বিয়ের পূর্বে প্রেম
বিয়ের আগে সম্পর্ক করা নিয়ে ইসলামের অবস্থান কি?
নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামবিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ‘আপনার জিজ্ঞাসা’। জয়নুল আবেদীন আজাদের উপস্থাপনায় এনটিভির জনপ্রিয় এ অনুষ্ঠানে দর্শকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিশিষ্ট আলেম ড. মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ।
আপনার জিজ্ঞাসার ৮৪০তম পর্বে একজন থেকে জানতে চেয়েছেন, বিয়ের আগে সম্পর্ক করা নিয়ে ইসলামের অবস্থান কি? অনুলিখন করেছেন মোহাম্মদ সাইফ আহমেদ।
প্রশ্ন : বিয়ের আগে সম্পর্ক করা নিয়ে ইসলামের অবস্থান কি?
উত্তর : বিয়ের আগে সম্পর্ক করা ইসলামে ভয়ংকর হারাম। কারণ, ইসলাম বিবাহপূর্ব অবৈধ যত সম্পর্ক আছে সবগুলোকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ এই সম্পর্ক। এসব সম্পর্ক সমাজকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যুবক-যুবতীকে এসব সম্পর্ক নষ্ট করে দিচ্ছে। এইগুলো বিকৃত কাজ। মানুষ শালীন জীবন-যাপন করবে। সেখানে এসব বিকৃত চিন্তার কাজ করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়। এসব অবৈধ সম্পর্ক দেখা গেছে তার পুরো জীবনকেই নষ্ট করে দিতে পারে। আবার দেখা যায় যুবক-যুবতীদের এসব সম্পর্ক পরিবারকেও ক্ষতিগ্রস্থ করে। সুতরাং এসব থেকে দূরে থাকা উচিত। রাসুল (সা.) এসব সম্পর্কে জেনার পর্যায়ের অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন। এমন সম্পর্ক কোনোভাবেই ইসলামে বৈধ নয়। এটা স্পষ্ট বক্তব্য
ভালোবাসা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
ভালোবাসা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন বিষয়। ভালোবাসা আমরা আল্লাহু তাআলার কাছ থেকে রহমত হিসেবে পেয়েছি। ইসলামে ভালোবাসা শব্দটি ইতিবাচক। আল্লাহু রাব্বুল আলামিন তার বান্দারদের ইতিবাচক দিক সবসময় পছন্দ করেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনুল কারিমে বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ নিষ্ঠাবানদের ভালবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভালোবাসা একটি আপেক্ষিক ও দ্বৈত বিষয়। এটি মূলত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার ফল। মানুষ ভালোবাসার ক্ষেত্রে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। বিষয়টির ওপর মানুষের হাত না থাকায় রাসুল (সা.)-ও আপন স্ত্রীদের পালা বণ্টন করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার যতটুকু সাধ্য ছিল আমি ইনসাফ করার চেষ্টা করেছি— আর যে বিষয়টি আমার সাধ্যে নেই (অর্থাৎ কোনো স্ত্রীর প্রতি বেশি ভালোবাসা), সে বিষয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না।’ (সুনানে তিরমিজি, ৩/১৮৫, হাদিস : ১১৪০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ৪/৪১৪)
তবে ভালোবাসা মানেই অবৈধ নয়। কিছু কিছু ভালোবাসা শরিয়তে কাম্য। সেটার প্রতি শরিয়ত উৎসাহ দিয়েছে। ভালোবাসার প্রকারভেদ জানা থাকলে— বিষয়টি আরও স্পষ্ট ও বোধধগম্য হয়ে উঠবে।
এক. বৈধ ভালোবাসা
বৈধ ভালোবাসা হলো স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা। স্বামী-স্ত্রীর মাঝের ভালোবাসা হচ্ছে পবিত্র ও কাঙ্ক্ষিত। ইসলাম এই ভালোবাসার প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুল (সা.) তাঁর স্ত্রীদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতেন। তাদের মন জয় করার চেষ্টা করতেন। তাদের নিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করতেন।
হাদিস শরিফে আছে, ‘রাসুল (সা.) আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌঁড় প্রতিযোগিতা করেছেন।’ আয়েশাকে নিয়ে মসজিদে তিনি আবিসিনীয়দের খেলা দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন, যার চরিত্র সুন্দর, তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (রিয়াদুস সালিহিন, হাদিস : ১/১৯৭)
বিয়ের আসল উদ্দেশ্য হলো- শান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যদি কোনো স্বামী স্ত্রীর দিকে দয়া ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায় তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দিকে দয়া ও রহমতের দৃষ্টি নিয়ে তাকান।’ এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, তাদের প্রতি রহম করা ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামীর কাছে ভালোবাসা চায়। স্বামীদের উচিত, স্ত্রীদের ভালোবাসা ও তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা।
বিয়ের দ্বারা অনেক জৈবিক চাহিদা পূরণ হয়। তবে তা শুধু বৈষয়িক ব্যাপারের মধ্যে সীমিত নয়। বরং বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসাপূর্ণ ও আবেগময় পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
দুই. অবৈধ ভালোবাসা
আজ আমাদের সমাজে যুবক-যুবতীদের মাঝে বিয়েপূর্ব যে অনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভালোবাসা সৃষ্টি হচ্ছে— ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ হারাম। ইসলাম কখনো এ ধরনের ভালোবাসা সমর্থন করে না। এটি মূলত যৌন তাড়নাপ্রসূত একটি বিষয়। যুবক-যুবতীরা বেলাল্লাপনা চরিতার্থ করার জন্য ভালোবাসায় আবদ্ধ হন। যখন যৌন তাড়না নিঃশেষ হয়ে যায় তখন ভালোবাসায় ভাটা পড়ে। তবে একে-অপরের ভালোবাসা যদি শুধু তাদের মনে লুকায়িত থাকে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে শরিয়ত লঙ্ঘন না করে, তাহলে সে ভালোবাসায় কোনো ক্ষতি নেই।
হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসে, তা লুকিয়ে রাখে, নিজেকে পবিত্র রাখে এবং এই অবস্থায় মারা যায়— সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে।’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস : ৩০/৭৪)
সবচেয়ে বড় কথা হলো- নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য তিনি তো আল্লাহর কাছে অবশ্যই বিনিময় পাবেন। তবে ভালোবাসার কারণে যদি অবৈধ কাজে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে তা অবশ্যই হারাম। এটি একটি মানসিক রোগ— যার আশু চিকিৎসা প্রয়োজন।
বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রেম করা যাবে? ইসলাম কি বলে
প্রেম মানুষের অন্তরের একটি বিশেষ অবস্থার নাম, যা কারো প্রতি আবেগ, গভীর অনুভূতির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়। প্রকৃত প্রেম হলো মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি প্রেম, যা ছাড়া অন্য কোনো মানুষ ঈমানদার হতে পারবে না। দুনিয়ায় কেউ কাউকে ভালোবাসলে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মা ও রক্তের আত্মীয়দের প্রতি প্রেমও মহান আল্লাহ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত করে দেন।
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, সওয়াবের আশায় কোনো মুসলমান যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করে, তা তার সদকা হিসেবে গণ্য হয়। (মুসলিম : ১২/১৪, হাদিস : ১০০২)
কিন্তু বর্তমানে প্রেম বলতে যা প্রচলিত হয়ে গেছে, তা নিছক একটি অবৈধ সম্পর্ক। যে সম্পর্ক মানুষকে পাপের অতল সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। এ এক মরীচিকা, যা তাকে আল্লাহর রহমত থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়।
এই মোহ তাকে দিন দিন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত করে শয়তানের পূজায় ব্যস্ত করে দেয়। ইতালির পিজায় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম প্রেম সত্যি ব্যক্তির ভাবনার পরিবর্তন ঘটায়। পিজা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডোনাটেলা মারাজ্জিতি ২০ জন সদ্য প্রেমে পড়া যুগলের ওপর একটি গবেষণা চালান। এই গবেষণায় তিনি যাদের সম্পর্কের বয়স ছয় মাসেরও কম, তাদের আহবান জানান।
গবেষণায় তিনি দেখতে চেয়েছেন যে সারাক্ষণ ভালোবাসার মানুষটির কথা ভাবার ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কেমন হতে পারে। গবেষণায় মারাজ্জিতি ছেলেমেয়েদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন সদ্য প্রেমে পড়া তরুণ-তরুণীদের ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির রক্তের সেরোটোনিনের পরিমাণ একই মাত্রায় রয়েছে। (সুত্র : বাংলানিউজ২৪)
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা : মোনাফিকুন, আয়াত : ৯) ওই আয়াতে যাদের ভালোবাসা জায়েজ ও ইবাদত, তাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে যে তারা যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে।
তাহলে যে সম্পর্কগুলো মহান আল্লাহ হারাম করেছেন, সেই সম্পর্ক যদি কাউকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে দেয়, তবে তা কতটা জঘন্য হবে? আল্লাহ হেফাজত করুন।
সাইকোলজিস্ট রবার্ট স্টেনবার্গ ভালোবাসাকে তিনটি উপাদানের মধ্যে ভাগ করেছেন। সেই উপাদানটিকে একটি ত্রিভুজের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করেছিলেন। সেই তিনটি উপাদানের মধ্যে অন্যতম হলো আবেগ (যৌন অথবা রোমান্টিক আকর্ষণ)। (জি নিউজ) যেই আকর্ষণ মানুষকে ব্যভিচারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
তাই কাউকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যেও তার সঙ্গে বিবাহপূর্ব প্রেম নামে যে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে, তা করার কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন জাগতে পারে, অনেকের ক্ষেত্রে তা হয়তো শারীরিক সম্পর্কে না-ও গড়াতে পারে, সে ক্ষেত্রেও কি তা হারাম হবে? এর উত্তর খোঁজার জন্য এই হাদিসগুলোতে চোখ বোলানো যেতে পারে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চোখের ব্যভিচার হলো (বেগানা নারীকে) দেখা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো (তার সঙ্গে) কথা বলা (যৌন উদ্দীপ্ত কথা বলা)। (বুখারি, হাদিস : ৬২৪৩)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, দুই চোখের ব্যভিচার হলো (বেগানা নারীর দিকে) তাকানো, কানের ব্যভিচার যৌন উদ্দীপ্ত কথা শোনা, মুখের ব্যভিচার আবেগ উদ্দীপ্ত কথা বলা, হাতের ব্যভিচার (বেগানা নারীকে খারাপ উদ্দেশ্যে) স্পর্শ করা আর পায়ের জিনা ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়া এবং মনের ব্যভিচার হলো চাওয়া ও প্রত্যাশা করা। (মেশকাত, হাদিস : ৮৬)
মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন সে তার মনের মানুষকে না দেখে থাকতে পারে না। সে দূরে থাকলেও কমপক্ষে তার ছবি দেখে অথবা তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে, কমপক্ষে তাকে নিয়ে স্বপ্নের বাসরে হারিয়ে যায়, যার প্রতিটি স্তরকেই উল্লিখিত হাদিসগুলোতে হারাম বলা হয়েছে। কারো প্রতি সত্যি দুর্বলতা চলে এলে, পারিবারিকভাবে তাকে বিয়ে করে নেওয়া উচিত। বিয়ে করার দৃঢ়সংকল্প থাকলেও কোনো বেগানা নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম। আর বেশির ভাগ প্রেমের শেষ পরিণতিই হয় বিচ্ছেদ, ধোঁকা। এটি শয়তানের মরীচিকা।
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম করা কি জায়েজ?
বেগানা পুরুষের সাথে বেগানা নারীর প্রেম পিরিত হারাম। ইসলামে প্রেম জায়েজ তবে সেটা আপনার বিবাহিত স্ত্রীর সাথে। কিন্তু সেই প্রেম হতে হবে বাবার প্রতি সন্তানের যে প্রেম থাকে, প্রতিবেশির প্রতি প্রতিবেশির যে প্রেম থাকে। যদি আপনার কোন যুবতী মেয়ের প্রতি যৌন উত্তেজিত প্রেম থাকে তাহলে সেই প্রেম একেবারেই জায়েজ নয়।
বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম। “স্বাধীনভাবে লালসা পূরণ কিংবা গোপনে লুকিয়ে প্রেমলীলা করবে না” (সূরা আল মায়িদা: ৫) এরপর সূরা নূর এর ৩০ নং আয়াতে পুরুষদের চোখ নীচু রাখতে এবং লজ্জা স্থান হিফাজত করতে বলা হয়েছে। ৩১ নং আয়াতে নারীদেরও একই কথা বলা হয়েছে, পর্দা করার কথা বলা হয়েছে আর নারীরা কাদের সাথে সাক্ষাত করতে পারবে তাদের একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে।
সূরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে পর্দা করার নির্দেশ আরো পরিস্কার ভাষায় বলা হয়েছে। যেখানে দৃষ্টি নীচু ও সংযত রাখা, লজ্জা স্থান হিফাজত করার কথা এবং পর্দা করার কথা বলা হয়েছে আর সূরা মায়িদাতে গোপন প্রেমলীলাকে নিষেধ করা হয়েছে সেখানে বিবাহ পূর্ব প্রেম বৈধ হতে পারে কি করে? এটা হারাম। জিনা তথা অবৈধ শারীরীক সম্পর্ক হারাম। (সূরা ইসরা আয়াতঃ ৩২) (সূরা ফুরকানঃ ৬৮) জিনার নিকট যাওয়াই নিষেধ অর্থাৎ যে সকল জিনিস জিনার নিকটবর্তী করে দেয় তার কাছে যাওয়াই নিষেধ। বিবাহ পূর্ব প্রেম নর-নারীকে জিনার নিকটবর্তী করে দেয় আর জিনা মারাত্মক একটি কবিরা গুণাহ।
বিবাহপূর্ব প্রেম অনেক সময় বান্দাহকে শিরকের নিকটবর্তী করে দেয়। কারণ অনেক সময় তারা একে অপরকে এতটাই ভালবাসা শুরু করে দেয় যে প্রকার ভালবাসা পাওয়ার দাবীদার একমাত্র আল্লাহ। (সূরা বাকারাঃ১৬৫) শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন ও কি নিবৃত্ত হবে? সূরা আল মায়েদাহ, আয়াত নং ৯০ থেকে ৯১।
আসলে ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা মানুষকে গুনাহ থেকে বাঁচতে বিভিন্ন উপায় বলে দেয়।প্রেম করলে শয়তান অবশ্যই জিনা করতে প্রলুব্ধ করবে। ইসলামে বিয়ের আগে প্রেম করা হারাম।
ভালোবাসা: ইসলাম কী বলে?
ছোঁয়াছে রোগের মতো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নামে একটি দিবস এখন অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের যুবসমাজও অবলীলায় ও মহাসমারোহে পালন করছে। এটি বিজাতীয়, নির্লজ্জ ও নগ্ন সংস্কৃতি। মুসলিম যুবসমাজকে ধ্বংস করার অতীত ষড়যন্ত্রেরই বর্তমান রূপ হচ্ছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আজ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি, সভ্যতার নামে অসভ্যতা, বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনা দ্বারা পুরো মুসলিম যুবসমাজকে বিপথগামী ও চরিত্রহীন করার জন্য মরণপণ চেষ্টা চলছে। কালের বিবর্তনে আজ আমাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। মুসলমানেরা আজ আপন সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে অন্যদের সংস্কৃতি গ্রহণ করছে।
বর্তমানে ভালোবাসা মানেই যুবক-যুবতীর অবৈধ মেলামেশা, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা, যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক বালেগ নারী-পুরুষের ওপর পর্দার বিধান রক্ষা করা ফরজ। ইসলাম বিয়েপূর্ব নারী-পুরুষের কোনো সম্পর্ককেই বৈধতা প্রদান করে না। চাই তা যেভাবেই হোক না কেন। দেখা-সাক্ষাৎ, চিঠিপত্র আদান-প্রদান, পারস্পরিক কথাবার্তা এই সবই নাজায়েজ ও মারাত্মক গুনাহ। এ বিষয়ে অসংখ্য কুরআনের আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
ভালোবাসা একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটি মূলত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার ফল। মানুষ ভালোবাসার ক্ষেত্রে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। বিষয়টির ওপর মানুষের হাত না থাকায় রাসূল সা:ও আপন স্ত্রীদের পালা বণ্টন করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার যতটুকু সাধ্য ছিল আমি ইনসাফ করার চেষ্টা করেছি, আর যে বিষয়টি আমার সাধ্যে নেই (অর্থাৎ কোনো স্ত্রীর প্রতি বেশি ভালোবাসা), সে বিষয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না।’ [সুনানে তিরমিজি : ৩/১৮৫, হাদিস নং ১১৪০, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৪/৪১৪] তবে ভালোবাসা মানেই অবৈধ নয়। কিছু কিছু ভালোবাসা শরিয়তে কাম্য। সেটার প্রতি শরিয়ত উৎসাহ প্রদান করেছে।
ভালোবাসার প্রকারভেদ : ১. বৈধ ভালোবাসা : বৈধ ভালোবাসা হলো স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা। স্বামী-স্ত্রীর মাঝের ভালোবাসা হচ্ছে পবিত্র ও কাক্সিত। ইসলাম এই ভালোবাসার প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূল সা: তাঁর স্ত্রীদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতেন। তাদের মন জয় করার চেষ্টা করতেন। তাদের নিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করতেন। হাদিস শরিফে আছে, ‘রাসূল সা: হজরত আয়েশা রা:-এর সাথে দৌঁড় প্রতিযোগিতা করেছেন।’ আয়েশাকে নিয়ে মসজিদে তিনি আবিসিনীয়দের খেলা দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন, যার চরিত্র সুন্দর, তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ [রিয়াদুস সালিহিন, ১/১৯৭]
বিয়ের আসল উদ্দেশ্য হলো, শান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। হাদিসে আছে, রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘যদি কোনো স্বামী স্ত্রীর দিকে দয়া ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায় তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার দিকে দয়া ও রহমতের দৃষ্টি নিয়ে তাকান।’ এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, তাদের প্রতি রহম করা ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামীর কাছে ভালোবাসা চায়। স্বামীদের উচিত, স্ত্রীদের ভালোবাসা ও তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা।
বিয়ের দ্বারা অনেক জৈবিক চাহিদা পূরণ হয়। তবে তা শুধু বৈষয়িক ব্যাপারের মধ্যে সীমিত নয়। বরং বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসাপূর্ণ ও আবেগময় পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
২. অবৈধ ভালোবাসা আজ আমাদের সমাজে যুবক-যুবতীদের মাঝে বিবাহপূর্ব যে অনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভালোবাসা সৃষ্টি হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ হারাম। ইসলাম কখনো এ ধরনের ভালোবাসা সমর্থন করে না। এটি মূলত যৌন তাড়নাপ্রসূত একটি বিষয়। যুবক-যুবতীরা পাশবিকতা চরিতার্থ করার জন্য ভালোবাসায় আবদ্ধ হন। যখন যৌন তাড়না নিঃশেষ হয়ে যায় তখন ভালোবাসায় ভাটা পড়ে। তবে একে-অপরের ভালোবাসা যদি শুধু তাদের মনে লুকায়িত থাকে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে শরিয়ত লঙ্ঘন না করে, তাহলে সে ভালোবাসায় কোনো ক্ষতি নেই। হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসে, তা লুকিয়ে রাখে, নিজেকে পবিত্র রাখে এবং এই অবস্থায় মারা যায় সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে।’ [কানজুল উম্মাল : ৩০/৭৪] সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য তিনি তো আল্লাহর কাছে অবশ্যই বিনিময় পাবেন। তবে ভালোবাসার কারণে যদি অবৈধ কাজে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে তা অবশ্যই হারাম। এটি একটি মানসিক রোগ। যার আশু চিকিৎসা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ছেলেমেয়ের মাঝে যদি ভালোবাসা থাকে এবং তারা বিয়ের প্রতীক্ষায় থাকেন সে ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত ছেলেমেয়ের সেই সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া। ছোটখাটো বিষয় বিবেচনায় না এনে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়াই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘ভালোবাসায় আবদ্ধ দুইজন পুরুষ-মহিলার মাঝে বিয়ের চেয়ে উত্তম কোনো ব্যাপার নেই।’ এই হাদিসটির প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমাদের কাছে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। এক ব্যক্তি রাসূল সা:-এর নিকট এসে বলল, আমার যতেœ একটি ইয়াতিম বালিকা আছে। দুইজন ব্যক্তি তাকে বিয়ে করতে চায়। একজন দরিদ্র, অন্যজন ধনী। কিন্তু ইয়াতিম বালিকাটি দরিদ্র লোকটিকে ভালোবাসে এবং তাকেই বিয়ে করতে চায়। তার কথা শুনে রাসূল সা: বলেন, ‘ভালোবাসা আবদ্ধ দুইজনের মাঝে বিয়ের চেয়ে আর কী উত্তম হতে পারে?’
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম একটি প্রায়োগিক ধর্ম। কারো সাথে ভালোবাসা হয়ে যাওয়াটা একটি স্বভাবগত বিষয়। ইসলাম এই স্বভাবগত বিষয়টিকে শরিয়তসম্মত রূপদানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। যাতে ছেলেমেয়ে অবৈধ কোনো কর্মে লিপ্ত না হতে পারে। বেশির ভাগ বাবা-মা সামান্য কারণ দেখিয়ে, বা নিজেদের বংশমর্যাদা রক্ষার অজুহাতে ভালোবাসায় আবদ্ধ দুইজন ব্যক্তির মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। ফলে তারা নিজেরাও বিপদে পড়েন, সন্তানদেরও বিপদে ফেলেন। অনেক সন্তান জেদি হয়ে থাকে। তারা বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে অন্য জীবন বেছে নেয়। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তা ছাড়া বাবা-মা যখন জোর করে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তকে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন, তখন সন্তান পরিবারে নিজেকে নিঃস্ব ও অসহায় ভাবে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই পরে সে তালাক-ডিভোর্সের মতো জঘন্য কোনো অপরাধ করে। মোদ্দাকথা পরিবারের কোনো সন্তানের প্রতি যখন জোর করে কোনো বিষয় চাপিয়ে দেয়া হয় অথবা তাদের সিদ্ধান্ত ও আবেগকে পূর্ণরূপে অবজ্ঞা করা হয়, তখন তাদের মাঝে জেদ, হিংসা-বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতার মতো ভয়ঙ্কর অমানবিক দোষগুলো তাদের অবচেতন মনেই আয়ত্ত হয়ে যায়। আর এগুলো নিজের বাবা-মা, ভাইবোন এমনকি নিজের জীবনের প্রতি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করে না। পরিবারে যদি ভালোবাসা ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে তাহলে সেই পরিবারের সন্তানেরা মানবীয় জঘন্য প্রবৃত্তিগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিকতা চর্চা করতে পারে। তখন পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হয়। অনেকে প্রিয় মানুষকে না পেয়ে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে মাদকাসক্ত হয়ে যায়। সেই সাথে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকাসক্তদের অনেকেই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অথবা পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে না হওয়ার কারণে প্রাথমিক অবস্থায় মাদক গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে তা নেশায় পরিণত হয়। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ ছিনতাই, চাঁদাবাজির মতো ঘটনাও ঘটায়। এ জন্য উচিত বংশমর্যাদা বা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতাকে মূল মানদণ্ড না বানিয়ে বরং দ্বীনদারিকে মানদণ্ড বানানো। উভয়ের মাঝে চরিত্রগত দ্বীনদারির দিক থেকে বড় ধরনের পার্থক্য না থাকলে সেই সম্পর্ককে প্রত্যাখ্যান না করে বিয়ের ব্যবস্থা করাই শ্রেয়। রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের কাছে এমন প্রস্তাব আসবে যাদের দ্বীনদারির ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট ও নিশ্চিত, তাহলে তোমরা তাদের বিয়ের জন্য নির্ধারিত করে নাও। যদি এমন না করো তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা, ফাসাদ ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে।’
প্রেম করা হারাম কেন?
প্রশ্নঃ প্রেম করা হারাম কেন?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
পরনারী এবং পরপুরুষের মধ্যকার প্রেম নিঃসন্দেহে হারাম। কেননা,
১. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُواْ الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ وَلاَ مُتَّخِذِي أَخْدَانٍ
তোমাদের জন্যে হালাল সতী-সাধ্বী মুসলমান নারী এবং তাদের সতী-সাধ্বী নারী, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তোমাদের পূর্বে, যখন তোমরা তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর তাদেরকে স্ত্রী করার জন্যে, কামবাসনা চরিতার্থ করার জন্যে কিংবা গুপ্ত প্রেমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে নয়। (সূরা মায়িদা ৫)
২. তাছাড়া এজাতীয় প্রেম নর-নারীকে জিনার নিকটবর্তী করে দেয়। আর জিনা মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ। জিনা তথা অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক হারাম এবং যে সকল জিনিস জিনার নিকটবর্তী করে দেয় তাও হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلا تَقرَبُوا الزِّنى إِنَّهُ كانَ فاحِشَةً وَساءَ سَبيلًا
আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। (সূরা ইসরা ৩২)
৩. প্রেম করলে শয়তান অবশ্যই জিনা করতে প্রলুব্ধ করবে। প্রেমিক-প্রেমিকা নির্জনতা কামনা করবে। আর এটা হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
أَلاَ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّكَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
শুনে রাখ, কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সঙ্গে নিভৃতে একত্রিত না হয় অন্যথায় শয়তান অবশ্যই তৃতীয় জন হিসাবে হাযির থাকে। (ইবনু মাজাহ ২৩৬৩, তিরমিযি ২১৬৫)
৪. অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
اَلْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظْرُ وَالْاُذُنَانِ زِنَاهُمَا الْاِسْتِمَاعُ وَاللِّسَانُ زِنَاهُمَا الْككَلَامُ وَالْيَدُ زِنَاهُمَا الْبَطْشُ وَالرِّجْلُ زِنَاهُمَا الخُطَا وَالْقَلْبُ يَهْوِىْ وَيَتَمَنَّى وَيُصَدِّقُ ذَالِكَ الْفَرْجُ اَوْ يُكَذِّبُه
দুই চোখের ব্যভিচার হল হারাম দৃষ্টি দেয়া, দুই কানের ব্যভিচার হল পরনারীর কণ্ঠস্বর শোনা, যবানের ব্যভিচার হল অশোভন উক্তি, হাতের ব্যভিচার হল পরনারী স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার হল গুনাহর কাজের দিকে পা বাড়ান, অন্তরের ব্যভিচার হল কামনা-বাসনা আর গুপ্তাঙ্গঁ তা সত্য অথবা মিথ্যায় পরিণত করে। (মেশকাত ১/৩২)
বলা বাহুল্য, এর সবগুলোই ধীরে ধীরে হারাম-প্রেমে অনুপ্রেশ করে থাকে।
৫. এছাড়াও হারাম-প্রেম অনেক সময় বান্দাহকে শিরকের নিকটবর্তী করে দেয়। কারণ অনেক সময় তারা একে অপরকে এতটাই ভালবাসা শুরু করে দেয় যে প্রকার ভালবাসা পাওয়ার দাবীদার একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّـهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّـهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّـهِ
আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। (সূরা বাক্বারা ১৬৫)
والله اعلم بالصواب
কোরআন-হাদিয়ে প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে
ভালবাসার শিরক
তাওয়াক্কুল, ভয় ও আশার মতই একটি ইবাদত ‘ভালবাসা’ (الحب والمحبة)। ভালবাসার ক্ষেত্রেও উপরের জাগতিক ও ঈমানী দুটি পর্যায় আছে। জাগতিক ভালবাসা ইবাদত নয়, তবে জাগতিক ভালবাসা যদি আল্লাহর বিধান পালনের বিপরীতে দাঁড়ায় তবে তা পাপ। পিতামাতা, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, উপকারী মানুষ ও অন্যান্য বিভিন্ন মানুষকে মানুষ জাগতিকভাবে ভালবাসে। এরূপ ভালবাসার উৎস জাগতিক সম্পর্ক, মেলামেশা, দেখাশুনা ইত্যাদি।
ঈমানী ভালবাসার তিনটি দিক রয়েছে: (১) আল্লাহকে ভালবাসা (حب الله), (২) আল্লাহর জন্য ভালবাসা (الحب لله) এবং (৩) আল্লাহর সাথে ভালবাসা (الحب مع الله)। আল্লাকে ভালবাসা হয় কেবলমাত্র তাঁরই জন্য আর কারো জন্য নয়। আর এ ভালবাসার সাথে থাকে গভীর অলৌকিক ভয়, আশা ও অসহায়ত্বের ও ভক্তির প্রকাশ। এরূপ ভালবাসাই ইবাদত। আল্লাহর জন্য ভালবাসতে হয় যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর আল্লাহর সাথে ভালবাসা হলো শিরক। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আল্লাহর জন্য নয়, বরং তার নিজের কারণে ভালবাসা বা অলৌকিক ভক্তি, ভয় ও অসহায়ত্বের সাথে ভালবাসা শিরক। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
‘‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে, কিন্তু যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসা দৃঢ়তম।’’[1]
মুশরিকগণ দাবি করত যে, তারা তাদের উপাস্যদেরকে ভালবাসত ‘আল্লাহর প্রিয়’ হওয়ার কারণে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের হৃদয়ে এ সকল উপাস্যের প্রেমই ছিল মূল। এদের মর্যাদায়, প্রশংসায় কিছু বললে তারা খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠত। পক্ষান্তরে একমাত্র আল্লাহর মর্যাদা, প্রশংসা ও গুণকীর্তন করলে তারা বিরক্ত হতো। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَحْدَهُ اشْمَأَزَّتْ قُلُوبُ الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِالآَخِرَةِ وَإِذَا ذُكِرَ الَّذِينَ مِنْ دُونِهِ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ
‘‘একমাত্র আল্লাহর কথা বলা হলে যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে যারা তাদের উল্লেখ করা হয়ে তারা আনন্দে উল্লসিত হয়।’’[2]
[1] সূরা (২) বাকারা: ১৬৫ আয়াত।
[2] সূরা (৩৯) যুমার: ৪৫ আয়াত।
৫. ৩. ২. ২. ৭. আনুগত্যের শিরক
আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের একটি বিশেষ দিক তাঁর ‘হাকামিয়্যাত’ বা হুকুম, বিধান বা ফয়সালা দানের অধিকার ও ক্ষমতা। আল্লাহর মহান নামগুলির অন্যতম ‘আল-হাকাম’ অর্থাৎ বিচারক বা বিধানদাতা। যিনি প্রতিপালক তাঁরই অধিকার তার প্রতিপালিত সৃষ্টির জন্য বিধান প্রদান করার। মানুষ যেমন আপেক্ষিক অর্থে অন্যের রাবব বা প্রতিপালক হতে পারে, তেমনি আপেক্ষিক অর্থে বিধানদাতা, বিচারক ইত্যাদি হতে পারে। মহান আল্লাহর দেওয়া নির্দেশর আওতায় বা যেখানে তিনি মানুষের অধিকার দিয়েছে সেখানে মানুষ বিধান প্রণয়ন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত ও সামগ্রিক অধিকার ও ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহর। একমাত্র স্রষ্টা ও সর্বজ্ঞ মহাজ্ঞানী প্রতিপালক হিসেবে তিনিই জানেন সৃষ্টির কল্যাণ কিসে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আর্ন্তজাতিক সকল ক্ষেত্রে মহান আল্লাহকে একমাত্র হাকাম বা বিচারক ও বিধানদাতা বলে বিশ্বাস করা তাওহীদুর রুবূবিয়্যাতের অংশ। আর তাঁর উলূহিয়্যাতের দাবি যে, বান্দা তাঁর হুকুমের আনুগত্য করবে। এজন্য আনুগত্য ইবাদতের অন্যতম প্রকাশ। মহান আল্লাহ বলেন:
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلا
বল, ‘তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে হুকুমদাতা মানব? যদিও তিনিই তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।’’[1]
অন্যত্র তিনি বলেন:
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
‘‘তারা কি জাহিলীযুগের বিধিবিধান কামনা করে? দৃঢ়প্রতয়ী বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান দানে আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কে?’’[2]
আল্লাহর বিধানবালি তাঁর রাসূলের (ﷺ) মাধ্যমেই পাওয়া যায়। তিনি যে বিধান প্রদান করেন তাই আল্লাহর বিধান। কাজেই তাঁর সকল বিধান সর্বান্তকরণে মেনে নেওয়াই ঈমান। আল্লাহ বলেন:
فَلا وَرَبِّكَ لا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
‘‘কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার উপর অর্পন না করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে না নেয়।’’[3]
তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা ও ভালবাসার ন্যায় আনুগত্যেরও লৌকিক ও অলৌকিক দুটি পর্যায় রয়েছে। ‘অলৌকিক বিশ্বাসজাত আনুগত্য’ একমাত্র মহান আল্লাহরই নিমিত্ত। অন্য কাউকে এরূপ আনুগত্য করলে তা শিরক বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন;
وَلا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ
‘‘যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় নি তার কিছুই ভক্ষণ করো না। তা অবশ্যই পাপ। শয়তান তার বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়; যদি তোমর তাদের আনুগত্য কর তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হবে।’’[4]
এখানে কাফিরদের আনুগত্য করাকে শিরক্ বলা হয়েছে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لا إِلَهَ إِلا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
‘‘তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পন্ডিতগণকে এবং সংসার-বিরাগীগণকে রবব-প্রতিপালক রূপে গ্রহণ করেছে, এবং মরিয়ম তনয় মাসীহকেও। কিন্তু তারা শুধু এক ইলাহের ইবাদত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তারা যা শরিক করে তা থেকে তিনি কত পবিত্র!’’[5]
ইহূদী-খৃস্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, বিভিন্নভাবে তারা আলিম ও দরবেশদেরকে ‘রাবব’ হিসেবে গ্রহণ করেছে:
(১) তারা বিশ্বাস করত যে, আলিম, দরবেশ, সাধু বা সেন্টগণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। বিশেষত মৃত্যুর পরে তারা অলৌকিক কল্যাণ, অকল্যাণ ও বিশ্ব পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করেন। এজন্য তারা এ সকল সেন্ট, সান্তা বা সাধুদের মুর্তি তৈরি করত, তথায় মানত, নযর বা ভেট প্রদান করত, তাদের কবরের নিকট ইবাদতগাহ তৈরি করত এবং তাদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান থেকে ‘বরকত’ লাভের জন্য সচেষ্ট থাকত। তাদের ধর্মীয় ইতিহাস এবং বিভিন্ন হাদীস থেকে বিষয়গুলি জানা যায়।
(২) তারা পোপ-পাদরিগ ও সাধুদের ‘ইসমাত’ বা অভ্রান্ততায় (infallibility) বিশ্বাস করত। তারা বিশ্বাস করত ও করে যে, পবিত্র আত্মার প্রেরণায় তারা কাশফ, ইলহাম ও ইলমু লাদুন্নী লাভ করেন। সেগুলির আলোকে তারা ধর্মের যে বিধান প্রদান করেন তাই চূড়ান্ত। তাদের সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে না। সাধারণ মানুষদের জন্য ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন বা ধর্মীয় বিধান জানা সম্ভব নয়। ‘বাইবেলে’ কি আছে বা নেই তা বড় কথা নয়। পোপ বা ধর্মগুরুগণ কি ব্যাখ্যা বা নির্দেশ দিলেন তাই বড় কথা। এ সকল পোপ-পাদরি কখনোই সরাসরি ধর্মগ্রন্থের গুরুত্ব অস্বীকার করত না। সাধারণত তারা ‘ইল্লাত’ ও ‘হিকমাত’ বা কারণ ও দর্শন দেখিয়ে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করত ও করে। এ বিষয়টি অমুক কারণে ফরয বা হারাম করা হয়েছে, কাজেই অমুক বা তমুক কারণে তা তোমার জন্য বা সকলের জন্য এখন হালাল বা হারাম। সাধারণ অনুসারীরা তাদের এরূপ বিধানকে চূড়ান্ত বলে মেনে নিত।
এভাবে তারা রুবূবিয়্যাত বা প্রতিপালনের বিষয়ে আলিম ও দরবেশদেরকে আল্লাহর শরীক বানাতো। আর প্রতিপালনের শিরক আবশ্যম্ভাবীভাবে ইবাদতের শিরকে নিপতিত করে। তাদের অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাসের কারণে তারা তাদেরকে ডাকত ও তাদের জন্য মানত উৎসর্গ ইত্যাদি ইবাদত করত। অনুরূপভাবে তাদের ‘ইসমাত’ ও হাকামিয়্যাতের বিশ্বাসের কারণে তারা তাদের চূড়ান্ত ও নিঃশর্ত আনুগত্য করত। কুরআনের বক্তব্য থেকে তাদের এ দু প্রকারের শিরকই সুস্পষ্ট। আয়াতের প্রথমে তাদের রুবূবিয়্যাতের শিরকের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে এবং শেষে ইবাদতের শিরকের কথা বলা হয়েছে। একটি যয়ীফ সনদের হাদীস থেকে তাদের এ শিরকের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু জানা যায়।
গুতাইফ ইবনু আ‘ইউন (غطيف بن أعين) নামক দ্বিতীয় শতকের একজন অজ্ঞাত-পরিচয় তাবি-তাবিয়ী বলেন, প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুসআব ইবনু সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (১০৩ হি) তাকে বলেছেন, সাহাবী আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) বলেন,
سَمِعْتُ رسول الله (ﷺ) يَقْرَأُ فِي سُورَةِ بَرَاءَةٌ ( اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ ) قَالَ أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ
‘‘আমি শুনলাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূরা তাওবায় পাঠ করছেন: ‘তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পন্ডিতগণকে এবং সংসার-বিরাগীগণকে রবব-মালিক রূপে গ্রহণ করেছে’। তিনি বললেন, ইহূদী-খৃস্টানগণ তাদের (আলিম-দরবেশদের) ইবাদত করত না বটে, কিন্তু তারা যখন তাদের জন্য কোনো কিছু হালাল করে দিত, তখন তারা তাকে হালাল বলে মেনে নিত। আর তারা যখন তাদের উপর কোনো কিছু হারাম করে দিত, তখন তারা তা হারাম বলে মেনে নিত।’’[6]
ইমাম তাবারী তাঁর তাফসীরে গুতাইফের সূত্রে হাদীসটি সংকলন করেছেন। তার বর্ণনায় হাদীসটির ভাষা নিম্নরূপ:
قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّا لَسْنَا نَعْبُدُهُمْ فَقَالَ أَلَيْسَ يُحَرِّمُوْنَ مَا أَحَلَّ اللهُ فَتُحَرِّمُوْنَهُ وَيُحِلُّوْنَ مَا حَرَّمَ اللهُ فَتُحِلُّوْنَهُ؟ قَالَ قُلْتُ بَلَى قَالَ فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ
‘‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে উক্ত আয়াতটি পাঠ করতে শুনে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না! তিনি বলেন, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা তা তোমাদের জন্য হারাম করলে তোমরা কি তা হারাম বলে গ্রহণ কর না? আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা তা হালাল করলে তোমরা কি তা হালাল বলে মেনে নাও না? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেন, এ-ই হলো তাদের ইবাদত করা।’’[7]
হুযাইফা (রাঃ), ইবনু আববাস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী বলেছেন যে, ইহূদী খৃস্টানদের পন্ডিত-দরবেশগণ যখন আল্লাহর বিধান উল্টে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করত তখন তারা তা মেনে নিত। আর এই আনুগত্যই ছিল তাদের ‘রবব’ মানা।[8]
এখানে লক্ষণীয় যে, ‘আনুগত্য’ও ভয়, ভালবাসা ইত্যাদির মত স্বাভাবিক কর্ম। সাধারণভাবে তা ইবাদত নয়। এজন্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত শিরক হলেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য অবৈধ নয়। ইসলামী নির্দেশের বিপরীত নয় এমন বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য ইসলামে বৈধ বরং নির্দেশিত। কুরাআন-হাদীসে পিতামাতা, শাসক- প্রশাসক, আলিম-উলামা প্রমুখের আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীনের বিধান না জানলে আলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করে পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী নির্দেশের বিপরীত কোনো মানুষের আনুগত্য করলে তাতে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পাপ হবে, তবে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার অপরাধ হবে না। যদি মানবীয় ভালবাসা, ভয়, লোভ ইত্যাদি কারণে কারো নির্দেশ মত আল্লাহর বিধানের বিরোধী কাজ করে তবুও তা শিরক বলে গণ্য হবে না। আমরা দেখেছি যে, এরূপ ভয়জনিত আনুগত্যের ভিত্তিতে শিরক বা কুফরী কর্মে লিপ্ত হলেও তা শিরক-কুফর বলে গণ্য হবে না।
পক্ষান্তরে কাউকে প্রশ্নাতীত চূড়ান্ত আনুগত্যের যোগ্য বলে বিশ্বাস করে তার আনুগত্য করলেই শুধু তা শিরক বলে গণ্য হবে। যেমন মনে করা যে, কুরআন-হাদীসে যা-ই থাক, অমুক যেহেতু বলেছেন যে, এ কর্মটি আমার জন্য হালাল কাজেই তা আমার জন্য হালাল হয়ে গিয়েছে। অনুরূপভাবে যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের নির্দেশে যাই থাক না কেন, অমুক ব্যক্তি, আলিম, রাজা বা পার্লামেন্ট যা হালাল বলেছে তা প্রকৃতই হালাল এবং যা নিষিদ্ধ করেছে তা প্রকৃতই হারাম তাহলেও তা শিরক্ হবে। এক্ষেত্রেও মূলত বিশ্বাসই শিরক, কর্ম নয়।
এভাবে আমরা দেখছি যে, আনুগত্যও শিরক হতে পারে, যদি তা ইবাদত পর্যায়ের বা ‘চূড়ান্ত বিনয়-ভক্তি’ হিসেবে হয়। ইহূদী খৃস্টানদের আনুগত্য ছিল এ পর্যায়ের আনুগত্য। শয়তানের বন্ধু বা মুশরিকদের আনুগত্যের বিষয়টিও একইরূপ। এখানে আনুগত্য কর্মে নয়, বিশ্বাসে। এখানে আনুগত্য হলো মৃত প্রাণীর মাংস ভক্ষণ বৈধ বলে বিশ্বাস করা।
আনুগত্যের শিরকের বর্ণনা দিয়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ (রাহ) বলেন: মুশরিকগণ তাদের আলিমগণ ও নেককার আবিদগণকে রাবব বা মালিক ও প্রতিপালন হিসেবে গ্রহণ করত। এর অর্থ এই যে, তারা এ আকীদা পোষণ করত যে, এ সকল আলিম বা বুজুর্গ যা হালাল বলেন তা প্রকৃতপক্ষেই হালাল ও বৈধ। আর যা কিছু এ সকল আলিম ও বুজুর্গ হারাম করেন তা প্রকৃতই নিষিদ্ধ, হারাম ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। … এর রহস্য এই যে, কোনো বিষয়কে হালাল বা বৈধ করা এবং হারাম বা অবৈধ করার অর্থ সৃষ্টির রাজত্বে এরূপ কার্যকর নিয়ম সৃষ্টি করা যে, অমুক কাজটি করলে তাতে শাস্তি পেতে হবে এবং অমুক কাজটি করলে তাতে শাস্তি পেতে হবে না। এরূপ সৃষ্টি ও পরিচালনা একমাত্র আল্লাহরই বিশেষণ এবং তাঁর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এখানে দুটি প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রথমত, কিভাবে একথা বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অমুক বিষয় হালাল করেছেন বা হারাম করেছেন? দ্বিতীয়ত, কিভাবে বলা হয় যে, অমুক ইমাম বা মুজতাহিদ একে হালাল বা হারাম বলেছেন?
এর উত্তর হলো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বক্তব্য বা নির্দেশনা আল্লাহর নির্দেশনা জানার সুনিশ্চিত প্রমাণ। যখন তিনি বলেন যে, অমুক বিষয় হালাল বা হারাম তখন নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, আল্লাহ তা হালাল বা হারাম করেছেন। আর মুজতাহিদদের বিষয় হলো, তাঁরা আল্লাহর ওহী থেকে বা ইজতিহাদের মাধ্যমে হালাল হারামের বিধানটি অবগত করান মাত্র।
এখানে উল্লেখ্য যে, যখন আল্লাহ কোনো রাসূল প্রেরণ করেন এবং মুজিযার মাধ্যমে তাঁর রিসালতের দায়িত্ব প্রমাণিত হয় এবং তাঁর জবানীতে আল্লাহ পূর্ববর্তী শরীয়তের কোনো হারাম বিষয় হালাল করেন তখন যদি কারো অন্তরে বিধানটি গ্রহণ করতে দ্বিধা ও আপত্তি দেখা যায় তবে তা দুটি কারণে হতে পারে। প্রথম কারণটি এরূপ হতে পারে যে, উক্ত ব্যক্তির অন্তরে নতুন বিধানটি প্রামাণ্যতায় সন্দেহ থাকবে। এক্ষেত্রে সে উক্ত রাসূলের রিসালতে অবিশ্বাসকারী বা কাফির বলে গণ্য হবে।
এরূপ দ্বিধা ও আপত্তির দ্বিতীয় কারণটি এরূপ হতে পারে যে, উক্ত ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, প্রথমে যে হারামের বিধানটি দেওয়া হয়েছিল তা রহিত বা পরিবর্তন করা যায় না। কারণ যে ব্যক্তির মাধ্যমে বিধানটি পাওয়া গিয়েছিল সে ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহ ‘উলূহিয়্যাত’ বা ‘ঈশ্বরত্বের’ কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন। অথবা তিনি মহান আল্লাহর মধ্যে ফানা বা বিলুপ্ত হয়েছিলেন এবং তারই সাথে ‘বাকা’ বা অস্তিত্ব পেয়েছিলেন। কাজেই তিনি যে কাজটি নিষেধ করেছেন, অথবা অপছন্দ করেছেন তার বিরোধিতা করলে সম্পদ বা সন্তানের ক্ষতি হতে পারে। এরূপ ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত। কারণ সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্তা বা ব্যক্তির ‘পবিত্র ক্রোধ ও বিরক্তি’ আছে বলে বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা সত্তা ‘পবিত্র বা অলঙ্ঘনীয়’ হালাল বা হারামের বিধান দিতে পারেন।[9]
[1] সূরা (৬) আন‘আম: ১১৪ আয়াত।
[2] সূরা (৫) মায়িদা: ৫০ আয়াত।
[3] সূরা (৪) নিসা:
[4] সূরা আন‘আম, ১২১ আয়াত।
[5] সূরা তাওবা, ৩১ আয়াত।
[6] তিরমিযী, আস-সুনান ৫/২৭৮। তিনি বলেন, ‘‘হাদীসটি গরীব … গুতাইফ ইবনু আইউন হাদীস বর্ণনায় পরিচিত নয়।
[7] তাবারী, তাফসীর ১০/১১৪।
[8] তাবারী, তাফসীর ১০/১১৪-১১৫।
[9] শাহ ওয়ালি উল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/১৮৬-১৮৭।
৫. ৩. ২. ২. ৮. হজ্জ বা যিয়ারতের শির্ক
হজ্জ ইসলামের অন্যতম ইবাদত। ইবরাহীম (আঃ)-এর সময় থেকে আরবের মানুষদের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাবাগৃহের হজ্জ আদায়ের রীতি প্রচলিত ছিল। পরবর্তী যুগে যখন শিরকের প্রসার ঘটে তখন কাবাগৃহের হজ্জ ছাড়াও বিভিন্ন উপাস্যের সন্তুষ্টি, আশীর্বাদ, বর বা বরকত লাভের জন্য মুশরিকগণ আরো অনেক ‘পবিত্র’ স্থানে গমন করত বলে হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়। এগুলির মধ্যে ছিল ইয়ামানের ‘রিয়াম’ নামক মন্দির এবং খাস‘আমদের ‘যুল খুলাইসা’ নামক মন্দির।[1]
এ বিষয়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী বলেন: মুশরিকদের একপ্রকার শির্ক ছিল আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য হজ্জ। এর স্বরূপ এই যে, এরূপ মুশরিকগণ তাদের ‘উপাস্য-শরীকদের’ স্মৃতি বিজড়িত বিশেষ কিছু স্থানকে বরকতময় বলে বিশ্বাস করে এবং সে সকল স্থানে গমন ও অবস্থান এ সকল শরীকের নৈকট্য ও দয়া লাভের উপায় বলে বিশ্বাস করে। ইসলামী শরীয়তে এরূপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন[2]:
لا تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلا إِلَى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِ الرَّسُولِ (ﷺ) وَمَسْجِدِ الأَقْصَى (مَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِ الأَقْصَى وَمَسْجِدِي)
‘‘তিনটি মাসজিদ ছাড়া কোথাও সফরে যাওয়া যাবে না: মাসজিদুল হারাম, আমার মাসজিদ (মাসজিদে নববী) ও মাসজিদুল আকসা।’’[3]
[1] বুখারী, আস-সহীহ ৩/১১১০; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৯২৫-১৯২৬; তাবারী, তাফসীর ২৬/১৫৫।
[2] বুখারী, আস-সহীহ ১/৩৯৮, ৪০০, ২/৬৫৯, ৭০৩; মুসলিম, আস-সহীহ ২/১০১৪-১০১৫।
[3] শাহ ওয়ালি উল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/১৮৮।
৫. ৩. ২. ২. ৯. তাবার্রুকের শিরক
তাবার্রুক অর্থ বরকত অনুসন্ধান করা বা বরকত আশা করা। আরবের মুশরিকদের শিরকের একটি দিক ছিল তাবার্রুক বা বরকত লাভের জন্য কোনো স্থান বা দ্রব্যের প্রতি ভক্তি প্রকাশ। তারা কাবা ঘরের পাথর ইত্যাদি বরকতের জন্য কাছে রাখত, তাওয়াফ করত বা সম্মান করত। এ সম্পর্কে ইবনু ইসহাক তার ‘‘সীরাতুন্নবী’’ গ্রন্থে বিভিন্ন সাহাবী ও তাবেয়ীর সূত্রে লিখেছেন: ইসমাঈলের বংশে আরবদের মধ্যে শিরক প্রচলনের কারণ ছিল, এরা কাবাঘরের খুবই ভক্তি করত। তারা কাবাঘর ছেড়ে যেতে চাইতেন না। যখন তাদের বাধ্য হয়ে কাবাঘর ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো, তখন তারা সাথে করে কাবাঘরের তাযীমের জন্য কাবাঘরের কিছু পাথর নিয়ে যেতেন। তারা যেখানেই যেতেন সেখানে এই পাথরগুলি রেখে তার তাওয়াফ করতেন ও সম্মান করতেন। পরবর্তী যুগে ক্রমান্বয়ে এ সকল পাথর ইবাদত করার প্রচলন হয়ে যায়। পরে মানুষেরা খেয়াল খুশি মতো বিভিন্ন পাথর পূজা করতে শুরু করে।[1]
কাবাগৃহের পাথর ইত্যাদি ছাড়া আরো অনেক কিছু তারা ‘তাবার্রুকের নামে’ ভক্তি করত, আর আমরা দেখেছি যে, চূড়ান্ত বা অলৌকিক ভক্তি ও অসহায়ত্ব প্রকাশই ইবাদত। এভাবে তাবার্রুকের নামে তারা শিরকের মধ্যে &&নপতিত হতো। তাদের এ সকল ভক্তিকৃত দ্রব্যের মধ্যে ছিল ‘যাত আনওয়াত’ নামক একটি বৃক্ষ।
আবু ওয়াকিদ লাইসি (রাঃ) বলেছেন:
إنَّ رَسُولَ اللَّهِ (ﷺ) لَمَّا خَرَجَ إِلَى حُنَيْنٍ (خَرَجَنَا مَع رسول الله (ﷺ) إِلَى حُنَيْنٍ وَنَحْنُ حَدِيْثُوْ عَهْدٍ بِكُفْرٍ، وكَانُوا أَسْلَمُوا يَوْمَ الْفَتْحِ) مَرَّ بِشَجَرَةٍ لِلْمُشْرِكِينَ يُقَالُ لَهَا ذَاتُ أَنْوَاطٍ يُعَلِّقُونَ عَلَيْهَا أَسْلِحَتَهُمْ (سِدْرَةٌ يَعْكُفُوْنَ حَوْلَهَا ويُعَلِّقُوْنَ بِهَا أَسْلِحَتَهُمْ فَقَالُوا (قلنا) يَا رَسُولَ اللَّهِ اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ فَقَالَ النَّبِيُّ (ﷺ) سُبْحَانَ اللَّهِ هَذَا كَمَا قَالَ قَوْمُ مُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَرْكَبُنَّ سُنَّةَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ
‘‘মক্কা বিজয়ের পরে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সাথে হুনাইনের যুদ্ধের জন্য যাত্রা করি। তখন আমরা নও মুসলিম। মক্কা বিজয়ের সময়েই কেবল আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। চলার পথে তিনি মুশরিকদের একটি (বরই) বৃক্ষের নিকট দিয়ে যান, যে গাছটির নাম ছিল ‘যাতু আনওয়াত’। মুশরিকগণ এ গাছের কাছে বরকতের জন্য ভক্তিভরে অবস্থান করত এবং তাদের অস্ত্রাদি বরকতের জন্য ঝুলিয়ে রাখত। আমাদের কিছু মানুষ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, মুশরিকদের যেমন ‘যাতু আনওয়াত’ আছে আমাদেরও অনুরূপ একটি ‘যাতু আনওয়াত’ নির্ধারণ করে দেন। আমরা যখন এ কথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম, তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার! আল্লাহর কসম, মূসার কওম যেরূপ বলেছিল: মুশরিকদের মূর্তির মতো আমাদেরও মূর্তির দেবতা দাও[2], তোমরাও সেইরূপ বললে। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের সুন্নাত অনুসরণ করবে।’’[3]
ইহূদী-খৃস্টানদের এরূপ তাবার্রুক বিষয়ক যে শিরকের কথা হাদীস শরীফে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো নবী ও অলীগণের স্মৃতিবিজড়িত স্থান বা কবর মাজার থেকে বরকত লাভের চেষ্টা। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিষয়ে তাদের নিন্দা করেছেন এবং তাঁর উম্মাতকে এরূপ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অনেক সাহাবী থেকে এ অর্থে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ অর্থের কয়েকটি হাদীস আমরা ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরিচয় ও জীবনী বিষয়ক আলোচনায় উল্লেখ করেছি। আমরা দেখেছি, এরূপ এক হাদীসে তিনি বলেন, ‘‘তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মানুষেরা তাদের নবীগণ ও ওলীগণের কবরকে মসজিদ (ইবাদতগাহ) বানিয়ে নিত। তোমরা সাবধান! তোমরা কখনো কবরকে মসজিদ বানিয়ে নেবে না, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি এ কাজ থেকে।’’ …
এখানে লক্ষণীয় যে, কবর বা কবরস্থের পূজা নয় বা মৃতের কাছে চাওয়া নয়, কবরের কাছে মসজিদ বানানো বা সালাত আদায়ের জন্য রাসূলুল্লাহ(ﷺ) ইহুদি-নাসারাদেরকে কঠিন ভাষায় অভিশাপ করেছেন। মসজিদ ও মসজিদ কেন্দ্রিক সকল কর্ম আল্লাহর ইবাদত। অথচ আল্লাহর ইবাদত করার জন্য তিনি ঐসব জাতিকে লা’নত করলেন, শুধুমাত্র কবরের কাছে এই ইবাদতগুলি পালন করার কারণে। মসজিদ আল্লাহর ইবা্দতের জন্য। মসজিদে সালাত, দু‘আ ইত্যাদি যা কিছু করা হয় সবই আল্লাহর জন্য। মৃতের জন্য কিছুই নয়। কবরের নিকট মসজিদ বানানোর উদ্দেশ্য কবরবাসীর জন্য সালাত আদায় নয়, বরং আল্লাহর জন্য সালাত আদায়ে নেককার মানুষের সাহচার্য ও বরকত লাভ মাত্র। কিন্তু এরূপ তাবার্রুকের চিন্তাই শিরকের অন্যতম পথ। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কঠোরভাবে এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।
[1] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবীয়্যাহ ১/৯৪-৯৫।
[2] সূরা (৭) আ’রাফ: ১৩৮ আয়াত।
[3] ইবনু আবী আসিম, আস-সুন্নাহ, পৃ. ৩৭; তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৪৭৫। হাদীসটি সহীহ।
৫. ৩. ৩. শিরকের কারণ ব্যাখ্যা করা
কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা দেখি যে, পূর্ববর্তী মুশরিক সম্প্রদায়গুলি জীবিত, মৃত ও জড় বিভিন্ন সৃষ্টির ইবাদত করত। জীবিতদের মধ্যে তারা ফিরিশতা ও জিন্নগণের ইবাদত করত। আর মৃতদের মধ্যে তারা বিভিন্ন নবী, রাসূল ও নেককার মানুষদের ইবাদত করত। মৃতদের ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত কিছু সামনে রেখে তাঁদের ডাকত। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান অবলম্বন ছিল, তাদের সমাধি, মূর্তি, স্মৃতিবিজড়িত দ্রব্য বা স্থান ইত্যাদি। এ সকল বস্ত্তকে সামনে রেখে এ সকল মৃতদের আত্মার জন্য তারা উৎসর্গ, ভেট, জবাই, সাজদা ইত্যাদি পেশ করত এবং তাদের সাহায্য, সুপারিশ, নেক-নজর ইত্যাদি কামনা করত। যুগের আবর্তনে সাধারণ অনেক মুশরিক এ সকল মূর্তি, পাথর, কবর, বৃক্ষ ইত্যাদিকেই ‘প্রকৃত উপাস্য’ বলে মনে করত। তবে তাদের মধ্যকার পন্ডিত ও ধর্মগুরুগণ দাবি করত যে, এ সকল দ্রব্য প্রকৃত উপাস্য নয়, বরং এগুলির সাথে জড়িত মূল ব্যক্তির আত্মাই প্রকৃত ভক্তির পাত্র। এগুলি ভক্তি প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। এছাড়া চাঁদ, সুর্য ইত্যাদির ইবাদতও বিভিন্ন মুশরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এগুলিকে তারা স্রষ্টার শক্তির প্রকাশ বা উৎস হিসেবে এবং কেউ বা প্রকৃত মঙ্গল-অমঙ্গলের আধার হিসেবে ইবাদত করত।
এ সকল মুশরিকের অধিকাংশই পূর্ববর্তী নবীগণের শিক্ষালাভ করার পরেও বিভিন্ন কারণে কুফর-শিরকের মধ্যে নিপতিত হয়েছে। মক্কার কাফিরগণ, ইহূদীগণ, খৃস্টানগণ এবং এরূপ অন্যান্য জাতির অনেকেই আল্লাহর প্রতি ঈমান, নবীগণের প্রতি ঈমান, ফিরিশতাগণের প্রতি ঈমান, কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, আখিরাতের প্রতি ঈমান, তাকদীরের প্রতি ঈমান ইত্যাদি দাবি করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা শিরকে লিপ্ত ছিল। এ সকল মুশরিক আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করত। ঈসা (আঃ), উযাইর (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ) ও অন্যান্য নবীগণ ও ফিরিশতাগণের ইবাদত করত। এছাড়া কল্পিত অনেক ‘আল্লাহর প্রিয় বান্দার’ ইবাদতও তারা করত। কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা অনুসারে তাদের এ বিভ্রান্তির কারণসমূহ নিম্নরূপ:
৫. ৩. ৩. ১. বিশেষ বান্দাগণের ভক্তি বিষয়ক বিভ্রান্তি / ৫. ৩. ৩. ২. বিশেষ বান্দাদের সুপারিশ বিষয়ক বিভ্রান্তি
৫. ৩. ৩. ১. বিশেষ বান্দাগণের ভক্তি বিষয়ক বিভ্রান্তি
তাদের দাবি ছিল যে, এ সকল বান্দা আল্লাহর অতি প্রিয় এবং এদের সাথে আল্লাহর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। যে সম্পর্কের কারণে তারাও বিশেষ ভক্তি বা ইবাদতের পাওনাদার হয়েছেন। এ সকল মানুষের মুজিযা, কারামত বা অলৌকিক কর্মকান্ডকে তারা তাদের উলূহিয়্যাত বা ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করত। তাদের মতে, মহান আল্লাহই এদেরকে সে মর্যাদা দিয়েছেন কাজেই এদের ইবাদত করলে স্বয়ং আল্লাহ খুশি হন এবং এদের ইবাদত করলে এরাই মানুষদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেন। তাদের এ দাবি বা ‘যুক্তির’ বিষয়ে আল্ললাহ বলেছেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
‘‘আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য আউলিয়া (অভিভাবক বা বন্ধু) গ্রহন করেছে তারা বলে, আমরা তো এদের শুধু এজন্যই ইবাদাত করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে। তারা যে বিষয়ে মতবিরোধে লিপ্ত রয়েছে আল্লাহ তার ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’’[1]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারী বলেন: ‘‘মহান আল্লাহ বলছেন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদেরকে তারা ওলী হিসেবে গ্রহণ করেছে তারা আল্লাহ ছাড়া তাদেরকে ভালবাসে ও ইবাদত করে এবং বলে, হে আমাদের উপাস্যগণ, আমরা তো তোমাদের একমাত্র এজন্যই ইবাদত করছি যে, তোমরা আমাদেরকে আল্লাহর নিকট নৈকট্য ও মর্যাদা পাইয়ে দেবে এবং আমাদের হাজত প্রয়োজনের বিষয়ে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে।… প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুফাস্সির মুজাহিদ ইবনু জাব্র (১০৪ হি) বলেন: কুরাইশ তাদের মুর্তিগুলিকে এ কথা বলত এবং তাদের পূর্ববর্তীগণ ফিরিশতাগণকে তা বলত, ঈসা ইবনু মরিয়মকে (আঃ) তা বলত এবং উযাইর (আঃ)-কে তা বলত।’’[2]
আমরা দেখেছি যে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রাহ) তাদের এ যুক্তির ব্যাখ্য করেছেন। তাদের এ দাবির সারমর্ম হলো, এ সকল বুজুর্গের ইবাদত না করে শুধু আল্লাহর ইবাদত করলে তা কবুল হবে না। এ ছাড়া আল্লাহ অতি মহান ও অতি ঊর্ধ্বে। তার নৈকট্য লাভের জন্য সরাসরি তার ইবাদত কোনো কাজে আসবে না। বরং এ সকল বুজুর্গের ইবাদত করতে হবে যাতে তারা আল্লাহর নৈকট্য পাইয়ে দিতে পারেন।
৫. ৩. ৩. ২. বিশেষ বান্দাদের সুপারিশ বিষয়ক বিভ্রান্তি
মুশরিকদের দ্বিতীয় যুক্তি বা ‘দলিল’ ছিল সুপারিশের দলিল। তারা স্বীকার করত যে, সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। তবে এ সকল বান্দাকে আল্লাহ বিশেষভাবে ভালবাসেন, কাজেই এদের সুপারিশ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন না। মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَضُرُّهُمْ وَلا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلا فِي الأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
‘‘তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করে তারা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারে না উপকারও করতে পারে না। তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী (শাফায়াতকারী)। বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন কিছু জানাচছ যা তিনি জানেন না আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর মধ্যে? সুবহানাল্লাহ! তিনি সুমহান, সুপবিত্র এবং তোমাদের শিরক থেকে তিনি উর্ধেব।’’[3]
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো , কাফিররা একথা অস্বীকার করত না যে, আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ সকল উপাস্যের কোন ক্ষমতা নেই। এরা শুধু সুপারিশ করতে পারে। আল্লাহ যদি কোন কল্যাণ অকল্যাণের সিদ্ধান্ত নেন তাহলে তা রোধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ
‘‘যদি এদেরকে জিজ্ঞাসা কর: আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী কে সৃস্টি করেছেন? এরা উত্তরে অবশ্যই বলবে: আল্লাহ। বল: তোমরা বল তো, যদি আল্লাহ আামার কোনো অনিষ্ট করতে চান তাহলে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকছ তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি যদি আমাকে অনুগ্রহ করতে চান তাহলে কি তারা সে অনুগ্রহকে রোধ করতে পারবে? বল: আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট । নির্ভরকারীগণ তার উপরই নির্ভর করে।’’[4]
অর্থাৎ কাফিররা মেনে নিচ্ছে যে আল্লাহর ইচ্ছা রোধ করার ক্ষমতা এদের নেই। তার পরও তারা এদের ইবাদত করত, শুধুমাত্র এ যুক্তিতে যে, এরা আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করে তাদের প্রয়োজন মেটাবে এবং এদের ইবাদত করলে আল্লাহ খুশি হবেন, কারণ এরা আল্লাহর প্রিয়। আল্লাহ এখানে এবং কুরআনের সর্বত্র এই অদ্ভূত যুক্তির অসারতা বর্ণনা করেছেন। এদের যখন কোন ক্ষমতাই নেই এবং সব ক্ষমতাই যখন আল্লাহর তখন আল্লাহকে না ডেকে এদেরকে ডাকার মত বোকামি আর কি হতে পারে।
তাদের এরূপ কর্মের অসারতা ও স্ববিরোধিতা ধরিয়ে দিলে সকল যুক্তিতে পরাস্ত হলে তারা প্রচলনের দোহায় দিত। সকল ধর্মে করছে, যুগ যুগ ধরে পূর্বপুরুষরা করে এসেছেন, তারা ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ) ও অন্যান্য নবী থেকেই তো ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কাজেই তাদের কর্ম কিভাবে ভুল হতে পারে। একমাত্র আল্লাহর এবাদত করতে হবে এটা একটি অদ্ভূত নতুন কথা, উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য এসব কথা বলা হচ্ছে, যা আমরা আগে কখনো শুনিনি । এ বিষয়ক কিছু আয়াত আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি।
কুরআনের বর্ণনার আলোকে আমরা দেখি যে, শিরকের পথে তাদের পদক্ষেপগুলি ছিল নিম্নরূপ:
(১) তারা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা ও সকল ক্ষমতার মালিক। তাদের এ বিশ্বাস সঠিক ছিল।
(২) তারা বিশ্বাস করত যে, ফিরিশতাগণ নবীগণ ও অন্যান্য কিছু মানুষকে আল্লাহ বিশেষভাবে ভালবাসেন। ফিরিশতা ও নবীগণের বিষয়ে তাদের বিশ্বাস সঠিক ছিল, তবে অন্যান্যদের বিষয়ে তারা অনেক মনগড়া ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি করেছিল।
(৩) তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে পারেন। তাদের এ বিশ্বাসটি ছিল সত্য ও মিথ্যার সমন্বিত রূপ। মহান আল্লাহ জানিয়েছেন যে, ফিরিশতাগণ বা আল্লাহ প্রিয় বান্দাগণ সুপারিশ করবেন, তবে তা তাদের ইচ্ছামত নয়। বরং সুপারিশ বা শাফা‘আতের মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ যাকে অনুমতি প্রদান করবেন তিনি সুপারিশ করবেন কেবলমাত্র তার জন্য যার বিষয়ে আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন এবং যার উপরে আল্লাহ নিজে সন্তুষ্ট রয়েছেন। কাজেই সুপারিশের কল্পনা করে তাদের ইবাদত করা যাবে না। বরং আল্লাহর ইবাদত করতে হবে, আল্লাহ যার উপর সন্তুষ্ট হবেন তার জন্য সুপারিশের অনুমতি প্রদান করবেন।
(৪) তারা বিশ্বাস করত যে, এদের ইবাদত করলে আল্লাহ খুশি হন এবং এরাও সুপারিশ করে তাদের প্রয়োজনগুলি আল্লাহর নিকট থেকে আদায় করে দেন। এ বিশ্বাসটি ভয়ঙ্কর মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
[1] সূরা (৩৯) যুমার:৩ আয়াত।
[2] তাবারী, তাফসীর (বায়ানুল কুরআন) ২৩/১৯১।
[3] সূরা (১০) ইউনুস: ১৮ আয়াত।
[4] সূরা (৩৯) যুমার: ৩৮ আয়াত।
৫. ৩. ৩. ৩. শয়তানের প্রতারণা
শিরকের অন্যতম কারণ ছিল শয়তানের প্রতারণা। মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلائِكَةِ أَهَؤُلاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنْتَ وَلِيُّنَا مِنْ دُونِهِمْ بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُمْ بِهِمْ مُؤْمِنُونَ
‘‘যেদিন তিনি এদেরকে সকলকে একত্রিত করবেন এবং ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘এরা কি তোমাদেরকেই ইবাদত করত?’ ফিরিশতারা বলবে, ‘তুমি পবিত্র, মহান! আমাদের সম্পর্ক তোমারই সাথে, তাদের সাথে নয়। তারা তো ইবাদত করত জিন্নদের এবং এদের অধিকাংশই ছিল তাদের প্রতি বিশ্বাসী।’’[1]
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا رَأَى الَّذِينَ أَشْرَكُوا شُرَكَاءَهُمْ قَالُوا رَبَّنَا هَؤُلاءِ شُرَكَاؤُنَا الَّذِينَ كُنَّا نَدْعُوا مِنْ دُونِكَ فَأَلْقَوْا إِلَيْهِمُ الْقَوْلَ إِنَّكُمْ لَكَاذِبُونَ
‘‘মুশরিকগণ যাদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়েছিল (কিয়ামদের দিন) যখন তারা তাদেরকে দেখবে তখন বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, এরাই তো তারা যাদেরকে আমরা তোমার শরীক বানিয়েছিলাম, যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে ডাকতাম। তখন তাদের কথার প্রতি-উত্তরে তারা বলবে: তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।’’[2]
এ সকল আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, জিন্ন শয়তানগণ এ সকল উপাস্যের বেশ ধরে এদের নিকট প্রকাশিত হতো, এদেরকে স্বপ্ন, কাশফ, অলৌকিক দর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করত, বিভিন্ন অলৌকিক কার্য করিয়ে দিত। এভাবে এ সকল মুশরিক মনে করত যে, তারা ফিরিশতাদেরই ইবাদত করছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানের ইবাদত করত।
সাধারণভাবে শয়তান ধার্মিক মানুষদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নেককার বুজুর্গদের বিষয়ে ভক্তির মাত্রা বাড়াতে বাড়াতে শিরকের মধ্যে নিপতিত করার জন্য প্ররোচনা দেয় বলে হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়। নূহ (আঃ)-এর জাতির কুফর সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالُوا لا تَذَرُنَّ آَلِهَتَكُمْ وَلا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلا سُوَاعًا وَلا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
তারা বলল, ‘তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের ইলাহদেরকে (উপাস্যদেরকে), পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সূওয়া’আ, য়াগূস, য়া‘ঊক ও নাস্র-কে।’’[3]
হাদীস শরীফে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, প্রথম মানব সমাজ ছিল তাওহীদবাদী মুমিন মুসলিম। আদম (আঃ)-এর পরে কয়েক শতাব্দী এভাবেই মানুষ তাওহীদ ও ঈমানের উপর ছিল। এরপর আওলিয়া কেরামের ক্ষেত্রে অতিভক্তির কারণে ক্রমান্বয়ে সমাজে শিরকের শুরু হয়। সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে, তাফসীরে তাবারী ও অন্যান্য তাফসীরের গ্রন্থে এ বিষয়ক অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সকল বর্ণনার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: আদম সন্তানদের মধ্যে ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগূস, ইয়াঊক ও নাসর – এই পাঁচ ব্যক্তি খুব নেককার বুজুর্গ মানুষ ছিলেন। তাঁদের অনেক অনুসারী, ভক্ত ও মুরীদ ছিলেন, যারা তাঁদের বিলায়েতের বিষয়ে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। তাঁদের মৃত্যুর পরে তাঁদের বিষয়ে অতিভক্তিকারী কোনো কোনো অনুসারী শয়তানের ওয়াওয়াসায় বলেন: আমরা এদের মাজলিস বা স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলিতে এদের জন্য কিছু স্মৃতিচিহ্ন বা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে রাখি। আমরা যদি এঁদের ছবি বানিয়ে রেখে দিই তাহলে তা আমাদেরকে বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি করতে উৎসাহিত করবে। এরপর যখন এরাও মারা গেল তখন ইবলিস পরবর্তী যুগের মানুষদেরকে ওয়াসওয়াসা দিতে লাগল, তোমাদের পূর্ববর্তীগণ তো এঁদের শুধু শুধু ছবি করে রাখেননি। তারা তো এদের ‘ভক্তি’ করত এবং এদের ডাকার ফলেই তো তারা বৃষ্টি পেত। তখন সে যুগের মানুষেরা এঁদের পূজা করা শুরু করল।[4]
[1] সূরা (৩৪) সাবা: ৪০-৪১ আয়াত।
[2] সূরা (১৬) নাহল: ৮৬ আয়াত।
[3] সূরা (৭১) নূহ: ২৩ আয়াত।
[4] বুখারী, আস-সহীহ ৪/১৮৭৩, তাবারী, তাফসীর ২৯/৯৮-৯৯।
৫. ৩. ৩. ৪. বিভ্রান্ত ব্যক্তিদের অন্ধ-অনুসরণ
কুরআন-হাদীসের আলোকে আমরা দেখি যে, শিরকের অন্যতম কারণ পূর্ববর্তী বিভ্রান্ত ব্যক্তিদের অন্ধ-অনুকরণ। আমরা ইতোপূর্বে আরবের কাফিরদের প্রসঙ্গে দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কুরআনের মাধ্যমে তাদের শিরকের সকল যুক্তির অসারতা প্রমাণ করতেন তখন তারা সর্বশেষ যুক্তি হিসেবে সমাজের প্রচলন ও পূর্বপুরুষদের কর্মকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করত এবং শিরক পরিত্যগ করতে অস্বীকার করত।
ইহূদী-খৃস্টানদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সুস্পষ্ট। তাদের নিকট বিদ্যমান বিকৃত ‘বাইবেল’ সুস্পষ্টরূপে তাদের শিরকের অসারতা প্রমাণ করে। বাইবেলের অগণিত আয়াত একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির, মুর্তির বা প্রতিকৃতির পূজা ও উপাসনা কঠিনভাবে নিষেধ করে। বাইবেলের কোথাও ত্রিত্ববাদ এবং ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করার কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই। এ সকল বিষয় তাদের কাছে সুস্পষ্ট করার পরেও তারা তাদের শিরক পরিত্যাগ করতে রাজি হন না। মূলত তাদের যুক্তি একটিই, পৌল ও তার অনুসারী মুশরিকদের প্রতি তাদের ভক্তি এবং হাওয়ারী বা শিষ্যগণের নামে প্রচলিত কিছু মিথ্যা কথার ভিত্তিতে তাদেরকেও এরূপ মুশরিক মনে করে তাদের অনুসরণের দাবি। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ
‘‘বল, হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না এবং সে সম্প্রদায় ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’’[1]
[1] সূরা (৫) মায়িদা: ৭৭ আয়াত।
৫. ৩. ৩. ৫. নেতৃবৃন্দের অন্ধ আনুগত্য
অনেক সময় ব্যক্তি মানুষ নিজের বিবেক ও বুদ্ধি দিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু সমাজের নেতৃবৃন্দের অনুকরণ-প্রিয়তা বা তাদের বিরোধিতার অনাগ্রহ তাকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।
একজন সাধারণ মুশরিক যখন কুরআনের যুক্তিগুলি নিয়ে চিন্তা করে তখন শিরকের অসারতা ও তাওহীদের আবশ্যকতা বুঝতে পারে। মহান আল্লাহই একমাত্র প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই। কাজেই তাকে ছাড়া অন্যকে ডাকার, সাজদা করার, মানত করার, নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করার দরকার টা কি? আমরা দাবি করছি যে, মহান আল্লাহ কোনো কোনো বান্দাকে কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু এ দাবি আমরা ওহীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারছি না। তিনি কাউকে কোনো ক্ষমতা দিয়েছেন বলে কোথাও বলেন নি। তিনি তার কোনো নবী বা প্রিয় বক্তিত্বকে ডাকতেও নির্দেশ দেন। তিনি কোথাও বলেন নি যে, অমুক নবী, ফিরিশতা বা অমুক ব্যক্তিকে ডাক এবং তার কাছে সাহায্য চাও, মানত কর, ভেট দাও, তাহলে আমি খুশি হব। বরং তিনি বারংবার বলছেন যে, আমাকে ছাড়া কাউকে ডেক না। কেবল আমাকেই ডাক আমিই সব প্রয়োজন মেটাতে পারি। কাজেই আমি কেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকব বা তার ইবাদত করব? সকল যুক্তি ও বিবেকের দাবি তো এই যে, আমি শুধু মহান আল্লাহরই ইবাদত করব।
এভাবে একজন সাধারণ তার নিজের বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে শিরকের অসারতা বুঝতে পারে। কিন্তু সে তার এ চিন্তা ধর্মগুরু বা সমাজপতির মতামতের বিরুদ্ধে প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করে অথবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। অথবা এরূপ ধর্মগুরু বা সমাজপতিদের কাছে তার চিন্তা প্রকাশ করলে তারা বলে, আরে বাদ দে ওসব কথা! যারা পিতাপিতামহদের ধর্ম পরিত্যাগ করে নতুন কথা বলছে তাদের মত বেয়াদবদের কথায় কান দিবি না। যুগ যুগ ধরে সকলেই করছে, কেউ কিছু বুঝল না আর তুমি বেশি বুঝলে। অমুক, অমুক, তমুক বুজুর্গ, পাদরি, যাজক, ধর্মগুরু এরূপ বলেছেন ও করেছেন, তাদের কথা তোমার ভাল লাগে না! এরূপ করে অমুক এত কিছু পেয়েছেন, বেয়াদবি করে অমুক অমুক শাস্তি পেয়েছে, কাজেই সাবধান!! … ইত্যাদি বিভিন্ন যুক্তির কাছে দুর্বল চিত্ত মানুষের বিবেক খেই হারিয়ে ফেলে। সে নিজের বিবেকের ডাক প্রত্যাখ্যান করে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে।
এদের অবস্থা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন:
إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتُّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الأَسْبَابُ وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا
‘‘যখন অনুসৃতগণ অনুসরণকারিগণ সম্বন্ধে দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকার করবে এবং তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে এবং তাদের মধ্যকার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। এবং যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে, ‘হায়! যদি একবার আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটত তবে আমরাও তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন করল।’’’[1]
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ مَوْقُوفُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلا أَنْتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ. قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنِ الْهُدَى بَعْدَ إِذْ جَاءَكُمْ بَلْ كُنْتُمْ مُجْرِمِينَ. وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَنْ نَكْفُرَ بِاللَّهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَنْدَادًا
‘‘তুমি যদি দেখতে জালিমদেরকে যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে তাদেরকে দন্ডায়মান করা হবে, তখন তারা পরস্পর বাদ-প্রতিবাদ করবে। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম। যারা ক্ষমতাদর্পী ছিল তারা দুর্বলদেরকে বলবে, ‘তোমাদের নিকট সৎপথের দিশা আসার পর কি আমরা তোমাদেরকে তা থেকে বিবৃত্ত করেছিলাম? বস্তুত তোমরাই ছিলে অপরাধী। দুর্বলরা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, ‘প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবারাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তার শরীক স্থাপন করি।’’[2]
[1] সূরা (২) বাকারা: ১৬৬-১৬৭ আয়াত।
[2] সূরা (৩৪) সাবা: ৩১-৩৩ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা (১৪) ইবরাহীম: ২১ আয়াত।
৫. ৩. ৩. ৬. ইবাদতের অর্থ সম্পর্কে বিভ্রান্তি
ইতোপূর্বে আমরা খৃস্টানদের শিরকের বিষয়েও কুরআনের বিশ্লেষণ আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, ওহীর সাথে নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা সংযোগ করে ব্যাখ্যাকে বিশ্বাসে পরিণত করে তারা শিরকে নিমজ্জিত হয়। তাদের শিরকের ক্ষেত্রে কুরআন কারীমে অন্য একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রিত্ববাদ ও ঈসা (আঃ)-এর ঈশ্বরত্ব ছাড়াও তারা ঈসা (আঃ)-এর মাতা মারিয়াম (আঃ)-কে মা’বুদ হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ
‘‘আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?…’’[1]
খৃস্টান ধর্মগুরুগণ দাবি করেন যে, সাধারণ খৃস্টানগণ কখনোই মরিয়ামকে ত্রিত্ববাদের অংশ বা ঈশ্বর হিসেবে বিশ্বাস করেন না। বরং তারা তাকে মানুষ ও যীশুর মাতা হিসেবে ‘ভক্তি’ করেন, তার নামে মানত করেন, ভক্তির প্রকাশ হিসেবে তার নামে উৎসর্গ করেন বা তার মুর্তি তৈরি করে রাখেন। কিন্তু কখনোই তারা তাকে ‘ঈশ্বর’ বলে মনে করেন না, ঈশ্বরের কোনো অংশ বলেও মনে করেন না।[2]
বস্ত্তত ‘ইবাদতের’ ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞতাই তাদের এ সকল প্রলাপের কারণ। প্রকৃতপক্ষে তারা ‘ভক্তি’, ‘শ্রদ্ধা’ ইত্যাদির নামে তারা ‘মরিয়ম’ (আঃ)-এর ইবাদত করত। আমরা ইতোপূর্বে ইবাদতের অর্থ আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, অলৌকিক বা অপার্থিব প্রার্থনাই ইবাদতের মুল ও প্রধান প্রকাশ। আর প্রার্থনা বা দু‘আর কবুলিয়্যাতের জন্য মানত, নযর, উৎসর্গ, সাজদা ইত্যাদি করা হয়। খৃস্টানগণ এভাবেই মারইয়াম (আঃ)-এর ইবাদত করে। তারা তাঁকে আল্লাহ বা স্রষ্টা বলে দাবি করে না। তবে ‘ঈশ্বরের মাতা’ বা ‘আল্লাহর বিশেষ করুণা-প্রাপ্ত মানুষ হিসেবে’ ফিলিস্তিনে তাঁর কবরে এবং সকল গীর্জায় তাঁর মুর্তি তৈরি করে মুর্তির সামনে তাদের হাজত বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য অলৌকিক সাহায্যের আশায় তাঁরা কাছে প্রার্থনা করে। আর প্রার্থনা যেন ‘মা-মেরী’ তাড়াতাড়ি পূরণ করেন সে আশায় তার নিকট মানত, নযর ইত্যাদি পেশ করে বা সাজদা করে পড়ে থাকে।
[1] সূরা (৫) মায়িদা: ১১৬ আয়াত।
[2] Geoffrey Parrinder, Jesus in the Quran, pp 19, 62, 94, 133-141.
যোগাযোগ
সরাসরি WhatsApp-এ যোগাযোগ করুন:
Asadullah
Raipura, Narsingdi, Bangladesh
MBBS Session: 2020-21
Founder-Chairman, MD, Directorate Head, Owner, CEO, Consultant
Doctor’s Matrimony BD, Doctor Consultancy,
and Asadullah TV.BD
Founder Member & Director:
Narsingdi Helth Services & Research Center
Narsingdi Medical College Hospital
Phone: +880 1568-318976
Email: drasadullahmedicalconsultant@gmail.com