্য পালনীয় বিধান, রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা, যাতে তোমরা সতর্ক হও এবং উপদেশ অনুসরণ করো।
سُورَةٌ أَنزَلْنَاهَا وَفَرَضْنَاهَا وَأَنزَلْنَا فِيهَا آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لَّعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴿١﴾
২. প্রত্যেক ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে (ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে) একশত বেত মারবে। আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয়ে থাকলে এ বিধান কার্যকর করতে গিয়ে আবেগ বা দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে। আর ওদের শাস্তি দেয়ার সময় যেন বিশ্বাসীদের একটি দল উপস্থিত থাকে। ৩. ব্যভিচারী শুধু ব্যভিচারিণী বা শরিককারী নারীকে বিয়ে করবে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী বা শরিককারী পুরুষ বিয়ে করবে। বিশ্বাসীদের জন্যে এদের বিয়ে করা হারাম।
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ ۖ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّـهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿٢﴾ الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ ﴿٣﴾
৪. কোনো পূতচরিত্রা নারীর বিরুদ্ধে কেউ (ব্যভিচারের) অপবাদ দিয়ে যদি চার জন সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে অপবাদ রটনাকারীকে শাস্তি হিসেবে ৮০ বেত মারবে। আর কোনোদিন তার সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। এরা সত্যত্যাগী। ৫. তবে এরপর এরা যদি তওবা করে নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তবে আল্লাহ তো অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿٤﴾ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّـهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿٥﴾
৬-৭. যদি কেউ নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দেয় এবং তার পক্ষে যদি কোনো সাক্ষী না থাকে, তাহলে সে আল্লাহর নামে চার বার শপথ করে বলবে যে, সে (এ বিষয়ে) সত্য বলছে। আর পঞ্চম বার শপথ করে বলবে যে, তার অভিযোগ মিথ্যা হলে তার ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে। ৮-৯. আর এর বিপক্ষে স্ত্রী যদি চার বার আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, তার স্বামী মিথ্যা বলছে এবং পঞ্চম বার শপথ করে বলে যে, তার স্বামী সত্য বলে থাকলে তার নিজের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে, তাহলে স্ত্রীকে শাস্তি দেয়া যাবে না।
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُن لَّهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍ بِاللَّـهِ ۙ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ ﴿٦﴾ وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللَّـهِ عَلَيْهِ إِن كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ ﴿٧﴾ وَيَدْرَأُ عَنْهَا الْعَذَابَ أَن تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ بِاللَّـهِ ۙ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ ﴿٨﴾ وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللَّـهِ عَلَيْهَا إِن كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ ﴿٩﴾
১০. হে মানুষ! তোমাদের ওপর আল্লাহর করুণা ও রহমত না থাকলে তোমরা কেউই অব্যাহতি পেতে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, প্রজ্ঞাময়।
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّـهَ تَوَّابٌ حَكِيمٌ ﴿١٠﴾
১১. যারা চরিত্রহীনতার মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তো তোমাদেরই একটি দল। (কিন্তু এই অপবাদে যাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে) তারা যেন নিজেদের জন্যে বিষয়টিকে ক্ষতিকর মনে না করে। বরং এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। (অপবাদ রটনাকারী) প্রত্যেককেই এ পাপের জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। এদের মধ্যে যে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্যে অপেক্ষা করছে কঠিন আজাব।
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ ۚ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم ۖ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ ۚ وَالَّذِي تَوَلَّىٰ كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿١١﴾
১২. (আফসোস!) এ অপবাদ শোনার পর বিশ্বাসী নরনারীরা কেন নিজেদের ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করে নি? কেন তারা বলতে পারল না যে, ‘এ-তো নিছক মিথ্যাচার!’ ১৩. কেন তারা এ ঘটনার চার জন সাক্ষী হাজির করে নি? সাক্ষী হাজির না করার কারণে আল্লাহর বিধানে তারা মিথ্যাবাদী।
لَّوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَـٰذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ ﴿١٢﴾ لَّوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ ۚ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَـٰئِكَ عِندَ اللَّـهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ ﴿١٣﴾
১৪-১৫. তোমাদের ওপর আল্লাহর করুণা ও দয়া না থাকলে এ পাপের জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন আজাব তোমাদের গ্রাস করত। তোমরা কানাঘুষা করে মুখে মুখে এসব কথা বলে বেড়াচ্ছিলে, যে-বিষয়ে তোমরা কিছুই জানো না। তোমরা বিষয়টিকে খুব সাধারণভাবে নিয়েছিলে কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে এ ছিল গুরুতর অন্যায়। ১৬. (আফসোস!) কথাগুলো শোনামাত্র তোমরা কেন বললে না, ‘এ বিষয়ে কানাঘুষা করা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র মহান। এ-তো মিথ্যা অপবাদ!’
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿١٤﴾ إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُم مَّا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِندَ اللَّـهِ عَظِيمٌ ﴿١٥﴾ وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُم مَّا يَكُونُ لَنَا أَن نَّتَكَلَّمَ بِهَـٰذَا سُبْحَانَكَ هَـٰذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ ﴿١٦﴾
১৭. আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি বিশ্বাসী হও, তবে ভবিষ্যতে কখনো এ ধরনের পাপ করবে না। ১৮. আল্লাহ তাঁর নির্দেশনা তোমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে বলছেন (যাতে করে তোমরা তা সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারো)। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
يَعِظُكُمُ اللَّـهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴿١٧﴾ وَيُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمُ الْآيَاتِ ۚ وَاللَّـهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴿١٨﴾
১৯. যারা বিশ্বাসীদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়াতে চায়, তাদের জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি। আসল সত্য আল্লাহ জানেন, যা তোমরা জানো না। ২০. তোমাদের ওপর আল্লাহর করুণা ও রহমত না থাকলে তোমরা কেউই রেহাই পেতে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরমদয়ালু, বড়ই মেহেরবান।
[হিজরি ৫ সালে নবীজী (স) মুসতালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান শেষে ফেরার পথে হযরত আয়েশা (রা) ঘটনাচক্রে একা পেছনে পড়ে যান। কয়েক ঘণ্টা পর এক সাহাবী তাকে দেখতে পেয়ে শিবিরে নিয়ে আসেন। তখন কেউ কেউ গুজব রটনা করে। ১১-২০ আয়াতে আল্লাহ হযরত আয়েশার (রা) বিরুদ্ধে আনীত অপবাদ-সম্পর্কিত বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে সকল কালে, সকল সমাজ-পরিবেশে এ ধরনের ক্ষেত্রে বিশ্বাসীদের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন।]
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۚ وَاللَّـهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ﴿١٩﴾ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّـهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿٢٠﴾
২১. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। শয়তান তোমাকে সবসময়ই অশ্লীলতা, অন্যায় ও অনৈতিক কাজে প্ররোচিত ও প্রলুব্ধ করবে। আল্লাহর করুণা ও রহমত না থাকলে তোমাদের কেউই কখনো শুদ্ধচিত্ত হতে পারতে না। আল্লাহ যাকে চান, তাকে শুদ্ধ করেন। আল্লাহ (বিশ্বাসীর) সব (আকুতি) শোনেন, (শয়তানের) সব (কৌশল) জানেন।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۚ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَىٰ مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَـٰكِنَّ اللَّـهَ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّـهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿٢١﴾
২২. তোমাদের মধ্যে যারা ধনসম্পত্তি ও প্রাচুর্যের অধিকারী, (তোমাদের বদনাম করা হলেও) তোমরা কখনো আত্মীয়স্বজন, অভাবী ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকার শপথ করবে না। ওদের ক্ষমা করবে, দোষত্রুটিকে উপেক্ষা করবে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের দোষত্রুটি ক্ষমা করুন? নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّـهِ ۖ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّـهُ لَكُمْ ۗ وَاللَّـهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿٢٢﴾
২৩. যারা সরল পূতপবিত্র বিশ্বাসী নারী সম্পর্কে ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ রটনা করে (এবং যদি সেজন্যে অনুতপ্ত না হয় তবে), তারা দুনিয়া ও আখেরাতে ধিক্কৃত হবে। তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর শাস্তি। ২৪-২৫. মহাবিচার দিবসে তাদের জিহ্বা, হাত ও পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। সেদিন আল্লাহ তাদের সমুচিত শাস্তি দেবেন। সেদিন তারা বুঝবে, আল্লাহই চূড়ান্ত সত্য এবং সকল সত্যের নিরপেক্ষ প্রকাশক।
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿٢٣﴾ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿٢٤﴾ يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّـهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّـهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ ﴿٢٥﴾
২৬. চরিত্রহীনা নারী চরিত্রহীন পুরুষের যোগ্য আর চরিত্রহীন পুরুষ চরিত্রহীনা নারীর যোগ্য। চরিত্রবতী নারী চরিত্রবান পুরুষের যোগ্য আর চরিত্রবান পুরুষ চরিত্রবতী নারীর যোগ্য। কোনো মিথ্যা অপবাদই চরিত্রবানদের কলঙ্কিত করতে পারে না। এদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবনোপকরণ।
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ ۚ أُولَـٰئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ۖ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ ﴿٢٦﴾
২৭. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যের বাড়িতে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ কোরো না। অন্যের বাড়িতে প্রবেশ করার আগে তাদের সালাম জানাও ও অনুমতি নাও। এ নিয়ম তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। এ ব্যাপারে তোমরা সচেতন থাকবে। ২৮. যদি তোমরা বাড়িতে কাউকে (কোনো পুরুষকে) না পাও, তবে তোমাদের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত ঘরে ঢুকবে না। যদি (ঘরের ভেতর থেকে) তোমাদের বলা হয়, ‘ফিরে যাও’, তাহলে ফিরে যাবে। নীতি হিসেবে এটাই উত্তম। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা ভালোই জানেন।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴿٢٧﴾ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّىٰ يُؤْذَنَ لَكُمْ ۖ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا ۖ هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ ۚ وَاللَّـهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ ﴿٢٨﴾
২৯. বাসগৃহ ছাড়া অন্যান্য ঘরে, যেখানে তোমাদের কোনো কাজ বা প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে, সেখানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশে কোনো দোষ নেই। কিন্তু সবসময় মনে রেখো, তোমরা প্রকাশ্যে যা করো আর যা লুকিয়ে করতে চাও, আল্লাহ তা সবই জানেন।
لَّيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ لَّكُمْ ۚ وَاللَّـهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ ﴿٢٩﴾
৩০. (হে নবী!) বিশ্বাসী পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে শালীন রাখে, লজ্জাস্থান ঢেকে চলে এবং যৌনাকাঙ্ক্ষাকে সংযত রাখে। এটি তাদের শুদ্ধাচারী করে তুলবে। তারা যা করে, আল্লাহ সে-সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّـهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴿٣٠﴾
৩১. (হে নবী!) বিশ্বাসী নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে শালীন রাখে, লজ্জাস্থানসমূহ ঢেকে চলে এবং যৌনাকাঙ্ক্ষাকে সংযত রাখে। সাধারণভাবেই যা প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য ও মাধুর্য যেন জনসমক্ষে প্রকাশ না করে। তাদের ঘাড় ও বুক যেন মাথার ওড়না দ্বারা ঢাকা থাকে। স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, আত্মীয়া, দাসী, যৌনকামনা রহিত পুরুষ কর্মচারী, নারী-অঙ্গ সম্পর্কে অসচেতন শিশু ছাড়া অন্য কারো সামনে যেন তাদের সৌন্দর্য-মাধুর্য প্রকাশিত না হয়, সে ব্যাপারে তাদের সচেতন থাকতে হবে। হাঁটার সময় তারা যেন এমনভাবে পা না নাড়ায়, যা তাদের গোপন সৌন্দর্যের দিকে অন্যের মনোযোগকে আকৃষ্ট করে। হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সবসময় সকলে মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ ۚ وَتُوبُوا إِلَى اللَّـهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿٣١﴾
৩২. তোমাদের মধ্যে যারা একা আছ, তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। তোমাদের দাসদাসীদের মধ্যে যারা বিবাহের যোগ্য, তাদেরও বিয়ের ব্যবস্থা করো। (যাদের বিয়ে করতে চাচ্ছ) তারা গরিব হলেও (তা যেন তোমাদের পিছিয়ে না দেয়)। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ-সম্পদ থেকেই তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّـهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَاللَّـهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ﴿٣٢﴾
৩৩. যাদের বিয়ের সক্ষমতা নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে সক্ষম না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। তোমাদের বৈধ অধিকারভুক্ত দাসদাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্যে লিখিত চুক্তি করতে চাইলে তাদের সাথে চুক্তি করো, যদি তাদের মধ্যে ভালো কিছু দেখতে পাও। আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা থেকে (তাদের অংশ) তাদেরকে দাও। আর তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীরা সচ্চরিত্র থেকে বিয়ে করতে চাইলে, ক্ষণিকের লালসা চরিতার্থ করার জন্যে তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে প্রলুব্ধ বা বাধ্য কোরো না। এদের মধ্যে কেউ যদি অসহায়ত্বের কারণে (ব্যভিচারিণী হতে) বাধ্য হয়, তবে আল্লাহ তো অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।
وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ اللَّـهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا ۖ وَآتُوهُم مِّن مَّالِ اللَّـهِ الَّذِي آتَاكُمْ ۚ وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِّتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَمَن يُكْرِههُّنَّ فَإِنَّ اللَّـهَ مِن بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿٣٣﴾
৩৪. আমি সুস্পষ্টভাবে তোমাদের কাছে এই নির্দেশনা নাজিল করেছি, তোমাদের পূর্বপুরুষদের উদাহরণ দিয়েছি, যাতে আল্লাহ-সচেতনরা এই উপদেশাবলি সহজে অনুসরণ করতে পারে।
وَلَقَدْ أَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ آيَاتٍ مُّبَيِّنَاتٍ وَمَثَلًا مِّنَ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُمْ وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ ﴿٣٤﴾
৩৫. আল্লাহ মহাকাশ ও পৃথিবীর (সকলের পথপ্রদর্শক) জ্যোতি। তাঁর এই জ্যোতির উপমা হচ্ছে : তাকের ওপর একটি প্রদীপ। প্রদীপটি কাচের আচ্ছাদনের মধ্যে। কাচের আচ্ছাদনটি নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল। প্রদীপটি জ্বলে পবিত্র জয়তুন গাছের তেলে। এ জয়তুন গাছ প্রাচ্যের নয়, পাশ্চাত্যেরও নয়। আগুনের স্পর্শ ছাড়াই তেল আপনা-আপনি প্রজ্জ্বলিত থেকে আলো বিকিরণ করছে। জ্যোতির ওপর জ্যোতি। (যে সৎপথ চায়) আল্লাহ তাকে তাঁর জ্যোতির পথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ এভাবেই উপমা দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে থাকেন। সকল বিষয়ে আল্লাহ সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
اللَّـهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّـهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّـهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّـهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴿٣٥﴾
৩৬-৩৮. তিনি যে ঘরগুলোর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন এবং যেখানে তাঁর নাম স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে (আল্লাহর জ্যোতিতে) আলোকিত মানুষেরা সকাল-সন্ধ্যা তাঁর মহিমা ঘোষণা করে। ব্যবসাবাণিজ্য ও বৈষয়িক লেনদেনও কখনো তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে বিরত রাখতে পারে না। তারা শঙ্কিত থাকে সেই মহাবিচার দিবস নিয়ে, যেদিন বহু হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ ও দৃষ্টি বিস্ফারিত হয়ে যাবে। (তারা প্রত্যাশা করে) সেদিন আল্লাহ তাদের কাজের উত্তম পুরস্কার দেবেন ও অতিরিক্ত অনুগ্রহে ধন্য করবেন। আল্লাহ যাকে চান, বেহিসাব দান করেন।
فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّـهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ ﴿٣٦﴾ رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّـهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ۙ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ ﴿٣٧﴾ لِيَجْزِيَهُمُ اللَّـهُ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ ۗ وَاللَّـهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ ﴿٣٨﴾
৩৯. কিন্তু যারা ক্রমাগত সত্য অস্বীকার করে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকাসদৃশ। পিপাসার্ত মানুষ একে পানি মনে করে এগিয়ে যায় কিন্তু যখন সেখানে পৌঁছায় তখন দেখে বিশাল শূন্যতা। একইভাবে (মহাবিচার দিবসে) যখন সে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে, তখন দেখবে তার সকল কর্ম নিষ্ফল হয়েছে। তিনি দ্রুত হিসাব চুকিয়ে দেবেন। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অতিদ্রুত ও সূক্ষ্ম। ৪০. অথবা তাদের কর্মের উপমা হচ্ছে : সমুদ্রতলের গভীর অন্ধকার, তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ যে অন্ধকারকে করেছে আরো গভীর। তার ওপর আচ্ছন্ন করে রয়েছে কালো মেঘ। স্তরে স্তরে শুধু জমাটবাঁধা অন্ধকার। কেউ হাত বাড়ালেও তা সে মোটেই দেখতে পায় না। (ক্রমাগত অবাধ্যতার কারণে) আল্লাহ যাকে আলো থেকে বঞ্চিত করেন, তার জন্যে কোনো আলো নেই।
وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتَّىٰ إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّـهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ ۗ وَاللَّـهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ ﴿٣٩﴾ أَوْ كَظُلُمَاتٍ فِي بَحْرٍ لُّجِّيٍّ يَغْشَاهُ مَوْجٌ مِّن فَوْقِهِ مَوْجٌ مِّن فَوْقِهِ سَحَابٌ ۚ ظُلُمَاتٌ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ إِذَا أَخْرَجَ يَدَهُ لَمْ يَكَدْ يَرَاهَا ۗ وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّـهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ ﴿٤٠﴾
৪১. তুমি কি সচেতন নও যে, মহাকাশ ও পৃথিবীর সকল সৃষ্টি, এমনকি উড়ন্ত পাখিরাও আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তাঁর ইবাদত ও মহিমা ঘোষণার নিয়ম। আর ওরা যা করে, সে-বিষয়ে আল্লাহ ভালো করেই জানেন। ৪২. কারণ মহাবিশ্বের সবকিছুর সার্বভৌমত্ব শুধু আল্লাহর। তাঁর কাছেই সবাইকে ফিরে যেতে হবে।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّـهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صَافَّاتٍ ۖ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ ۗ وَاللَّـهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُونَ ﴿٤١﴾ وَلِلَّـهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِلَى اللَّـهِ الْمَصِيرُ ﴿٤٢﴾
৪৩. তুমি কি লক্ষ করো না, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন, তারপর তা একত্র করে পুঞ্জীভূত করেন? তারপর সেখান থেকে বৃষ্টি নামে, যা তুমি দেখ। তিনিই আকাশে পর্বতসম পুঞ্জীভূত মেঘকে শিলাস্তূপে রূপান্তরিত করে শিলাবৃষ্টি ঘটান। যার ওপর ইচ্ছা শিলাবর্ষণ করেন, যাকে ইচ্ছা রক্ষা করেন। আর (কখনো কখনো) বিদ্যুতের চমক চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ৪৪. আল্লাহই রাত ও দিনের আবর্তন ঘটান। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্যে এতে রয়েছে উজ্জ্বল নিদর্শন।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّـهَ يُزْجِي سَحَابًا ثُمَّ يُؤَلِّفُ بَيْنَهُ ثُمَّ يَجْعَلُهُ رُكَامًا فَتَرَى الْوَدْقَ يَخْرُجُ مِنْ خِلَالِهِ وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مِن جِبَالٍ فِيهَا مِن بَرَدٍ فَيُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ وَيَصْرِفُهُ عَن مَّن يَشَاءُ ۖ يَكَادُ سَنَا بَرْقِهِ يَذْهَبُ بِالْأَبْصَارِ ﴿٤٣﴾ يُقَلِّبُ اللَّـهُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِي الْأَبْصَارِ ﴿٤٤﴾
৪৫. আল্লাহ পানি থেকে সকল প্রাণের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। ওদের কিছু বুকে ভর দিয়ে চলে, কিছু দুই পায়ে ও কিছু চার পায়ে। তিনি যা চান, তা-ই সৃষ্টি করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। ৪৬. সুস্পষ্টভাবে সত্যের বর্ণনা দিয়ে আমি আমার বাণীসমূহ নাজিল করেছি। আল্লাহ সাফল্যের সরলপথ তাকেই দেখান, যে পথ খোঁজে।
وَاللَّـهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِّن مَّاءٍ ۖ فَمِنْهُم مَّن يَمْشِي عَلَىٰ بَطْنِهِ وَمِنْهُم مَّن يَمْشِي عَلَىٰ رِجْلَيْنِ وَمِنْهُم مَّن يَمْشِي عَلَىٰ أَرْبَعٍ ۚ يَخْلُقُ اللَّـهُ مَا يَشَاءُ ۚ إِنَّ اللَّـهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴿٤٥﴾ لَّقَدْ أَنزَلْنَا آيَاتٍ مُّبَيِّنَاتٍ ۚ وَاللَّـهُ يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ﴿٤٦﴾
৪৭. অনেকেই বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও রসুলে বিশ্বাস করি এবং আনুগত্য করি।’ কিন্তু একথা বলার পরে অনেকেই আবার মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। ওরা আসলেই বিশ্বাসী নয়। ৪৮-৪৯. ওদের (বিবদমান বিষয়ে) ফয়সালা করে দেয়ার জন্যে যখন ওদেরকে আল্লাহ ও রসুলের দিকে ডাকা হয়, তখন অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। আবার রায় ওদের পছন্দমতো হবে মনে করলে তা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে। ৫০. ওদের অন্তর কি (মুনাফেকির) ব্যাধিতে আক্রান্ত, না ওরা ওহী সম্পর্কে সন্দিগ্ধ? না ওরা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রসুল ওদের ওপর অবিচার করবেন? আসলে ওরা জালেম!
وَيَقُولُونَ آمَنَّا بِاللَّـهِ وَبِالرَّسُولِ وَأَطَعْنَا ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٌ مِّنْهُم مِّن بَعْدِ ذَٰلِكَ ۚ وَمَا أُولَـٰئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ ﴿٤٧﴾ وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّـهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ ﴿٤٨﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ ﴿٤٩﴾ أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّـهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ ۚ بَلْ أُولَـٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿٥٠﴾
৫১. অথচ বিশ্বাসীদেরকে যখন তাদের ভেতরের কোনো বিষয় ফয়সালা করে দেয়ার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের দিকে ডাকা হয়, তখন তারা শুধু বলে, ‘আমরা শুনলাম ও মানলাম।’ এরাই সফল। ৫২. যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহ-সচেতন থাকে এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকে, তারাই সফল।
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّـهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿٥١﴾ وَمَن يُطِعِ اللَّـهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّـهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ ﴿٥٢﴾
৫৩. (মুনাফেকরা) আল্লাহর নামে শক্ত শপথ করে বলে, ‘(হে নবী!) আপনি হুকুম করলেই সবকিছু ছেড়ে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ব।’ (হে নবী!) ওদের বলো, শপথ করতে হবে না! শুধু আল্লাহর বিধানের যুক্তিসঙ্গত অনুসরণই তোমাদের কাছ থেকে কাম্য! তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ ওয়াকিবহাল।
وَأَقْسَمُوا بِاللَّـهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ أَمَرْتَهُمْ لَيَخْرُجُنَّ ۖ قُل لَّا تُقْسِمُوا ۖ طَاعَةٌ مَّعْرُوفَةٌ ۚ إِنَّ اللَّـهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴿٥٣﴾
৫৪. (হে নবী!) বলো, ‘আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রসুলের আনুগত্য করো। কিন্তু যদি এরপর তোমরা (রসুল থেকে) মুখ ফিরিয়ে নাও, (তবে মনে রেখো) তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্যে সে দায়ী। আর তোমাদের দায়িত্ব পালনের দায় তোমাদের। তোমরা আনুগত্য করলে তোমরা সঠিক পথ পাবে। আর রসুলের দায়িত্ব তো শুধু আল্লাহর বিধান সুস্পষ্টভাবে তোমাদের কাছে পৌঁছে দেয়া।’
قُلْ أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ ۖ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُم مَّا حُمِّلْتُمْ ۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا ۚ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴿٥٤﴾
৫৫. তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ববান করবেন, যেমন তিনি কর্তৃত্ববান করেছিলেন পূর্বসূরিদের। আল্লাহ তাঁর মনোনীত ধর্মকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেবেন। তাদের বর্তমান অনিশ্চয়তা দূর করে নিরাপত্তা ও শান্তি-সমৃদ্ধি প্রদান করবেন। বিশ্বাসীরা শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। এরপর যদি কেউ বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয় তবে সে নিঃসন্দেহে সত্যত্যাগী।
وَعَدَ اللَّـهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿٥٥﴾
৫৬. অতএব (হে বিশ্বাসীগণ!) তোমরা নামাজ কায়েম করো, যাকাত আদায় করো এবং রসুলের আনুগত্য করো, যাতে তোমরা আল্লাহর করুণাসিক্ত হতে পারো। ৫৭. (চূড়ান্ত পরিণতির কথা বাদ দাও, এমনকি) দুনিয়ায়ও সত্য অস্বীকারকারীদের অজেয় মনে কোরো না। (আখেরাতে) জাহান্নামই হবে ওদের ঠিকানা। কতই না মর্মান্তিক পরিণতি!
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴿٥٦﴾ لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ ۚ وَمَأْوَاهُمُ النَّارُ ۖ وَلَبِئْسَ الْمَصِيرُ ﴿٥٧﴾
৫৮. হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের দাসদাসীরা এবং অপ্রাপ্তবয়স্করা যেন দিনের তিনটি সময়ে তোমাদের কক্ষে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে। তিনটি সময় হচ্ছে : (এক) ফজরের নামাজের আগে, (দুই) দুপুরে বিশ্রামের সময়, যখন পোশাক আলগা করে রাখো আর (তিন) এশার নামাজের পর। এ তিনটি সময় তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এ-ছাড়া অন্য সময়ে অনুমতি ছাড়া প্রবেশে কোনো দোষ নেই। তোমাদের পরস্পরের কাছে তো নিয়মিত যাতায়াত করতেই হবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর বিধান সুস্পষ্টভাবে বয়ান করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ۚ مِّن قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُم مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَمِن بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ ۚ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَّكُمْ ۚ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ ۚ طَوَّافُونَ عَلَيْكُم بَعْضُكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمُ الْآيَاتِ ۗ وَاللَّـهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴿٥٨﴾
৫৯. (হে বিশ্বাসীগণ!) তোমাদের সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে তারাও যেন তাদের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো অনুমতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। এভাবেই আল্লাহ তাঁর বিধান সুস্পষ্টভাবে বয়ান করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। ৬০. বৃদ্ধা নারী, যারা বিয়ের কোনো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, তারা যদি সৌন্দর্য প্রদর্শনী না করে তাদের জড়ানো চাদর খুলে রাখে, তবে তাতে কোনো দোষ নেই। তবে খুলে না রাখাটাই ভালো। আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন।
وَإِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمْ آيَاتِهِ ۗ وَاللَّـهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴿٥٩﴾ وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ اللَّاتِي لَا يَرْجُونَ نِكَاحًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَن يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِينَةٍ ۖ وَأَن يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَّهُنَّ ۗ وَاللَّـهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿٦٠﴾
৬১. (হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যেহেতু পরস্পরের ভাই, তাই) অন্ধ, খঞ্জ ও রুগ্ণ ব্যক্তির জন্যে কারো ঘরে কিছু খাওয়া দোষের নয়। আর তোমরা নিজেরাও সন্তান পিতা মাতা ভাই বোন চাচা ফুফু মামা খালা বন্ধু ও যে-সব ঘরের চাবি তোমাদের কাছে আছে, তাদের ঘরে খেতে পারো। তোমরা একসাথে খাও বা আলাদা আলাদা খাও, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই। তবে ঘরে প্রবেশের পূর্বে অভিবাদন জানাবে, সালাম করবে। এ কল্যাণের দোয়া আল্লাহর কাছ থেকে নির্ধারিত, কল্যাণময় ও পবিত্র। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্যে তাঁর বিধান সুস্পষ্টভাবে বয়ান করেন, যাতে তোমরা তোমাদের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে শেখো।
لَّيْسَ عَلَى الْأَعْمَىٰ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ وَلَا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَن تَأْكُلُوا مِن بُيُوتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ آبَائِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أُمَّهَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ إِخْوَانِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخَوَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَعْمَامِكُمْ أَوْ بُيُوتِ عَمَّاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخْوَالِكُمْ أَوْ بُيُوتِ خَالَاتِكُمْ أَوْ مَا مَلَكْتُم مَّفَاتِحَهُ أَوْ صَدِيقِكُمْ ۚ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَأْكُلُوا جَمِيعًا أَوْ أَشْتَاتًا ۚ فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّـهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ ﴿٦١﴾
৬২. বিশ্বাসী তারাই, যারা আল্লাহ ও রসুলকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করে। আর কোনো কাজে রসুলের সাথে একত্র হলে তারা রসুলের অনুমতি ছাড়া স্থান ত্যাগ করে না। হে নবী! যারা তোমার অনুমতি চায়, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রসুলে বিশ্বাসী। অতএব তারা তাদের কোনো কাজে বাইরে যেতে চাইলে তুমি যাদেরকে ইচ্ছা অনুমতি দিও এবং তাদের পরিত্রাণের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া কোরো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَىٰ أَمْرٍ جَامِعٍ لَّمْ يَذْهَبُوا حَتَّىٰ يَسْتَأْذِنُوهُ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ أُولَـٰئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَرَسُولِهِ ۚ فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضِ شَأْنِهِمْ فَأْذَن لِّمَن شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّـهَ ۚ إِنَّ اللَّـهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿٦٢﴾
৬৩. হে বিশ্বাসীগণ! কোনো ব্যাপারে রসুলের আহ্বানকে তোমাদের পারস্পরিক আহ্বানের মতো মনে কোরো না। তোমাদের মধ্যে যারা চুপি চুপি সরে পড়ে, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। অতএব যারা আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে পার্থিব বিপদ বা পরকালীন কঠিন শাস্তি তাদের গ্রাস করবে।
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا ۚ قَدْ يَعْلَمُ اللَّـهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمْ لِوَاذًا ۚ فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿٦٣﴾
৬৪. হে মানুষ! জেনে রাখো, মহাকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর। তোমাদের অবস্থান তিনি জানেন, তোমাদের লক্ষ্যও তাঁর কাছে পরিষ্কার। একদিন সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। তোমরা জীবনে কী করেছ, সেদিন তিনি তোমাদের সব দেখিয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে সবকিছু জানেন।
أَلَا إِنَّ لِلَّـهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ قَدْ يَعْلَمُ مَا أَنتُمْ عَلَيْهِ وَيَوْمَ يُرْجَعُونَ إِلَيْهِ فَيُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا ۗ وَاللَّـهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴿٦٤﴾
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
সূরাঃ ১৭/ আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) | Al-Isra (Bani-Israil) | اٌلاِسْرٰاء (بَنِي إِسْرَائِيل) আয়াতঃ ১১১ মাক্কী
- আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল)
১৭ : ৩১ وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَكُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُهُمۡ وَ اِیَّاكُمۡ ؕ اِنَّ قَتۡلَهُمۡ كَانَ خِطۡاً كَبِیۡرًا ﴿۳۱﴾ و لا تقتلوا اولادكم خشیۃ املاق نحن نرزقهم و ایاكم ان قتلهم كان خطا كبیرا ﴿۳۱﴾
অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিয্ক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।
-আল-বায়ান
দরিদ্রতার ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিযক দেই আর তোমাদেরকেও, তাদের হত্যা মহাপাপ।
-তাইসিরুল
তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্রতার ভয়ে হত্যা করনা, তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিই; তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।
-মুজিবুর রহমান
And do not kill your children for fear of poverty. We provide for them and for you. Indeed, their killing is ever a great sin.
-Sahih International
৩১. আর তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্ৰ-ভয়ে হত্যা করো না। তাদেরকেও আমিই রিযক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।(১)
১. আলোচ্য আয়াতে এই নির্দেশটি জাহেলিয়াত যুগের একটি নিপীড়নমূলক অভ্যাস সংশোধনের নিমিত্ত উল্লেখিত হয়েছে। জাহেলিয়াত যুগে কেউ কেউ জন্মের পরপরই সন্তানদেরকে বিশেষ করে কন্যা সন্তানদেরকে হত্যা করত, যাতে তাদের ভরণ-পোষণের বোঝা বহন করতে না হয়। এক হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এটা অবশ্যই বড় কিন্তু তারপর কি? তিনি বললেন, এবং তোমার সাথে খাবে এ ভয়ে তোমার সন্তানকে হত্যা করা”। [বুখারীঃ ৪৪৭৭]
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা তাদের এই কর্মপন্থাটি যে অত্যন্ত জঘন্য ও ভ্রান্ত তাই সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। অনুধাবন করতে বলেছেন যে, রিযিকদানের তোমরা কে? এটা তো একান্তভাবে আল্লাহ্ তাআলার কাজ। তোমাদেরকেও তো তিনিই রিযিক দিয়ে থাকেন। যিনি তোমাদেরকে দেন, তিনিই তাদেরকেও দেবেন। তোমরা এ চিন্তায় কেন সন্তান হত্যার অপরাধে অপরাধী হচ্ছে?
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩১) তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদেরকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। [1]
[1] এই নির্দেশ সূরা আনআম ১৫১ নং আয়াতেও উল্লেখ হয়েছে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সাঃ) শিরকের পর যে গুনাহকে সবচেয়ে বড় গণ্য করেছেন, তা হল এই ((أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ خَشْيَةَ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ)) ‘‘তোমার নিজ সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করা যে, সে তোমার সাথে খাবে।’’ (বুখারীঃ তাফসীর সূরা বাকারা, আদব অধ্যায়, মুসলিমঃ তাওহীদ অধ্যায়) ইদানীং সন্তান হত্যার এই মহাপাপ অতীব সুশৃঙ্খল নিয়মে ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’-এর সুন্দর নামে সারা পৃথিবীতে চলছে। পুরুষরা ‘উত্তম শিক্ষা ও তরবিয়ত’ (বা ‘ছোট পরিবার, সুখী সংসার’) এর নামে এবং মহিলারা তাদের দেহের ‘সুষমা’ অক্ষয় রাখার জন্য ব্যাপকহারে (‘আমরা দুই আমাদের দুই’ শ্লোগান দিয়ে) এই অপরাধ করে চলেছে। أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهُ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩২ وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا ﴿۳۲﴾ و لا تقربوا الزنی انهٗ كان فاحشۃ و سآء سبیلا ﴿۳۲﴾
আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।
-আল-বায়ান
আর যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অতি জঘন্য পথ।
-তাইসিরুল
তোমরা অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হয়োনা, ওটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।
-মুজিবুর রহমান
And do not approach unlawful sexual intercourse. Indeed, it is ever an immorality and is evil as a way.
-Sahih International
৩২. আর যিনার ধারে-কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।(১)
১. “যিনার কাছেও যেয়ে না” এ হুকুম ব্যক্তির জন্য এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও। আয়াতে ব্যভিচার হারাম হওয়ার দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছেঃ এক, এটি একটি অশ্লীল কাজ। মানুষের মধ্যে লজ্জা-শরাম না থাকলে সে মনুষ্যত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। অতঃপর তার দৃষ্টিতে ভালমন্দের পার্থক্য লোপ পায়। কিন্তু যাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের সামান্যতম অংশও বাকী আছে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলে তারা ব্যভিচারকে অন্যায় বলে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে না। আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক যুবক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন। এটা শুনে চতুর্দিক থেকে লোকেরা তার দিকে তেড়ে এসে ধমক দিল এবং চুপ করতে বলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, বস। যুবকটি বসলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি এটা তোমার মায়ের জন্য পছন্দ কর? যুবক উত্তর করলঃ আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না।
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তেমনিভাবে মানুষও তাদের মায়েদের জন্য সেটা পছন্দ করে না। তারপর রাসূল বললেন, তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য তা পছন্দ কর? যুবক উত্তর করলঃ আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অনুরূপভাবে মানুষ তাদের মেয়েদের জন্য সেটা পছন্দ করে না। তারপর রাসূল বললেন, তুমি কি তোমার বোনের জন্য সেটা পছন্দ কর? যুবক উত্তর করলঃ আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না। তখন রাসূল বললেনঃ তদ্রুপ লোকেরাও তাদের বোনের জন্য তা পছন্দ করে না। (এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ফুফু, ও খালা সম্পর্কেও অনুরূপ কথা বললেন আর যুবকটি একই উত্তর দিল) এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উপর হাত রাখলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহ! তার গুনাহ৷ ক্ষমা করে দিন, তার মনকে পবিত্র করুন এবং তার লজ্জাস্থানের হেফাযত করুন।” বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, এরপর এ যুবককে কারো প্রতি তাকাতে দেখা যেত না। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২৫৬, ২৫৭]
দ্বিতীয় কারণ সামাজিক অনাসৃষ্টি। ব্যভিচারের কারণে এটা এত প্রসার লাভ করে যে, এর কোন সীমা-পরিসীমা থাকে না। এর অশুভ পরিণাম অনেক সময় সমগ্ৰ গোত্র ও সম্প্রদায়কে বরবাদ করে দেয়। এ কারণেই ইসলাম এ অপরাধটিকে সব অপরাধের চাইতে গুরুতর বলে সাব্যস্ত করেছে। এবং এর শাস্তি ও সব অপরাধের শাস্তির চাইতে কঠোর বিধান করেছে। কেননা, এই একটি অপরাধ অন্যান্য শত শত অপরাধকে নিজের মধ্যে সন্নিবেশিত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যিনাকারী ব্যক্তি যিনা করার সময় মুমিন থাকে না। চোর চুরি করার সময় মুমিন থাকে না। মদ্যপায়ী মদ্যপান করার সময় মুমিন থাকে না। [মুসলিমঃ ৫৭]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩২) তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। [1]
[1] ইসলামে ব্যভিচার যেহেতু বড়ই অপরাধমূলক কাজ; এত বড় অপরাধ যে, কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা মহিলার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেলে, ইসলামী সমাজে তার জীবিত থাকার অধিকার থাকে না। আবার তাকে তরবারির এক আঘাতে হত্যা করাও যথেষ্ট হয় না, বরং নির্দেশ হল, পাথর মেরে মেরে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। যাতে সে সমাজে (অন্যদের জন্য) শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায়। সেহেতু এখানে বলা হয়েছে, ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। অর্থাৎ, তাতে উদ্বুদ্ধকারী উপায়-উপকরণ থেকেও দূরে থাক। যেমন, ‘গায়ের মাহরাম’ (যার সাথে বিবাহ হারাম নয় এমন বেগানা) নারীকে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তার সাথে অবাধ মেলামেশার ও কথা বলার পথ সুগম করা। অনুরূপ মহিলাদের সাজ-সজ্জা করে বেপর্দার সাথে বাড়ী থেকে বের হওয়া ইত্যাদি যাবতীয় কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা জরুরী। যাতে এই ধরনের অশ্লীলতা থেকে বাঁচা যায়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৩ وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ؕ وَ مَنۡ قُتِلَ مَظۡلُوۡمًا فَقَدۡ جَعَلۡنَا لِوَلِیِّهٖ سُلۡطٰنًا فَلَا یُسۡرِفۡ فِّی الۡقَتۡلِ ؕ اِنَّهٗ كَانَ مَنۡصُوۡرًا ﴿۳۳﴾ و لا تقتلوا النفس التی حرم الله الا بالحق و من قتل مظلوما فقد جعلنا لولیهٖ سلطنا فلا یسرف فی القتل انهٗ كان منصورا ﴿۳۳﴾
আর তোমরা সেই নাফ্সকে হত্যা করো না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ছাড়া। যে অন্যায়ভাবে নিহত হয় আমি অবশ্যই তার অভিভাবককে ক্ষমতা দিয়েছি। সুতরাং হত্যার ব্যাপারে সে সীমালঙ্ঘন করবে না; নিশ্চয় সে হবে সাহায্যপ্রাপ্ত।
-আল-বায়ান
যথাযথ কারণ ছাড়া আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন তাকে হত্যা করো না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে আমি তার উত্তরাধিকারীকে অধিকার দিয়েছি (কিসাস দাবী করার বা ক্ষমা করে দেয়ার) কাজেই সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন না করে, কারণ তাকে তো সাহায্য করা হয়েছে (আইন-বিধান দিয়ে)।
-তাইসিরুল
আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করনা; কেহ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; সেতো সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছেই।
-মুজিবুর রহমান
And do not kill the soul which Allah has forbidden, except by right. And whoever is killed unjustly – We have given his heir authority, but let him not exceed limits in [the matter of] taking life. Indeed, he has been supported [by the law].
-Sahih International
৩৩. আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না!(১) কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমরা তার প্ৰতিকারের অধিকার দিয়েছি(২); কিন্তু হত্যা ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না। করে(৩); সে তো সাহায্যপ্ৰাপ্ত হয়েছেই।
১. অন্যায় হত্যার অবৈধতা বর্ণনা প্রসঙ্গে এটা আরেক নির্দেশ। অন্যায় হত্যা যে মহা অপরাধ, তা বিশ্বের দলমত ও ধর্মাধর্ম নির্বিশেষে সবার কাছে স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একজন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চাইতে আল্লাহর কাছে সমগ্ৰ বিশ্বকে ধ্বংস করে দেয়া লঘু অপরাধ। [তিরমিযীঃ ১৩৯৫, ইবনে মাজহঃ ২৬১৯] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ প্রত্যেক গোনাহ আল্লাহ্ তাআলা ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি কুফারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে অথবা যে ব্যক্তি জেনে-শুনে ইচ্ছাপূর্বক কোন মুসলিমকে হত্যা করে, তার গোনাহ ক্ষমা করা হবে না। [নাসায়ীঃ ৭/৮১] সুতরাং কোন মু’মিনকে হত্যা করা অন্যায়। শুধুমাত্র তিনটি কারণে অন্যায় হত্যা ন্যায়ে পরিণত হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে মুসলিম আল্লাহ একমাত্র সত্যিকার মাবুদ এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল বলে সাক্ষ্য দেয়, তার রক্ত হালাল নয়; কিন্তু তিনটি কারণে তা হালাল হয়ে যায়। (এক) বিবাহিত হওয়া সত্বেও সে যদি যিনা করে, তবে প্রস্তুর বর্ষণে হত্যা করাই তার শরীআতসম্মত শাস্তি। (দুই) সে যদি অন্যায়ভাবে কোন মানুষকে হত্যা করে, তবে তার শাস্তি এই যে, নিহত ব্যক্তির ওলী তাকে কেসাস হিসেবে হত্যা করতে পারে। (তিন) যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তার শাস্তিও হত্যা। [মুসলিমঃ ১৬৭৬] এ তিনটি শাস্তির দাবী করার অধিকার প্রতিটি মুমিনের তবে এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষমতা কেউ যেন নিজ হাতে নিয়ে না নেয়। বরং একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার প্রধান এ অধিকার পাবে।
দাহহাক বলেন, এটি মক্কায় নাযিল হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলিমরা তখন মক্কায় ছিল। এটি হত্যা সংক্রান্ত নাযিল হওয়া প্রথম আয়াত। তখন মুসলিমদেরকে কাফেররা গোপনে বা প্রকাশ্যে হত্যা করছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মুশরিকদের কেউ তোমাদের হত্যা করছে বলে তোমরা তাদের পিতা, ভাই, অথবা তাদের গোত্রীয় কাউকে হত্যা করো না। যদিও তারা মুশরিক হয়। তোমাদের হত্যাকারী ছাড়া কাউকে হত্যা করো না। [ফাতহুল কাদীর]
২. মূল শব্দ হচ্ছে, “তার অভিভাবককে আমি সুলতান দান করেছি।” এখানে সুলতান অর্থ হচ্ছে “প্ৰমাণ” যার ভিত্তিতে সে হত্যাকারীর উপর কিসাস দাবী করতে পারে। এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বের হয় যে, হত্যা মোকদ্দমায় নিহত ব্যক্তির অভিভাবকগণই এর মূল বাদীপক্ষ। তারা হত্যাকারীকে মাফ করে দিতে এবং কিসাসের পরিবর্তে রক্তপণ গ্ৰহণ করতে সম্মত হতে পারে। [ইবন কাসীর] তবে যদি মূল অভিভাবক না থাকে, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এ কাজের দায়িত্ব নিতে পারে। [ফাতহুল কাদীর]
৩. এর সারমর্ম এই যে, অন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায়ের মাধ্যমে নেয়া জায়েয নয়। প্ৰতিশোধের বেলায়ও ইনসাফের প্রতি লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য। হত্যার ব্যাপারে বিভিন্নভাবে সীমা অতিক্রম করা যেতে পারে। এগুলো সবই নিষিদ্ধ। যেমন প্ৰতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে উন্মত্তের মতো অপরাধী ছাড়া অন্যদেরকেও হত্যা করা। অথবা অপরাধীকে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলা। কিংবা মেরে ফেলার পর তার লাশের উপর মনের ঝাল মেটানো অথবা রক্তপণ নেবার পর আবার তাকে হত্যা করা ইত্যাদি। [ইবন কাসীর] যে পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির ওলী ইনসাফ সহকারে নিহতের প্রতিশোধ কেসাস নিতে চাইবে, সেই পর্যন্ত শরীআতের আইন তার পক্ষে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তার সাহায্যকারী হবেন। পক্ষান্তরে সে যদি প্রতিশোধ স্পৃহায় উম্মত্ত হয়ে কেসাসের সীমালঙ্ঘন করে, তবে সে মযলুম না হয়ে যালেম হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর আইন এখন তার সাহায্য করার পরিবর্তে প্রতিপক্ষের সাহায্য করবে এবং তাকে যুলুম থেকে বাঁচাবে।
যায়েদ ইবন আসলাম এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, জাহেলিয়াত যুগের আরবে সাধারণতঃ এক ব্যক্তির হত্যার পরিবর্তে হত্যাকারীর পরিবার অথবা সঙ্গীসাথীদের মধ্য থেকে যাকেই পাওয়া যেত, তাকেই হত্যা করা হত। কোন কোন ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তি গোত্রের সরদার অথবা বড়লোক হলে তার পরিবর্তে শুধু এক ব্যক্তিকে কেসাস হিসেবে হত্যা করা যথেষ্ট মনে করা হত না; বরং এক খুনের পরিবর্তে দু-তিন কিংবা আরও বেশী মানুষের প্রাণ সংহার করা হত। কেউ কেউ প্রতিশোধ সম্পূহায় উম্মত্ত হয়ে হত্যাকারীকে শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হত না, বরং তার নাক, কান ইত্যাদি কেটে অঙ্গ বিকৃত করা হত। আয়াতে মুসলিমদেরকে এ রকম কিছু না করতে উপদেশ দেয়া হয়েছে [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৩) আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না; [1] কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। সুতরাং হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত। [2]
[1] যথার্থ কারণে হত্যাঃ যেমন হত্যার বদলে হত্যা করা। যাকে মানুষের জীবন এবং নিরাপত্তার ও শান্তির কারণ গণ্য করা হয়েছে। অনুরূপ বিবাহিত ব্যভিচারীকে এবং মুরতাদ (ধর্মত্যাগী)-কে হত্যা করার নির্দেশ আছে।
[2] অর্থাৎ, নিহতের উত্তরাধিকারীদের এ অধিকার বা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, তারা হত্যাকারীকে ক্ষমতাসীন শাসক কর্তৃক শরীয়তী ফায়সালার পর খুনের বদলে খুন নিয়ে তাকে হত্যা করবে অথবা তার নিকট থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করবে কিংবা তাকে ক্ষমা করে দেবে। আর যদি খুনের বদলে খুনই করতে চায়, তবে তাতে যেন বাড়াবাড়ি না করে। অর্থাৎ, একজনের পরিবর্তে দু’জনকে যেন হত্যা না করে অথবা তার যেন অঙ্গবিকৃতি না ঘটায় অথবা নানা কষ্ট দিয়ে যেন তাকে হত্যা না করে। নিহতের ওয়ারেস ‘সাহায্যপ্রাপ্ত’ অর্থাৎ, নেতা ও শাসকদেরকে তার সাহায্য করার তাকীদ করা হয়েছে। কাজেই এর জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। বাড়াবাড়ি করে তাঁর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত নয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৪ وَ لَا تَقۡرَبُوۡا مَالَ الۡیَتِیۡمِ اِلَّا بِالَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ حَتّٰی یَبۡلُغَ اَشُدَّهٗ ۪ وَ اَوۡفُوۡا بِالۡعَهۡدِ ۚ اِنَّ الۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡـُٔوۡلًا ﴿۳۴﴾ و لا تقربوا مال الیتیم الا بالتی هی احسن حتی یبلغ اشدهٗ و اوفوا بالعهد ان العهد كان مسـٔولا ﴿۳۴﴾
আর তোমরা ইয়াতীমের সম্পদের কাছে যেয়ো না সুন্দরতম পন্থা* ছাড়া, যতক্ষণ না সে বয়সের পূর্ণতায় উপনীত হয়। আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
-আল-বায়ান
ইয়াতীম বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তার সম্পদের কাছেও যেয়ো না সৎ উদ্দেশ্য ব্যতীত। আর ওয়া‘দা পূর্ণ কর, ওয়া‘দা সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
-তাইসিরুল
পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়োনা এবং প্রতিশ্রুতি পালন কর; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।
-মুজিবুর রহমান
And do not approach the property of an orphan, except in the way that is best, until he reaches maturity. And fulfill [every] commitment. Indeed, the commitment is ever [that about which one will be] questioned.
-Sahih International
* অর্থাৎ তার সম্পদ বৃদ্ধি, তার নিজের খরচ এবং দরিদ্র হলে বেতন গ্রহণ বৈধ।
৩৪. আর ইয়াতীম বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুপায়ে ছাড়া তার সম্পত্তির ধারে-কাছেও যেও না এবং প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।
–
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৪) সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না।[1] আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। [2]
[1] অবৈধভাবে কারো জান নষ্ট করতে নিষেধ করার পর এখানে মাল নষ্ট করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আর ইয়াতীমের মালের ব্যাপারটা যেহেতু বেশী গুরুতত্ত্বপূর্ণ তাই বললেন, ইয়াতীমের সাবালক হওয়া পর্যন্ত তার মালকে এমন কাজে লাগাও যাতে তার লাভ হয়। চিন্তা-ভাবনা না করেই এমন ব্যবসায় লাগিয়ে দিও না, যাতে তা (মাল) নষ্ট হয়ে যায় অথবা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কিংবা সাবালক হওয়ার পূর্বেই তার মাল নিঃশেষ হয়ে যায়।
[2] ‘প্রতিশ্রুতি’ বা অঙ্গীকার বলতে সেই অঙ্গীকার যা আল্লাহ ও বান্দাদের মধ্যে রয়েছে এবং সেই অঙ্গীকারও যা বান্দাগণ আপোসে একে অপরের সাথে করে থাকে। উভয় অঙ্গীকার পূরণ করা জরুরী। পক্ষান্তরে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে কাল কিয়ামতে জিজ্ঞাসিত হতে হবে এবং সে ব্যাপারে কৈফিয়ত দিতে হবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৫ وَ اَوۡفُوا الۡكَیۡلَ اِذَا كِلۡتُمۡ وَ زِنُوۡا بِالۡقِسۡطَاسِ الۡمُسۡتَقِیۡمِ ؕ ذٰلِكَ خَیۡرٌ وَّ اَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا ﴿۳۵﴾ و اوفوا الكیل اذا كلتم و زنوا بالقسطاس المستقیم ذلك خیر و احسن تاویلا ﴿۳۵﴾
আর মাপে পরিপূর্ণ দাও যখন তোমরা পরিমাপ কর এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওযন কর। এটা কল্যাণকর ও পরিণামে সুন্দরতম।
-আল-বায়ান
মাপ দেয়ার সময় মাপ পূর্ণমাত্রায় করবে, আর ওজন করবে ত্রুটিহীন দাঁড়িপাল্লায়। এটাই উত্তম নীতি আর পরিণামেও তা উৎকৃষ্ট।
-তাইসিরুল
মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দিবে এবং ওযন করবে সঠিক দাঁড়ি পাল্লায়, এটাই উত্তম ও পরিণামে উৎকৃষ্ট।
-মুজিবুর রহমান
And give full measure when you measure, and weigh with an even balance. That is the best [way] and best in result.
-Sahih International
৩৫. আর মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দাও এবং ওজন কর সঠিক দাঁড়িপাল্লায়(১), এটাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট।(২)
১. আয়াতে মাপ ও ওজন সম্পর্কে যে নির্দেশ আছে, লেন-দেনের ক্ষেত্রে মাপ ও ওজন পূর্ণ করার আদেশ এবং কম মাপার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তার সারমর্ম এই যে, যার যতটুকু হক, তার চাইতে কম দেয়া হারাম। ইবন কাসীর]
২. এতে মাপ ও ওজন করা সম্পর্কে দুটি বিষয় বলা হয়েছে। (এক) এর উত্তম হওয়া। অর্থাৎ দুনিয়াতে এটি উত্তম হওয়া যুক্তি ও বিবেকের দাবী। (দুই) এর পরিণতি শুভ। এতে আখেরাতের পরিণতি তথা সওয়াব ও জান্নাত ছাড়াও দুনিয়ার উত্তম পরিণতির দিকেও ইঙ্গিত আছে। অর্থাৎ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই এর পরিণতি শুভ। [ইবন কাসীর]
দুনিয়ায় এর শুভ পরিণামের কারণ হচ্ছে এই যে, এর ফলে পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কোন ব্যবসা ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নতি করতে পারে না, যে পর্যন্ত জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে না পারে। বিশ্বাস ও আস্থা উপরোক্ত বাণিজ্যিক সততা ব্যতীত অর্জিত হতে পারে না। ক্রেতা ও বিক্রেতা দু’জন দু’জনের উপর ভরসা করে, এর ফলে ব্যবসায়ে উন্নতি আসে এবং ব্যাপক সমৃদ্ধি দেখা দেয়। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর] অন্যদিকে আখেরাতে এর শুভ পরিণাম পুরোপুরি নির্ভর করে ঈমান ও আল্লাহ ভীতির উপর।
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৫) মেপে দেয়ার সময় পূর্ণরূপে মাপো এবং সঠিক দাঁড়ি-পাল্লায় ওজন কর, এটাই উত্তম[1] ও পরিণামে উৎকৃষ্টতম।
[1] নেকীর দিক দিয়ে উত্তম। এ ছাড়াও মানুষের মাঝে বিশ্বস্ততা জন্মানোর জন্য ওজন ও মাপে ঈমানদারী (ব্যবসার জন্য) বড়ই ফলপ্রসূ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৬ وَ لَا تَقۡفُ مَا لَیۡسَ لَكَ بِهٖ عِلۡمٌ ؕ اِنَّ السَّمۡعَ وَ الۡبَصَرَ وَ الۡفُؤَادَ كُلُّ اُولٰٓئِكَ كَانَ عَنۡهُ مَسۡـُٔوۡلًا ﴿۳۶﴾ و لا تقف ما لیس لك بهٖ علم ان السمع و البصر و الفؤاد كل اولٓئك كان عنه مسـٔولا ﴿۳۶﴾
আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।
-আল-বায়ান
আর সে বিষয়ের পেছনে ছুটো না, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই। কান, চোখ আর অন্তর- এগুলোর সকল বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
-তাইসিরুল
যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়োনা। কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় – ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে।
-মুজিবুর রহমান
And do not pursue that of which you have no knowledge. Indeed, the hearing, the sight and the heart – about all those [one] will be questioned.
-Sahih International
৩৬. আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না;(১) কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।(২)
১. আয়াতে উল্লেখিত (وَلَا تَقْفُ) শব্দটির সঠিক অর্থ, পিছু নেয়া, অনুসরণ করা। [ফাতহুল কাদীর] সে অনুসারে আয়াতের অর্থ হবে যে বিষয়ে তুমি জাননা সে বিষয়ের পিছু নিওনা। [ফাতহুল কাদীর] ইবন আব্বাস বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, বলো না। অপর বর্ণনায় তিনি বলেছেন, যে বিষয় সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কাউকে অভিযুক্ত করো না। কাতাদাহ বলেন, যা দেখনি তা বলো না। মুহাম্মদ ইবনুল হানফিয়া বলেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দিও না। [ইবন কাসীর] মোটকথা: যে বিষয় জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কথা বলাকে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সবচেয়ে বড় গুনাহের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক করা—যার কোন সনদ তিনি পাঠাননি, এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।” [আল-আরাফঃ ৩৩] অনুরূপভাবে ধারণা করে কথা বলাও এর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় ধারনা করে কথা বলা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা বিবিধ ধারনা করা থেকে বেঁচে থাক; কেননা কোন কোন ধারনা করা গুনাহের পর্যায়ে পড়ে।” [সূরা আলহুজুরাতঃ ১২] হাদীসে এসেছে, “তোমরা ধারনা করা থেকে বেঁচে থাক; কেননা ধারনা করে কথা বলা মিথ্যা কথা বলা৷” [বুখারীঃ ৫১৪৩, মুসলিমঃ ২৫৬৩]
২. এ আয়াতের দুটি অর্থ করা হয়ে থাকেঃ
এক. কেয়ামতের দিন কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ সম্পর্কে তার মালিককে প্রশ্ন করা হবে। প্রশ্ন করা হবেঃ তুমি সারা জীবন কি কি শুনেছ? প্রশ্ন করা হবেঃ তুমি সারা জীবন কি কি দেখেছ? প্রশ্ন করা হবেঃ সারা জীবনে মনে কি কি কল্পনা করেছ এবং কি কি বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছ? যদি শরীআত বিরোধী কাজ কর্ম করে থাকে, তবে এর জন্য সে ব্যক্তিকে আযাব ভোগ করতে হবে। [ফাতহুল কাদীর]
দুই. কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এ ব্যাপারে স্বয়ং সাক্ষ্য দেবে। কারণ আল্লাহ সেগুলোকে প্রশ্ন করবেন। এটা হাশরের ময়দানে গুনাহগারদের জন্য অত্যন্ত লাঞ্ছনার কারণ হবে। সূরা ইয়াসীনে বলা হয়েছেঃ “আজ (কেয়ামতের দিন) আমি এদের (অপরাধীদের) মুখ মোহর করে দেব। ফলে, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের চরণসমূহ সাক্ষ্য দেবে তাদের কৃতকর্মের” [সূরা ইয়াসীনঃ ৬৫]। অনুরূপভাবে সূরা আন-নূরে এসেছে, “যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে।[সূরা নূরঃ ২৪]।
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৬) যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। [1] নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে। [2]
[1] قَفَا يَقْفُوْ এর অর্থ পিছনে পড়া। অর্থাৎ, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার পিছনে পড়ো না। আন্দাজে কথা বলো না। অর্থাৎ, কারো প্রতি কুধারণা করো না। কারো ছিদ্রান্বেষণ করো না। অনুরূপ যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার উপর আমলও করো না।
[2] অর্থাৎ, যে জিনিসের পিছনে পড়বে, সে ব্যাপারে কানকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে কি শুনেছিল? চোখকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে কি দেখেছিল? এবং অন্তরকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে কি জেনেছিল? কারণ, এই তিনটিই হল জানার মাধ্যম। অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ এই অঙ্গগুলোকে বাকশক্তি দান করবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৭ وَ لَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ۚ اِنَّكَ لَنۡ تَخۡرِقَ الۡاَرۡضَ وَ لَنۡ تَبۡلُغَ الۡجِبَالَ طُوۡلًا ﴿۳۷﴾ و لا تمش فی الارض مرحا انك لن تخرق الارض و لن تبلغ الجبال طولا ﴿۳۷﴾
আর যমীনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো যমীনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।
-আল-বায়ান
যমীনে গর্বভরে চলাফেরা করো না, তুমি কক্ষনো যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায় পর্বতের ন্যায় হতেও পারবে না।
-তাইসিরুল
ভূপৃষ্ঠে দম্ভ ভরে বিচরণ করনা, তুমিতো কখনই পদভরে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবেনা এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত সমান হতে পারবেনা।
-মুজিবুর রহমান
And do not walk upon the earth exultantly. Indeed, you will never tear the earth [apart], and you will never reach the mountains in height.
-Sahih International
৩৭. আর যমীনে দম্ভভরে বিচরণ করো না; তুমি তো কখনই পদভরে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত প্ৰমাণ হতে পারবে (১)
১. অহংকারের অর্থ হচ্ছে নিজেকে অন্যের চাইতে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ এবং অন্যকে নিজের তুলনায় হেয় ও ঘূণ্য মনে করা। হাদীসে এর জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আল্লাহ্ তাআলা ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছেন যে, নম্রতা অবলম্বন কর। কেউ যেন অন্যের উপর গর্ব ও অহংকারের পথ অবলম্বন না করে এবং কেউ যেন কারও উপর যুলুম না করে।’ [মুসলিমঃ ২৮৬৫]
অন্য হাদীসে এসেছে, তোমাদের পূর্বেকার জাতিদের মধ্যে কোন এক লোক দুখানি চাদর নিয়ে গর্বভরে চলছিল। এমতাবস্থায় যমীন তাকে নিয়ে ধ্বসে গেল, সে এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত এর মধ্যে ঢুকতে থাকবে। [বুখারীঃ ৫৭৮৯, মুসলিমঃ ২০৮৮]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৭) ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না। [1]
[1] অহংকার ও দাম্ভিকতার সাথে চলা আল্লাহর নিকট অতীব অপছন্দনীয়। এই অপরাধের কারণেই কারূনকে তার প্রাসাদ ও ধন-ভান্ডার সমেত যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে। (সূরা কাসাস ৮১ আয়াত) হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি দু’টি চাদর পরিধান করে অহংকারের সাথে চলছিল। ফলে তাকে যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত ধসেই যেতে থাকবে। (মুসলিমঃ কিতাবুল লিবাস, পরিচ্ছেদঃ দম্ভভরে যমীনে চলা হারাম—) মহান আল্লাহ বিনয় ও নম্রতা পছন্দ করেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৮ كُلُّ ذٰلِكَ كَانَ سَیِّئُهٗ عِنۡدَ رَبِّكَ مَكۡرُوۡهًا ﴿۳۸﴾ كل ذلك كان سیئهٗ عند ربك مكروها ﴿۳۸﴾
এ সবের যা মন্দ তা তোমার রবের নিকট অপছন্দনীয়।
-আল-বায়ান
এগুলোর মধ্যে যে সমস্ত বিষয় মন্দ, তোমার প্রতিপালকের নিকট তা ঘৃণিত।
-তাইসিরুল
এ সবের মধ্যে যেগুলি মন্দ সেগুলি তোমার রবের নিকট ঘৃণ্য।
-মুজিবুর রহমান
All that – its evil is ever, in the sight of your Lord, detested.
-Sahih International
৩৮. এ সবের মধ্যে যা মন্দ তা আপনার রাবের কাছে ঘৃণ্য।(১)
১. অর্থাৎ উল্লেখিত সব মন্দ কাজ আল্লাহর কাছে মকরূহ ও অপছন্দনীয়। উল্লেখিত নির্দেশাবলীর মধ্যে যেগুলো হারাম ও নিষিদ্ধ, সেগুলো যে মন্দ ও অপছন্দনীয়, তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কিছু করণীয় আদেশও আছে; যেমন- পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা ইত্যাদি। যেহেতু এগুলোর মধ্যেও উদ্দেশ্য এদের বিপরীত কর্ম থেকে বেঁচে থাকা; অর্থাৎ পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়া থেকে, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা থেকে বেঁচে থাকা, তাই এসবগুলোও হারাম ও অপছন্দনীয়। অথবা অন্য কথায় বলা যায়, আল্লাহর যে কোন হুকুম অমান্য করা অপছন্দনীয় কাজ। [ফাতহুল কাদীর] আয়াতে উল্লেখিত سيئُهُ বাক্য অন্য কেরা’আতে سيئة পড়া হয়েছে। তখন আয়াতের অর্থ হবে, এ সবগুলোই মন্দ কাজ। আল্লাহ এগুলো অপছন্দ করেন। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৮) এ সবের মধ্যে যেগুলি মন্দ সেগুলি তোমার প্রতিপালকের নিকট ঘৃণ্য। [1]
[1] অর্থাৎ, যে কথাগুলো উল্লেখ করা হল, তার মধ্যে যেগুলো মন্দ ও নিষিদ্ধ তা অপছন্দনীয় ও ঘৃণ্য।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৩৯ ذٰلِكَ مِمَّاۤ اَوۡحٰۤی اِلَیۡكَ رَبُّكَ مِنَ الۡحِكۡمَۃِ ؕ وَ لَا تَجۡعَلۡ مَعَ اللّٰهِ اِلٰـهًا اٰخَرَ فَتُلۡقٰی فِیۡ جَهَنَّمَ مَلُوۡمًا مَّدۡحُوۡرًا ﴿۳۹﴾ ذلك مما اوحی الیك ربك من الحكمۃ و لا تجعل مع الله الـها اخر فتلقی فی جهنم ملوما مدحورا ﴿۳۹﴾
এগুলো সেই হিকমতভুক্ত, যা তোমার রব তোমার নিকট ওহীরূপে পাঠিয়েছেন। আর তুমি আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য নির্ধারণ করো না, তাহলে তুমি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে নিন্দিত ও বিতাড়িত হয়ে।
-আল-বায়ান
এসব সেই হিকমাতের অন্তর্ভুক্ত যা তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি ওয়াহী করেছেন। আল্লাহর সঙ্গে অপর কোন ইলাহ স্থির করো না, করলে তুমি নিন্দিত ও যাবতীয় কল্যাণ বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
-তাইসিরুল
তোমার রাব্ব অহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমাত দান করেছেন এগুলি উহার অন্তর্ভুক্ত; তুমি আল্লাহর সাথে কোন ইলাহ স্থির করনা, তাহলে তুমি নিন্দিত ও (আল্লাহর) অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
-মুজিবুর রহমান
That is from what your Lord has revealed to you, [O Muhammad], of wisdom. And, [O mankind], do not make [as equal] with Allah another deity, lest you be thrown into Hell, blamed and banished.
-Sahih International
৩৯. আপনার রব ওহীর দ্বারা আপনাকে যে হিকমত দান করেছেন এগুলো তার অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ স্থির করো না, করলে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।(১)
১. এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হলেও উদ্দেশ্য হলো তার উম্মত। কারণ তিনি শির্ক করার অনেক ঊর্ধ্বে। লক্ষণীয় যে, এ আদেশ, নিষেধ ও অসিয়তের শুরু হয়েছিল শির্কের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। শেষ করা হলো আবার সেই শির্কের নিষেধাজ্ঞা দিয়েই। এর দ্বারা এটাই বোঝানো ও এ বিষয়ে তাকীদ দেয়া উদ্দেশ্য যে, দ্বীনের মূলই হচ্ছে শির্ক থেকে দূরে থাকা। তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা। কেউ কেউ বলেন, প্রথম যখন শির্ক থেকে নিষেধ করা হয়েছিল তখন তার শাস্তি বলা হয়েছে যে, লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে বসে পড়বে, অর্থাৎ দুনিয়াতে তারা এভাবে সাহায্যহীন হয়ে থাকবে। তারপর সবশেষে যখন শির্ক থেকে নিষেধ করা হয়েছে তখন তার শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছে যে, তাহলে জাহান্নামে নিন্দিত ও বিতাড়িত হয়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এটা নিঃসন্দেহে আখেরাতে হবে। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৩৯) তোমার প্রতিপালক অহী (প্রত্যাদেশ) দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করেছেন এগুলি তার অন্তর্ভুক্ত; তুমি আল্লাহর সাথে কোন উপাস্য স্থির করো না, করলে তুমি নিন্দিত ও আল্লাহর অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
–
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৭ : ৪০ اَفَاَصۡفٰىكُمۡ رَبُّكُمۡ بِالۡبَنِیۡنَ وَ اتَّخَذَ مِنَ الۡمَلٰٓئِكَۃِ اِنَاثًا ؕ اِنَّكُمۡ لَتَقُوۡلُوۡنَ قَوۡلًا عَظِیۡمًا ﴿۴۰﴾ افاصفىكم ربكم بالبنین و اتخذ من الملٓئكۃ اناثا انكم لتقولون قولا عظیما ﴿۴۰﴾
তোমাদের রব কি পুত্র সন্তানের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করেছেন এবং তিনি ফেরেশতাদের থেকে কন্যা গ্রহণ করেছেন? নিশ্চয় তোমরা সাংঘাতিক কথা বলে থাক।
-আল-বায়ান
তাহলে কি (হে কাফিরগণ!) তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক সন্তান নির্বাচিত করেছেন, আর নিজের জন্য ফেরেশতাদের মধ্য হতে কন্যা গ্রহণ করেছেন? বাস্তবিকই তোমরা বড় ভয়ানক কথা বলছো।
-তাইসিরুল
তোমাদের রাব্ব কি তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি নিজে (ফেরেশতাদের) কন্যা রূপে গ্রহণ করেছেন? তোমরাতো নিশ্চয়ই ভয়ানক কথা বলে থাক।
-মুজিবুর রহমান
Then, has your Lord chosen you for [having] sons and taken from among the angels daughters? Indeed, you say a grave saying.
-Sahih International
৪০. তোমাদের রব কি তোমাদেরকে পুত্র সন্তানের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি নিজে কি ফিরিশতাদেরকে কন্যারুপে গ্রহন করেছেন? তমরা তো নিশ্চয় ভয়ানক কথা বলে থাক।(১)
১. এ আয়াতের সমার্থে আরো আয়াত পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে। যেমন, সূরা মারইয়ামঃ ৮৮–৯৫] এ আয়াতে কাফের মুশরিকদের মারাত্মক ভুল ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তারা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করেছে, এতে করে তারা তিনটি ভুল করেছে। এক. আল্লাহর বান্দাদেরকে মেয়ে বানিয়ে নিয়েছে। দুই. তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে হওয়ার দাবী করেছে। তিন. তারপর তাদের ইবাদতও করেছে। তাই আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াতে তাদের সমস্ত অযৌক্তিক ও মিথ্যা দাবী ও কর্মকাণ্ডকে খণ্ডন করে বলছেন, তোমরা কিভাবে এটা মনে করছ যে, যাবতীয় পুরুষ সন্তান তোমাদের জন্য রেখে তিনি তাঁর নিজের জন্য মেয়ে সন্তানগুলোকে নির্ধারণ করেছেন? তোমরা তো এক মারাত্মক কথা বলছি। নিজেদের জন্য অপছন্দ করে আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা কি যুলুম নয়?
তাফসীরে জাকারিয়া
(৪০) তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে পুত্র সন্তানের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি নিজে ফিরিশতাদেরকে কন্যারূপে গ্রহণ করেছেন? তোমরা তো নিশ্চয়ই বিরাট কথা বলে থাকো।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল্লাহ আমাদের পরকিয়া থেকে সকল দাম্পত্য জীবনকে মুক্ত রাখুক,আমিন।
যোগাযোগ
সরাসরি WhatsApp-এ যোগাযোগ করুন:
Asadullah
Raipura, Narsingdi, Bangladesh
MBBS Session: 2020-21
Founder-Chairman, MD, Directorate Head, Owner, CEO, Consultant
Doctor’s Matrimony BD, Doctor Consultancy,
and Asadullah TV.BD
Founder Member & Director:
Narsingdi Helth Services & Research Center
Narsingdi Medical College Hospital
Phone: +880 1568-318976
Email: drasadullahmedicalconsultant@gmail.com