কোরআন-হাদিসে বিয়ে সম্পর্কে
” ইসলামে বিয়ে ও পরিবার গঠনের উদ্দেশ্য”
মানবসভ্যতার আদি প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। এর মাধ্যমেই সভ্যতার সূচনা ও বিকাশ। পরিবারের সূচনা বাবা আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)–এর দাম্পত্য সম্পর্কের মাধ্যমে।
দাম্পত্য জীবনের সূচনা হয় বিয়ের মাধ্যমে। বিয়ে একটি ইবাদত। ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের যাবতীয় কর্মকালই ইবাদত। দাম্পত্য জীবন মানবজীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুগলবন্দী দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য হলো সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোরআন মাজিদে বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়ার উদ্রেক করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ২১)
বিয়ের অন্যতম ফরজ অনুষঙ্গ হলো মহর। আল্লাহ তাআলা কোরআন কারিমে বলেন, ‘আর তোমরা নারীদের তাদের মহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে; সন্তুষ্ট চিত্তে তারা মহরের কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে উপভোগ করবে।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৪)। মহরের পরিমাণ উভয় পক্ষের সম্মতিতে বরের সামর্থ্য ও কনের যোগ্যতা বিবেচনায় নির্ধারিত হবে। এর সর্বনিম্ন কোনো পরিমাণ নির্ধারিত নেই।
মুজতাহিদ ফকিহদের গবেষণামতে, মহরের পরিমাণ সর্বনিম্ন ১০ দিরহাম বা আড়াই ভরি রৌপ্যের সমান। মহরের সর্বোচ্চ পরিমাণ সীমিত করা নেই।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা তাদের কোনো একজনকে অগাধ সম্পদ বা অঢেল অর্থও দিয়ে থাকো, তবু তা হতে কিছুই প্রতিগ্রহণ কোরো না।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ২০)
বাংলাদেশ সরকারের সংবিধিবদ্ধ আইনেও যৌতুক শাস্তিযোগ্য ও দণ্ডনীয় অপরাধ। যৌতুকের শর্তে বিয়ে সম্পাদিত হলে, বিয়ে কার্যকর হয়ে যাবে; কিন্তু যৌতুকের শর্ত অকার্যকর বলে বিবেচিত হবে।
ইসলামি শরিয়তের বিধানমতে, অবৈধ শর্ত পালনীয় নয় বরং বাধ্যতামূলকভাবেই তা বর্জনীয়। যে বিয়েতে যৌতুক লেনদেন হয় বা যৌতুকের শর্ত থাকে, সেসব বিয়ে বর্জন করা কর্তব্য। যৌতুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও সোচ্চার হওয়া আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যাদের বিবাহের সামর্থ্য নাই, আল্লাহ তাদের নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।’ (সুরা-২৪ নূর, আয়াত: ৩৩)
ইসলামি শরিয়তের বিধানাবলির অন্তর্নিহিত দর্শন বা উদ্দেশ্য তথা ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’র পাঁচ পাঁচটিই বিদ্যমান রয়েছে বিয়ের মধ্যে। যথা জীবনের সুরক্ষা, সম্পদের সুরক্ষা, জ্ঞানের সুরক্ষা, বংশধারার সুরক্ষা ও ধর্মের সুরক্ষা।
তাই তো হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘বিবাহ হলো ইমানের অর্ধেক, যে বিবাহ করল, সে তার ইমানের অর্ধেক পূর্ণ করল, বাকি অর্ধেকের জন্য সে আল্লাহকে ভয় করুক।’ (সুনানে বায়হাকি, সহিহ্ আলবানী: ১৯১৬)
প্রিয় নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘বিবাহ করা আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নত থেকে বিরাগভাজন হয়, সে আমার উম্মত নয়।’ (মুসলিম: ১৪০১)
“ইসলামে বিয়ের নিয়ম ও বিধান-শর্ত”
বিয়ে আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত ও রাসুল (সা.) এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। চারিত্রিক অবক্ষয় রোধের অনুপম হাতিয়ার। আদর্শ পরিবার গঠন, মানুষের জৈবিক চাহিদাপূরণ ও মানবিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ। বিয়ে ইসলামী শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো— তিনি তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জীবনসঙ্গিনী, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। ’ (সুরা রুম, আয়াত :২১)
ইসলামে বিয়ের যাবতীয় নিয়ম-কানুন এবং বিধান-শর্ত ও আনুসাঙ্গিক বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
ইসলামে বিয়ের রুকন বা মৌলিক ভিত্তি
এক. বর-কনে উভয়ে বিয়ে সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হওয়া।
দুই. ইজাব বা প্রস্তাবনা: এটি হচ্ছে বরের কাছে মেয়ের অভিভাবক বা তার প্রতিনিধির পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব উপস্থান করা। যেমন, ‘আমি অমুককে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম’ অথবা এ ধরনের অন্য কোনভাবে প্রস্তাব পেশ করা।
তিন: কবুল বা গ্রহণ করা: এটি বর বা তার প্রতিনিধির সম্মতিসূচক বাক্য। যেমন, ‘আমি কবুল বা গ্রহণ করলাম’ ইত্যাদি।
বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত
(১) বর-কনে উভয়কে গ্রহণযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট করে নেয়া।
(২) বর-কনে একে অন্যের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া। রাসুল (সা.) বলেন, ‘স্বামীহারা নারী (বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা)-কে তার সিদ্ধান্ত ছাড়া (অর্থাৎ পরিষ্কারভাবে তাকে বলে তার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে) বিয়ে দেয়া যাবে না। কুমারী মেয়েকে তার সম্মতি (কথার মাধ্যমে অথবা চুপ থাকার মাধ্যমে) ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! কেমন করে তার সম্মতি জানব? তিনি বললেন, চুপ করে (লজ্জার দরুন) থাকাটাই তার সম্মতি। ’ (বুখারি, হাদিস নং : ৪৭৪১)
(৩) বিয়ের আকদ (চুক্তি) করানোর দায়িত্ব মেয়ের অভিভাবককে পালন করতে হবে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বিয়ে দেয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশনা জারি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যে অবিবাহিত নারী-পুরুষদের বিবাহ দাও। ’ (সুরা নুর, ২৪:৩২)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। ’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১০২১)
(৪) বিয়ের আকদের সময় সাক্ষী রাখতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অভিভাবক ও দুইজন সাক্ষী ছাড়া কোন বিবাহ নেই। ’ (সহিহ জামে, হাদিস নং : ৭৫৫৮)
সাক্ষী এমন দুইজন পুরুষ (স্বাধীন) সাক্ষী বা একজন পুরুষ (স্বাধীন) ও দুইজন মহিলা সাক্ষী হতে হবে, যারা প্রস্তাবনা ও কবুল বলার উভয় বক্তব্য উপস্থিত থেকে শুনতে পায়। (আদ-দুররুল মুখতার-৩/৯; ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া-১/২৬৮)
বিয়ের প্রচারণা নিশ্চিত করাও জরুরি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিয়ের বিষয়টি ঘোষণা কর। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ১০৭২)
কনের অভিভাবক হওয়ার জন্য শর্ত
১. সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।
৩. দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্ত হওয়া।
৪.অভিভাবক কনের ধর্মানুসারী হওয়া। সুতরাং কোনো অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম নর-নারীর অভিভাবক হতে পারবে না।
৫. ন্যায়পরায়ণ হওয়া। অর্থাৎ ফাসেক না হওয়া। কিছু কিছু আলেম এ শর্তটি আরোপ করেছেন। অন্যেরা বাহ্যিক ‘আদালত’কে (ধর্মভীরুতা) যথেষ্ট বলেছেন। আবার কারো কারো মতে, যাকে তিনি বিয়ে দিচ্ছেন তার কল্যাণ বিবেচনা করার মত যোগ্যতা থাকলেও চলবে।
৬.পুরুষ হওয়া। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘এক নারী অন্য নারীকে বিয়ে দিতে পারবে না। অথবা নারী নিজে নিজেকে বিয়ে দিতে পারবে না। ব্যভিচারিনী নিজে নিজেকে বিয়ে দেয়। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ১৭৮২; সহিহ জামে : ৭২৯৮)
৭. বিয়ের ক্ষেত্রে বর-কনের ‘কুফু’ বা সমতা ও অন্যান্য কল্যাণের দিক বিবেচনা করতে পারার যোগ্যতাবান হওয়া।
ফিকাহবিদরা অভিভাবকদের ধারা নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং কাছের অভিভাবক থাকতে দূরের অভিভাবকের অভিভাবকত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। কাছের অভিভাবক না থাকলে দূরের অভিভাবক গ্রহণযোগ্য হবে।
বিয়ে সম্পর্কিত কুরআন এর কয়েকটি আয়াত ও এর ফজিলত
বিয়ে মহান আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ নেয়ামতের নাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। ঈমানের পূর্ণতার সহায়ক। যুবক-যুবতীর চরিত্র গঠনের অন্যতম উপাদান। আদর্শ পরিবার গঠন, মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ এবং মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ হচ্ছে বিয়ে, যা প্রত্যেক মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বিয়ে নিয়ে অনেক আয়াত নাজিল করেছেন।বিয়ে সম্পর্কিত কুরআন এর আয়াত এসব আয়াত আমাদের জন্য বিয়ের ব্যপারে পথ প্রদর্শক। এই ব্লগে বিয়ে সম্পর্কিত কুরআন এর কয়েকটি আয়াত ও এর ফজিলত নিয়ে আমরা আলোচনা করব।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে বিয়ে করায় উৎসাহিত করেছেন
বিয়ে একজন নারী বা পুরুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। বিয়ে ছাড়া আমাদের জীবন আনন্দময় হওয়া বা পরিপূর্ণতা লাভ করা কঠিন। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন এবং আমরা যে বিয়ের মাধ্যমে শান্তি লাভ করতে পারবো সে কথাও বলেছেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন কারীমে এই প্রসঙ্গে বলেন,
“আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা রুম : আয়াত ২১)
স্বাুমী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক। একজন ব্যতীত অন্য জনের চলা কষ্টকর। আর বিষয়টিকে বুঝানোর জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অন্যত্র বলেন,
“তারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা (স্বামীগণ) তাদের পোশাকস্বরূপ।” (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)
বিয়ে মানুষকে স্বাবলম্বী ও সম্পদশালী করে তুলে
বিয়ে সম্পর্কিত কুরআন এর আয়াত
বিয়ের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের জন্য আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়া খুব জরুরী। কারণ বিয়ে সম্পর্কিত খরচ এবং বিয়ে পরবর্তী যত সাংসারিক ব্যয়ভার বহন করতে হবে তার সব কিছুই স্বামীর দায়িত্ব। এজন্য অনেক পুরুষই বিয়ের উপযুক্ত বয়স হওয়া সত্বেও সত্ত্বেও আর্থিক সমস্যার কারণে বিয়ে করতে চায় না বা বিয়ে করতে পারেনা। আর এসব কারণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে বিয়েও করতে বলেছেন এবং পাশাপাশি আর্থিক স্বাবলম্বী করে দেওয়ারও প্রতিশ্রতিও দিয়েছেন।
“তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিয়ে সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে স্বচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। যারা বিবাহে সমর্থ নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।” (সূরা নূর : আয়াত ৩২-৩৩)
অর্থাৎ যাদের বিয়ের সময় হয়েছে কিন্তু বিয়ে করছে না শুধু আর্থিক সমস্যার কারণে যদি তারা ন্যায়পরায়ণ হয় তাহলে মহান আল্লাহ তাদেরকে স্বচ্ছল করে দিবেন, কারণ তিনি বিরাট প্রাচুর্যের মালিক।
কাকে বিয়ে করা যাবেনা
একজন মুসলমান কাকে বিয়ে করতে পারবেনা সে বিষয়ে আল কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে।
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকন্যা, ভগ্নিকন্যা, তোমাদের সে মাতা যারা তোমাদের স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যা যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকারী, দয়ালু।” [সূরা নিসা : আয়াত ২৩]
স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিতে হবে খুশীমনে
স্ত্রীদেরকে মোহর দিয়ে বিয়ে করতে হবে, আর মোহর খুশি মনে আদায় করতে হবে। কিন্তু আমরা আমাদের দেশে কখনো কখনো এই বিষয়টি কাবিন নামাতেই থাকে। নগদ প্রদানের অভ্যাস খুব কম। কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই ব্যপারে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে স্ত্রীদের মহরানা খুশি মনে দিয়ে দিতে হবে। মোহর আদায় প্রসঙ্গে আল কুরআনের আয়াত:
“আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশি হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।” [সূরা নিসা : আয়াত ৪]
পুরুষদেরকে একটি বিয়ের জন্যই উৎসাহিত করেন তবে যোগ্যতা থাকলে দুটি বা চারটিও করতে পারবেন
“সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে একটিই, অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।” [সূরা নিসা : আয়াত ৩]
একজন পুরুষ কয়টি বিয়ে করতে পারবেন সে বিষয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে পবিত্র কুরআনুল কারীমে ভালভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি একটি বিয়ের ব্যপারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন কিন্তু কেউ যদি দুটি বা তার অধিক চারটি পর্যন্ত বিয়ে করতে চায়, করতে পারবেন। তবে সকল স্ত্রীর প্রতি সমতা রক্ষা করতে হবে; যা খুবই কষ্টকর। সেক্ষেত্রে তিনি একটি বিয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন।
পবিত্র কুরআনুল কারীমে বিয়ে সম্পর্কিত এসব আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে বিয়ের মত মানব জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন যা আমাদের জন্য খুবই জরুরী।
বিয়ে সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?
উত্তর : বিয়ে মহান আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ নেয়ামত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। ঈমানের পূর্ণতার সহায়ক। যুবক-যুবতীর চরিত্র গঠনের অন্যতম উপাদান এবং তা অনেক সাওয়াবেরও বটে।
আদর্শ পরিবার গঠন, মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ এবং মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ হচ্ছে বিয়ে, যা প্রত্যেক মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বিয়ে সম্পর্কে অনেক আয়াত নাজিল করেছেন।বিয়ে সম্পর্কিত কুরআন এর এসব আয়াত আমাদের জন্য বিয়ের ব্যপারে পথ প্রদর্শক।
বিয়ে একজন নারী বা পুরুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। বিয়ে ছাড়া আমাদের জীবন আনন্দময় হওয়া বা পরিপূর্ণতা লাভ করা কঠিন। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন এবং বিয়ের মাধ্যমে আমরা যে প্রশান্তি লাভ করতে পারবো সে কথাও বলেছেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন কারীমে এই প্রসঙ্গে বলেন,
“আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক স¤প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা রুম : আয়াত ২১)
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক। একজন ব্যতীত অন্য জনের চলা কষ্টকর। আর বিষয়টিকে বুঝানোর জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অন্যত্র বলেন,
“তারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা (স্বামীগণ) তাদের পোশাকস্বরূপ।” (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)।
একজন পুরুষের জন্য আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়া খুব জরুরী। কারণ বিয়ে সম্পর্কিত খরচ এবং বিয়ে পরবর্তী যত সাংসারিক ব্যয়ভার বহন করতে হবে তার সব কিছুই স্বামীর দায়িত্বে। এজন্য অনেক পুরুষই বিয়ের উপযুক্ত হওয়া সত্তে¡ও আর্থিক সমস্যার কারণে বিয়ে করতে চায় না বা বিয়ে করতে পারেনা।কিন্তু অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে বিয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
“তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিয়ে সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে স্বচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। যারা বিবাহে সমর্থ নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।” (সূরা নূর : আয়াত ৩২-৩৩)
এমনটি রাসুল সা.এর একাধিক হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে।
কিন্তু তা তখনই সুফল বয়ে আনবে, যখন বিয়েটা হবে ইসলামিক দিকনির্দেশনায়।যেখানে থাকবে না পশ্চিমাদের কোনো কৃষ্টি-কালচার। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে,আজ ইহুদী-খৃষ্টানদের বিয়ে বিষয়ক প্রথা গুলো আমাদের মুসলিম সমাজে এতটাই ছেয়ে গেছে যে,আমাদের সমাজে সেগুলো কে খুবই পছন্দ ও ভালো কাজ মনে করা হয়ে থাকে।সাথে সাথে একজন নেককার আদর্শ মুসলিম এর জন্য এরকম অপ্রয়োজনীয় কাজ করা কখনোই উচিত নয়। একারণেই দেখা যায় যে,আজ মানুষ বিয়ে করে থাকে ঠিকই, কিন্তু এর ভেতর থাকেনা কুরআন হাদিসের বর্ণিত বারাকাত ।থাকেনা সংসারে প্রশান্তি।
ইসলামে বিয়ে পড়ানোর সঠিক নিয়ম
বিয়ে করা সব নবীর সুন্নত। বিয়ে করা ইবাদত হিসেবেও গণ্য হয় যদি ইসলামি বিধিবিধান মেনে বিয়ে হয়ে থাকে এবং পরবর্তী দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তাআলা ও তার রসুলের দেখানো পথে চলে।
যাদের যিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব।
যাদের যিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব।
মাওলানা নোমান বিল্লাহ
যাদের যৌন চাহিদা রয়েছে তবে জিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা নেই তাদের জন্য বিয়ে করা সুন্নাত। আর যাদের জিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব। যাদের যৌন চাহিদা নেই যেমন, পুরুষত্বহীন ও বয়স্ক ইত্যাদি লোকের বিয়ে করা বৈধ। তবে প্রয়োজন না থাকলে যারা দারুল হরবে তথা যুদ্ধরত কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করেন তাদের জন্য বিয়ে করা হারাম।
বিবাহ সংঘটিত হওয়ার শব্দাবলি
যে কোনো ভাষায় বিবাহ করা বা দেয়া বুঝায় এমন সব শব্দে বিবাহ সংঘটিত হবে। যেমন বলা, (زوجت أو نكحت) আমি বিবাহ করলাম বা বিয়ে দিলাম। অথবা বলা, (قبلت هذا النكاح) আমি এ বিয়ে কবুল করলাম। অথবা (تزوجتها) আমি তাকে বিয়ে করলাম, বা (تزوجت) আমি বিয়ে করলাম, অথবা (رضيت) এ বিয়ে আমি রাজি আছি।
আরবি ভাষার শব্দ ব্যবহার করা মুস্তাহাব। তবে যারা আরবি ভাষা জানেন না তারা তাদের ভাষায় প্রস্তাব দিলে ও কবুল বললেই বিয়ে সংঘটিত হবে।
বিবাহের রুকন
বিয়ের মূল কাজ বা রুকন দুটি। এক. প্রস্তাব দেয়া (الإيجاب): অলি তথা অভিভাবক অথবা যিনি তার স্থলাভিষিক্ত হবেন তার পক্ষ থেকে বিয়ে করার বা বিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া। যিনি আরবি ভালো পারেন তার (إنكاح أو تزويج) শব্দ দ্বারা প্রস্তাব দেয়া উত্তম। কেননা এ শব্দদ্বয় কোরআনে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,فَٱنكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে। (সুরা আন-নিসা ৩)
আরও পড়ুন: জান্নাতে গিয়েও মানুষ যে কারণে আফসোস করবে
দুই. কবুল (القبول): স্বামী বা তার স্থলাভিষিক্ত থেকে বিয়ে কবুল করার শব্দ। যেমন বলা, (قبلت) আমি বিয়ে কবুল করলাম বা (رضيت هذا النكاح) এ বিয়ে আমি রাজি আছি বা শুধু কবুল করেছি বলা। ইজাব তথা প্রস্তাব কবুলের আগে হতে হবে, তবে কোনো আলামত থাকলে আগে কবুল বললেও হবে।
বিবাহের শর্তাবলী
বিয়ের শর্ত চারটি। এক. স্বামী-স্ত্রী নির্ধারিত হওয়া। দুই. স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকা। অতএব, স্বামী-স্ত্রী কাউকে জোর করে বিয়ে দেয়া জায়েজ নেই। কুমারী ও অকুমারী উভয়ের অনুমতি নিবে। কুমারীর চুপ থাকা তার অনুমতি দেয়া আর অকুমারীর মৌখিক সম্মতি নিতে হবে। পাগল ও নির্বোধের ক্ষেত্রে এটি শর্ত নয়।
তিন. অভিভাবক: অভিভাবক পুরুষ, স্বাধীন, বালিগ (প্রাপ্তবয়স্ক), আকেল (জ্ঞানবান), বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়া শর্ত। এছাড়া একই দীনের অনুসারী হওয়াও শর্ত। বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের বাবা তার অভিভাবক হওয়ার সর্বাধিক যোগ্য, তারপর বাবার অসিয়তকৃত ব্যক্তি, তার দাদা, এভাবে উর্ধতন দাদারা, তার ছেলে ও নিম্নতম ছেলেরা, তার সহোদর ভাই, তারপর তার বৈমাত্রেয় ভাই, তারপর এসব ভাইয়ের ছেলেরা, তারপর, আপন চাচা, তারপর বৈমাত্রেয় চাচা, তারপর তাদের সন্তানেরা, তারপর বংশীয় নিকটাত্মীয়রা, তারপর দেশের বাদশাহ অভিভাবক হবেন।
চার. সাক্ষ্য: ন্যায়পরায়ণ, পুরুষ ও শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য (প্রাপ্তবয়স্ক) এমন দুজন সাক্ষ্যের সাক্ষী ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ হবে না। পাঁচ. স্বামী-স্ত্রী উভয়ে বিবাহ বন্ধনে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞামুক্ত থাকা (অর্থাৎ যাদের সাথে বিয়ে হারাম তাদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া)।
বিবাহ পড়ানোর সুন্নাহ পদ্ধতি
প্রথমে কনের কাছ থেকে ইজন বা অনুমতি নিতে হবে। বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী বা বর-কনেই মুখ্য, যারা সারা জীবন একসঙ্গে ঘর-সংসার করবে। তাই বিবাহের আগে তাদের সম্মতি থাকতে হবে।
কোনো অবস্থায়ই কোনো ছেলে-মেয়ের অসম্মতিতে তাদের বিবাহ করতে বাধ্য করা উচিত নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে তোমরা বলপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকারী হবে। (সুরা নিসা ১৯)
হজরত আবু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরায়রা (রা.) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে নবী (স.) বলেছেন, কোনো বিধবা নারীকে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারি নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসুল, কিভাবে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বলেন, তার চুপ থাকাই তার অনুমতি। (বুখারি ৫১৩৬)
তারপর অভিভাবক (যদি বিবাহ পড়াতে সক্ষম হন) বা যিনি বিবাহ পড়াবেন তিনি বিবাহের খুতবা পাঠ করবেন। এরপর মেয়ের অভিভাবক বরের সামনে মেয়ের পরিচয় ও মোহরের পরিমাণ উল্লেখ করবেন। তারপর তিনি বিবাহের প্রস্তাব পেশ করবেন। অথবা অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে যিনি বিবাহ পড়াবেন তিনি হবু বরের কাছে বিবাহের প্রস্তাব তুলে ধরবেন। এটাকে ইসলামের ভাষায় ‘ইজাব’ বলা হয়।
বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে। বিশেষ করে মেয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি একান্তভাবে আবশ্যক। কারণ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ হয় না। নবী করিম (স.) বলেন, ‘অভিভাবক ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।’ (তিরমিজি ১১০১)
যিনি বিয়ে পড়াবেন তিনি উপস্থিত মজলিসে হবু বরের উদ্দেশে বলবেন যে অমুকের মেয়ে অমুককে এত টাকা মোহরানায় আপনার কাছে বিবাহ দিলাম, আপনি বলুন ‘কবুল’ বা ‘আমি গ্রহণ করলাম’।
বিয়ে পড়ানোর সময় কমপক্ষে দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে। তখন বর উচ্চ স্বরে ‘কবুল’ অথবা ‘আমি গ্রহণ করলাম’ বা সম্মতিসূচক ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলবে। এরূপ তিনবার বলা উত্তম (বুখারি ৯৫)। স্মরণ রাখতে হবে যে, আগে খুতবা পাঠ করতে হবে তারপর ইজাব-কবুল (প্রস্তাব দেয়া-নেয়া)।
শুধু বরকেই কবুল বলাতে হবে। কনের কাছ থেকে কনের অভিভাবক শুধু অনুমতি নেবেন। বর বোবা হলে সাক্ষীদ্বয়ের উপস্থিতিতে ইশারা বা লেখার মাধ্যমেও বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। এভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর উপস্থিত সবাই পৃথকভাবে সুন্নতি দোয়া পাঠ করবে, ‘বা-রাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বা-রাকা আলাইকা, ওয়া জামাআ বায়নাকুমা ফী খায়ের।’
‘আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার ওপর বরকত দিন ও তোমাদের দুজনকে কল্যাণের সঙ্গে মিলিত করুন।’ (তিরমিজি ১০৯১)
বিবাহের খুতবা: বিবাহের খুতবার জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট কাঠামোতে হামদ ও সানা বা আল্লাহর প্রশংসা করবে। তারপর পবিত্র কোরআনের তিনটি আয়াত পাঠ করবে, যা যথাক্রমে সুরা নিসা, আয়াত: ১, সুরা আলে ইমরান ১০২ এবং সুরা আহজাব, আয়াত ৭০-৭১। (সুনানে আবু দাউদ ২১১৮)
একজন মুসলিম এর বিয়ের প্রস্তুতি
আল-হামদুলিল্লাহ, বিয়ের দ্বারা ইমানের অর্ধেক পূর্ণতা লাভ হয়। তাই একজন মুমিনের জন্য বিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কোন কাজ করার আগে সেই বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হয়। একজন মুসলমান কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
মুত্তাকী হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলাঃ
আল্লাহ্ তাআলার সাধারণ নিয়ম হল, যে যেমনভাবে নিজের চরিত্রকে গড়ে তুলবেন তাকে সেই রকম জীবন সঙ্গী দান করবেন। আমরা সবাই একজন সুন্দর চরিত্রের জীবন সঙ্গী চাই কিন্তু নিজের ব্যাপারে গাফেল থাকি, তাহলে কিভাবে একজন ভাল জীবন সঙ্গী পাওয়া যেতে পারে?
মুসলিম এর বিয়ের প্রস্তুতি
এই জন্য নিজের চরিত্রকে, আমলকে সুন্দর করতে হবে। তাহলে আশা করা যায় ভাল জীবন সঙ্গী পাওয়া যাবে। ব্যতিক্রমও হতে পারে, তা ঈমানের পরীক্ষার জন্য বা তার মর্যাদাকে উন্নত করার জন্য। কিন্তু তা খুবই ব্যতিক্রম। একইভাবে সকল প্রকার পাপাচার থেকে নিজেকে হেফাজত করতে হবে তাহলে ইনশাআল্লাহ্ আশা করা যায় সুন্দর চরিত্রবান জীবন সঙ্গী জীবনে জুটবে।
দোয়া করাঃ
মহান আল্লাহর কাছে একজন নেককার, সুন্দর জীবনসঙ্গীর জন্য দোয়া করতে হবে। দোয়ার জন্য নির্দিস্ট দোয়া বা কোন সময় নেই। যেকোনভাবে, যেকোন সময় দোয়া করা যাবে।
সুরা ফুরকান এর ৭৪ নং আয়াতের শেষ অংশ পাঠ করতে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে।
দোয়াঃ “রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররি ইয়াতিনা কুররাতা আইয়ুনিও ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।”
এর অর্থ হচ্ছে- “হে আমাদের রাব্ব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন যারা আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ স্বরুপ করুন”
দ্বীনদার পাত্র–পাত্রী খুঁজে নেওয়ার চেস্টা করাঃ
পাত্রী বা পাত্র খোঁজ করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারীতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য্যকে প্রাধান্য দেই আর ছেলেদের ক্ষেত্রে অর্থ সম্পদকে প্রাধান্য দেই। কিন্তু ইসলামে তথা হাদিসে দ্বীনদারীকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। কারণ এই দ্বীনদার অর্থাৎ দুনিয়া বিমুখ জীবন সঙ্গী পেলে সুখী হওয়া যাবে আশা করা যায়। কারণ এতে অল্পতুস্টির অভ্যাস পয়দা হবে।
অধিকার সম্পর্কে জানাঃ
স্বামী–স্ত্রীর একে অপরের অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। স্বামী তার স্ত্রীর ইজ্জত ও আব্রুর নিরাপত্তা সহ খাদ্য, পোশাক যাবতীয় ভরন পোশনের দায়িত্ব পালন করবে। স্ত্রী তার স্বামীর অনুগত হয়ে চলবে, তার ডাকে আহ্বান দিবে, স্বামীর অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে ইত্যাদি। স্ত্রীর বিয়ের পুর্বে গৃহস্থালীর কাজ জেনে নিতে হবে। অর্থাৎ বিয়ের পরে রান্না–বাড়া সহ দৈনন্দিন সকল কাজ পূর্ব থেকে জেনে নিতে হবে।
একজন মুসলিম এর বিয়ের প্রস্তুতি
হালাল উপার্জনের চেস্টা করাঃ
বিয়ের পর স্বামীকে পরিবারের যাবতীয় ভরন পোশনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই জন্য হালাল উপার্জনের ব্যাবস্থা থাকতে হবে যাতে সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে অন্যের মুখাপেক্ষী না হতে হয়। আর্থিক এবং শারিরীক সামর্থ্য না থাকলে ইসলাম তাকে বিয়ের জন্য উৎসাহিত করেনা। হালাল উপার্জন করতে হবে, কিন্তু প্রচুর পরিমাণে উপার্জন থাকতে হবে তা জরুরী নয়।
তালাক প্রদানের মাছআলা জানাঃ
বিয়ের শুরুতেই একজন মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে তালাকের মাছআলা জানতে হবে। কারণ কোন কথার দ্বারা তালাক হয়ে যায়, তা জানা না থাকলে পরে সমস্যা হতে পারে। তালাকের পরে আফসোস না করে আগেই এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।
পারিবারিক ব্যবস্থাপনা জানাঃ
একে অপরের শ্বশুর বাড়ির লোকদের অধিকার ও পর্দা সম্পর্কে জানতে হবে। কার সাথে দেখা করা যাবে, কথা বলা যাবে এবং কার সাথে যাবে না এই মাছআলা জানতে হবে। এতে পারিবারিক ব্যাবস্থাপনা সুন্দর থাকবে। স্ত্রীর জন্য আলাদা একটি ঘরের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সে নিজেকে পর্দার সাথে থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা একজন পুরুষকে বিয়ের পূর্বেই করতে হবে।
ইনশাআল্লাহ্ বিয়ের আগে এসব প্রস্তুতির দ্বারা আমরা একটি সুন্দর ও সফল বিবাহিত জীবন পেতে পারি।
ইসলাম বিবাহ সহজ করার কথা বলে
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, তোমরা যে ব্যক্তির দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ, তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে বিয়ে দাও। তা যদি না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে
[ জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪ ]
জাওয়াদ তাহের
ইসলাম বিবাহ সহজ করার কথা বলে
বিবাহ কঠিন নয়, সহজ করতে হবে—এটা ইসলাম চায়। বিবাহ সহজ করার কথাই বলে ইসলাম। বিবাহ যদি কঠিন করা হয়, তাহলে সমাজে ব্যভিচার আর অন্যায় বাড়বে। কিন্তু বিবাহ যদি সহজ করা হয় তাহলে সমাজে ব্যভিচার কমবে শান্তি বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে আমরা নানাভাবে, নানা কায়দায় বিবাহ জিনিসটাকে কঠিন করে তুলেছি। বিবাহের কথা বিশাল আকারের কোনো পাহাড় মাথায় জেঁকে বসে। যার কারণে একজন পুরুষকে বিবাহের কথা ভাবতে হলে তাকে অনেক কিছুর কথা চিন্তা করতে হয়। নিচে আমরা বিবাহকে কিভাবে সহজ করতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করব।
বিবাহ আল্লাহর নিদর্শন
বিবাহের আগে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ থাকে না। কিন্তু বিবাহের পর তাদের মধ্যে এমন অদৃশ্য গভীর বন্ধন ও ভালোবাসা গড়ে ওঠে; তারা অতীত জীবনকে ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণরূপে একে অন্যের হয়ে যায়। এখন আর একজন অন্যজন ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। যৌবনকালে না হয় এ ভালোবাসার পেছনে জৈব তাগিদের কোনো ভূমিকাকে দাঁড় করানো যাবে; কিন্তু বৃদ্ধকালে কোন সে তাড়না এ ভালোবাসাকে স্থিত রাখে? তখন তো দেখা যায়, একের প্রতি অন্যের টান ও মমতা আরো বৃদ্ধি পায়।
এটাই কুদরতের সেই নিদর্শন, যার প্রতি আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাঁর এক নিদর্শন এই যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর ভেতর নিদর্শন আছে সেই সব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সুরা : আয়াত : ২১)
বড় আয়োজন বর্জন করতে হবে
আমাদের তরুণসমাজ অনেকেরই ধারণা বিবাহ করতে গেলে বিশাল বড় আয়োজন করতে হবে। যদি বড় আয়োজন না করে তাহলে মানুষ কী বলবে, লোকেরা কী ধারণা করবে! চক্ষুলজ্জায় হলেও আমাদের সাধ্যের বাইরে গিয়ে আয়োজন করতে হবে।
এমন মনমানসিকতা কমবেশি সবাই লালন করে। হাদিসে অলিমার কথা এসেছে। অলিমার ব্যবস্থা সাধ্য অনুযায়ী মানুষ আয়োজন করবে। লোক দেখানোর জন্য অলিমা করবে না। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বিয়ের প্রথম দিনের ভোজের ব্যবস্থা করা আবশ্যকীয়, দ্বিতীয় দিনের ভোজের ব্যবস্থা করা সুন্নত এবং তৃতীয় দিনের ভোজ হলো নাম-ডাক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে। যে ব্যক্তি নাম-ডাক ছড়াতে চায়, (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তাআলা তাকে তদ্রুপ (অহংকারী ও মিথ্যুক হিসেবে) প্রকাশ করবেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৯৭)
বিপুল অর্থের মোহর নির্ধারণ না করা
বিবাহ কঠিন হওয়ার আরেকটি বড় অন্যতম কারণ হচ্ছে চড়া মূল্যের মোহর নির্ধারণ করা। অথচ শরিয়ত নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে, চড়া মূল্যে মোহর নির্ধারণ করাকে কোনোক্রমেই পছন্দ করে না। আবুল আজফা আস-সুলামি (রহ.) বলেন, একবার ওমর (রা.) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন, সাবধান! তোমরা নারীদের মোহর নির্ধারণে সীমা লঙ্ঘন করো না। কারণ যদি তা দুনিয়ার মর্যাদার বস্তু হতো এবং আল্লাহর কাছে পরহেজগারির বস্তু হতো, তাহলে তোমাদের চেয়ে নবী (সা.) হতেন এর যোগ্যতম ব্যক্তি। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারো মোহর এবং তাঁর কন্যাদের কারো মোহর ১২ উকিয়ার বেশি ধার্য করেননি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১০৬)
কুসংস্কার পরিহার
সামাজিক যেসব কুসংস্কার আছে তা পরিহার করা। আমাদের সমাজে প্রচলিত বিবাহের মাঝে অনেক কুসংস্কার আছে। বিবাহের অনুষ্ঠানে গিফট বুথ রাখা। অর্থাৎ বিবাহে আগন্তুক যত মানুষ আসবে তাদের বাধ্যতামূলক উপঢৌকন দেওয়া—এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা। যাতে মানুষ চক্ষুলজ্জায় হলেও উপঢৌকন দেয়। এসব দেখে অতিথি অনেক সময় চক্ষুলজ্জায় উপঢ্যৌকন দিয়ে থাকে। অথচ উপঢৌকন দেওয়া-নেওয়ার মাঝে সন্তুষ্ট থাকা চাই। এভাবে জোর করে, চাপ দিয়ে উপঢৌকন নেওয়ার কোনো অর্থ হতে পারে না।
তেমনি বরযাত্রীকে গ্রহণ করার জন্য গেট ফি থাকে। এসব নিয়ে কত বিয়ের মাঝে যে মনোমালিন্য হয় তার কোনো ইয়াত্তা নেই। ইসলাম এসবের কোনোটাই সমর্থন করে না। এসব আয়োজনের মাঝেই অনেক এমন অনৈসলামিক কার্যকলাপ ঘটে থাকে, যার কারণে আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর ক্রোধান্বিত হন। এসব কারণে বিবাহের মধ্যে আল্লাহ তাআলা যে বরকত রেখেছেন সে বরকত উঠিয়ে নেন।
উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পাওয়ার পরও
বিবাহ না দেওয়া
অনেকেই আছেন নিজের ক্যারিয়ারকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিবাহতে যথেষ্ট বিলম্ব করে থাকেন। উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পাওয়ার পরও বিবাহ দিতে চান না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যে ব্যক্তির দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে বিয়ে দাও। তা যদি না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪)
অভাবের ভয়ে বিবাহ না করা
আমাদের সমাজে অনেকে এমন আছেন যে তাদের বিশ্বাস, বিবাহ করলে অভাব বেড়ে যাবে। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)
এ আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বালেগ নারী-পুরুষ যদি বিবাহের উপযুক্ত হয়, তবে অভিভাবকদের উচিত তাদের বিবাহের জন্য চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে বর্তমান সামর্থ্যই যথেষ্ট। বিবাহের পর স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে সে অভাবে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় বিবাহ বিলম্বিত করা সমীচীন নয়। চরিত্র রক্ষার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করে বিবাহ দিলে অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহের জন্য আল্লাহ তাআলা উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা করে দেবেন। (তাওজিহুল কোরআন)
ইবনে মাসউদ বলতেন, ‘তোমরা যদি ধনী হতে চাও, তবে বিবাহ করো।’ (মাআরেফুল কোরআন)
যৌতুক দাবি করা
যারা বিবাহের মাঝে স্ত্রীর ওপর যৌতুক দাবি করে তাদের মতো নিম্ন, নিচু ইতর শ্রেণি আর হতে পারে না। এই যৌতুকের মতো গজব চাপিয়ে আমাদের সমাজে যে কত বিশৃঙ্খলা আর অশান্তি হচ্ছে, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভালো জানেন।
ইসলামি বৈবাহিক আইনশাস্ত্র
ইসলামে বিবাহের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না।
বিবাহের আরবি শব্দ হলো নিকাহ। নিকাহ এর শাব্দিক অর্থ হলো, একত্রিত হওয়া, নারী পুরুষ মিলিত হওয়া। পারিভাষিক অর্থে নিকাহ বা বিবাহ বলা হয়। ইসলামী শরীয়াহ আইন অনুযায়ী, বিবাহ হল একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে নিষ্পন্ন বৈধ বন্ধন ও সামাজিক চুক্তি । ইসলামে বিবাহ হল একটি সুন্নাহ বা মুহাম্মাদ (সা) এর আদর্শ এবং ইসলামে বিবাহ করার জন্য অত্যন্ত জোরালোভাবে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।[১][২] পাশাপাশি, ইসলামে সন্ন্যাসজীবন এবং কৌমার্যেরও কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে।[২] একজন ব্যক্তি তখনই বিবাহের বয়সী হবে, যখন সে মানসিক, দৈহিক ও আর্থিকভাবে বৈবাহিক জীবন নির্বাহ করতে সমর্থ হবে । বিশেষ শর্তসাপেক্ষে পুরুষের বহুবিবাহের জন্য ইসলামে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে নারীর বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ইসলামে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
অর্থ: “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক উৎস থেকে। আর তা থেকে তোমাদের স্ত্রীদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। এরপর তা থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” (সূরা নিসা, আয়াত ০১)
“পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।” (সুরা নিসা: ৩৪)
ইসলামী শরীয়ত অনুসারে বিবাহের রুকন বা মূল স্তম্ভ হচ্ছে দু’টি। ১.ইজাব তথা প্রস্তাব, ২.কবুল, বা গ্রহণ। এর জন্য আবশ্যকীয় শর্ত হচ্ছে সাক্ষী থাকা
যাদের বিবাহ করা হারাম (নিষিদ্ধ)
সম্পাদনা
কুরআনের আলোকে যাদের সঙ্গে বিবাহ হারাম তারা হলেন:
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকন্যা, ভগিনীকন্যা, তোমাদের সে মাতা যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সঙ্গে সহবাস করেছ, সে স্ত্রীদের কন্যা যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সঙ্গে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই, তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকরী, দয়ালু। এবং অন্যের বৈধ স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম।
যে সমস্ত মহিলাদেরকে বিবাহ করা হারাম তাদেরকে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ মহিলা: তারা তিন শ্রেণীর।
ক.বংশগত কারণে নিষিদ্ধ: তারা হলেন-
১. মাতা
২. দাদী
৩. নানী
৪. নিজের মেয়ে, ছেলের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে যত নিচেই যাক না কেন।
৫. আপন বোন, বৈমাত্রেয় বোন ও বৈপিত্রেয় বোন।
৬. নিজের ফুফু, পিতা, মাতা, দাদা, দাদী, নানা ও নানীর ফুফু।
৭. নিজের খালা, পিতা, মাতা, দাদা, দাদী, নানা ও নানীর খালা।
৮. আপন ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই ও বৈপিত্রেয় ভাই ও তাদের অধঃতন ছেলেদের কন্যা।
৯. আপন বোন, বৈমাত্রেয় বোন ও বৈপিত্রেয় বোন ও তাদের অধঃতন মেয়েদের কন্যা।
খ. দুগ্ধ সম্বন্ধীয় কারণে নিষিদ্ধ:
বংশগত কারণে যাদেরকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ দুগ্ধ সম্বন্ধের কারণেও তারা নিষিদ্ধ। তবে, শর্ত হচ্ছে-
দুই বছরের আগেই স্তন্য পান করা। দুই বছর বয়সের পর স্তন্য পান করলে স্তন্যদানকারীনির সঙ্গে তার দুগ্ধ সম্পর্ক সৃষ্টি হবে না।
গ. বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে নিষিদ্ধ:
১. পিতা, দাদা ও নানা (যতই উপরে যাক না কেন) যাদেরকে বিবাহ করেছেন।
২. কোন পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হোক বা না হোক উক্ত পুরুষের পুত্র-পোত্র বা প্রপোত্রের সঙ্গে মহিলার বিবাহ নিষিদ্ধ।
৩. কোন পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হোক বা না হোক উক্ত পুরুষের পিতা-দাদা বা নানার সঙ্গে মহিলার বিবাহ নিষিদ্ধ।
৪. শাশুড়ী। মহিলার সঙ্গে বিবাহ হলেই তার মাতা ও দাদী বা নানী হারাম হয়ে যাবে। দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হোক বা না হোক।
৫. স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেই তার কন্যা, তার পুত্রের কন্যা ইত্যদি হারাম হয়ে যাবে।
সাময়িক ভাবে নিষিদ্ধ মহিলা:
সাময়িক কারণে কখনো কখনো মহিলাকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ হয়ে থাকে। উক্ত কারণ দূর হয়ে গেলে তাকে বিবাহ করা বৈধ হবে।
১. কোন মহিলাকে বিবাহ করলেই তার আপন বোন, ফুফু, খালাকে বিবাহ করা হারাম গণ্য হবে। তবে, তাকে যখন তালাক দিয়ে দেবে কিংবা, স্বামী মারা যাবে এবং সে ইদ্দত শেষ করবে, তখন তাকে সে বিবাহ করতে পারবে।
২. যে মহিলা অন্যের বিবাহাধীনে ছিল। তাকে স্বামী তালাক দিয়েছে কিংবা মারা গেছে এবং সে ইদ্দত পালন করছে; এমতাবস্থায় তাকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলেই বিবাহ করতে পারবে।
বহুবিবাহ
ইসলাম আসলে পুরুষদের অসংখ্য বিয়ের সুযোগ রহিত করে দিয়েছে। ইসলাম বিবাহ বিমুখ সমাজে এসে লোকদেরকে পাইকারী হারে চারটি করে বিয়ের নির্দেশ দেয় নি, বরং নারীদের যথেচ্ছ ব্যবহারে উন্মুখ সমাজে পুরুষদের শতাধিক বিয়ের ক্ষমতাকে রহিত করে দিয়ে তাকে সর্বোচ্চ চারটির মধ্যে স্থির করে দিয়েছে। ইসলাম পূর্ব আরব সমাজে নারীদেরকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা হতো। এক একজন ব্যক্তির স্ত্রীদের কোন সীমা রেখা ছিলো না। শুধু মুসলমান নয় অন্যান্য ধর্মের অনুসারি সহ অনেকের স্ত্রীদের সংখ্যা ছিলো ১০০ (একশত) এরও বেশি। ১০/১৫ টি ছিলো সাধারণ বিষয়।
ইসলাম পুরুষদেরকে একাধিক তথা চারটি বিয়ের ‘নির্দেশ’ দেয়নি, বরং প্রয়োজনীয় শর্ত সাপেক্ষে ‘অনুমতি’ দিয়েছে। যদি শর্ত পূরণ করা না যায়, তাহলে একটির অধিক বিবাহ করাকেও হারাম বলেছে।
ইরশাদ হয়েছে,
“তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি।”(সূরা নিসা, আয়াত ৩)
অনুমোদিত বয়স
ইসলামে বিবাহের জন্য কোনো বয়সের সীমারেখা নেই, বরের ক্ষেত্রে মনোদৈহিক ও আর্থিক সামর্থ্য তৈরি হলে এবং কনের ক্ষেত্রে অভিভাবকের উপস্থিতিতে নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী সকল বয়সে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া বৈধ । তবে বিবাহের পরেও দৈহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়েরই শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত ও পরিপক্ব হওয়া আবশ্যক ।
পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সমতা (কুফু)
মূল নিবন্ধ: কুফু
কাফাহ বা কুফু (আরবি: الكفاءة; আল-কাফ’আ) হল ইসলামে বিয়ের ব্যাপারে ইসলামী আইনশাস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি শব্দ, যার আরবি ভাষায় আক্ষরিক অর্থ, সমতা বা সমতা। এইভাবে এটি একটি সম্ভাব্য স্বামী এবং তার সম্ভাব্য স্ত্রীর মধ্যে সামঞ্জস্য বা সমতা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যা মেনে চলতে হবে।এই সামঞ্জস্য ধর্ম, সামাজিক মর্যাদা, নৈতিকতা, ধার্মিকতা, সম্পদ, বংশ বা রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত একাধিক কারণের উপর নির্ভরশীল।
মোহরানা
ইসলামে, মহর বা মোহর হল বিবাহের সময় কনের দাবিকৃত অর্থ বা সম্পদ, যা বর বা বরের পিতার পক্ষ থেকে কনেকে প্রদান করতে হয়| মোহরানা ধার্য করা ওয়াজিব। এটি প্রদান করা বাধ্যতামুলক| মহরের মাধ্যমেই পূর্ণাঙ্গ বিয়েকে বৈধ করা হয়| প্রাচীন আরবে যৌতুক দেয়ার প্রথা চালু ছিল, নবুয়াত প্রাপ্তির পর মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশে যৌতুক প্রথাকে নিষিদ্ধ করে আবশ্যক দেনমহরপ্রথা চালু করেন| ইসলামে মহরের কোন সীমারেখা নেই| মোহর বাকি না রেখে যথাসাধ্য আদায় করতে বলা হয়েছে, যেন কনের মহর প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়|
যদি মহরানা ধার্য না করে বিয়ে করে ফেলে তারপরও স্ত্রীকে মহরানা দিতে হবে। এটা কোন মতেই বাদ দেয়া যাবে না। এসম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে:
“আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সুরা নিসা: ৪)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
“তোমরা তাদেরকে বিয়ে করলে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না, যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহর প্রদান কর।” (সুরা মুমতাহিনা: ১০)
ওয়লিমা হচ্ছে বিয়ের পরের দিন বরের বাড়িতে বরের সাধ্য অনুযায়ী অনুষ্ঠান করা। হযরত মুহাম্মদ (সা) কোন বিয়েতে ওয়ালিমা করে অনেক মানুষকে খাইয়েছিলেন। আবার কোন বিয়েতে অল্প পরিসরে অনুষ্ঠান করেছিলেন
হাদিসের আলোকে পুরুষের বিয়ের যোগ্যতা
আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সৃষ্টি করছেন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বিষয়টাকে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের অংশ।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯৫)
হাদিসে অবিবাহিত নারী ও পুরুষকে কর্পদকশূন্য মিসকিনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যদিও তাদের অঢেল ধন-সম্পদ থাকে। (বাইহাকি ফি শুআবিল ইমান: ৫০৯৭)।
নারী পুরুষের মধ্যে পরিপূর্ণতা তখনই আসে—যখন তারা আল্লাহর নামে একে অপরকে গ্রহণ করে। আর এই গ্রহণের ধর্মসম্মত ও সামাজিক পদ্ধতিকেই বলা হয় বিবাহ।
বিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, বংশরক্ষা এবং শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্য থেকে এটি একটি যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করতে পার এবং তিনি তোমাদের (স্বামী-স্ত্রীর) পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা রূম: ২১)
তবে বিয়ে করার জন্য নারী ও পুরুষ উভয়কেই বিয়ের যোগ্য হতে হয়। এখানে আমরা হাদিসের আলোকে পুরুষের বিয়ের যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করব।
পুরুষ কখন বিবাহের যোগ্য হয়?
হাদিস থেকে বোঝা যায়—একজন পুরুষ তখনই বিয়ের যোগ্য হয়, যখন সে একজন নারীর দায়িত্বগ্রহণের যোগ্য হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) যুবকদের বলেন, তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের (অর্থনৈতিক ও শারীরিক) সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে এবং যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা, রোজা যৌনচাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে। (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)
আরেকটি হাদিসে বিয়েকে ‘সম্পদশালী’ হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন :
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ‘যু-তওল’ (অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়ার মতো সম্পদশালী), সে যেন বিয়ে করে, কারণ তা দৃষ্টিকে অবনতকারী এবং লজ্জাস্থানের অধিক হেফাজতকারী। আর যে ব্যক্তি সম্পদশালী নয়, সে যেন রোজা রাখে; কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ। (সহিহুল জামে: ৬৪৯৮)
দুটো হাদিসেই বিয়ের জন্য সামর্থ্যবান বা সম্পদশালী হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সামর্থ্য না থাকলে যৌন উত্তেজনা প্রশমনের জন্য রোজা রাখতে বলা হয়েছে। কারণ সম্পদ না থাকলে কেউ যথাযথভাবে দায়িত্বগ্রহণ করতে পারবে না। বিয়ের উদ্দেশ্য স্রেফ যৌনতা নয়, বরং এর সঙ্গে স্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ, সন্তানের জন্ম ও তার প্রতিপালনসহ অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে আছে।
প্রাপ্তবয়স্ক হলে পুরুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণবোধ করে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হলেও দায়িত্ব গ্রহণের উপযুক্ত না হলে পুরুষ বিয়ের যোগ্য হয় না। তাই এই অবস্থায় তার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নিজেকে তৈরি করা উচিত।
বিয়ে করে ফেলার পর দায়িত্বে অবহেলা বা ব্যর্থতা ইসলামে অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাসুল (সা.) বলেন, আমি দুই শ্রেণির দুর্বলের অধিকারের বিষয়ে কঠোরতা আরোপ করছি: এতিম ও নারী। (সহিহুল জামে: ২৪৪৭)
আরেকটি হাদিসে এসেছে, প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।… একজন পুরুষ—সে তার পরিবারের দায়িত্বশীল, আর তার পরিবারের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। (মুসনাদে আহমদ: ৫১৬৭)
এ ছাড়া বিদায় হজের ভাষণেও রাসুল (সা.) নারীর প্রতি দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সর্বাধিক সচেতনতা অবলম্বন করার নসিহত করেছেন। (সুনানে তিরমিজি: ১১৬৩)
বিবাহ, এর বিধান ও শর্তাবলী বিবাহ শরী‘আতসম্মত হওয়ার হিকমত:
বিবাহ ইসলামের একটি অন্যতম সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন,
«يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ».
“হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহ করার সামর্থ রাখে, তারা যেন বিবাহ করে। কেননা, বিবাহ তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং যৌনতাকে সংযমী করে। আর যাদের বিবাহ করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সাওম পালন করে; কেননা, সাওম তার যৌনতাকে দমন করবে।”[1] (একদল বর্ণনাকারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
বিবাহের হিকমতের মধ্যে:
১- পারিবারিক সম্পর্ক বজায়, পরস্পর ভালোবাসা বিনিময়, আত্মসংযম ও হারাম কাজ থেকে নিজেকে হিফাযত করতে বিবাহ একটি উত্তম মাধ্যম ও উপায়।
২- (হালালভাবে) বংশ পরিক্রমা ঠিক রেখে সন্তান জন্ম দেওয়া ও বংশ বিস্তারে বিবাহ একটি উত্তম পদ্ধতি।
৩- নানা রোগ-ব্যাধিমুক্ত ও নিরাপদে মানুষের যৌন চাহিদা মিটাতে ও মনোবাসনা পূরণ করতে বিবাহ একটি সুন্দরতম পদ্ধতি।
৪- বিবাহের মাধ্যমে সন্তান লাভের দ্বারা পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের স্বাদ ভোগ করা যায়।
৫- বিবাহে রয়েছে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য শান্তির আবাস, প্রশান্তি, শালীনতা ও সচ্চরিত্র।
বিবাহের শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচিতি:
বিবাহের শাব্দিক সংজ্ঞা:
নিকাহ তথা বিবাহের শাব্দিক অর্থ যৌন সঙ্গম, দু’টি জিনিস একত্রিত করা। কখনও কখনও নিকাহ বন্ধন বা চুক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়, (نكح فلانة) যখন কেউ বিয়ে করার দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করে ও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আবার বলা হয়, (نكح امرأته) সে তার স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম করল।
শরী‘আতের পরিভাষায় বিবাহ:
عقد يعتبر فيه لفظ إنكاح أو تزويج في الجملة والمعقود عليه منفعة الاستمتاع أو الازدواج أو المشاركة.
“নিকাহ হলো এমন একটি চুক্তি যাতে ‘বিবাহ দেওয়া বা বিবাহ করা’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে উপভোগ বা একত্রে থাকা বা পরস্পর অংশীদার হওয়া বুঝায়”।
বিবাহের হুকুম:
যাদের যৌন চাহিদা রয়েছে তবে যিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা নেই তাদের জন্য বিয়ে করা সুন্নাত। আর যাদের যিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব। যাদের যৌন চাহিদা নেই যেমন, পুরুষত্বহীন ও বয়স্ক ইত্যাদি লোকের বিয়ে করা বৈধ। তবে প্রয়োজন না থাকলে যারা দারুল হরবে তথা যুদ্ধরত কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করেন তাদের জন্য বিয়ে করা হারাম।
বিবাহ সংঘটিত হওয়ার শব্দাবলী:
যে কোনো ভাষায় বিবাহ করা বা দেওয়া বুঝায় এমন সব শব্দে বিবাহ সংঘটিত হবে। যেমন বলা, (زوجت أو نكحت) আমি বিবাহ করলাম বা বিয়ে দিলাম। অথবা বলা, (قبلت هذا النكاح) আমি এ বিয়ে কবুল করলাম। অথবা (تزوجتها) আমি তাকে বিয়ে করলাম, বা (تزوجت) আমি বিয়ে করলাম, অথবা (رضيت) এ বিয়ে আমি রাজি আছি।
আরবী ভাষার শব্দ ব্যবহার করা মুস্তাহাব। তবে যারা আরবী ভাষা জানেন না তারা তাদের ভাষায় প্রস্তাবনা ও কবুল করলেই বিয়ে সংঘটিত হবে।
বিবাহের রুকনসমূহ:
বিয়ের রুকন দু’টি। তা হলো:
১- প্রস্তাব (الإيجاب): অলী তথা অভিভাবক অথবা যিনি তার স্থলাভিষিক্ত হবেন তার পক্ষ থেকে বিয়ে করার বা বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া। যিনি আরবী ভালো পারেন তার (إنكاح أو تزويج) শব্দ দ্বারা প্রস্তাব দেওয়া উত্তম। কেননা এ শব্দদ্বয় কুরআনে এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿فَٱنكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ ﴾ [النساء : ٣]
“তাহলে তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩]
২- কবুল (القبول): স্বামী বা তার স্থলাভিষিক্ত থেকে বিয়ে কবুল করার শব্দ। যেমন বলা, (قبلت) আমি বিয়ে কবুল করলাম বা (رضيت هذا النكاح) এ বিয়ে আমি রাজি আছি বা শুধু কবুল করেছি বলা। ইজাব তথা প্রস্তাব কবুলের আগে হতে হবে, তবে কোনো আলামত থাকলে আগে কবুল বললেও হবে।
বিবাহের শর্তাবলী:
বিয়ের শর্ত চারটি। তা হচ্ছে:
১- স্বামী-স্ত্রী নির্ধারিত হওয়া।
২- স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকা। অতএব, স্বামী-স্ত্রী কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়া জায়েয নেই। কুমারী ও অকুমারী উভয়ের অনুমতি নিবে। কুমারীর চুপ থাকা তার অনুমতি দেওয়া আর অকুমারীর মৌখিক সম্মতি নিতে হবে। পাগল ও নির্বোধের ক্ষেত্রে এটি শর্ত নয়।
৩- অভিভাবক: অভিভাবক পুরুষ, স্বাধীন, বালিগ (প্রাপ্তবয়স্ক), আকেল (জ্ঞানবান), বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়া শর্ত। এছাড়া একই দীনের অনুসারী হওয়াও শর্ত। বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের বাবা তার অভিভাবক হওয়ার সর্বাধিক যোগ্য, অতঃপর বাবার অসিয়তকৃত ব্যক্তি, অতঃপর তার দাদা, এভাবে উর্ধতন দাদারা, অতঃপর তার ছেলে ও নিম্নতম ছেলেরা, তার সহোদর ভাই, অতঃপর তার বৈমাত্রেয় ভাই, অতঃপর এসব ভাইয়ের ছেলেরা, অতঃপর, আপন চাচা, অতঃপর বৈমাত্রেয় চাচা, অতঃপর তাদের সন্তানেরা, অতঃপর বংশীয় নিকটাত্মীয়রা, অতঃপর দেশের বাদশাহ অভিভাবক হবেন।
৪- সাক্ষ্য: ন্যায়পরায়ণ, পুরুষ ও শরী‘আতের বিধান প্রযোজ্য (প্রাপ্তবয়স্ক) এমন দুজন সাক্ষ্যের সাক্ষী ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ হবে না।
৫- স্বামী-স্ত্রী উভয়ে বিবাহ বন্ধনে শরী‘আতের নিষেধাজ্ঞামুক্ত থাকা (অর্থাৎ যাদের সাথে বিয়ে হারাম তাদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া)।
বিবাহে যেসব কাজ সুন্নাত ও যেসব কাজ হারাম:
যে ব্যক্তি দীনদারিতা, ভিনদেশীয়তা, কুমারী, সন্তান ও সৌন্দর্য্যের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণতা ও সমতা বজায় রাখতে পারবে না তার জন্য একটি বিয়ে করা সুন্নাত।
বিয়ের খিতবা তথা প্রস্তাব দেওয়া কন্যাকে সতর ব্যতীত অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভালোভাবে দেখা মুস্তাহাব, যাতে তাকে বিয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলে, তবে নির্জনে দেখতে পারবে না। এমনিভাবে কনেও হবু বরকে ভালোভাবে দেখা মুস্তাহাব।
বিয়ের প্রস্তাবকারী বরের পক্ষে মেয়েকে দেখা সম্ভব না হলে সে একজন বিশ্বস্ত নারী পাঠাবে, তিনি ভালোভাবে দেখে তাকে মেয়ের গুণাবলী বর্ণনা করবে।
কেউ কোনো মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব দিলে উক্ত প্রস্তাবকারী তার প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়া বা তাকে দেখার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত অন্য কেউ উক্ত মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হারাম।
যেসব নারী তিন ত্বালাক ব্যতীত বায়েন ত্বালাকের ইদ্দত পালনরত তাদেরকে স্পষ্ট বা ইশারায় বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া বৈধ।
তবে রাজ‘ঈ তালাকের ইদ্দত পালনকারী নারীকে স্পষ্ট বা ইশারায় বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হারাম।
জুম‘আর দিন (শুক্রবার) বিকেলে বিয়ে পড়ানো সুন্নাত। কেননা আসরের সালাতের পরের সময় দো‘আ কবুল হয় এবং সম্ভব হলে মসজিদে বিয়ে পড়ানো সুন্নাত।
[1] সহীহ বুখারী, নিকাহ, হাদীস নং ৪৭৭৮; সহীহ মুসলিম, নিকাহ, হাদীস নং ১৪০০; তিরমিযী, নিকাহ, হাদীস নং ১০৮১ ; নাসাঈ, সাওম, হাদীস নং ২২৪০ ; আবু দাউদ, নিকাহ, হাদীস নং ২০৪৬ ; ইবন মাজাহ, নিকাহ, হাদীস নং ১৮৪৫ ; আহমদ, ১/৩৭৮ ; দারেমী, নিকাহ, হাদীস নং ২১৬৫।
৪ বিবাহ নিয়ে হাদিসে কি বলেছে জেনে নিন
৪ বিবাহ নিয়ে হাদিসে কি বলেছে জেনে নিন ৪ বিবাহ নিয়ে হাদিসে কি বলেছে জেনে নিন
একজন পুরুষ চারজন মহিলাকে বিবাহ করতে পারে তবে শর্ত হলো সকলের মাঝে সমতা বহাল রাখার যোগ্য হতে হবে,মাহর স্ত্রীর হক, তাই তাকে প্রদান করা আবশ্যক বিষয়ে কোরআন তাফসির।
4,আন্-নিসা,আয়াত নং: 2
وَ اٰتُوا الْیَتٰمٰۤى اَمْوَالَهُمْ وَ لَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِیْثَ بِالطَّیِّبِ١۪ وَ لَا تَاْكُلُوْۤا اَمْوَالَهُمْ اِلٰۤى اَمْوَالِكُمْ١ؕ اِنَّهٗ كَانَ حُوْبًا كَبِیْرًا
এতিমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দাও। ভালো সম্পদের সাথে মন্দ সম্পদ বদল করো না। আর তাদের সম্পদ তোমাদের সম্পদের সাথে মিশিয়ে গ্রাস করো না। এটা মহাপাপ।
4,আন্-নিসা,আয়াত নং: 3
وَ اِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تُقْسِطُوْا فِی الْیَتٰمٰى فَانْكِحُوْا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَآءِ مَثْنٰى وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَ١ۚ فَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تَعْدِلُوْا فَوَاحِدَةً اَوْ مَا مَلَكَتْ اَیْمَانُكُمْ١ؕ ذٰلِكَ اَدْنٰۤى اَلَّا تَعُوْلُوْاؕ
আর যদি তোমরা এতিমদের (মেয়েদের) সাথে বে-ইনসাফী করার ব্যাপারে ভয় করো, তাহলে যেসব মেয়েদের তোমরা পছন্দ করো তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি তোমরা তাদের সাথে ইনসাফ করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করো, তাহলে একজনকেই বিয়ে করো। অথবা তোমাদের অধিকারে সেসব মেয়ে আছে তাদেরকে বিয়ে করো। বে-ইনসাফীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এটিই অধিকতর সঠিক পদ্ধতি।
4,আন্-নিসা,আয়াত নং: 4
وَ اٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِهِنَّ نِحْلَةً١ؕ فَاِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَیْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوْهُ هَنِیْٓئًا مَّرِیْٓئًا
আর আনন্দের সাথে (ফরয মনে করে) স্ত্রীদের মোহরানা আদায় করে দাও। তবে যদি তারা নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছায় মোহরানার কিছু অংশ মাফ করে দেয়, তাহলে তোমরা সানন্দে তা খেতে পারো।
তাফসীর: : আল্লাহ তা’আলা পিতৃহীনদের অভিভাবকগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন-পিতৃহীনেরা যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌছে ও বিবেকসম্পন্ন হয় তখন তাদেরকে তাদের মাল পুরোপুরি প্রদান করবে। কিছুমাত্র কম করবে না বা আত্মসাৎও করবে না। তাদের মালকে তোমাদের মালের সঙ্গে মিশ্রিত করে ভক্ষণ করার বাসনা অন্তরে পোষণ করো না। হালাল মাল যখন আল্লাহ পাক তোমাদেরকে প্রদান করেছেন-তখন হারামের দিকে যাবে কেন? তোমাদের ভাগ্যে যে অংশ লিপিবদ্ধ তা তোমরা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। তোমাদের হালাল মাল ছেড়ে দিয়ে অপরের মাল যা তোমাদের জন্যে হারাম তা কখনও গ্রহণ করো না। নিজেদের দুর্বল ও পাতলা পশুগুলো দিয়ে অপরের মোটাতাজাগুলো হস্তগত করো না। মন্দ দিয়ে ভাল নেয়ার চেষ্টা করো না। পূর্বে লোকেরা এরূপ করতো যে, তারা পিতৃহীনদের ছাগলের পাল হতে বেছে বেছে ভালগুলো নিয়ে নিজেদের দুর্বল ছাগলগুলো দিতো এবং এভাবে গণনা ঠিক রাখতো। মন্দ দিরহামগুলো তাদের মালে রেখে দিয়ে তাদের ভালগুলো নিয়ে নিতো। অতঃপর মনে করতো যে তারা ঠিকই করেছে। কেননা, ছাগলের পরিবর্তে ছাগল দিয়েছে এবং দিরহামের পরিবর্তে দিরহাম দিয়েছে। তারা পিতৃহীনদের সম্পদকে নিজেদের সম্পদের মধ্যে মিশ্রিত করে দিয়ে এ কৌশল করতো যে, এখন আর স্বাতন্ত্র কি আছে? তাই আল্লাহ পাক বলেন-“তাদের সম্পদ নষ্ট করো না, কেননা, এটা বড় পাপ।
আল্লাহ তা’আলা বলেন-‘কোন পিতৃহীনা বালিকার লালন পালনের দায়িত্ব যদি তোমাদের উপর ন্যস্ত থাকে এবং তোমরা তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে কর, কিন্তু যেহেতু তার অন্য কেউ নেই, কাজেই তোমরা এরূপ করো না যে, তাকে মোহর কম দিয়ে স্ত্রীরূপে ব্যবহার করবে, বরং আরও বহু স্ত্রীলোক রয়েছে তাদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দুটি, তিনটি এবং চারটিকে বিয়ে কর।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘একটি পিতৃহীনা বালিকা ছিল। তার মাল-ধনও ছিল এবং বাগানও ছিল। যে লোকটি তাকে লালন পালন করছিল সে। শুধুমাত্র তার মাল-ধনের লালসায় পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ না করেই তাকে বিয়ে করে নেয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
। তথায় বলা হয়-যখন পৃতিহীনা মেয়ের মাল ও সৌন্দর্য কম থাকে তখন তো অভিভাবক তার প্রতি কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না, সুতরাং এর কোন কারণ নেই যে, তার মাল ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার পূর্ণ হক আদায় না করেই তাকে বিয়ে করে নেবে। হ্যাঁ, তবে ন্যায়ের সাথে যদি পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ করতঃ বিয়ে করে তবে কোন দোষ নেই। নচেৎ স্ত্রীলোকের কোন অভাব নেই। তাদের মধ্যে হতে যেন পছন্দ মত সে বিয়ে করে। ইচ্ছে করলে দু’টি, তিনটি এবং চারটি পর্যন্ত করতে পারে।
পুরুষের জন্যে এক সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ, যেমন এ আয়াতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং জমহুরের এটাই উক্তি। এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় অনুগ্রহ ও দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সুতরাং চারটের বেশীর উপর সমর্থন থাকলেও অবশ্যই তা বলতেন।★ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাকারী হাদীস শরীফ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারও জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী একত্রিত করা বৈধ নয়।’ এর উপরই উলামা-ই-কিরামের ইজমা হয়েছে।★
মুসনাদ-ইশাফিঈর মধ্যে রয়েছে, হযরত নাওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার ৫টা স্ত্রী ছিল। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওদের মধ্যে পছন্দমত চারটিকে রাখ এবং একটিকে পৃথক করে দাও। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল এবং নিঃসন্তান ছিল তাকে আমি তালাক দিয়ে দেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন-‘তোমরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে খুশী মনে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও যা দিতে তোমরা স্বীকৃত হয়েছে। তবে যদি স্ত্রী ইচ্ছে প্রণোদিত হয়ে তার সমস্ত মোহর বা কিছু অংশ মাফ করে দেয় তবে তা করার তার অধিকার রয়েছে এবং সে অবস্থায় স্বামীর পক্ষে তা ভোগ করা বৈধ। নবী (সঃ)-এর পরে কারও জন্যে মোহর ওয়াজিব করা ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয় এবং ফাকি দিয়ে শুধু নামমাত্র মোহর ধার্য করাও বৈধ নয়।’মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তি বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রোগাক্রান্ত হয় তখন তার উচিত যে, সে যেন তার স্ত্রীর মালের তিন দিরহাম বা কিছু কম বেশী গ্রহণ করতঃ তা দিয়ে মধু ক্রয় করে এবং আকাশের বৃষ্টির পানি তার সাথে মিশ্রিত করে, তাহলে তিনটি মঙ্গল সে লাভ করবে। একটি হচ্ছে স্ত্রীর মাল যাকে আল্লাহ পাক তৃপ্তি সহকারে খেতে বলেছেন, দ্বিতীয় হচ্ছে মধুর শিকা এবং তৃতীয় হচ্ছে কল্যাণময় বৃষ্টির পানি। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, মানুষ তাদের মেয়েদের মোহর নিজেরা গ্রহণ করতো। ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এ কাজ হতে বিরত রাখা হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)
এ নির্দেশ শুনে জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি?’ তিনি বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপরেই তাদের পরিবার সম্মত হয়ে যায়।'(Tafsir Ibn Kathir)
একাধিক বিবাহের শর্ত হল সুবিচার করতে হবে আর যদি সুবিচার করতে সক্ষম না হয় তাহলে একজনকে বিবাহ করবে অথবা কোন ক্রীতদাস বিবাহ করবে। তবে সুবিচার করা খুবই কষ্টকর
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَنْ تَسْتَطِيْعُوْآ أَنْ تَعْدِلُوْا بَيْنَ النِّسَا۬ءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيْلُوْا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوْهَا كَالْمُعَلَّقَةِ)
“আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে সুবিচার করতে পারবে না; যদিও তোমরা প্রবল ইচ্ছা কর; অতএব তোমরা কোন একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড় না ও অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখ না।”(সূরা নিসা ৪:১২৯)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তির দু’জন স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তন্মধ্যে একজনের দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামাতের দিন তার অর্ধদেহ ধসাবস্থায় উপস্থিত হবে। (আহমাদ: ২/৩৪৭, হাকিম: ২/১৮৬)
সুতরাং বহু বিবাহ ইসলামী শরীয়তের অন্যতম একটি বিধান। এ সকল শরয়ী বিধান যা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে এসেছেন তা কেউ ঘৃণা করলে সে কাফির হয়ে যাবে। এ জন্য মহিলাদের উচিত, একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকাটা যেন তারা অপছন্দ না করে। কারণ এটা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিধান। তবে স্বভাবগতভাবে এ বিষয়টাকে অপছন্দ করা, ভাল না বাসার অর্থ শরয়ী বিধানকে অপছন্দ করা নয়। এরূপ অপছন্দের কারণে ঈমানের কোন ক্ষতি হবে না। অথবা কতক পুরুষ যারা স্ত্রীদের মাঝে সমতা বজায় রাখতে পারে না এজন্য একাধিক বিবাহকে অপছন্দ করা দোষণীয় নয়। কিন্তু একাধিক বিবাহ করার শরয়ী বিধানকে অপছন্দ করলে মুরতাদ হয়ে যাবে। কারণ সে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক আনীত বিধানকে অপছন্দ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوْا مَآ أَنْزَلَ اللّٰهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ)
“কারণ, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করছে; তাই আল্লাহ তাদের আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।”(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীদের মাহর সন্তুষ্ট মনে আদায় করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। স্ত্রী যদি খুশি হয়ে কিছু ছেড়ে দেয় তাহলে কোন সমস্যা নেই। এ আয়াত প্রমাণ করছে স্ত্রীকে মাহর প্রদান করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে সকল আলেম একমত। (আল ইসতিযকার, ইবনু আব্দুল বার ১৬/৬৮)
মাহরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কোন পরিমাণ নেই (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ৩/১৬২)। যার যেমন সামর্থ্য সে সেই পরিমাণ দেবে, এতে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তা আদায় করে দেয়া উত্তম। মৃত্যুর সময় ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত নয়।।(Tafsire Fathul Majid)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেক হারাম সম্পদ ও বস্তু অপবিত্র। আর প্রত্যেক হালাল সম্পদ ও বস্তু পবিত্র।
২. ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়া হারাম।
৩. একত্রে একজন পুরুষ চারজন মহিলাকে বিবাহ করতে পারে তবে শর্ত হলো সকলের মাঝে সমতা বহাল রাখার যোগ্য হতে হবে।
৪. মাহর স্ত্রীর হক, তাই তাকে প্রদান করা আবশ্যক।
৫. ইসলামের কোন বিধানকে অপছন্দ করা কুফরী কাজ, বরং আনুগত্যের সাথে সকল বিধানকে মেনে নিতে হবে।
৬. ইসলাম নারীর অর্থনৈতিক অধিকার দিয়েছে, তাদের অর্থে স্বামীরও হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই
ইসলামে নামকরণের তাৎপর্য ও গুরুত্ব
নামকরণ করা হয় নবজাতকের। উত্তম হচ্ছে জন্মের সপ্তমদিনের মধ্যে নামকরণ করবে, আক্বিকা দিবে এবং মাথামুণ্ডন করবে। তারপর থেকেই শিশু নামের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করে। শুধু শিশুই নয়, তার বাবা-মামাও তার নামের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করে। এ নামের এমনই ফল যে কোনো মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে। তারপরও ঐ ব্যক্তির নাম-নিশানা অবশিষ্ট থাকে।
নামের মাধ্যমে শিশুর সঙ্গে পিতা-মাতার বন্ধন তৈরি হয়। পিতা-মাতা ও পরিবার ঐ নামেই ডাকে যে নাম তারা শিশুর জন্য নির্বাচন করে। তাইতো প্রাচীনযুগে বলা হতো- ‘তোমার নাম থেকেই তোমার পিতার পরিচয় পাওয়া যায়।’
নামের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষ ও মহিলা সাহাবিদের একটি বিশেষ অংশের নাম পরিবর্তন করেছেন। এমনকি তিনি মালিকুল আমলাক (রাজাদের রাজা) ও অনুরূপ নাম রাখতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঐ ব্যক্তির নাম, যার নাম রাখা হয়েছে মালিকুল আমলাক। (মুসনাদ আস সাহাবা)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো নামে আনন্দিত হতেন এবং তাকে সুলক্ষণ মনে করতেন। তিনি বলেন, যার নামে আল্লাহর দাসত্বের ঘোষণা রয়েছে সে নাম রাখতে বলতেন যেমন আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান। (মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ)
মুসলিম শিশুর জন্ম পরবর্তী করণীয়
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর করণীয়
তাহনীক ও দো‘আ করা : নবজাত শিশুর জন্য প্রথম করণীয় সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُؤْتَى بِالصِّبْيَانِ فَيُبَرِّكُ عَلَيْهِمْ وَيُحَنِّكُهُمْ، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে নবজাত শিশুদের নিয়ে আসা হ’ত, তিনি তাদের কল্যাণ ও বরকতের জন্য দো‘আ করতেন এবং তাহনীক করতেন’।
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর খেজুর, মধু বা মিষ্টি জাতীয় কোন খাদ্য বস্ত্ত চিবেয়ে শিশুর মুখে দেওয়াকে তাহনীক বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খেজুর নিয়ে তা চিবিয়ে নরম করে মুখের লালা মিশ্রিত চিবানো খেজুর দিয়ে তাহনীক করতেন। যেমন আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, وُلِدَ لِى غُلاَمٌ، فَأَتَيْتُ بِهِ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم فَسَمَّاهُ إِبْرَاهِيمَ، فَحَنَّكَهُ بِتَمْرَةٍ، وَدَعَا لَهُ بِالْبَرَكَةِ، ‘আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাকে নিয়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইব্রাহীম এবং খেজুর দিয়ে তার তাহনীক করলেন’।
সুতরাং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মুত্তাক্বী আলেম বা পরহেযগার ব্যক্তির নিকট শিশুকে নিয়ে গিয়ে তাহনীক ও দো‘আ করে নিতে হবে। তাহনীক করার সময় নিম্নোক্ত দো‘আ পাঠ করবে, اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِى مَا رَزَقْتَهُمْ، (আল্লাহুম্মা বারিক লাহুম ফীমা রাযাক্বতাহুম) ‘হে আল্লাহ তাকে সর্ব বিষয়ে বরকত দান কর এবং যে রিযিক দান করেছ তাতেও বরকত দান কর’।
শিশুর নাম রাখা : সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর দ্বিতীয় করণীয় হচ্ছে তার অর্থপূর্ণ ভাল নাম রাখা। বিভিন্ন হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সন্তান জন্মগ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম দিন, দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন কিংবা সাত দিনের মধ্যে সুবিধা মত যেকোন দিন নাম রাখতে হয়। নাম রাখার জন্য ৭ম দিনে আক্বীক্বা করা পর্যন্ত বিলম্বিত করার প্রয়োজন নেই। আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, গত রাতে আমার একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছে। আমি তার নাম রেখেছি আমার পিতার নামানুসারে ইবরাহীম।
শিশু জন্মগ্রহণের পর বর্জনীয় বিষয়সমূহ :
১. আযান ও ইক্বামত : শিশু জন্মগ্রহণের পর প্রথম করণীয় হিসাবে ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামত দিতে হবে অথবা তার কানে আযান দিতে হবে মর্মে বর্ণিত হাদিসগুলির একটিও ছহীহ নয়। বরং এর কোনটি যঈফ আবার কোনটি মওযূ বা জাল। কেবলমাত্র আযান দেওয়া সংক্রান্ত আবূ রাফে‘ (রাঃ) বর্ণিত অতি প্রসিদ্ধ হাদীছটি সম্পর্কে শায়খ নাছেরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, ‘আমি ইতিপূর্বে আবূ রাফে‘ (রাঃ) বর্ণিত এ হাদিসটি হাসান বললেও এখন আমার নিকট বর্ণনাটি যঈফ হিসাবে স্পষ্ট হয়েছে।
২. জন্মকালীন প্রচলিত কুসংস্কার ও বিদ‘আত : শিশু জন্মগ্রহণের সময় আমাদের দেশে অনেক প্রকার কুসংস্কার প্রচলিত আছে। এর কোনটি শিরক আবার কোনটি বিদ‘আত। যেমন-
(১) প্রসব বেদনায় কষ্ট হলে অথবা প্রসবে বিলম্ব হলে গর্ভবতীর দেহে তাবীয-কবয বাঁধা। যা সুস্পষ্ট শিরক। বরং এ সময়ে করণীয় হচ্ছে, অভিজ্ঞ ডাক্তার বা ধাত্রীর সাহায্য নেওয়া।
(২) প্রসূতির ঘরে ছেঁড়া জাল, মুড়ো ঝাড়ু, লোহার বস্তু প্রভৃতি টাঙ্গানো।
(৩) শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জিন-ভূতের আছর বা মানুষের বদ নজর লাগার ভয়ে হাত, পা বা গলায় তাবীজ-কবজ বেঁধে দেওয়া।
(৪) শিশুকে বদ নজর থেকে রক্ষার জন্য কপালের পাশে কালো ফোঁটা বা টিপ দেওয়া।
(৫) শিশু জন্মের সপ্তম দিনে ‘সাতলা’ অনুষ্ঠান করা।
(৬) শিশু ভূমিষ্ঠের ৪০ দিনে প্রসূতির ‘পবিত্রতা’ অর্জনের জন্য বাড়ী-ঘর ধোয়া-লেপার বিশেষ আয়োজন করা।
যেকোন অবস্থায় সকল প্রকার তাবীয ব্যবহার করা শিরক। সেটা কুরআনের সূরা, আয়াত বা বানোয়াট নকশা দিয়ে লেখা হোক অথবা গাছ-গাছড়া জাতীয় দ্রব্যাদি দিয়ে হোক না কেন। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ عَلَّقَ تَمِيْمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ ‘যে ব্যক্তি তাবীজ লটকাল সে শিরক করল’
করণীয় : বদ নযর থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য রাসূল (ছাঃ) নিম্নোক্ত দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন-أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَّهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ- ‘আঊযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইত্বা-নিন ওয়া হাম্মা-তিন ওয়া মিন কুল্লি ‘আয়নিন লাম্মাহ’। অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকটে পূর্ণ গুণাবলীর বাক্য দ্বারা সকল শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও ক্ষতিকর চক্ষু থেকে পরিত্রাণ চাই। সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য উক্ত দোয়া ও সাথে সূরা ফালাক্ব ও নাস ৩ বার করে পাঠ করতঃ সকাল-সন্ধ্যায় ঝাড়-ফুঁক করতে হবে। যা বিভিন্ন ছহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
আকিকা করা :
শিশু জন্মের সপ্তম দিনে নবজাতকের পক্ষ থেকে যবহ করা পশুকে আকিকা বলা হয়। আকিকা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,كُلُّ غُلاَمٍ مُرْتَهَنٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ وَيُسَمَّى وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ- ‘প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সাথে বন্ধক থাকে। অতএব জন্মের সপ্তম দিনে শিশুর পক্ষ থেকে পশু যবহ করতে হয়, নাম রাখতে হয় ও তার মাথা মুন্ডন করতে হয়।
ইমাম খাত্ত্বাবী বলেন, ‘আকিকার সাথে শিশু বন্ধক থাকে’-একথার ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, যদি বাচ্চা আকিকা ছাড়াই শৈশবে মারা যায়, তাহলে সে তার পিতা-মাতার জন্য কিয়ামতের দিন শাফাআত করবে না। কেউ বলেছেন, আকিকা যে অবশ্য করণীয় এবং অপরিহার্য বিষয়, সেটা বুঝানোর জন্যই এখানে ‘বন্ধক’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরিশোধ না করা পর্যন্ত আল্লাহর নিকট সে দায়বদ্ধ থাকে।
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,مَعَ الْغُلاَمِ عَقِيقَةٌ فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيْطُوْا عَنْهُ الْأَذَى- ‘সন্তানের সাথে আকিকা যুক্ত। অতএব তোমরা তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত কর এবং তার থেকে কষ্ট দূর করে দাও (অর্থাৎ তার জন্য একটি আকিকার পশু যবহ কর এবং তার মাথার চুল ফেলে দাও)।
সপ্তম দিনে আক্বীক্বা দেওয়া সুন্নাত। রাসূল (সাঃ) তাঁর নাতি হাসান ও হুসাইনের আকিকা সপ্তম দিনে করেছিলেন।
ইমাম শাফেঈ বলেন, সাত দিনে আক্বীক্বার অর্থ হ’ল, ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ সাত দিনের পরে আক্বীক্বা করবে না। যদি কোন কারণে বিলম্ব হয়, এমনকি সন্তান বালেগ হয়ে যায়, তাহলে তার পক্ষে তার অভিভাবকের আকিকার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সে নিজের আকিকা নিজে করতে পারবে।
যদি কেউ আক্বীক্বা ছাড়াই মারা যায়, তবে তার আক্বীক্বার প্রয়োজন নেই।আর সামর্থ্য না থাকায় পিতা আক্বীক্বা দিতে ব্যর্থ হ’লে তার উপর কোন দোষ বর্তাবে না।
আকিকার পশু হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে তার বদলে আরেকটি পশু আকিকা দিবে।
আকিকার পশু : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ، لاَ يَضُرُّكُمْ أَذُكْرَانًا كُنَّ أَمْ إِنَاثًا- ‘নর হোক বা মাদী হোক, ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল ও মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আক্বীক্বা দিতে হয়।
সপ্তম দিবসে অন্যান্য করণীয় : শিশু জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা ছাড়াও নবজাতকের মাথা মুন্ডনের পর চুলের ওজন পরিমাণ রূপা বা রূপার মূল্য পরিমাণ অর্থ ছদকা করা উত্তম।
ইসলামী নামের গুরুত্ব : সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জন্য, বিশেষভাবে ঈমানদার মুমিনের ক্ষেত্রে নামের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বেশী। আর তা এজন্য যে, সকল শুভ কাজের সূচনা তাকে তার মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে তথা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করতে হয়।
মহান আল্লাহ তাঁর নিজ নামকে এতই ভালবাসেন যে, তিনি বলেন, আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে, সে নামে তাঁকে ডাকো’ (আ‘রাফ ৭/১৮০)। কিয়ামতের ময়দানে সকল বনি আদমকে আল্লাহ বিচারের জন্য সমবেত করে ডাকবেন পিতা ও পুত্রের নাম ধরে।
অর্থহীন নাম পরিহার করতে হবে : প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সামনে কোন নবাগত লোক আসলে, তিনি তার নাম জিজ্ঞেস করতেন। ভাল নাম হ’লে সন্তুোষ প্রকাশ করতেন। অপসন্দ হ’লে তা পরিবর্তন করে দিতেন। তিনি অশুভ, ঘৃণাদায়ক, অর্থহীন, অতি বিশেষণমূলক ও আত্মঅহংকার প্রকাশ পায় এমন বহু নামের পরিবর্তন করেছেন। যেমন তিনি আসীয়া (বিদ্রোহীনি, পাপিয়সী) নামটি পরিবর্তন করে বললেন, তুমি জামীলা (সুন্দরী)। বাররাহ (অত্যন্ত ধার্মিকা) নাম পরিবর্তন করে তাঁর নাম রাখেন যয়নাব (সুগন্ধময় ফুল)। হাযন (শক্ত মাটি) নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন সাহল (নরম মাটি)। এভাবে নাম পরিবর্তনের কথা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
তাই অর্থহীন নাম আরবী ভাষার হলেও তা পরিবর্তন করতে হবে। খাঁটি বাঙ্গালী সাজতে গিয়ে অনেকে পিতৃপ্রদত্ত আরবী নামের সাথে বাংলা নাম মিশ্রণ করে নামকরণ করে থাকেন। যেমন অমিত হাসান, ফটিক রহমান, অনিক মাহমূদ, শুভ রহমান ইত্যাদি। ইদানীং কেউ কেউ পিতৃপ্রদত্ত আরবী নাম বিকৃত আকারে প্রকাশ করছেন। যেমন মালেক মেহমুদ, শফিক রেহমান, রেহমান সোবহান ইত্যাদি। এভাবে রহমানকে রেহমান, মাহমূদকে মেহমুদ উচ্চারণ করা গুরুতর অপরাধ।
প্রচলিত আরবী ভুল নাম : বাংলাদেশে মুসলিম সমাজে প্রচলিত সব আরবী নামই কিন্তু নির্ভুল নয়। যেমন আল্লাহ ব্যতীত নবী ও রাসূল, পীর, ইমাম প্রভৃতি মাখলূকের নামের পূর্বে আরবী ‘গোলাম’ এবং ফার্সী শব্দ ‘বখ্শ’ (দান) যোগ করে নামকরণ করা। যা শিরক। যেমন আব্দুন্নবী (নবীর দাস), আব্দুর রাসূল (রাসূলের দাস), গোলামুন্নবী (নবীর দাস), গোলাম রাসূল (রাসূলের দাস), গোলাম মুহাম্মাদ (মুহাম্মাদের দাস), গোলাম মোস্তফা (মোস্তফার দাস), আলী বখশ (আলীর দাস), মাদার-বখশ (মাদার বা পীরের দান), গোলাম মহিউদ্দীন (মহিউদ্দীনের দাস), গোলাম হোসায়েন (হোসায়েনের দাস) প্রভৃতি।
যেসব নাম রাখা সর্বোত্তম : ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, মহীয়ান-গরিয়ান আল্লাহর নিকটে তোমাদের নামগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম নাম হল আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। তদ্রূপ ‘আসমাউল হুসনা’ (আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ)-এর পূর্বে ‘আব্দ’ শব্দ যোগ করে নাম রাখা হলে তা উক্ত হাদীসের মর্মানুযায়ী আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয় হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ তাতে আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশ পায়।
নাম রাখার ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, নবীদের নামে নাম রাখ, আল্লাহর কাছে প্রিয় নাম হ’ল আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবথেকে যথার্থ নাম হ’ল হারেছ (পরিশ্রমী), হাম্মাম (আগ্রহশীল)। সর্বাধিক নিকৃষ্ট নাম হল হারব (যুদ্ধ) ও মুররা (তিক্ত)।
আকিকার গুরুত্ব ও ফজিলত
আকিকা আরবি শব্দ। এর অর্থ কর্তন করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় নবজাতক ছেলে মেয়ের জন্মের সপ্তম দিন পশুর যে রক্ত প্রবাহিত করা হয় একে আকিকা বলে। আকিকা একটি মুস্তাহাব আমল। নবজাতক সন্তানের পিতা বা অভিভাবকের পক্ষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় পূর্বক কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ আকিকা করা মুস্তাহাব।
রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা আকিকা প্রমাণিত। রাসূল (সা.) আপন নাতী হজরত হাসান ও হুসাইন (রা.) এদের আকিকা করেছেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ছেলে মেয়ের জন্য আকিকা। এদের পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করাও এবং এর মাধ্যমে ময়লা (মাথার চুল) দূর করো।’ (সহিহ বোখারি)
আকিকার পশু জবাইয়ের সময় : জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা মুস্তাহাব। হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধকস্বরূপ। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে জবাই করবে এবং তারা মাথা মুন্ডন করে নাম রাখবে।’ (সুনানে আবু দাউদ ২/৩৯২) সপ্তম দিনে না পারলে পরে যখনই করবে, সপ্তম দিনের হিসাবে করা উত্তম। অর্থাৎ সপ্তাহের যে বারে শিশু জন্মগ্রহণ করবে, তার আগের বারে আকিকা করবে। শুক্রবার দিন জন্মগ্রহণ করলে বৃহস্পতিবার আকিকা করবে। বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণ করলে বুধবার আকিকা করবে। এভাবে যখনই আকিকা করা হবে এই হিসাবে সপ্তম দিনে পড়বে।
সন্তান বড় হয়ে গেলেও আকিকা করা যায়। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) নবুওয়াত পাওয়ার পর নিজের আকিকা নিজে করেছেন।’ (বায়হাকি)
আকিকার উপকারিতা : আকিকার অনেক উপকারিতা রয়েছে। জীবনের প্রারম্ভে নবজাতকের নামে রক্ত প্রবাহিত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। এটা ইসলামী ভ্যাকসিন। এর মাধ্যমে আল্লাহর হুকুমে অনেক পেরেশানি, বিপদ-মুসিবত ও অসুস্থতা থেকে মুক্তি মিলে। দুনিয়াবী ভ্যাকসিনের সাথে আমাদের আখেরাতের ভ্যাকসিনের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা উচিত।
নবজাতকের জন্ম আল্লাহর বড় একটি নেয়ামত। আকিকার মাধ্যমে এই নেয়ামতের বহির্প্রকাশ হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সম্পদ ও সন্তানসন্তুতি জীবনের শোভা।’ (সূরা কাহাফ, আয়াত : ৪৬)
সন্তানের আকিকা করার মাধ্যমে কিয়ামতের দিন পিতা সন্তানের সুপারিশের উপযুক্ত হয়। এ ছাড়াও আকিকার মাধ্যমে দানশীলতার বিকাশ ঘটে। গরিব মিসকিন ও আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় হয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সম্পর্ক বাড়ে। পরষ্পরে হৃদ্যতা ও আন্তরিকতাপূর্ণ ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
আকিকার পশুর সংখ্যা : ছেলে সন্তানের জন্য দুটি ছাগল আকিকা করতে হয়। আর কন্যা সন্তানের জন্য একটি। হজরত উম্মে কুরজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘ছেলের জন্য এক ধরনের দুটি বকরি এবং মেয়ের জন্য একটি বকরি আকিকা করবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৮৩৪)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) তাদেরকে ছেলে সন্তানের জন্য দুটি সমসয়সী ছাগল আর মেয়ে সন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করার জন্য নির্দেশ করেছেন।’ (জামে তিরমিজি ১/১৮৩)
হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, ‘ইহুদিরা পুত্রসন্তানের আকিকা করত কিন্তু কন্যাসন্তানের আকিকা করত না। তোমরা পুত্রসন্তানের জন্য দুটি ছাগল এবং কন্যাসন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে হলেও আকিকা করো।’ (বায়হাকি, সুনানে কুবরা, হাদিস : ১৯৭৬০)
তবে কারো সামর্থ না থাকলে একটা ছাগল দিয়েও আকিকা হতে পারে। হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘রাসূল (সা.) একটি ছাগল দিয়ে হাসানের আকিকা দিলেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৬০২)
আকিকার জন্তুর ধরন : যে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ, সেই পশু দিয়ে আকিকা করাও বৈধ। যে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ নয়, সেই পশু দিয়ে আকিকা করাও বৈধ নয়। তাই আকিকার ক্ষেত্রে জন্তুর বয়স ও ধরনের দিক থেকে কোরবানির জন্তুর গুণ পাওয়া যায়, এমন জন্তুই নির্বাচন করতে হবে। (জামে তিরমিজি ৪/১০১)
কোরবানির জন্তুর সঙ্গে আকিকা করা : কোরবানির জন্তুর সঙ্গে আকিকা করা বৈধ। একটি পশুতে তিন শরিক কোরবানি হলে সেখানে আরো দু-এক শরিক আকিকার জন্যও দেওয়া যেতে পারে। তদ্রুপ কোরবানির মতো একই পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে আকিকা আদায় করতে পারবে। (দুরারুল আহকাম ১/২৬৬) বড় পশু অর্থাৎ গরু, মহিষ, উট ইত্যাদিতে ছেলের জন্য এক শরিক আকিকা দিলেও তা আদায় হয়ে যাবে।
আকিকার গোশত : কোরবানির মতো আকিকার পশুর গোশতও তিন ভাগ করে এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য, এক তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনদের জন্য সদকা করে দিয়ে বাকি এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া সুন্নত। অবশ্য পরিবারের সদস্য বেশি হলে ইচ্ছা করলে সব গোশতও নিজেদের জন্য রেখে দেওয়া যায়। আকিকার গোশত সচ্ছল আত্মীয়-স্বজনকেও দেওয়া যায়। এখান থেকে আরেকটি বিষয় বুঝা গেল যে, আকিকার গোশত আকিকাদাতা স্বয়ং, যার জন্য আকিকা সে নিজে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-অনাত্মীয়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই আহার করতে পারবেন। কাঁচা গোশত হাদিয়া দিতে পারবেন অথবা রান্না করেও খাওয়াতে পারবেন।
মৃত বাচ্চার আকিকা : যেহেতু আকিকা করা হয় বিপদ-মুসিবত দূর করার জন্য, তাই মৃত বাচ্চার পক্ষ থেকে আকিকা করা সুন্নত। (আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫৩৬)
আকিকার পশুর চামড়া : কোরবানির মতোই আকিকার পশুর চামড়া গরিব-মিসকিনকে দিয়ে দেবে। নিজে ব্যবহার করলেও করতে পারবে। কিন্তু বাজারে বিক্রি করলে, বিক্রয়কৃত টাকা তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। চামড়া বা চামড়ার মূল্য কোনোটাই কসাইকে দেওয়া যাবে না।
আকিকার কুসংস্কার : অনেকেই মনে করে যে, আকিকার গোশত দাদা-দাদি ও নানা-নানি খেতে পারে না। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
সন্তানের মাথার চুল মুন্ডানোর জন্য যখন মাথার উপরের ক্ষুর টানা হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আকিকার জন্তু জবাই করতে হবে, এটাও ভিত্তিহীন। মাথা মুন্ডানোর আগে-পরে যেকোনো সময় আকিকার পশু জবাই করা যাবে। হজরত আতা (রহ.)-এর এক বর্ণনা মতে, আকিকার পশু জবাই করার আগে মাথা মুন্ডিয়ে নেওয়া উত্তম। (আল মুকাদ্দামাতুল মুমাহহাদাত ১/৪৪৯)
হাদিয়া বা উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করা সুন্নত। কিন্তু আকিকার মতো ধর্মীয় ইবাদতকে এর সঙ্গে শর্তযুক্ত করা পবিত্র ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানকে নিরানন্দ ও বিষাদময় করা মাকরুহ ও ক্ষেত্রবিশেষে হারাম।
আকিকা উপলক্ষে নবজাতকের নানার বাড়ির পক্ষ হতে কিছু পোশাক, খাবার ও সহায়ক সামগ্রী প্রেরণের বিষয়টিকে জরুরি মনে করা কুসংস্কার ও পরিষ্কার হারাম।
সৎ ও নেক সন্তানের জন্য করনীয়?
সন্তান সৎ ও নেক হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই কিছু বিধিমালা মেনে চলা। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা।
তাদের মতে পরিবারের আদর্শ ও শিক্ষার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে সন্তানটি কেমন হবে। তবে গর্ভবতী মা ও বাবার ওপর বিষয়টি অনেকাংশেই জড়িত।
অর্থাৎ সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রুণ অবস্থা থেকে মায়ের যাবতীয় আমল ও আখলাক গর্ভে থাকা সন্তানের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাই এক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর বাবার দায়িত্ব হচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের জন্য হালালভাবে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে পরিবারের ব্যয় বহন করা।
এ ছাড়া আরও কিছু পালনীয় বিষয় হলো-
১. সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তার মঙ্গলকামনায় বেশি বেশি দোয়া করা ও আল্লাহর রহমত কামনা করা।
২. প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা।
৩. প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা।
৪. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা।
৫. যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিদিন সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করা।
৬. দান-খয়রাত করা। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।
শিশুর নাম রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা
নাম হলো পরিচয় ও নিদর্শন। নামের আরবি হলো ‘ইসম’। ইসম অর্থ চিহ্ন, আলামত, পরিচিতি, লক্ষণ, উন্নয়ন, বর্ধন, সম্মান, সুনাম, যশ, খ্যাতি ইত্যাদি। মানুষ দুনিয়ায় আসার পর প্রথম যা লাভ করে তা হলো তার নাম-পরিচয়।
মৃত্যুর পরেও মানুষের নাম বেঁচে থাকে। তাই শিশুর সুন্দর নাম তার জন্মগত অধিকার।
শিশুর নাম রাখবে কে
শিশুর নাম রাখার অধিকারী হলেন প্রথমত মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোন, ফুফু-খালা, চাচা-মামা ও আত্মীয়-স্বজন। নাম যেন অর্থবহ হয় তা খেয়াল রাখতে হবে।
যে কেউ নামের প্রস্তাব বা পরামর্শ দিতে পারে। অভিজ্ঞ আলেম বা বিজ্ঞ ব্যক্তি প্রস্তাবিত নামের অর্থ, গুণাগুণ ও তাৎপর্য অনুসারে এর প্রাধান্য ব্যাখ্যা করবেন। সন্তানের অভিভাবকরা নাম গ্রহণে সিদ্ধান্ত নেবেন। সুন্দর অর্থবহ ও শ্রুতিমধুর নাম হওয়া বাঞ্ছনীয়
নাম অর্থবহ, সুন্দর, শ্রুতিমধুর ও সহজ হওয়া বাঞ্ছনীয়। মন্দ অর্থবহ বা গুণাগুণ সংবলিত নাম রাখা উচিত নয়। (বুখারি : ২/৯১৪) তাই ক্ষতিকারক ও আল্লাহর গজব সংবলিত ফণী, তিতলি ইত্যাদি কারো নাম রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। কেননা নামের প্রভাব মানুষের সত্তা ও গুণাগুণের ওপরও পড়ে। আর হাশরের ময়দানে প্রত্যেককে তার নামেই ডাকা হবে। (আবু দাউদ : ২/৬৭৬)
নাম পরিবর্তন করা
কারো নাম ভালো অর্থবহ না হলে তা পরিবর্তন করে রাখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সাহাবির এরূপ নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন। (তিরমিজি : ২/১১১)
নাম রাখার সময়
সপ্তম দিন নাম রাখা ভালো। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘জন্মের সপ্তম দিন নবজাতকের নাম রাখো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৮৩২)
আগে-পরে হলেও কোনো ক্ষতি নেই। জন্মের আগেও নাম নির্ধারণে বাধা নেই। (আবু দাউদ : ২/৪৪৬)
আকিকা
আকিকা করা একটি সুন্নত। সপ্তম দিন আকিকা করা আরেকটি সুন্নত। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘সপ্তম দিন রাসুল (সা.) হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.)-এর আকিকা দিয়েছেন এবং তাঁদের নাম রেখেছেন।’ (ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৩১১)
কোনো কারণে সপ্তম দিন আকিকা করা সম্ভব না হলে পরে সুবিধামতো সময়ে আকিকা করা যাবে। একটি ছাগল জবাই করার দ্বারা আকিকার সুন্নত আদায় হয়ে যায়। তবে ছেলেশিশু হলে দুটি ছাগল জবাই করা উত্তম। আকিকার গোশত কোরবানির গোশতের মতো সবাই খেতে পারে। (শরহুল মুহাজ্জাব : ৮/৪৩০)
নামের সঙ্গে বাবার নাম
বংশপরিচয়ের জন্য ছেলে বা মেয়ের নামের সঙ্গে বাবার নাম বা বংশের নাম ব্যবহার করা উত্তম। বিয়ের পর নারীর নামের সঙ্গে নিজ বংশের নামের পরিবর্তে স্বামীর বংশের নাম অথবা পিতার নামের পরিবর্তে স্বামীর নাম যুক্ত করা অযৌক্তিক। নবীপত্নীরা ও সাহাবায়ে কেরামের স্ত্রীরা এমনটি করেননি।
মা-বাবার নামের সঙ্গে মিল রাখা
সন্তানের নাম মা বা বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা জরুরি নয়। একইভাবে জরুরি নয় ছেলের নামের সঙ্গে বাবার নাম ও মেয়ের নামের সঙ্গে মায়ের নাম অথবা তার বিপরীত উল্লেখ করা। অর্থাৎ মা-বাবার নামের সঙ্গে মিল থাকা গুরুত্বপূর্ণ নয়, নামটি সুন্দর হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মনিবন্ধন
শিশুর নামকরণের পর তার জন্মনিবন্ধন করা উচিত। এতে তার নাগরিক অধিকার ও জাতীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়। চিকিৎসাসেবা, শিক্ষালাভ ও আন্তর্জাতিক পরিষেবাগুলো প্রাপ্তির পথ সুগম হয়। ভবিষ্যতে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আইনগত ক্ষেত্রে সুবিধা গ্রহণ করা সহজ হয় এবং জটিলতামুক্ত হওয়া যায়।
সঠিকভাবে নাম লেখা উচিত
প্রথম স্কুল বা বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিশুর নাম ও মা-বাবার নাম সঠিকভাবে লেখা উচিত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্ব বেশি।
জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস বা কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র সঠিক নাম পূর্ণরূপে লেখা কর্তব্য। তা না হলে নানা সমস্যা ও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে
যোগাযোগ
সরাসরি WhatsApp-এ যোগাযোগ করুন:
Asadullah
Raipura, Narsingdi, Bangladesh
MBBS Session: 2020-21
Founder-Chairman, MD, Directorate Head, Owner, CEO, Consultant
Doctor’s Matrimony BD, Doctor Consultancy,
and Asadullah TV.BD
Founder Member & Director:
Narsingdi Helth Services & Research Center
Narsingdi Medical College Hospital
Phone: +880 1568-318976
Email: drasadullahmedicalconsultant@gmail.com